চল্লিশের দশকে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা

১৯৪৭-এর ভারত ভাগের পর অধিকাংশ উচ্চশিক্ষিতরা পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে ভারতে চলে যান। পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমানে বাংলাদেশে) সে সময় পাঁচ-ছয়শ চিকিৎসক ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের তত্কালীন ১৭ জেলার প্রায় সব শহরে অন্ততপক্ষে কলকাতা থেকে এমবিবিএস পাস করা একজন মুসলমান চিকিৎসক ছিলেন। হিন্দু চিকিৎসক ছিলেন কয়েক গুণ বেশি। পশ্চাত্পদ মুসলমানদের শিক্ষায় উৎসাহী করার মূল কারিগর পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, যিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি নিয়ম করেছিলেন, মেধাবীরা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রকৌশল ও চিকিৎসার মতো উচ্চশিক্ষায় ভর্তি তো হবেই, আবার নমিনেশন (কোটা) প্রথার মাধ্যমেও কিছু ছাত্র ভর্তি হতে পারবে। শেরেবাংলা কেবল সমাজের প্রয়োজনে এবং প্রার্থীর আগ্রহের ভিত্তিতে পশ্চাত্পদ মুসলমান ও নিম্নবর্ণের হিন্দু ছাত্রদের ম্যাট্রিক (বর্তমানে এসএসসি) ও উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় খুব ভালো ডিভিশন না থাকলেও ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং ও বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য উচ্চশিক্ষায় তাদের প্রবেশের দ্বার নমিনেশন (কোটা) প্রথার মাধ্যমে উন্মুক্ত করে দিলেন। এর ফলে বেশ কিছুসংখ্যক মুসলমান ছাত্ররা চিকিৎসা ও অন্যান্য উচ্চশিক্ষায় আসার সুযোগ পেল।

তখন দেশে কয়েকশ এলএমএফ চিকিৎসক ছিলেন। আরো ছিলেন প্রত্যেক গ্রামে ‘দেখে দেখে শেখা’ মধ্যবয়স্ক একাধিক স্বেচ্ছাসেবী নারী প্রসবধাত্রী এবং সে যুগে দাদি-নানিরা সামান্য আফিম দিয়ে শিশুদের ব্যথা নিরসনের চিকিৎসা করতেন। দেশে প্রায় ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বল্পমাত্রার আফিম বিক্রির জন্য নির্ধারিত দোকান ছিল। প্রচলন ছিল গাছগাছড়া থেকে তৈরি মান্ডার তেল মেখে ও বাঁশের কঞ্চি সাপোর্ট দিয়ে গ্রামগঞ্জে ভাঙা হাড়ের চিকিৎসা। এজন্য বরিশাল বিশেষভাবে খ্যাত ছিল। অবশ্য খুনখারাবিও বরিশালে বেশি হতো বলে বরিশালের সিভিল সার্জনের ভালো শৈল্যবিদের পরিচিতি হতো।

স্মরণ প্রয়োজন যে, পূর্ব পাকিস্তানে আয়ুর্বেদীয় ও হ্যানিম্যানের হোমিও চিকিৎসাও প্রচলিত ছিল। সাধনা ও শক্তি ঔষধালয় সারা বাংলাদেশে বহুল পরিচিত আয়ুর্বেদীয় শিল্প।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অংশে ব্রিটিশ সামরিক ব্যাটালিয়ন ছাউনি ছিল। সেটাকে রূপান্তর করে ১৯৪৬ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। ওই বছর এমবিবিএস ছাত্র ছিল মাত্র ১০ জন। অধ্যাপক মির্জা মাজহারুল ইসলাম, আবু আহমদ চৌধুরী, স্নায়ু মেডিসিনের আবদুল মান্নান, রেডিওলজির সোবহান প্রমুখ ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রথম ব্যাচের ছাত্র।

১৯৪৭ সালে দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্র ছিলেন মতিঝিলের বহুল পরিচিত জেনারেল প্র্যাকটিশনার ডা. আলী আজগর, ‘কুয়াশা’ নামে খ্যাত চাটুকদার লেখক এবং পরবর্তীতে ঢাকা ডেন্টাল কলেজের প্রথম প্রিন্সিপাল ডা. আবু হায়দার সাজেদুর রহমান (মাস্তানা)। ১৯৪৮ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে একবারে আটজন নারী শিক্ষার্থী ভর্তি হন। চক্ষু বিশেষজ্ঞ আলীম চৌধুরীও ১৯৪৮ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। আটজন ছাত্রীর অন্যতম ছিলেন সাহসী মনোয়ারা বিনতে রহমান। আশির দশকে তিনি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিভাগের মহাপরিচালক পদে উন্নীত হয়েছিলেন। ডা. মনোয়ারার খালা, মালেকা আলরাজী লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘পিএইচডি’প্রাপ্ত পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম মুসলমান নারী। ডা. মনোয়ারার বাবা ডা. আবদুর রহমান বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার প্রথম মুসলিম এমবিবিএস ডাক্তার। তিনি ময়মনসিংহ শহরে প্র্যাকটিস করতেন। তিনি পাকিস্তান আমলে বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা থেকে পাকিস্তান জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

১৯৪৯ সাল থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ১০০ জন শিক্ষার্থী নেয়া শুরু হলো। সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী, বাংলাদেশে কার্ডিওলজির স্রষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) এমএ মালিক, অ্যানাটমির অধ্যাপক এমএ সালাম, মুক্তিযুদ্ধে মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন সেক্টরের চিকিৎসক ফার্মাকোলজিস্ট ডা. হুমায়ুন আবদুল হাই এবং অত্যন্ত খ্যাতিমান রবীন্দ্র প্রাবন্ধিক ও ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ডা. আহমদ রফিক ছিলেন ১৯৪৯ সালের ছাত্র। পরবর্তী ব্যাচে ১৯৫০ সালের ছাত্র ছিলেন ফজলে রাব্বী, খন্দকার আলমগীর, ভদ্র কবির উদ্দিন প্রমুখ।

