যদিও ডিজিটাল লেনদেনের প্রবৃদ্ধি আশাব্যঞ্জক। ই-কমার্স লেনদেনের ক্ষেত্রে এখনো ক্যাশ-অন-ডেলিভারি (সিওডি) সবচেয়ে বড়। ফলে এখানে ডিজিটাল পেমেন্ট বাড়ানোর সুযোগ অনেক বেশি বলে আমরা মনে করি। একটি বিষয়ে আমরা বাংলাদেশে ভালো অগ্রগতি দেখতে পেয়েছি, আর তা হলো কার্ডভিত্তিক কন্ট্যাক্টলেস পেমেন্ট, যা আঞ্চলিক ট্রেন্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
রমজান ও ঈদকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে ডিজিটাল কেনাকাটার প্রবৃদ্ধি কীভাবে দেখছেন?
রমজান ও ঈদ বাংলাদেশে বছরের সবচেয়ে বড় ভোক্তা-লেনদেনের সময়। এ সময়টায় আমরা ধারাবাহিকভাবে দেখেছি, কার্ডভিত্তিক ডিজিটাল পেমেন্ট ও ই-কমার্স লেনদেন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বিগত বছরগুলোয় রমজান ও ঈদের সময়ে কার্ডের মাধ্যমে ডিজিটাল পেমেন্ট ২৫ শতাংশের অধিক হারে বেড়েছে, যা উৎসবকেন্দ্রিক কেনাকাটার শক্তিশালী চাহিদার ইঙ্গিত।
ঈদ সামনে রেখে গ্রাহকদের জন্য ভিসা ও অংশীদার ব্যাংকগুলো কী ধরনের অফার দিচ্ছে?
ঈদকে কেন্দ্র করে আমাদের মূল উদ্দেশ্য দুটি। এগুলো হলো ১. যারা কার্ড ব্যবহার করেন না বা কম ব্যবহার করেন, তাদের কার্ড ব্যবহারে উৎসাহিত করা এবং ২. কার্ডের মাধ্যমে নিয়মিত ব্যয়কে পুরস্কৃত করার মাধ্যমে অনুপ্রাণিত করা।
আমরা এ বছর রমজান ও ঈদ সামনে রেখে স্পেন্ড অ্যান্ড উইন এবং ট্রানজ্যাক্ট অ্যান্ড উইন ক্যাম্পেইন লঞ্চ করেছি, যা ১ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়ে আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত চলবে। স্পেন্ড অ্যান্ড উইন ক্যাম্পেইনে ভিসা ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ড ব্যবহার করে সর্বোচ্চ অর্থ ব্যয়ের জন্য থাকছে লন্ডন, ইস্তানবুল, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় গন্তব্যে ফুল পেইড ট্রিপ, গোল্ড জুয়েলারি ভাউচার, লাইফস্টাইল ভাউচার, গ্রোসারি ভাউচারসহ আরো অনেক আকর্ষণীয় পুরস্কার জেতার সুযোগ।
ট্রানজ্যাক্ট অ্যান্ড উইন ক্যাম্পেইনের আওতায় ভিসা কার্ডহোল্ডাররা নির্দিষ্টসংখ্যক লেনদেন করে জিতে নিতে পারছেন নিশ্চিত পুরস্কার। এ অফার সব অংশগ্রহণকারী ব্যাংকের গ্রাহকদের জন্য প্রযোজ্য। এছাড়া আমাদের পার্টনার ব্যাংকগুলো তাদের গ্রাহকদের জন্য বিভিন্ন রকমের রমজান ও ঈদ অফার নিয়ে এসেছে, যা ভিসা কার্ড ব্যবহার করে উপভোগ করা যাবে।
ঈদের মতো উচ্চ লেনদেনের সময়ে ডিজিটাল পেমেন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভিসা কী ধরনের উদ্যোগ নিয়ে থাকে?
