১৯৭১ সালে চট্টগ্রামে বিএলএফের (বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স) একটি গেরিলা দলের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ডা. মাহফুজুর রহমান। তার গ্রুপে চারজন গেরিলা যোদ্ধা নিয়মিত বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করতেন। চট্টগ্রাম শহরের অন্যতম এই গেরিলা যোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালী ট্রান্সমিটার মাহফুজ নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি তার গেরিলা দলের কমান্ডার ছিলেন। তার নির্দেশনা অনুযায়ী বাকি গেরিলা যোদ্ধারা প্রতিদিন কোনো না কোনো জায়গায় অভিযান চালাতেন। আগস্ট-পরবর্তী সময় থেকে থেকে ১৬ ডিসেম্বর তারা পর্যন্ত চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে গেরিলা যুদ্ধ চালাতেন। তিনি জানান, গেরিলাদের প্রধান কাজ ছিল হামলা করেই পালানো। যাকে ইংরেজিতে বলা হতো ‘হিট অ্যান্ড রান’। চট্টগ্রামে এক দিনে শতাধিক গেরিলা হামলার পরিকল্পনা করা হয় মূলত নভেম্বরের দিকেই। ঠিক হয় এ দিনটি হবে ডিসেম্বর মাসের শুরুতে কোনো একটি দিন।

চট্টগ্রামে বিএলএফের সাতটি, এমএফের (মুজিব ফোর্স) ২২টি গ্রুপসহ বিভিন্ন গ্রুপের সঙ্গে সমন্বয় করে ১০০টি জায়গায় বিস্ফোরণের পরিকল্পনা করা হয়। ৩০ নভেম্বরের মধ্য রাত থেকেই এ হামলা শুরুর পরিকল্পনা করা হয়। মূলত ১ ডিসেম্বর ছিল সেই সিরিজ হামলার দিন। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিটি অপারেশনের জন্য তিনজন এবং অনেক ক্ষেত্রে পাঁচ-সাতজন যোদ্ধাকে দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনটি অপারেশন স্পট এর জন্য তিনজনের একটি সুপারভাইজিং টিম গঠিত হয়। এই টিম অপারেশন স্পটের রেকি শেষে পরিকল্পনা করে যোদ্ধাদের করণীয় বলে দিত। কোথা থেকে গেরিলা যোদ্ধারা যাত্রা করবেন, অপারেশনের পর কোথায় যাবেন সব তারা ঠিক করে। বিভিন্ন স্থান থেকে হাই কমান্ডের নির্দেশনায় অস্ত্র ও বিস্ফোরক সংগ্রহ করে সেগুলো যথাসময়ে পৌঁছে দেয় তারা। আবার অপারেশন শুরু হলে তাদের প্রত্যেককে একটি অপারেশন স্পটে অংশ নেয়ার দায়িত্ব দেয়া হয়। শহরের বেইজ কমান্ডাররা তৈরি থাকেন অপারেশনের আগে ও পরে যোদ্ধাদের নিরাপদে রাখার। আবার পাঁচটি সুপারভাইজিং টিমের দায়িত্বে থাকেন একজন করে গ্রুপ কমান্ডার। সব মিলিয়ে প্রায় ৬০০-৭০০ গেরিলা যোদ্ধা অংশ নেয়ার কথা ছিল। তবে গেরিলারা বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় থাকার কারণে সর্বমোট কতজন গেরিলা অংশগ্রহণ করেছিল সেটা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি বলে জানান গেরিলা কমান্ডার ডা. মাহফুজুর রহমান।

একজন কমান্ডারের অধীনে ১৫টি অপারেশন স্পটের দায়িত্ব দেয়া হয়। মোট সাতজন কমান্ডারকে এ দায়িত্ব দেয়া হয়। প্রতি কমান্ডারের অধীনে রাখা হয় একটি স্ট্রাইকিং ফোর্স। তাদের দায়িত্ব ছিল বিপদ হলে যোদ্ধাদের পাশে দাঁড়ানো। এর ওপর থাকে হাইকমান্ড যারা সামগ্রিক পরিকল্পনা তৈরি করে এবং তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেয়।