পঞ্চাশের দশকে পূর্ব পাকিস্তানে এমবিবিএস চিকিৎসক ছিলেন ২০০ জনের অধিক। প্যাথলজিস্ট কেএ মনসুর, (ডায়রিয়া ও কলেরা জীবাণু নির্ণায়ক মনসুর মিডিয়ার উদ্ভাবক), কাজী খালেক ও আনোয়ার আলী, নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ আলী আফজাল— প্রথম ডবল এফআরসিএস, ধাত্রী বিশেষজ্ঞ হাবিবুদ্দিন আহমেদ (তার নামে বহু চমকপ্রদ গল্প প্রচলিত), রেডিওথেরাপির ডা. এসএফ হক (শেরেবাংলার আত্মীয়), গ্রে’জ অ্যানাটমিখ্যাত অধ্যাপক এসআইএমজি মান্নান ও এমএ কাশেম, ‘মানিকগঞ্জের গোল্ড মেডেলিস্ট ডা. এমএন নন্দী, অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, মো. ইব্রাহিম, একে শামসুদ্দিন আহমদ, চক্ষু বিশেষজ্ঞ টি আহমদ, সার্জন কেএস আলম, কর্নেল এমএম হক প্রমুখ সবাই কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করা। ষাটের দশকে সার্জন কেএস আলম ছিলেন ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধুর পাশের বাড়ির বাসিন্দা। ডা. কেএস আলম ছিলেন নামকরা সাহসী সার্জন। রাজশাহীর ছাপড়া ওয়ার্ডে ইলা মিত্র নির্যাতনের শিকার হলে ডা. কেএস আলম তাকে চিকিৎসার জন্য ভারতে নিয়ে গিয়েছিলেন। এজন্য তাকে চাকরিজীবনে যথেষ্ট সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। গাইনি ও ধাত্রী বিশেষজ্ঞ জোহরা বেগম কাজী কলকাতা থেকে নয়, তিনি দিল্লির লেডি হার্ডিঞ্জ মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করেছিলেন প্রথম স্থান অধিকার করে স্বর্ণপদক নিয়ে। উল্লেখ্য, মহাত্মা মোহন দাস করম চাঁদ গান্ধীর দ্বিতীয় পুত্র রামদাস গান্ধী তার ছেলেবেলার খেলার সাথী সুন্দরী তম্বী ডা. জোহরা বেগম কাজীর প্রেমে পাগল ছিলেন। ভারতের হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির লক্ষ্যে মহাত্মা গান্ধীর একান্ত আবেদনে ডা. জোহরা বেগম কাজী রামদাসকে বিয়ে না করে পাকিস্তানে চলে এসেছিলেন পঞ্চাশের দশকে।

পূর্ব পাকিস্তানের আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার পুরোধা

থানা হেলথ কমপ্লেক্স, যেটিকে আমরা বর্তমানে উপজেলা বলে জানি— তার জন্মকথা লুকিয়ে আছে অন্যত্র। পূর্ব পাকিস্তানের গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবার প্রসারের যিনি চিন্তা করেছিলেন, প্রথম উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি কোনো চিকিৎসক ছিলেন না, ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি হলেন জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের বিশেষ বন্ধু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ভালো ছাত্র কিন্তু পুলিশ কর্মকর্তা আমুদে বাঘ শিকারি আবুল হাসনাত মোহাম্মদ শামছুল আলম। সার্জন কেএস আলম, লুত্ফর রহমান, ইব্রাহীম, শামসুদ্দীন, এমএন নন্দী, ডা. জোহরা কাজী ও আরো অনেকে ছিলেন ঢাকা পুলিশের সহমহাপরিদর্শক এএইচএম শামসুল আলমের বন্ধুজন। বুড়িগঙ্গার তীরে মিল ব্যারাকে পুলিশ কর্মকর্তা শামসুল আলমের বিরাট সরকারি বাসভবন ছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গ্রাম থেকে উচ্চশিক্ষা বা চাকরির সন্ধানে ঢাকায় আগত প্রায় সব উচ্চ মাধ্যামিক পাস তরুণকে কয়েক মাস বিনা খরচে আহার ও বাসস্থান জুটত আলম সাহেবের মিল ব্যারাকস্থ বাসভবনে, সবাই তার ভাতিজা বা ভাগ্নে বলে পরিচয় দিত।

ডাক্তার মনোয়ারা বিনতে রহমান ৪০ বছর বয়সে বিয়ে করেছিলেন ৫৫ বছর বয়সী অবিবাহিত সুদর্শন সাহিত্য, অর্থশাস্ত্র ও গল্পে পটু হাস্যরসিক পুলিশ কর্মকর্তা শামসুল আলমকে। তিরিশের দশকে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপক এমএন হুদা সাহেবদের সতীর্থ ভালো ছাত্র ছিলেন। তার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল থানার শাহবাজপুর গ্রামে। তিনি সর্বভারতীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিসে নির্বাচিত হয়েছিলেন, প্রথম কর্মস্থল ছিল বিপ্লবী ভারতীয়দের তীর্থস্থান মেদিনীপুরে ১৯৪৩ সালে। এ ভদ্রলোক তার অর্থনীতির জ্ঞানের কারণে পাকিস্তান আমলে পরিকল্পনা বোর্ডের সদস্য মনোনীত হয়েছিলেন, পাকিস্তানের মার্কিন অর্থনৈতিক উপদেষ্টাদের সুপারিশে। পূর্ব পাকিস্তানের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কাঠামো গঠনে শামসুল আলমের একটা বিরাট অবদান আছে। ষাটের দশকে তিনি এবং তার সহকারী পরিচালক ডাক্তার আবদুস সোবহান চৌধুরী মিলে প্রতিটি উপজেলায় থানা হেলথ কমপ্লেক্স সৃষ্টির পরিকল্পনা করলেন এবং পাকিস্তান পরিকল্পনা কমিশনে পাস করালেন। অর্থায়ন হবে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক। পাকিস্তানের উভয় অংশে ১০টি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও দুটি পোস্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিকেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করাচিতে জিন্নাহ পোস্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিকেল ইনস্টিটিউট ও ঢাকা আইপিজিএমআর স্থাপনের প্রস্তাবও তিনি পাস করান। এটা ষাটের দশকের শুরুর ঘটনা। এটিই কিন্তু আসলে পূর্ব পাকিস্তানে আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গোড়াপত্তন। ঠিক যেভাবে লন্ডন শহরের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গোড়াপত্তন করেছিলেন, এডউইন চ্যাডক, যিনি ডাক্তার ছিলেন না, ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার। শেখ মুজিবুর রহমান পশ্চিম পাকিস্তান গেলে অবশ্যই পরিকল্পনা কমিশনের শামসুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন, বুঝতে চাইতেন পাকিস্তান অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি। সেখানেই তার পরিচয় ঘটে ভবিষ্যৎ স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশে তার সচিব কুমিল্লার শাহরাস্তির ড. এমএ সাত্তার সিএসপির সঙ্গে।