রমজান বা ঈদের মতো উচ্চ লেনদেনের সময়ে নিরাপত্তা আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভিসা কার্ডভিত্তিক ডিজিটাল পেমেন্টের নিরাপত্তায় কয়েকটি স্তরে কাজ করে। এগুলো হলো ১. রিয়েল-টাইম রিস্ক মনিটরিং ও ফ্রড ডিটেকশন: প্যাটার্ন, ভেলোসিটি, লোকেশন বা ডিভাইস সিগন্যাল ইত্যাদির ভিত্তিতে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করা। ২. কন্ট্যাক্টলেস/ট্যাপ পেমেন্টের সেফটি স্ট্যান্ডার্ড: কন্ট্যাক্টলেস পেমেন্টে নিরাপত্তা নিশ্চিতে নেটওয়ার্ক পর্যায়ে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ জোরালো করা হয়। ৩. আন্তঃসীমান্ত ও ই-কমার্স লেনদেনে অতিরিক্ত সতর্কতা: উৎসবের সময়ে আন্তর্জাতিক ই-কমার্স বা ট্রাভেল বুকিং বাড়ে। সেক্ষেত্রে আন্তঃসীমান্ত লেনদেন মনিটরিং ও শক্তিশালী কমপ্লায়েন্স চেক নিশ্চিত করা হয়।
ক্যাশলেস লেনদেন বাড়াতে নতুন সরকারের কাছে কী ধরনের নীতিগত সহায়তা বা সংস্কার প্রত্যাশা করছে ভিসা?
আমরা মনে করি, সরকারি নীতিসহায়তা পেলে বাংলাদেশে ডিজিটাল পেমেন্টের গ্রহণযোগ্যতা আরো দ্রুত বাড়বে। যে নীতিগত সহায়তা আমরা প্রত্যাশা করছি, তা হলো কার্ডভিত্তিক লেনদেনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো। যেমন সরকারি সেবার ক্ষেত্রে ডিজিটাল পেমেন্ট বাধ্যতামূলক করা, মেট্রোরেল বা টোল প্রদানের ক্ষেত্রে ডেবিট/ক্রেডিট বা প্রিপেইড কার্ডের ব্যবহার উন্মুক্ত করা। এছাড়া ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করার ক্ষেত্রে ডিজিটাল অনবোর্ডিং সহজ করা গেলে আরো অনেক বেশি মানুষ কার্ডভিত্তিক ডিজিটাল পেমেন্টের সুবিধা ভোগ করতে পারবে।
গ্রাম ও মফস্বল এলাকায় ডিজিটাল পেমেন্ট বিস্তারে ভিসার কৌশল কী? স্থানীয় ব্যাংক ও মার্চেন্টদের সঙ্গে কীভাবে কাজ করছেন?
কার্ড পেমেন্ট যেন গ্রাম-মফস্বলেও বিস্তৃত হয়, সেজন্য ভিসা ব্যাংক ও মার্চেন্ট-অ্যাকোয়ারারদের সঙ্গে নিরলস কাজ করে চলেছে। এছাড়া আমরা মাইক্রো মার্চেন্ট এবং এসএমইগুলোর জন্য বিভিন্ন উদ্ভাবনী সমাধান নিয়ে আসছি, যাতে তারা খুব সহজে এবং কম খরচে কার্ড পেমেন্ট গ্রহণ করতে পারেন।
মধ্যবিত্ত ও তরুণ ক্রেতাদের জন্য ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে কিস্তিতে কেনাকাটার সুযোগ কীভাবে বড় অংকের কেনাকাটাকে সহজ করছে?
ইলেকট্রনিকস, হোম অ্যাপ্লায়েন্স, ফার্নিচার বা ট্রাভেলিংয়ের ক্ষেত্রে মধ্যবিত্ত ও তরুণদের জন্য বড় কেনাকাটার ক্ষেত্রে এককালীন পেমেন্ট তাদের জন্য বড় ধরনের মানসিক ও আর্থিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর যদি তা মাসিক কিস্তিতে ভাগ করে নেয়ার সুবিধা থাকে (ইএমআই), তাহলে তা মানসিক ও আর্থিক চাপ কমায়। রমজান বা ঈদের সময়ে এ ধরনের কেনাকাটার বড় অংশ ক্রেডিট কার্ড থেকে আসে বলেও আমাদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে কেনাকাটা করলে বিভিন্ন ধরনের ইএমআই প্রোগ্রাম (যেমন শূন্য বা নিম্ন সুদহারে ইএমআইয়ের সুযোগ, প্রক্রিয়াকরণ ফিতে ছাড় ইত্যাদি) অফার করে, যা গ্রাহকদের এককালীন বড় অংকের টাকা পরিশোধের চাপ থেকে রেহাই দেয়।
অনেক বাংলাদেশী ঈদের কেনাকাটা দেশের বাইরে বা আন্তর্জাতিক ই-কমার্স প্লাটফর্ম থেকে করেন। এক্ষেত্রে ভিসার আন্তর্জাতিক লেনদেন ও ক্রস-বর্ডার পেমেন্ট পারফরম্যান্স কেমন?