ভোর ৪টায় পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম হামলা হিসেবে পাকিস্তানি সেনাদের অবস্থানের সন্নিকটে অবস্থিত বারিক বিল্ডিংয়ের কাছে পেট্রোল পাম্পে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এর পরপরই শহরময় একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটতে থাকে। মাত্র ১০/১২ মিনিটের এ কর্মযজ্ঞ শেষ করে সব যোদ্ধা নিরাপদে তাদের আশ্রয়ে ফিরে যায়। এদিন মোট ১০০টি অপারেশনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। বিস্ফোরণ ঘটানোর একদিন আগে অপারেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কমান্ডার এমরান গ্রেফতার হয়ে গেলে তার নিয়ন্ত্রণের ১৫টি অপারেশন হয়নি। হাইকমান্ড তার এলাকার আশপাশে আরো ১৫টি অপারেশন স্থগিত করে দেয়। এত বেশিসংখ্যক অপারেশনে যোদ্ধাদের কোনো ক্ষতি হয়নি, কেউ গ্রেফতার হননি। এর পরদিন হানাদার ও সহযোগীদের বিশাল বাহিনী পুরো আগ্রাবাদ এলাকা ঘেরাও করে যোদ্ধাদের খুঁজতে থাকে। কিন্তু এ সময় মিত্রবাহিনীর বিমান আক্রমণ শুরু হলে তারা নিজেদের অভিযান গুটিয়ে ক্যাম্পে চলে যায়।

বিস্ফোরণ হওয়া উল্লেখযোগ্য জায়গাগুলো হলো—আগ্রাবাদের বারিক বিল্ডিংয়ের পাশে পেট্রোল পাম্প, বার্মা ইস্টার্ন পেট্রোল পাম্প, বন্দর থানার কাছে পেট্রোল পাম্প, মাঝিরঘাট পেট্রোল পাম্প, সল্টগোলা পেট্রোল পাম্প, কাস্টমস এলাকার পেট্রোল পাম্প, মাদারবাড়ী পেট্রোল পাম্প, মাদারবাড়ী এলাকার দুটি বিদ্যুৎ ট্রান্সফরমার, আমেরিকান এক্সপেসের পেছনের ট্রান্সফরমার, বেপারীপাড়া ট্রান্সফরমার, আবিদের পাড়া ট্রান্সফরমার, কর্ণফুলী বাজার ট্রান্সফরমার, আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার দুটি ট্রান্সফরমার, জাম্বুরি মাঠের ট্রান্সফরমার, আগ্রাবাদ কলোনি পাওয়ার স্টেশন, সিএন্ডবি কলোনি টান্সফরমার, ঈদগাঁও পেট্রল পাম্প, হাজী ক্যাম্প ট্রান্সফরমার, গোল্ডেন টোব্যাকো ট্রান্সফরমার, জেলেপাড়ার ট্রান্সফরমার, জোলারহাট শিউলি পেট্রোল পাম্প, গোল্ডেন টোব্যাকো কোম্পানি পেট্রল পাম্প, বারকোয়ার্টার পেট্রোল পাম্প, দেওয়ানহাট থেকে জোলারহাট পর্যন্ত চারটি ট্রান্সফরমার, ওয়াপদা কলোনি ট্রান্সফরমার, মোহাম্মদ আলী পেট্রল পাম্প, বউবাজার পেট্রল পাম্প, পোস্ট অফিস কলোনি ট্রান্সফরমার, কোতোয়ালি থানাসংলগ্ন ট্রান্সফরমার, চকবাজার পেট্রল পাম্প, স্টেডিয়াম ট্রান্সফরমার, অভয়মিত্রঘাট ট্রান্সফরমার, কালুরঘাট ট্রান্সফরমার, আসকরদীঘির পাড়ের ট্রান্সফরমার, লালদীঘি পেট্রল পাম্প, লালদীঘির ইউনাইটেড ব্যাংকের সামনের ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণ করেন গেরিলা যোদ্ধারা।