১৯৫৭ সালে দ্বিতীয় মেডিকেল কলেজ চট্টগ্রামে, ১৯৫৮ সালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ এবং ১৯৬২ সালে সিলেট ও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ষাটের দশকে পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তানের কয়েকটি মেডিকেল স্কুল, মেডিকেল কলেজে রূপান্তরিত হয়। আটটি মেডিকেল কলেজ ষাটের দশকেই প্রতিষ্ঠিত হয়। এ নিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করি। একদিকে থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, অন্যদিকে মেডিকেল কলেজ। দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভিত গড়ে তোলার জন্য প্রতিটি মেডিকেল কলেজই ১০০ জন করে ছাত্র ভর্তি করা হতো। আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার, সে যুগে একই সঙ্গে এলএমএফ (লাইসেনসিয়েট মেডিকেল ফ্যাকাল্টি) স্কুলও চালু ছিল। আমি যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক ছিলাম, তখন সব চিকিৎসক ও মেডিকেল ছাত্র দাবি উঠাল দুই রকম মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থা নয়, এক রকম ব্যবস্থা চালু করতে হবে। আন্দোলনের ফলে এলএমএফ স্কুল বন্ধ করে দেয়া হয়। এলএমএফ চিকিৎসকদের জন্য দুই বছরের সংক্ষিপ্ত এমবিবিএস কোর্স চালু করা হয়। এলএমএফ চিকিৎসকরা ক্রমে এমবিবিএস চিকিৎসকে উন্নীত হন। সেই লক্ষ্যে মিটফোর্ড মেডিকেল স্কুল স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে রূপান্তরিত হয়। আজকের সদরঘাটের ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ তখনকার দিনে ন্যাশনাল স্কুল ও হাসপাতাল নামে পরিচালিত হতো। এ সময় পূর্ব পাকিস্তান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (পূর্ব জোন) খুব সক্রিয় ছিল। পূর্ব পাকিস্তানের সব এলাকার মানুষ যেন আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা পায়, তার জন্য পিএমএর পক্ষে আন্দোলন করতেন ডা. তৈয়ব আলী ও আহমদ রফিক। তারা পিএমএর (ইস্ট জোন) পক্ষে একটি ত্রৈমাসিক মেডিকেল সাময়িকী বের করতেন।

পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ছাত্ররা পূর্ব পাকিস্তানে মেডিকেল কলেজে পড়তে আসত। পশ্চিম পাকিস্তানে মাত্র একটি পুরনো মেডিকেল কলেজ ছিল। সেটি ছিল লাহোরে। মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, মিয়ানমার ও নেপাল থেকেও ছাত্ররা ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়তে আসত। ষাটের দশকের মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানেও সাত-আটটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তান থেকেও কিছু ছাত্র সেখানে পড়তে যেত বিশেষ বৃত্তি নিয়ে। পশ্চিম পাকিস্তানে ভর্তির জন্য ভালো ডিভিশনের প্রয়োজন হতো না। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সংখ্যালঘুদের জন্য পাকিস্তানের সব মেডিকেল কলেজে একটি বিশেষ কোটা ছিল। অতি ভালো ছাত্রদের পাশাপাশি তৃতীয় বিভাগ, এমনকি সাপ্লিমেন্টারিতে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করে কিছুসংখ্যক নিম্নবর্ণের সংখ্যালঘু ছাত্ররা ডাক্তারী পড়ার সুযোগ পেত, এদের অনেকে বর্তমানে বিলেত, আমেরিকা ও কানাডায় উচ্চপর্যায়ে কর্মরত।

মেডিকেল কলেজগুলোর তত্কালীন প্রিন্সিপালরা বিভিন্ন অধ্যাপকের সঙ্গে নিয়ে পাঁচ-ছয়টি ভর্তি কমিটি করে মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে সরাসরি ছাত্রদের ভর্তি করতেন। মেট্রিক-ইন্টারমিডিয়েটের ফলাফলের ওপর ছিল ৫০ নম্বর। আর ২৫ নম্বর থাকত ভর্তি কমিটির হাতে। ভর্তি কমিটি শিক্ষার্থীদের মফস্বলে আদি বাসস্থান, গ্রামের স্কুলে অধ্যয়ন এবং ছাত্রদের মূলত সেবার আগ্রহ বের করার চেষ্টা করতেন। লেখালেখি, কবিতা পাঠ, খেলাধুলা প্রভৃতি গুণ বলে বিবেচিত হতো। তারা কেন ডাক্তারি পড়তে এসেছে— নিজের ইচ্ছায় না মা-বাবার চাপে, গ্রামে যাবে কিনা— এসব জিজ্ঞেস করা হতো। বিভিন্ন কোটায় ভর্তি হতো প্রতি মেডিকেল কলেজে অন্য ২০ জন।

আইপিজিএমআর ‘ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিসিন অ্যান্ড রিসার্চ’ প্রতিষ্ঠিত হয় ষাটের দশকের শুরুতে। প্রথম পরিচালক ছিলেন বিলেতের স্যার জেমস ক্যামেরুন। আইপিজিএমআর বর্তমানে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে পরিচিত। শুরুতে আইপিজিএমআর যুগ্ম পরিচালক ছিলেন অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, এমআরসিপি। তার অবদানে বাংলাদেশে বহু পোস্ট গ্র্যাজুয়েট চিকিৎসক সৃষ্টি হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধে চিকিৎসকদের ভূমিকা

