রাষ্ট্রপতি হিসেবে লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনকাল ছিল ১৯৮৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৯০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাত্তারকে উত্খাত করে তিনি ১৯৮২ সালের এপ্রিলে আগেই রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করেন এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দেশ শাসন করেন। ক্ষমতায় আনার ক্ষেত্রে এইচএম এরশাদ ছিলেন সর্বোচ্চ সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের পছন্দসই ব্যক্তি। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনের সময়ে সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে যাকে তারা নম্র ও প্রত্যুত্পন্নমতি হিসেবে দেখেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রপতি জিয়াই তাকে সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে পছন্দ করেছিলেন, এমনকি লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদমর্যাদায় পদোন্নতি দিয়েছিলেন। কারণ তিনি বিবেচনা করেছিলেন, এরশাদ সেনাপ্রধান হলে ওই সময় ব্যাপকভাবে রাজনৈতিকীকরণ হওয়া সশস্ত্র বাহিনীর দিক থেকে তার কোনো উদ্বেগ থাকবে না। বলতে গেলে রাষ্ট্রপতি জিয়া এরশাদকে সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন, যার কোনো রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না!
রাজনীতিতে এইচএম এরশাদ গণতন্ত্রকে গুরুত্বহীন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি উন্নয়নের বিপরীতে একে (গণতন্ত্র) প্রতিস্থাপিত করেছিলেন এই ভেবে যে, নিজেদের জীবনে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বদৌলতে মানুষ ভুলে যাবে, কীভাবে তিনি ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন। এবং পরিবর্তে তারা তাকে সমর্থন করবে। তিনি সামরিক বাহিনীকে শান্ত ও স্থিতিশীল রেখেছিলেন তাদের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে, যা তাকে অর্থনৈতিক উন্নয়নে সময় দেয়ার সুযোগ দিয়েছিল। তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে কাজ করতে অনুমতি দেয়ার ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যেটি প্রাথমিক পর্যায়ে তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের জন্য ছিল একটি বিরাট সুযোগ। ওই খাতের নেতৃত্ব যারা দিয়েছিল, কারখানা স্থাপনের জন্য তাদের কোনো পুঁজি ছিল না। রাষ্ট্রপতি এরশাদের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় বেসরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো তৈরি পোশাক খাতে অর্থায়নে এগিয়ে আসে, চূড়ান্তভাবে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে যার নাটকীয় প্রভাব ছিল।
দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে রাষ্ট্রপতি এরশাদ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেন। কেবল এ বিষয়েই সজাগ ছিলেন না যে, তিনি পেছন দ্বার দিয়ে ক্ষমতায় আসেন; উপরন্তু তিনি জানতেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে পর্যায়ে পৌঁছেছেন, সে পর্যায়ে যেতে তার কোনো একক যোগ্যতা ছিল না। সুনির্দিষ্ট মাত্রার অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন তার প্রয়োজন পড়ে এজন্য যে, কীভাবে তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেছেন, সেটি ভুলতে মানুষ যাতে উৎসাহিত হয় এবং তাদের অর্থনৈতিক ভাগ্যের সমৃদ্ধির জন্য নেতা হিসেবে তাকে যেন মেনে নেয়। তিনি অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অভ্যন্তরীণ সম্পদ ও পুঁজি সঞ্চালনে দেশের ভয়াবহ সীমাবদ্ধতা সম্পর্কেও সতর্ক ছিলেন। তিনি জানতেন, বৈদেশিক সহায়তা ও বহির্বাণিজ্য ছাড়া এ সীমাবদ্ধতা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। এটি মাথায় রেখে তিনি তার শাসনামলের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বৈদেশিক সহায়তা ও বৈদেশিক বাণিজ্য বাড়ানোর বিষয়টি নির্ধারণ করেন এরশাদ। তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে প্রথমবারের জন্য এর একটি নাম দিলেন। তিনি পররাষ্ট্রনীতিতে দেশের অর্থনৈতিক লক্ষ্যের সন্ধানকে অভিহিত করলেন অর্থনৈতিক কূটনীতি হিসেবে। প্রকৃতপক্ষে এরশাদ শাসনামলে পররাষ্ট্রনীতির বাজওয়ার্ড ছিল অর্থনৈতিক কূটনীতি।