এছাড়া কাজীরদেউড়িতে পেট্রল পাম্প, স্টেশন রোডে দুটি ট্রান্সফরমার, টাওয়ার হোটেল, চন্দনপুরা ট্রান্সফরমার, ডিসি হিলের নিচে ট্রান্সফরমার, হেমসেন লেনের ট্রান্সফরমার, কোরবানীগঞ্জ ট্রান্সফরমার, হালিশহরের তিনটি ট্রান্সফরমার ও দুটি বিদ্যুৎ পাইপলাইন, নাসিরাবাদ এলাকার পেট্রল পাম্প ও দুটি ট্রান্সফরমার, রেয়াজউদ্দিন বাজারের কাছে ট্রান্সফরমার, ক্যাথলিক ক্লাবের কাছে ট্রান্সফরমার, বাকলিয়াতে ট্রান্সফরমার, নিউমার্কেট, চকবাজারে দুটি ট্রান্সফরমার, দেওয়ান হোটেলে বোমা, রেলস্টেশনের আনসার ক্যাম্পে বোমা, খাতুনগঞ্জে ট্রান্সফরমার, খাতুনগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণ, রেয়াজউদ্দিন বাজারের বিভিন্ন পয়েন্টে বোমা, টাইগারপাস মোড়ে নৌবাহিনী অফিসের দুদিকে গ্রেনেড, বন্দর, পাঁচলাইশ, কোতোয়ালি থানা প্রতিটি থানার সামনে ও পেছন থেকে গ্রেনেড ছোড়া হয়, কালুরঘাটে একটি ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয় পরিকল্পিতভাবে।

বিস্ফোরণ প্রসঙ্গে গেরিলা যোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান জানান, নভেম্বর থেকেই বাংরাদেশে অবস্থান করা পাকিস্তানি সৈন্যদের মনোবল ভেঙে যেতে শুরু করে। অপারেশন জ্যাকপটের কারণে পাকিস্তানিদের মনোবল আগে থেকেই পিছুটানের মধ্যে ছিল। যার কারণে ডিসেম্বরের শুরুতেই ১০০টি জায়গায় গেরিলাদের বিস্ফোরণ প্ল্যান করা ছিল অবশ্যম্ভাবী কাজ। পাকিস্তানিদের জ্বালানি সরবরাহ এবং বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সংযোগসহ সব ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে তাদের কোণঠাসা করে দেয়ার জন্য মূলত এ বিস্ফোরণের পরিকল্পনা করা হয়। সেদিনের অপারেশন প্রায় ৮৫টি জায়গায় সফলভাবে সম্পন্ন করা হয় বলে তিনি দাবি করেন। তাছাড়া মৌলভি সৈয়দ আহমেদের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে সমন্বয় করে তারা অনেক জায়গায় গেরিলা যুদ্ধের পরিকল্পনা করেন।

তার কাছ থেকে আরো জানা যায়, মূলত একই সময়ে বিস্ফোরণের পরিকল্পনা থাকলেও আধুনিক প্রযুক্তি না থাকায় প্রায় কাছাকাছি সময়ে বিস্ফোরণগুলো ঘটানো হয়েছিল। তবে অনেক গেরিলা গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব না হওয়ায় একই সময়ে বিস্ফোরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি। তবে একই দিনে হামলাগুলো করা সম্ভব হয়েছিল যা এ অপারেশনের সবচেয়ে বড় সফলতা ছিল বলে মনে করেন রণাঙ্গণের এ গেরিলাযোদ্ধা।

 

সুজিত সাহা: সাংবাদিক