১৯৭১ সালের মধ্যে প্রায় নয়-দশ হাজার চিকিৎসক তৈরি হয়ে গেছে। চার হাজারের মতো ডাক্তার সে সময়ে বিদেশে ছিলেন। বাকিরা দেশে ছিলেন। স্মতব্য যে, তিন ডজনের বেশি চিকিৎসক মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি। এসব চিকিৎসকের অধিকাংশই শরণার্থী শিবিরগুলোয় চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। কয়েকজন ছিলেন বিভিন্ন সেক্টরে গেরিলাদের সঙ্গে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের এবং পরবর্তী দুই বছর বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সচিব ছিলেন শৈল্য বিশেষজ্ঞ ডা. টি হোসেন এফআরসিএস। তার বিশেষ সহকারী ছিলেন ডা. সৈয়দ মোদ্দাসের আলী, যিনি নব্বইয়ের দশকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিচালনা পর্ষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. সৈয়দ মোদ্দাসের আলী এফআরসিএস বর্তমানে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় বাংলাদেশ গবেষণা কাউন্সিলের এবং কমিউনিটি হেলথ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান। প্রথম পঞ্চবার্ষিক প্রণয়নে ডা. টি হোসেনের বিশেষ অবদান রয়েছে। তিনি মানবতাবাদী কমিউনিস্ট এমএন রায়ের ভাব শিষ্য ছিলেন।

একটা কথা না বললে ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকা শহরে কয়েকজন সাহসী দেশপ্রেমিক চিকিৎসক আহত মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপকভাবে সাহায্য করতেন, চিকিৎসা দিতেন, আর্থিক সহায়তা করতেন, তারা হলেন— ডা. আজিজুর রহমান এফআরসিএস, অধ্যাপক কেএস আলম এফআরসিএস, সুলতানা বেগম এমআরসিওজি, ডা. জোহরা কাজী, ডা. আহমদ রফিক, ডা. আলী আজগর, চক্ষু বিশেষজ্ঞ আলিম চৌধুরী, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ফজলে রাব্বি, নবাবপুরের জেনারেল প্র্যাকটিশনার ডা. এমএ করিম প্রমুখ। মুক্তিযুদ্ধে লন্ডনস্থ বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের বিশেষ অবদান রয়েছে। ময়মনসিংহের প্রথম মুসলিম এমবিবিএস ডাক্তার আবদুর রহমানের ছোট ছেলে চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. আবু হেনা সাঈদুর রহমান (খসরু ভাই) বিলেতে মুক্তিযুদ্ধের সময় লন্ডনস্থ ‘বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের’ (বিএমএ) প্রথম সভাপতি হিসেবে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালে লন্ডনস্থ বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন এবং প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আগরতলা সীমান্তে ৪৮০ শয্যার বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল, যার কমান্ডার ছিলেন মেজর এটিএম হায়দারের ছোট বোন ঢাকা মেডিকেল থেকে পাস করা ক্যান্টেন সিতারা বেগম এমবিবিএস। মূল সার্জন ছিলেন ডা. এমএ মোবিন ও ডা. জাফরুল্লাহ্ চৌধুরী, প্রধান এনেসথেটিস্ট ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের সদ্য পাস করা ডা. নাজিম উদ্দিন আহমেদ। তিনি বর্তমানে টঙ্গীতে বসবাস করেন, সেখানে স্কুল-কলেজ-ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করে জনসেবা অব্যাহত রেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধের ফিল্ড হাসপাতালে নার্সিং দায়িত্বে ছিলেন আসমা, রেশমা, পদ্মা, নীলিমা, গীতা, ইরা, সুলতানা কামাল এবং আরো অনেকে। এদের সঙ্গে বেশ কয়েকজন বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের বিভিন্ন বর্ষের ছাত্ররাও সহায়তা করত। ডা. কাজী কামরুজ্জামান, ডা. আলতাফুর রহমান, ডা. বরকত চৌধুরী ও আরো কয়েকজন চিকিৎসক লন্ডনস্থ বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে ভারতে এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে বঙ্গবন্ধু

১৯৭২ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের ফিল্ড হাসপাতাল ‘বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল’এর নাম পরিবর্তন করে ‘গণস্বাস্থ্য ও পুনর্বাসন কেন্দ্র’ রাখার পরামর্শ দেন এবং প্রাথমিকভাবে সাভারে ১৩ একর জমি সরকারিভাবে বরাদ্দ দেয়া হয়। গণস্বাস্থ্য দাতব্য ট্রাস্ট অবশ্য এসব জমির মূল্য পরিশোধ করেছে।

১৯৭২ সালের মে মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান আমাকে সাভার থেকে ডেকে পাঠালেন— সোমবার থেকে শুক্রবার পরপর পাঁচদিন, প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা, পুরো ৩ ঘণ্টা ধরে দেশ পুনর্গঠনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ করলেন। তিনি আমার সঙ্গে পুরো একদিন ব্রিটেনের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ব্রিটিশ ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (NHS) নিয়ে আলাপ করেছিলেন। শুনতে চাইছিলেন বিলেতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চিত্র। এটা কি সত্যি ইংল্যান্ড, ওয়েলস ও স্কটল্যান্ডের যেখানেই হোক না কেন বসবাস, তাদের প্রত্যেক পরিবারের চিকিৎসা সুবিধা আছে সরকারি ব্যবস্থাপনায়? তাদের প্রত্যেকের একজন ডাক্তার জিপি আছে? তার খুব ইচ্ছা ছিল তিনিও ব্রিটেনের মতো বাংলাদেশের সব মানুষের জন্য চিকিৎসা সুবিধা করে দেবেন।

প্রশ্ন করলেন, গ্রামগঞ্জের সব মানুষের জন্য যেহেতু বহু চিকিৎসক প্রয়োজন, সেক্ষেত্রে মেডিকেল শিক্ষকের সংখ্যা অপর্যাপ্ত হওয়া সত্ত্বেও কি দেশে নতুন মেডিকেল কলেজ স্থাপন করা যুক্তিসঙ্গত হবে? পুনরায় এলএমএফ শুরু করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে কি? তিনি বুঝলেন যে, কেবল অধিক চিকিৎসক থাকলেই হবে না, তাদের বহু সহকারী থাকতে হবে— নার্স, টেকনিশিয়ান। দরকার দরদি ভালো দক্ষ চিকিৎসক, যাদের থানা পর্যায়ে বসবাস করে জনসাধারণকে সেবা দেয়ার মনোবৃত্তি রয়েছে।