রাষ্ট্রপতি এরশাদের শাসনামল অর্থনৈতিক কূটনীতিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছিল। দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে অতীত শাসনামলে নেয়া পররাষ্ট্রনীতির গতানুগতিক লক্ষ্য অর্জন আগের মতোই অব্যাহত ছিল। দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় কূটনীতির মাধ্যমে পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য অর্জন ছাড়াও এরশাদ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় কূটনীতির গতানুগতিক লক্ষ্য অর্জনেও সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল। এরশাদের শাসন ছিল স্নায়ুযুদ্ধের সময়কালীন; যখন বিশ্ব যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা ব্লক ও সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট ব্লক দ্বারা দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। বাংলাদেশ সোভিয়েত ব্লক বা অধিক প্রত্যক্ষভাবে ভারত-সোভিয়েত ব্লকে ছিল, যা বঙ্গবন্ধুর সময়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি সাহায্য করেছিল। জিয়ার শাসনামলে আমাদের দেশ পশ্চিমা ব্লকে গিয়েছিল। প্রথম দুই শাসনামলের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ হয়েছিল তারা কোন ব্লক ধারণ করত সেটি দ্বারা।
প্রত্যক্ষভাবে দুটি ব্লকের কোনোটিতেই তার শাসনামলে এরশাদ বাংলাদেশকে জড়াননি। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে আরো যাতে সাহায্য করতে পারে, সেজন্য তিনি বাংলাদেশকে পশ্চিমা ও ভারত-সোভিয়েত উভয় ব্লকের কবজা থেকে মুক্ত করতে পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেছিলেন। রাষ্ট্রপতি এরশাদ তার শাসনামলের প্রথম দিকেই বুঝেছিলেন, বিপুল জনসংখ্যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বড় সমস্যা হবে। কাজেই তিনি অর্থনৈতিক কূটনীতি নিশ্চিতের প্রধান অঞ্চল হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর সর্বোচ্চ মনোযোগ দেন। তিনি জিয়াউর রহমান ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির সূত্র ধরে সফলভাবে মুসলিম ক্রেডেনশিয়াল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন; যারা ভারতের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাংলাদেশকে ওআইসিতে যোগদানে ভূমিকা রেখেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তিন স্তম্ভের একটি, যার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ ‘ইন্টারন্যাশনাল বাস্কেট কেস’ থেকে রূপান্তর করেছিলেন সেটি হলো, জনশক্তি রফতানি। বাইরে থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের রেমিট্যান্স নিয়ে আসা এ জনশক্তি রফতানি চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এরশাদের আমলে, যখন কয়েক মিলিয়ন প্রবাসী শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যে কাজ পেয়েছিলেন।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন রূপান্তরে ভূমিকা রাখা দ্বিতীয় স্তম্ভও অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদারের অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে শুরু হয় এরশাদ আমলে। তিনি তার সময়ের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্যের কেন্দ্রীয়/প্রধান ধাপে বৈদেশিক বাণিজ্যকে এনেছিলেন।
