সুইজারল্যান্ডের জাতীয় দিবস উদযাপনের ইতিহাস সাত শতাব্দীরও বেশি সময় আগে থেকে শুরু। ১২৯১ সালের আগস্টে তিনটি আলপাইন ক্যান্টনের প্রতিনিধিরা ঐক্যের যে শপথ নিয়েছিলেন, সেটিই সুইস কনফেডারেশনের ভিত্তি স্থাপন করে। বৈচিত্র্য, সংহতি, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা সংস্কৃতি, আইনের শাসন, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র আজকের সুইজারল্যান্ডের মূল ভিত্তি। জাতীয় দিবস উদযাপন আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র চিহ্নিত করারও একটি চমৎকার সুযোগ এনে দেয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের দুই দেশ নানা ক্ষেত্রে একটি দৃঢ়, বহুমাত্রিক ও শক্তিশালী অংশীদারত্ব গড়ে তুলেছে। সুইজারল্যান্ড বাংলাদেশের একটি প্রতিশ্রুতিশীল অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগী। ক্রমবর্ধমান দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও সুইস বেসরকারি খাতের উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ এ সম্পর্কের দৃঢ়তারই প্রতিফলন।

সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য বেশ কয়েকটি অগ্রগতি হয়েছে। তবে আমি এখানে বিশেষভাবে একটি বিষয়ের কথা তুলে ধরতে চাই। ২০২৬ সালের জুনে ঢাকায় বাংলাদেশ ও সুইজারল্যান্ডের মধ্যে ষষ্ঠ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সামগ্রিক বিষয় পর্যালোচনা করা হয় এবং ভবিষ্যৎ সম্পৃক্ততা আরো সম্প্রসারণের উপায় নিয়ে আলোচনা হয়। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ছিল আলোচ্যসূচির অন্যতম প্রধান বিষয়। দুই দেশ গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন এবং নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধাসহ অভিন্ন মূল্যবোধের প্রতি তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে। পাশাপাশি জাতিসংঘ ও ইন্টারন্যাশনাল জেনেভাসহ বিভিন্ন ফোরামে সহযোগিতা জোরদারের বিষয়েও আলোচনা হয়। এ সংলাপ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রতি উভয় দেশের গুরুত্ব এবং ভবিষ্যৎ অংশীদারত্ব আরো গভীর করার পারস্পরিক অঙ্গীকারের প্রতিফলন।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আমাদের বার্ষিক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য টানা পঞ্চম বছরের মতো ১০০ কোটি ডলারের বেশি পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশের প্রধান প্রধান ব্যবসায়িক খাতে সুইস বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রযুক্তি, পণ্য ও সেবা সরবরাহকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। ফলে আমাদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উদ্ভাবন, গুণগত মান এবং কারিগরি দক্ষতার ক্ষেত্রে সুইজারল্যান্ডের উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার সক্ষমতা রয়েছে। আমাদের বিশ্বাস, আরো উন্নত কাঠামো ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ পারস্পরিক স্বার্থে আমাদের দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী করবে। একই সঙ্গে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর করে তুলতে সুইজারল্যান্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এবং রোহিঙ্গা মানবিক সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশের পাশে দৃঢ়ভাবে রয়েছে।

চলতি বছর বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। ফেব্রুয়ারিতে দেশটি সফলভাবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করেছে এবং নতুন সংসদ ও নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। সুইজারল্যান্ড এ অগ্রগতিকে স্বাগত জানায়। আমরা আত্মবিশ্বাসী যে নতুন সরকার বাংলাদেশের জনগণের একটি সমৃদ্ধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে কাজ করবে, যেখানে সব নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা সমুন্নত থাকবে। আমাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা বলে, গণতান্ত্রিক চর্চা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন একে অন্যকে শক্তিশালী করে এবং উভয়ই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতির ধারাবাহিকতার ওপর নির্ভরশীল।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে আমরা নানা গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জন করলেও বিশ্বজুড়ে নানা চ্যালেঞ্জ অব্যাহত রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত ও অনিশ্চয়তা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে এবং এর প্রভাব সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের সীমানা ছাড়িয়ে বিস্তৃত হচ্ছে। সুইজারল্যান্ড ও বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য নিয়মভিত্তিক বৈশ্বিক ব্যবস্থা এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিতকারী পরিবেশ ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তার এ সময়ে গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবচ। তাই বহুপক্ষীয়তার প্রতি আমাদের অভিন্ন অঙ্গীকার জাতিসংঘ ও ইন্টারন্যাশনাল জেনেভায় বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যু মোকাবেলায় দুই দেশের মধ্যে আরো ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমনই একটি বিষয়, যা আমাদের পরিচিত বিশ্বকে নতুনভাবে রূপ দিচ্ছে। আগামী বছরের জুনে সুইজারল্যান্ড জেনেভায় ২০২৭ সালের এআই সামিট আয়োজন করবে। সেখানে সরকার, গবেষক, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ ও বৈশ্বিক ডিজিটাল সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করবে।

আশা করি, আপনারা এ বিশেষ ক্রোড়পত্রটি আগ্রহের সঙ্গে পড়বেন। বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও অংশীদারত্বকে সুইজারল্যান্ড গভীরভাবে মূল্যায়ন করে। তাই আমরা আমাদের কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক আরো জোরদারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাংলাদেশের জনগণের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি কামনা করছি।

(মূল ইংরেজি থেকে অনূদিত)