বিগত বছরগুলোয় আমরা দেখেছি, ঈদের আগে ট্রাভেল বুকিং, আন্তর্জাতিক ই-কমার্স, সার্ভিস পেমেন্ট—সবকিছুতে কার্ডে মূল্য পরিশোধ বাড়ে। এছাড়া সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, ঈদের ছুটিতে অনেকেই পরিবার বা বন্ধুবান্ধবসহ দেশের বাইরে ঘুরতে যাচ্ছেন। আবার রমজান মাসে উমরাহ করার প্রবণতাও ইদানী লক্ষ করা যাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই এতে আন্তর্জাতিক লেনদেন বাড়ছে। কার্ডভিত্তিক আন্তর্জাতিক লেনদেনকে উৎসাহিত করার জন্য আমরা বিভিন্ন ধরনের অফার নিয়ে আসছি—যেমন হজ ও উমরাহর ক্ষেত্রে সৌদি আরবে বিভিন্ন মার্চেন্ট পয়েন্টে ডিসকাউন্ট, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসাসেবায় বিখ্যাত হাসপাতালগুলোয় নানা ধরনের অফার ও মার্চেন্ট পয়েন্টে ডিসকাউন্ট।
বর্তমানে বাংলাদেশে ভিসা কয়টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে? ভবিষ্যতে ব্যবসা সম্প্রসারণে নতুন কী পরিকল্পনা রয়েছে?
বাংলাদেশে ভিসা অনেকগুলো ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, ফিনটেকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে। আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ক্ষেত্রে যেসব বিষয়ে আমাদের মনোযোগ থাকে, সেগুলো হলো গ্রাহকদের পেমেন্ট অভিজ্ঞতাকে সহজ করার জন্য নিত্যনতুন সলিউশন নিয়ে আসা, মার্চেন্ট পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে নতুন ও আকর্ষণীয় প্রযুক্তি চালু করা, ই-কমার্স পেমেন্ট অভিজ্ঞতার উন্নয়ন ও অনলাইন পেমেন্টে নিরাপত্তা জোরদার করা এবং সর্বোপরি ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে নতুন ব্যবহারকারী ও নতুন ব্যবহারের ক্ষেত্রে কার্ড পেমেন্টকে সহজ করা।
দেশের নিজস্ব পেমেন্ট নেটওয়ার্ক ও ডিজিটাল অর্থনীতির উন্নয়নে প্রযুক্তিগত জ্ঞান, সাইবার নিরাপত্তা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে ভিসা কীভাবে সহায়তা করতে পারে?
আমাদের দৃষ্টিতে সহায়তার তিনটি ক্ষেত্র হলো (১) নলেজ ট্রান্সফার, (২) সাইবার সিকিউরিটি ও রিস্ক ম্যানেজমেন্ট এবং (৩) ইনোভেশন ও ইকোসিস্টেম বিল্ডিং। এছাড়া দেশী পেমেন্ট নেটওয়ার্ক যাতে আন্তর্জাতিক বা ক্রস-বর্ডার পেমেন্টের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যায়, তা নিশ্চিত করতে ভিসা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ভিসা বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত স্টেট অব দি আর্ট সলিউশন নিয়ে আসছে। অনেক ক্ষেত্রেই ভিসার সবচেয়ে আধুনিক ও উদ্ভাবনী সলিউশনগুলো আমরা বাংলাদেশে সবার আগে নিয়ে আসতে পারছি। আমরা মনে করি, বাংলাদেশে ডিজিটাল পেমেন্টের উন্নয়নে ভিসা উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছে।





