গবেষণা, ব্যবসা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে এআই এখন একটি কৌশলগত অগ্রাধিকার। বিশ্ববিদ্যালয়, স্টার্টআপ, শিল্প খাত এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার ওপর গড়ে উঠেছে এ উদ্ভাবন পরিবেশ। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, গবেষণায় ধারাবাহিক বিনিয়োগ এবং উচ্চমানের বৈজ্ঞানিক দক্ষতা প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।
ইটিএইচ জুরিখ, ইপিএফএল ও সুইস এআই ইনিশিয়েটিভ
সুইজারল্যান্ডের এআই পরিবেশের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জুরিখের সুইস ফেডারেল ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (ইটিএইচ) এবং লোজানের ইপিএফএলের মতো বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠান। ২০২৩ সালে তারা গবেষক, স্টার্টআপ এবং শিল্প খাতের অংশীদারদের নিয়ে জাতীয় সহযোগিতামূলক উদ্যোগ হিসেবে সুইস এআই ইনিশিয়েটিভ চালু করে। এ উদ্যোগের লক্ষ্য বৃহৎ পরিসরের এআই মডেল তৈরির সক্ষমতা বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের গবেষণা সক্ষমতা আরো শক্তিশালী করা। একই সঙ্গে এটি সুইজারল্যান্ডের উদ্ভাবন কৌশলেরও প্রতিফলন, যেখানে বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষ, বাস্তব প্রয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে একসঙ্গে গুরুত্ব দেয়া হয়।
বিশ্বের অন্যতম উন্নত সুপারকম্পিউটার ‘আল্পস’
সুইজারল্যান্ডের এআই অগ্রযাত্রার পেছনে রয়েছে অত্যাধুনিক কম্পিউটিং অবকাঠামো। সুইস ন্যাশনাল সুপারকম্পিউটিং সেন্টার (সিএসসিএস) পরিচালিত আল্পস সুপারকম্পিউটার ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী সুপারকম্পিউটার। এটি এআই মডেল প্রশিক্ষণ এবং জলবায়ুবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান ও জীবনবিজ্ঞানের মতো ক্ষেত্রে জটিল সিমুলেশন পরিচালনায় ব্যবহার হয়। এ সক্ষমতার মাধ্যমে গবেষকেরা বৃহৎ পরিসরের তথ্য বিশ্লেষণ এবং বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের গতি বাড়াতে সক্ষম হন। এ পরিবেশেই তৈরি হচ্ছে অ্যাপার্টাস, যা সুইজারল্যান্ডের প্রথম বৃহৎ পরিসরের, সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ও বহুভাষিক ভাষা মডেল। এ প্রকল্পে উন্মুক্ত বিজ্ঞান, স্বচ্ছতা এবং বহুভাষিক এআই ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
এ প্রেক্ষাপটে ইন্টারন্যাশনাল কম্পিউটেশন অ্যান্ড এআই নেটওয়ার্কও (আইসিএআইএন) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সুইজারল্যান্ডের সমর্থনে গড়ে ওঠা এ কৌশলগত উদ্যোগের লক্ষ্য নির্ভরযোগ্য, সার্বভৌম ও প্রয়োজনভিত্তিক এআই উন্নয়নকে এগিয়ে নেয়া। বিশ্বমানের কম্পিউটিং সক্ষমতা (সিএসসিএস), শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান (ইটিএইচ জুরিখ ও ইপিএফএল) এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের একটি যৌথ প্লাটফর্মে যুক্ত করেছে এ নেটওয়ার্ক। এর মাধ্যমে সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং গবেষকেরা স্বচ্ছতা ও আন্তঃকার্যকারিতাকে ভিত্তি করে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী এআই ব্যবস্থা তৈরি এবং পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছেন।
কীভাবে গবেষণাকে স্টার্টআপে রূপ দিচ্ছে সুইজারল্যান্ড
বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে বাস্তব প্রয়োগে রূপান্তরের সক্ষমতাও সুইজারল্যান্ডের অন্যতম শক্তি। বর্তমানে ইটিএইচ জুরিখ থেকে গড়ে ওঠা স্পিন-অফ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এআই অন্যতম শীর্ষ খাত। এর মাধ্যমে গবেষণা, উদ্যোক্তা কার্যক্রম ও বিনিয়োগের মধ্যে শক্তিশালী সংযোগ তৈরি হয়েছে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সুইজারল্যান্ড গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্সে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে, যা গবেষণা, দক্ষ মানবসম্পদ ও উদ্ভাবনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রতিফলন। একই সঙ্গে দেশটির উদ্ভাবন পরিবেশ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক এআই খাতে আন্তর্জাতিক গবেষক, প্রকৌশলী ও উদ্যোক্তাদেরও আকৃষ্ট করছে।
জেনেভা ও বৈশ্বিক এআই পরিচালনার ভবিষ্যৎ
গবেষণা ও উদ্ভাবনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এআই পরিচালনার কাঠামো গড়ে তুলতেও সুইজারল্যান্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দীর্ঘদিন ধরেই জেনেভা আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও সহযোগিতার অন্যতম কেন্দ্র। শহরটিতে ডিজিটাল পরিচালনা এবং প্রযুক্তিনীতি নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা, কূটনৈতিক মিশন এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান। ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (আইটিইউ) এবং ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর স্ট্যান্ডার্ডাইজেশনের (আইএসও) মতো প্রতিষ্ঠান টেলিযোগাযোগ, সাইবার নিরাপত্তা এবং তথ্য পরিচালনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণে ভূমিকা রাখছে। অন্যদিকে জেনেভা ইন্টারনেট প্লাটফর্ম গবেষণা, বিশ্লেষণ ও সক্ষমতা উন্নয়নের মাধ্যমে ডিজিটাল নীতিবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংলাপকে এগিয়ে নিচ্ছে।
২০২৭ সালে জেনেভায় বৈশ্বিক এআই সামিট
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং বৈশ্বিক পরিচালনার সংযোগস্থলে নিজেদের অবস্থান আরো শক্তিশালী করছে সুইজারল্যান্ড। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এআই ইমপ্যাক্ট সামিটে সুইস কনফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট গি পারমেলিন আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেন ২০২৭ সালের এআই সামিট জেনেভায় অনুষ্ঠিত হবে। ২০২৭ সালের ২১ ও ২২ জুন অনুষ্ঠেয় এ সম্মেলনে সরকার, গবেষক, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ এবং বৈশ্বিক ডিজিটাল সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করবেন।
(aboutswitzerland.eda.admin.ch এ প্রকাশিত নিবন্ধের সংক্ষিপ্ত রূপ মূল ইংরেজি থেকে অনূদিত)