সোভিয়েত ব্লকের সঙ্গে বিদ্যমান সুসম্পর্কের সুবাদে এরশাদ প্রশাসন আলোচ্য ব্লকের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য শক্তিশালী করেছিল, যেখানে প্রাথমিকভাবে বৈদেশিক বাণিজ্য পরিচালনার ক্ষেত্র ছিল সরকার থেকে সরকার পর্যায় আর সেক্ষেত্রে পূর্বশর্তই ছিল তার সময়ে বজায় রাখা দ্বিপক্ষীয় পররাষ্ট্রনীতি। একই সঙ্গে তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ব্যক্তিখাতকে অবাধে বাণিজ্য করার অনুমতি দিয়েছিলেন, যেখানে বাণিজ্যের ভিত্তি ছিল ব্যক্তিপর্যায়ে। প্রকৃতপক্ষে পরবর্তীতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের ফ্ল্যাগশিপ হওয়া কিংবা অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইঞ্জিন ও ব্যাপক আশা নিয়ে দেশকে বাস্কেট কেস থেকে রূপান্তরে ভূমিকা রাখা ব্যক্তিখাতই ছিল এরশাদ আমলে অর্থনৈতিক কূটনীতির ওপর জোর দেয়ার ফল।
অর্থনৈতিক কূটনীতি শক্তিশালী করতে নিজের শাসনামলে এরশাদ বাংলাদেশ দূতাবাস ও হাইকমিশনগুলোর জন্য নতুন নীতি প্রবর্তন করেন। দূতাবাস ও হাইকমিশনগুলোকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরোর পক্ষ থেকে বার্ষিক টার্গেট নির্ধারণ করে দেয়া হয়। রফতানি টার্গেট নির্ধারণে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও পরামর্শ করা হয়; কিন্তু আলোচ্য মন্ত্রণালয়ের পরামর্শের কোনো মূল্যই দেয়া হয়নি। বাস্তবে মিশনের জন্য নীতি বা রফতানি টার্গেটের স্কিম এ বিষয়েও প্রতিফলিত হয় যে, রাষ্ট্রপতি এরশাদ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চাপে রাখার নীতি হিসেবে এটি প্রবর্তন করেছিলেন। বাংলাদেশী রফতানির বিক্রেতা হতে তাদের জন্য কোনো প্রক্রিয়া উন্নয়ন ছাড়া বিপুল টার্গেট নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে যখনই কিছু দূতাবাস ও হাইকমিশন টার্গেট পূরণে অসমর্থ হতো, তখনই তিনি মন্ত্রণালয়কে ভর্ত্সনা করতেন। এভাবে এরশাদ বঙ্গবন্ধু ও জিয়া যেভাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আচরণ করেছিলেন, তার থেকে সম্পূর্ণ ইউ-টার্ন নেন। তারা উভয়ই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করেছিলেন এবং ১৯৭০-এর দশকের গোলযোগপূর্ণ দশকে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে দৃঢ়ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করেছিলেন।
সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও ওয়াশিংটনে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি এরশাদ তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেন। ১৯৮৬ ও ১৯৯০— এ সময়ের মধ্যে এরশাদ পাঁচজন পররাষ্ট্র সচিব পরিবর্তন করেন। তাদের মধ্যে ফখরুদ্দীন আহমদকে পরিবর্তন করা হয় এ কারণে যে, এরশাদ মনে করেছিলেন তার রেড ফোনের কলে ফখরুদ্দীন সাড়া দেন না! তিনি অন্যতম মেধাবী ক্যারিয়ার কূটনৈতিক কায়সার মুর্শেদকে চার মাসের জন্য তার পররাষ্ট্র সচিব নিয়োগ দিয়েছিলেন, যিনি ১৯৫৭ সালে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলেন! ক্যারিয়ার কূটনীতিকদের পাশ কাটিয়ে তিনি প্রতিরক্ষা, ইআরডি, বাণিজ্য প্রভৃতি বিভাগ থেকে কূটনীতিক নিয়োগের রীতি চালু করেছিলেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অন্ধকারে রেখে রাষ্ট্রপতি এরশাদ প্রায়ই পররাষ্ট্র সম্পর্কের বিষয়াদি পরিচালনা করেছিলেন। অধিকাংশই তত্কালীন সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান থেকে আসা জ্যেষ্ঠ সিভিল সার্ভেন্টদের কেউ কেউ তার সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং যারা কিনা রাজনৈতিক ক্ষমতারোহণে তাকে সাহায্য করেছিলেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তারা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতি খুব