লন্ডন মিউনিসিপ্যালিটির প্রকৌশলী এডউইন চ্যাডউইক ব্রিটিশ পার্লামেন্টসংলগ্ন ওয়েস্ট মিনস্টার এলাকায় সাধারণ মানুষের জন্য চিকিৎসক সমাজ ও ব্রিটিশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের মতামত অগ্রাহ্য করে কেবল পর্যাপ্ত সংখ্যক টয়লেট, গোসলের জন্য পানির সরবরাহ এবং পয়ঃপ্রণালির ব্যবস্থা করে ডায়রিয়া-কলেরা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ব্যাপক হারে কমিয়ে ফেলেছিলেন। এই কাহিনী শুনে মুজিব ভাই খুব চমকিত হন। চ্যাডউইকের সাহসী উদ্যোগের কথা শুনে বঙ্গবন্ধু হেসে বলে উঠেছিলেন। ‘ইঞ্জিনিয়াররাও ডাক্তারি জানে কিন্তু ডাক্তাররা ইঞ্জিনিয়ারিং জানে না’, হা! হা!। ১৯৪৮ সালে বিলেতের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের স্রষ্টা ওয়েলসের কয়লা খনির শ্রমিক সমাজতান্ত্রিক নেতা এনুরিন বিভানের অবদানের কথা শুনে তিনি ব্যাপকভাবে মুগ্ধ হন। ব্রিটিশ যুক্তরাজ্যের সব অঞ্চলের সাধারণ মানুষ সমান চিকিৎসা পায়, সবার একজন জেনারেল প্র্যাকটিশনার চিকিৎসক আছে। সবাই ওষুধ বিনা খরচে পায়— এটি শুনে তিনি চমকিত হন, স্বাগত উক্তি করলেন ‘বাংলাদেশে কবে সেরূপ স্বাস্থ্য সুবিধা হবে’। কেবল পুঁজিবাদী সম্রাজ্যবাদী দেশগুলো থেকে ওষুধ আমদানি সীমাবদ্ধ না রেখে, তিনি প্রথমবারই সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো থেকে সুলভে ওষুধ বাংলাদেশে আমদানির ব্যবস্থা করলেন। এক্ষেত্রে ডা. টি হোসেন সাহেবের যেমন অবদান, তেমনি শেখ সাহেবের অবদান ছিল অপরিসীম। আমার সঙ্গে মুজিব ভাই আলাপের কিছু প্রতিক্রিয়ার প্রতিফলন দেখায় প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়। তিনি থানা হেলথ কমপ্লেক্সের গুরুত্ব বাড়িয়ে দেন। তখন স্বাস্থ্য খাতে আজকের চেয়ে অপেক্ষাকৃত ভালো বরাদ্দ ছিল। ঢাকা মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস কোর্সে ১২০-এর স্থলে ১৫০ জন ভর্তির ব্যবস্থা করলেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, চিকিৎসকদের গ্রামে যেতে হবে। গ্রাম থেকে শুরু করতে হবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভিত্তি। গ্রামের দাইদের শিক্ষা দিতে হবে আধুনিক প্রসব ব্যবস্থা। পরিবার পরিকল্পনার গুরুত্বও তিনি উপলব্ধি করেছিলেন বলেই তিনি গণস্বাস্থ্যের ছয়-আট শ্রেণীপড়া গ্রামের মেয়েদের দ্বারা গ্রামে গ্রামে স্বাস্থ্য প্ররোচনায় সম্মতি দিয়েছিলেন।

স্বাধীনতার পর আইপিজিএমআরের পরিচালক নিযুক্ত হন অধ্যাপক নুরুল ইসলাম। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুরের শরীরে পিত্তথলির প্রদাহ ধরা পড়ে। সে সময়ে আইপিজিএমআর, বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বড় কয়েকটি জেলা সদর হাসপাতালে পিত্তথলির পাথর অপসারণের চিকিৎসা থাকা সত্ত্বেও অধ্যাপক নুরুল ইসলাম চিকিৎসার জন্য বঙ্গবন্ধুকে বিদেশে পাঠানোর পরামর্শ দিলেন। শেখ মুজিবের চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। যে শৈল্যবিদ বঙ্গবন্ধুর পিত্তথলির অপারেশন করবেন, তার বঙ্গবন্ধুর অনেক কাছে চলে আসার সম্ভাবনা সম্ভবত জাতীয় অধ্যাপক নুরুল ইসলামকে পীড়িত করছিল। বাংলাদেশে অধ্যাপক বখতিয়ার হোসেন, এফআরসিএস, অধ্যাপক কেএস আলম এফআরসিএস, অধ্যাপক আসিরুদ্দিন এফআরসিএস, অধ্যাপক আলী আশরাফ এফআরসিএস, মনিরুজ্জমান এফআরসিএসের মতো কয়েকজন প্রথিতযশা সার্জন থাকা সত্ত্বেও আইপিজিএমআর পরিচালক মেডিসিনের অধ্যাপক নুরুল ইসলাম নিজে সঙ্গে করে বঙ্গবন্ধুকে বিদেশে গিয়ে উত্তম চিকিৎসা করানোর সিদ্ধান্ত দিলেন। বিলেতে পৌঁছে শেখ মুজিব লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনারকে বললেন, লন্ডনস্থ কোনো বাঙালি ডাক্তার তার অপারেশন করুক। ৩০ জুলাই ১৯৭২ সালে হারলি স্ট্রিটের লন্ডন ক্লিনিকে লর্ড এডওয়ার্ড মুুয়ের এফআরসিএস এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজের ডা. নজরুল ইসলাম এফআরসিএস বঙ্গবন্ধুর পিত্তপ্রদাহ ও উত্তপ্ত এপেন্ডিক্স অপারেশন করে অপসারণ করেন। মূল পিত্তনালি ‘কমনবাইল ডাক্টে’ কোনো পাথর ছিল না।

ডা. নুরুল ইসলামের ওপর শেখ মুজিবের অবশ্য ভয়ানক আস্থা ছিল। শেখ মুজিব কখনো বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নিতে আগ্রহী ছিলেন না; যেতে চাননি, চিকিৎসকদের রাজনীতির কারণে কায়দা করে তাকে বিলেতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে জেনেভা শহরে জেনেভা হ্রদের তীরে বসে তিনি ঢাকায় তার চিকিৎসা করতে না পারায় দুঃখের কাহিনী আমাকে শুনিয়েছেন। তিনি চেয়েছিলেন দেশে চিকিৎসা নিতে, তিনি কখনো বিদেশে গিয়ে চিকিৎসার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেননি বরং ঘোর আপত্তি করেছিলেন। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার কি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে কিছু শিখেছে?

১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান আমলে বোধহয় শখানেক থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। বাকিগুলো পরবর্তী সময়ে পর্যায়ক্রমে নির্মিত হয়েছে। উল্লেখ্য, অতীতে আমাদের দেশে বিভিন্ন জায়গায় মূলত ইউনিয়ন পর্যায়ে বেশ কিছুসংখ্যক ডিসপেনসারি ছিল। এগুলো ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড কর্তৃক পরিচালিত হতো এলএমএফ ডাক্তার দ্বারা, তত্কালীন জমিদাররা এসব ডিসপেনসারি তৈরি করেছিলেন তাদের প্রিয়জনের স্মরণে।

স্বাস্থ্য সচিব টি হোসেনের পরামর্শে শেখ মুজিব ইউনিয়ন পর্যায়ে অনেকগুলো ডিসপেনসারির উন্নতি সাধন করেন। প্রতি ইউনিয়নে প্রতি ২০ হাজার লোকের জন্য একটি স্বাস্থ্য উপকেন্দ্র সৃষ্টির ইচ্ছা তার মনে জাগে অনেকটা আজকের ‘ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের আদলে’।

জেনারেল এরশাদের সময় থানা হেলথ কমপ্লেক্সের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে— ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স’ এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নতুন নামকরণ হয়েছে ‘স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়’।

বাংলাদেশে ওষুধ শিল্প

কিছু ওষুধ পূর্ব পাকিস্তানে উৎপাদন হতো। তখন তিনটি কোম্পানি ছিল। সবচেয়ে পুরনো কোম্পানি পাবনার এডরুক কোম্পানি তার বাণিজ্যিক পরিচালক মহিউদ্দিন ছিলেন সব মেডিকেল কলেজে পরিচিত নাম। তারপর আসে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আলবার্ট ডেভিড কোম্পানি। আলবার্ট ডেভিডেরই মেডিকেল ডিরেক্টর ছিলেন ভাষাসৈনিক ডা. আহমদ রফিক। আরেকটি পূর্ব পাকিস্তানি ওষুধ কোম্পানি ছিল নাম ফার্মাপাক। বাংলাদেশের বিজয়ের পর ফার্মাপাকের নতুন নাম হয় ফার্মাদেশ। কয়েকটি বিদেশী কোম্পানি ছিল পূর্ব পাকিস্তানে। ফাইসন্স, সু্কইব, ফাইজার, আইসিআই, গ্লাক্সো প্রভৃতির ফ্যাক্টরি ছিল ঢাকা ও চট্টগ্রামে। স্বাধীনতার পরও এরা ছিল। বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পে বিপ্লব আসে ১৯৮২ সালে রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদের আমলে প্রণীত জাতীয় ওষুধনীতির মাধ্যামে। জাতীয় ওষুধনীতির মূলকথা ছিল, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত অনূর্ধ্ব-৪০০ অতীব প্রয়োজনীয় ওষুধ দেশে উৎপাদিত হবে, মূলত একক সক্রিয় উপাদানে, উৎপাদিত ওষুধের উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে পর্যাপ্ত লাভ যোগ করে সরকার উৎপাদিত ‘ওষুধের বিক্রয়মূল্য’— MRP: Maximum Retail Price স্থির করে দেবেন। বিদেশী কোম্পানিগুলো কেবল দুটি সাধারণ প্রয়োজনীয় ওষুধ ‘অ্যান্টাসিড’ ও মুখে সেব্য ভিটামিন ছাড়া দেশীয় কোম্পানির মতো সব প্রয়োজনীয় ওষুধ উৎপাদন করতে পারবে। তবে কোনো কোম্পানির বাংলাদেশে নিজস্ব ফ্যাক্টরি না থাকলে, থার্ড পার্টি লাইসেন্সের মাধ্যমে অন্য কোম্পানির ফ্যাক্টরিতে ওষুধ উৎপাদন করে ‘বিদেশী ব্র্যান্ডে’ বেশি দামে ওষুধ বাজারজাত করতে পারবে না। এ নিয়ম চালু করা হয়েছিল বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগ ও শিল্প বৃদ্ধির স্বার্থে। জাতীয় ওষুধনীতির ফলে দেশে উৎপাদিত ওষুধের মান নির্ণয় সহজ হয়েছে, মানের উন্নতি হয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রয়োজনীয় ৯৭ শতাংশ ওষুধ উৎপাদন হচ্ছে, দেশের সর্বত্র— গ্রামগঞ্জে মানসম্পন্ন ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে সুলভ মূল্যে এবং কতক ওষুধ বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। জাতীয় ওষুধনীতিতে প্রথম পরিবর্তন আসে ১৯৯৪ সালে। বেক্সিমকোপ্রধান সালমান এফ রহমান তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে বোঝান যে, ওষুধ রফতানির বাজার দ্রুত বৃদ্ধির নিমিত্তে কেবল ১১৭টি ওষুধ, ভ্যাকসিন ও পরিবার পরিকল্পনার সামগ্রী ব্যতীত অন্য সব ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ সরকার কর্তৃক নির্ধারণের বিষয়টি প্রত্যাহার করা আবশ্যক। ১১৭টি ছাড়া অন্য সব ওষুধের বিক্রয়মূল্য স্থির করবে উৎপাদক ওষুধ কোম্পানিগুলো। এ পদ্ধতির নাম Indicative Price পদ্ধতি। এতে রোপিত হয়েছে ওষুধ শিল্পে সর্বনাশের বীজ। এ সিদ্ধান্ত জনস্বার্থবিরোধী। ওষুধের মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থাপনা ওষুধ কোম্পানির হাতে ছেড়ে দেয়ার ফলে বাজারে ওষুধের মূল্য কয়েক গুণ বেড়ে গেছে, কোম্পানিগুলো অনৈতিকভাবে মুনাফা বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে, সঙ্গে ব্যাপক বেড়েছে নকল ও ভেজাল ওষুধ। দুর্নীতির বিস্তৃতি ঘটেছে কতক চিকিৎসক সমাজেও। ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিরা চিকিৎসকদের অত্যধিক উপঢৌকন দিয়ে প্রভাবিত করছে অযৌক্তিক প্রেসক্রিপশন লিখতে, সুলভ অ্যান্টিবায়োটিকের পরিবর্তে তৃতীয়-চতুর্থ পর্যায়ের অ্যান্টিবায়োটিক যাদের ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া গ্রাহ্য না করে। ঘুষ বিবেককে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ নিরন্ন রোগীরা।

সম্প্রতি ঔষধ প্রশাসনের সব কমিটিতে নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞের পরিবর্তে ওষুধ শিল্প প্রতিষ্ঠানের কর্মরত ব্যক্তিদের প্রতিনিধিত্ব বেড়েছে, তাদের দাপট বেড়েছে। কর্তব্যপরায়ণ বিবেকবান চিকিৎসকদের প্রতিনিধিত্ব সীমিত। মিটিংয়ে তারা সবাক হচ্ছেন না। মিটিংয়ে বিএমএ প্রতিনিধি চিকিৎসকদের মৌনতা দুঃখজনক। ক্রমে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় সুপরিকল্পিতভাবে পরিবর্তন এনেছে জাতীয় ওষুধনীতির মৌলিক নীতিতে। থার্ডপার্টি লাইসেন্স চালু হয়েছে, বিনিয়োগ ছাড়া বিদেশী ওষুধ কোম্পানির বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে। লাভের সেই ধারা অনুসরণ করে ৫৫ বছরের পুরনো কোম্পানি গ্লাক্সো চট্টগ্রামে তাদের ফ্যাক্টরি বন্ধ ঘোষণা করেছে। OTC- Over the Counter ওষুধের সংখ্যা বেড়েই চলেছে, অদ্যাপি চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্রের অডিট চালু হয়নি।

জনগণের স্বাস্থ্য উন্নয়নে এনজিও অবদান

পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৫৩ সালে ফ্যামিলি প্ল্যানিং অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠিত হয়। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে পাকিস্তান ফ্যামিলি প্ল্যানিং অ্যাসোসিয়েশনের বিরাট অবদান রয়েছে। আজকের ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশন সম্ভব হয়েছে ফ্যামিলি প্ল্যানিং অ্যাসোসিয়েশনের নারী কর্মীদের হেঁটে হেঁটে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছোট পরিবার বার্তা বারে বারে পৌঁছে দেয়ার কারণে। দেশ যখন অনেক বেশি রক্ষণশীল ছিল, তখন তারা সাহসের সঙ্গে গ্রামে গ্রামে গিয়ে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে প্রচার করত জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ তথ্য। ফ্যামিলি প্ল্যানিং অ্যাসোসিয়েশনের তত্কালীন সভাপতি ছিলেন পুলিশের আইজি আলমগীর কবির। তার সঙ্গেও শেখ মুজিবের ভালো সখ্য ছিল।

স্বাধীনতা-উত্তরকালে গণস্বাস্থ্যকেন্দ্র, ব্র্যাক, কারিতাস, সিসিডিবি ও আরো কয়েক ডজন বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বাংলাদেশের গ্রামেগঞ্জে নারী স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমে প্রচার করল ‘দারিদ্র্য স্বাস্থ্য দুরবস্থার মূল কারণ’ ‘টিকা নবজাতক ও শিশুর মৃত্যু রোধ করে, পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ দারিদ্র্য নিরসনে সহায়ক, দুই সন্তানই যথেষ্ট’ প্রভৃতি। ক্ষুদ্র ঋণ সংস্থা ‘গ্রামীণ ব্যাংক’ ও ‘আশা’র জন্ম সত্তরের দশকের শেষ দিকে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক উন্নতির পেছনে এনজিওগুলোর একটা বড় অবদান রয়েছে। কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়া স্থানীয় নারী কর্মীরা গ্রামবাসীর পুষ্টি ও পরিচ্ছন্নতা শেখায়, ডায়রিয়া, জ্বর, কৃমি ও চর্মের সাধারণ রোগের চিকিৎসা দেয় বাড়িতে গিয়ে, গর্ভবতীদের সেবা ও নববিবাহিতাদের পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতির সঙ্গে পরিচয় করায়। প্রত্যেক পরিবার নির্দিষ্ট স্থানে গর্ত করে নিজস্ব পায়খানা ব্যবহার এবং হাতে দাবানো টিউবওয়েলের পানি পানের পরামর্শ স্বাস্থ্যক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তন সাধন করে। ডায়রিয়ার হার কমায়। গণস্বাস্থ্য মেডিকেল ছাত্র ও ডাক্তারদের গ্রামে নিয়ে গেছে। ১৯৭২ সাল থেকে গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসকরা গ্রামে গিয়ে কাজ করেছেন। তারা দাইদের প্রশিক্ষণ দিয়ে শিশুমৃত্যু ও মাতৃ মৃত্যুহার কমিয়েছেন। ৯০ শতাংশের অধিক শিশু ও গর্ভবতীদের রোগ প্রতিষেধক টিকা গ্রহণে আগ্রহ সৃষ্টির মূল কৃতিত্ব এনজিওগুলোর। এনজিও কর্মীদের মাধ্যমে বাংলাদেশে পরিশ্রুত হয় প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা। ১৯৭৬ সাল থেকে গণস্বাস্থ্যকেন্দ্র গ্রামের নারী স্বাস্থ্যকর্মীদের সাইকেল চালানো শিখিয়েছে, তারা গ্রামে গ্রামে গিয়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়িয়েছে। এনজিওগুলোর তত্পরতা ও জনগণের সচেতনতার কারণে দেশবাসীর আয়ু রেড়েছে, শিশুমৃত্যু ও মাতৃ মৃত্যুহার কমেছে, পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণের হার বেড়েছে। এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের বিশেষ কোনো অবদান নেই।

‘গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের সমন্বিত স্বাস্থ্য কার্যক্রম প্রভাবিত করেছিল ১৯৭৮ সালে ১৩৪ দেশের অনুমোদিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার  ২০০০ সালের মধ্যে সবার জন্য স্বাস্থ্য’ ঘোষণাকে। ব্র্যাক কর্মীরা ডায়রিয়ার চিকিৎসা ওআরএস বাড়িতে বাড়িতে বানানো শিখিয়েছেন। ডায়রিয়ার দ্রুত চিকিৎসায় ব্র্যাক কর্মীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে পৃথিবীর বৃহত্তম এনজিও— বাংলাদেশ রুরাল অ্যাসিস্ট্যান্স কমিটি। ১৯৮১ সালে গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালস প্রথম ওআরএসকে প্যাকেটজাত করে সুলভে বাজারজাত করেছে। গণস্বাস্থ্য ওষুধ কারখানা প্রতিষ্ঠিত করে উন্নত মানের ওষুধ কত সস্তায় বাজারজাত করা যায় সেটি দেখিয়েছে। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশের জাতীয় ওষুধনীতি প্রণয়নে গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদান হলো তিনি এনজিওগুলোর প্যারামেডিক প্রথাকে তার দলের মেনিফেস্টোর অন্তর্ভুক্ত করে ছিলেন। জিয়াউর রহমান নারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা সৃষ্টিতে গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের সাহায্য নিয়েছেন। জিয়াউর রহমান সরকারের প্রথম দুই নারী পুলিশ কনস্টেবল ছিলেন গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের এসএসসি পাস নারী কর্মী— হোসনে আরা ও চামেলী। চামেলী মারা গেছেন, হোসনে আরা পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টর পর্যন্ত পদোন্নতি পেয়েছেন। বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার অসমাপ্ত কাহিনী

সত্তর বা আশির দশকে মূল রোগ ছিল সংক্রামক ব্যাধি। ডায়রিয়া, কলেরা, নিউমোনিয়া প্রভৃতি। ৭-১০ দিনের ওষুধ দিলেই রোগ ভালো হয়ে যেত। ওআরএস তাত্ক্ষণিক ব্যবহার ডায়রিয়া থেকে মৃত্যু কমিয়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। ব্যাপকভাবে সংক্রামক রোগগুলো নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। সংক্রামক রোগের স্থান দখল করেছে অসংক্রামক রোগগুলো যথা বিকল কিডনি, উচ্চরক্তচাপ, বহুমূত্র, মানসিক রোগ, দৃষ্টিহীনতা, ক্যান্সার প্রভৃতি। এসব অসংক্রামক রোগে সারা বছর চিকিৎসা নিতে হয় এবং চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধির মূল কারণ চিকিৎসকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের জন্য সরকারি নিষ্ক্রিয়তা, ওষুধ কোম্পানি ও ক্লিনিক মালিকদের লাগামহীন ঘুষ বাণিজ্যের কারণে অহেতুক দীর্ঘ রোগ নির্ণয় তালিকা, অপ্রয়োজনীয় বহু ওষুধের ব্যবস্থাপত্র।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে পাস করা চিকিৎসক ছিলেন প্রায় ১০ হাজার, বর্তমানে দেশে চিকিৎসকের সংখ্যা বেড়ে উন্নীত হয়েছে ৮০ হাজারে, নার্সের সংখ্যা ৫০ হাজার, সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সংখ্যা অতিক্রম করেছে ২০ হাজার। বাংলাদেশের অধিকাংশ ইউনিয়ন পর্যায়ের সরকারি চিকিৎসালয়ে সন্ধ্যায় বাতি জ্বলে না, দুপুরের পর কোথাও কোনো চিকিৎসককে খুঁজে পাওয়া যায় না। এ বছর থেকে সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোয় প্রায় বিনা খরচে অতিরিক্ত ৫০০ ছাত্র এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি করা হবে। ভালো উদ্যোগ। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছা, অর্থাৎ ইন্টার্নশিপের মেয়াদ এক বছরের স্থলে দুই বছরে উন্নীত করে, এক বছর উপজেলা ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত না করলে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সান্ধ্য প্রদীপ জ্বলবে না এবং জনসাধারণ স্বাস্থ্যসেবা পাবে না। নিয়ম করা প্রয়োজন কেবল অধূমপায়ী ছাত্ররা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হবে। গড় আয়ু পৌঁছেছে ৭২-৭৩ বছরে। দেশের সর্বত্র চিকিৎসাসেবার বিস্তৃতির প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। সঙ্গে বেড়েছে স্বাস্থ্যসেবা না পাওয়ার বেদনা। নিজ পকেট থেকে চিকিৎসা ব্যয়ের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৪ শতাংশ। নার্সদের শিক্ষার উন্নতি হয়েছে। কিন্তু নার্সরা নার্সিং দায়িত্ব পালন না করে তা সমর্পণ করেছেন আয়া ও রোগীর আত্মীয়স্বজনের কাছে।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রিকতা বাড়ছে, ঢাকার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল বিল্ডিং ১৪ তলা হচ্ছে। রেফারেল পদ্ধতি চালু হওয়ার কারণে সাধারণ রোগ নিয়ে গ্রামের রোগীরা ঢাকায় ভিড় করছে। প্রাথমিকভাবে প্রতি শহরে নির্ধারিত মেয়রের অধীনে জেনারেল প্র্যাকটিশনারস ও রেফারেল পদ্ধতি চালুর কোনো উদ্যোগ নেই এবং সরকারের ইচ্ছা নেই। সংবিধানের স্থানীয় শাসন (ধারা ৫৯ ও ৬০) সুবিধার জন্য প্রতি জেলায় কর্তৃপক্ষ স্থাপন হবে সুস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় প্রথম পদক্ষেপ।

ভুল ওষুধে এবং অতিরিক্ত মাত্রা ওষুধ প্রয়োগের কারণে মৃত্যুর তথ্য প্রায়ই বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে। চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশন অডিট এবং হাসপাতালে মৃত্যুর অডিট বাধ্যতামূলক না হওয়ার কারণে মৃত্যুর মিছিল কমছে না। বঙ্গবন্ধু আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন? সাহিত্যিক জর্জ বার্নাড শ সমস্যার কারণ বিবৃত করেছিলেন ১৯০৮ সালে।

 

লেখক: ট্রাস্টি, গণস্বাস্থ্যকেন্দ্র