অসহযোগিতামূলক ছিলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ক্যারিয়ার কূটনীতিকদের কোণঠাসা করতে তারা তাদের প্রতি এরশাদের অপছন্দকে ব্যবহার এবং দেশের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে তারা কূটনীতিকদের ক্ষমতা খর্ব করেছিলেন। যেটি অবশ্যই নিছক যৌক্তিক কারণের জন্য দেশের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। প্রকৃতপক্ষে এরশাদের সময়ে তার ব্যক্তিগত অপছন্দের ভিত্তিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র ক্যাডারের ওপর করা ক্ষতি আলোচ্য মন্ত্রণালয়ে স্থায়ী ক্ষত রেখে যায়, দেশের মুক্তিযুদ্ধ ও তত্পরবর্তী সময়ে ভয়াবহ আন্তর্জাতিক বাধা-বিপত্তির বিপরীতে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যেটি বিপুল অবদান রেখেছিল।
এরশাদ শাসনামল ১৯৮৫ সালে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোহিতা সংস্থার (সার্ক) প্রতিষ্ঠা দেখেছিল, যদিও আঞ্চলিক সংস্থাটি গঠনের ভিশন এসেছিল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান থেকে। তার শাসন ভারত ও চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিল। ক্যারিয়ার কূটনীতিকদের পরিবর্তে সামরিক বাহিনীর ওপর তার নির্ভরতা ১৯৮৮ সালের বন্যায় ভারতের সঙ্গে তাকে ভয়াবহ ঝামেলায় ফেলেছিল। আলোচ্য বন্যা মোকাবেলায় ভারত মাত্র চারটি হেলিকপ্টার দিয়েছিল। এটি ছিল দেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ বন্যা। সেনাবাহিনী এতে অখুশি হয়েছিল এবং তারা ভারতীয় হেলিকপ্টার প্রত্যাহার করতে চেয়েছিল। রাষ্ট্রপতি এরশাদের সরাসরি নির্দেশনায় বন্যা ব্যবস্থাপনা আর প্রয়োজন নেই— এ যুক্তিতে যেদিনই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ভারতীয়দের হেলিকপ্টার ফিরিয়ে নেয়ার কথা বলা হলো, তার পরদিনই চীনা হেলিকপ্টার বাংলাদেশে এসে পৌঁছে। এ অপমানের জন্য ভারতীয়রা কখনো এইচএম এরশাদকে ক্ষমা করেনি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, পরবর্তী সময়ে তিনি ব্যক্তিগতভাবে কূটনৈতিক বিচ্যুতির জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন। ক্ষমা চাওয়া সত্ত্বেও ভারতীয়রা তাকে বিশ্বাস করেনি।
রাষ্ট্রপতি এরশাদকে এমন এক সময়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করা হয়, যখন প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধে সমর্থন তাকে ওয়াশিংটনের কাছে ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। ওই যুদ্ধে সমর্থন বা পৃষ্ঠপোষকতা জোগানো প্রথম অনারব রাষ্ট্রই হলো বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন মৈত্রী জোটের যেটি খুব দরকার ছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা থেকে তিনি সুফল পেতে অসমর্থ হয়েছিলন। কারণ এরই মধ্যে মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে এবং তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থান ঘটে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে গণতন্ত্রায়ন প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে এরশাদের স্বৈরশাসন বাংলাদেশকে কয়েক দশক পিছিয়ে দেয়। প্রকৃতপক্ষে প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা ধ্বংসের মাধ্যমে দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা হয়েছে এরশাদের শাসনামলে। তবে সাধারণভাবে দেশের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে যুক্ত প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও এর দূতাবাসগুলো ধ্বংসের প্রচেষ্টা থাকা সত্ত্বেও পররাষ্ট্র সম্পর্কের বিষয়াদিতে এরশাদের শাসনামল যুক্তিসঙ্গতভাবে সফল ছিল।
ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির
লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত





