১৯৪৯ সালের ১ মার্চ ময়মনসিংহ জেলার কোতোয়ালি থানার রশিদপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ডা. মাহফুজুর রহমান। ১৯৭১ সালে তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ডা. মাহফুজুর রহমান তার গেরিলা ইউনিটের কমান্ডার ছিলেন। ১৯৮০ সালে তিনি মুক্তিযুদ্ধ গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। দীর্ঘ এক দশক গবেষণার পর তিনি ‘বাঙালির জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম’ বইটি রচনা করেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার নিয়ে নিজের ইউটিউব চ্যানেলে দেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেবব্রত রায় 

আপনার গেরিলা যুদ্ধের শুরুটা কীভাবে হয়েছিল?

প্রশিক্ষণের পর আমাকে দায়িত্ব দেয়া হয় ডেমোলিশনের। ইঞ্জিনিয়ার হারুন ভাইকে দেয়া হয় রাজাকার আক্রমণের। রাজাকার প্রতিহত করার। এভাবেই কাজ করতে থাকলাম। চট্টগ্রাম ছোট একটা শহর। অথচ সেখানে সব মিলিয়ে চার শতাধিক অপারেশন পরিচালনা করা হয়েছে। বেশ বড় কিছু অপারেশনও রয়েছে। একটা হয় আমাদের গ্রুপ ও কেসি-৪ মিলিয়ে। এখানে বিএলএফের গ্রুপ সাতটি বা আটটি ছিল। বিএলএফের চট্টগ্রামের গ্রুপের নামগুলো কেসি-১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮  এভাবে। কেসি মানে কর্ণফুলী কন্টিনজেন্ট। আমাদের অপারেশনে কাট্টলীতে একটা ট্রেন উড়িয়ে দেয়া হয়। তিরিশ থেকে চল্লিশ জন পাকিস্তানি মারা যায় আক্রমণে। অবশ্য সংখ্যাটা নিশ্চিত না। গেরিলা যুদ্ধে শত্রুপক্ষের কতজন মারা গেল, তা দেখা যায় না।

কয়েকটি অপারেশনের অভিজ্ঞতা বলুন।

বড় বড় অপারেশন হয়েছে অনেক। যৌথ বাহিনী দিনেদুপুরে আক্রমণ করেছিল আগ্রাবাদের ফায়ার ব্রিগেড। ডেমোলিশন করেছে আমাদের গ্রুপ। হারুন ভাই ও লোকমানরা ছিল অ্যামবুশের দায়িত্বে। ধারণা করেছিলাম পাক আর্মি আসবে। একটা মুখোমুখি যুদ্ধ হবে তাদের সঙ্গে। কিন্তু হয়নি। এরপর আগ্রাবাদে হয়েছে অপারেশন। সেদিন জাতিসংঘের একটা টিম এসেছিল আগ্রাবাদে। অবস্থান করছিল হোটেলেই। চারজন ছেলে গিয়ে সেটা উড়িয়ে দিয়ে আসে। অপারেশন চালানো হয় ইউসিস লাইব্রেরিতেও। সেখানে আমেরিকান একটা টিম এসেছিল। শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত যেহেতু। পরিকল্পনা ছিল তিন-চারটা গ্রেনেড মেরে জানান দেয়া যে এখানে যুদ্ধ চলছে। এমন করেই যুদ্ধ চলেছে। চট্টগ্রামের যারা গেরিলা যুদ্ধের দায়িত্বে ছিল, তারা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সফলতার সঙ্গে পালন করেছেন। গেরিলা যুদ্ধের তাত্পর্য ছিল জনগণের মনোবল বাড়ানো ও পাঞ্জাবিদের মনোবল কমানো।

সাধারণ মানুষ থেকে আপনারা কেমন সাড়া পেয়েছিলেন?

চট্টগ্রামে যে চারশ অপারেশন আমরা চালিয়েছি তাদের মূল নায়ক কিন্তু জনগণ। জনগণ আশ্রয় না দিলে আমরা থাকতে পারতাম না। জনগণই পাঞ্জাবিদের অবস্থান আমাদের জানিয়ে দিত। জনগণই দেখিয়ে দিত রাস্তা। এই যে সাধারণ মানুষের অভূতপূর্ব সমর্থন, এটাই বিজয়ী করেছে। ভারতীয় বাহিনী, বেঙ্গল রেজিমেন্ট, মুক্তিবাহিনী ও ইপিআর ছিল অগ্রবর্তী বাহিনী। জনগণ ছিল মূল বাহিনী। অঞ্চল তো ছিল ছোট। তার পরও এত অপারেশনে কেউ ধরা পড়ল না। শুধু একজন মারা গেছে আমাদের। সিটি কলেজের সরাসরি যুদ্ধে। গেরিলাদের মৃত্যুহারও কম ছিল। শুধু বাসা থেকে কয়েকজনকে ধরে নিয়ে গেছে। একাত্তরের কৃতিত্ব যদি দিতে হয়, সাধারণ সেই মানুষদেরই দিতে হবে। গেরিলা অভিযান চট্টগ্রামে হয়েছে দেশের অন্য অঞ্চলের চেয়ে বেশি। তার মানসিক প্রস্তুতি ছিল বেশ আগে থেকেই। এমএ আজিজ কিন্তু স্বাধীনতার পক্ষে আটষট্টি সাল থেকেই ছিলেন। কেবল প্রকাশ্যে বলতেন না। আটষট্টির পরে আমি ব্যক্তিগতভাবেই কখনো ছয় দফার কথা বলিনি। বলেছি স্বাধীনতার কথা। তরুণরা সক্রিয় হয়েছে। জনগণের সহযোগিতা ছিল সত্যিই মারাত্মক। আমি এমন কোনো বাড়ি পাইনি, যেখানে আমাকে শুনতে হয়েছে, ‘মাহফুজ তুমি থেকো না’। তারা অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করেছেন। এমনকি চাঁদাও তুলেছেন মহিলারা। মেজর শামসু ভাইয়ের স্ত্রী চাঁদা তুলতে গিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছিল। কোনো রকমে বেরিয়ে আসে। কাঠগড়ের মুক্তিযোদ্ধা নুরুদ্দিন। তার মা অলংকার বিক্রি করে আমাদের খাইয়েছে। শহরের অস্ত্রগুলো আনা হতো বাঁশবাড়ির মোজাফফর মতিনের ওখান থেকে। নৌকা দিয়ে অস্ত্রগুলো শহরে আনতে হতো। যারা এ অস্ত্র আনছে, তাদের মুক্তিযোদ্ধা না বললে কাকে বলব? আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি, চট্টগ্রামের অপারেশনে অংশগ্রহণকারী ৬০ ভাগই মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

গেরিলা যুদ্ধে আপনাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদের ব্যবস্থা কেমন ছিল?

আমার ওপর যেহেতু ডেমোলিশনের দায়িত্ব ছিল, মোজাফফর মতিনের সঙ্গে যোগাযোগ হতো। ওই যে বলছিলাম, শহরের অস্ত্রগুলো ওখানে রাখা হতো। তিনি আবার আগের রাজনীতির সূত্রেও আমাদের পরিচিত। তাকে বলেছিলাম কেউ অস্ত্র জমা দিলে নিয়ে নিতে। কিন্তু আমার স্লিপ ছাড়া যেন কাউকে অস্ত্র না দেয়। যার ফলে বিভিন্ন গ্রুপের কিছু অস্ত্র আমি মেরে দিয়েছিলাম। এতে লাভ হয়েছিল পরবর্তী সময়ে। চট্টগ্রামে কোনো গ্রুপের অপারেশনের সময়ই গেরিলাদের অস্ত্রের অভাব হয়নি। যখনই যাদের অস্ত্রের প্রয়োজন পড়েছে, আমরা পাঠিয়ে দিয়েছি। এটা নিয়ে একবার একটা গ্রুপ অভিযোগ করেছিল। আমি শুধু প্রশ্ন করেছিলাম, তোমার গ্রুপ যেসব অপারেশন করছে, তাদের অস্ত্র বা বিস্ফোরকের অভাব হয়েছে কখনো? জবাবে বলেছিল, ‘না, মাহফুজ ভাই’।

আসলে অস্ত্র সেভাবে থাকেও না। মিসপ্লেসড হয়ে যায়। তাছাড়া গেরিলাদের সেভাবে অস্ত্র প্রয়োগের প্রয়োজনও হয়নি। মূলত গ্রেনেড ছিল সাধারণ যোদ্ধাদের কমন অস্ত্র। একটা গ্রেনেড ফাটালেই আশপাশের মানুষ বুঝে ফেলত মুক্তিযোদ্ধা আসছে। পাঞ্জাবিরাও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ত। বুঝতে পারত সাধারণ মানুষও তাদের প্রতিকূলে। তাদের বিভ্রান্তির আরেকটা কারণ ছিল পেছনে। তাদের বলে আনা হয়েছিল বাংলাদেশে সব হিন্দু। কিন্তু এখানে এসে দেখেছে আশেপাশের চার-পাঁচটি মসজিদে একসঙ্গে আজান হয়। এটা তাদের নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে দিয়েছে। সেটা আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করেছে। আমরা টার্গেট করেই এগিয়েছি। আগ্রাবাদ, ইউসিস লাইব্রেরি, ট্রেন ও ট্রান্সফরমারে অপারেশন ছিল টার্গেটেড। বিদ্যুৎ চলে গেলে তারা বেশি ভয় পায়। কিন্তু তারাও দিনশেষে মানুষ তো। পাঞ্জাবিরা এখানে এসেই বুঝে গেছে, তারা শত্রুবেষ্টিত অঞ্চলে ঢুকে পড়েছে। এজন্যই বলেছি মুক্তিযুদ্ধে জনগণই প্রধান নায়ক।

আপনাদের যুদ্ধকৌশল, পরিকল্পনা ও নেতৃত্ব কেমন ছিল?

সারা চট্টগ্রামকে ভাগ করা হয়েছিল আক্রমণের সুবিধার্থে। ফটিকছড়িতে বিএলএফ কমান্ডার ছিলেন আনোয়ার আজিম, এফএফ কমান্ডার মির্জা মনসুর। হাটহাজারীতে বিএলএফ কমান্ডার এসএম ফজলুল হক ও এফএফ কমান্ডার সম্ভবত কামাল উদ্দিন। আরো অনেক গ্রুপ সক্রিয় ছিল। রাঙ্গুনিয়ায় এফএফ কমান্ডার খোদা বক্স ও বিএলএফ কমান্ডার ছিলেন নুরুল আলম। কমান্ডার ছিলেন আরো। রাউজানে বিএলএফ কমান্ডার নাজিম উদ্দিন এবং এফএফ কমান্ডার ছিল আবু মোহাম্মদ হাশেম। এখানেও অনেক কমান্ডার ছিলেন। মিরসরাইয়ে এফএফ কমান্ডার ছিলেন অহিদুল ভাই ও বিএলএফের ছিলেন এরফান। সীতাকুণ্ডে এফএফ কমান্ডার ছিলেন আবুল কালাম আজাদ ও বিএলএফ কমান্ডার ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার সালাহউদ্দিন। বোয়ালখালীতে এফএফ কমান্ডার নির্দিষ্ট ছিল না। বিএলএফ কমান্ডার ছিলেন রাজেন্দ্রপ্রসাদ চৌধুরি। পটিয়া, বোয়ালখালী, আনোয়ারা ও বাঁশখালীতে সক্রিয় ছিলেন ক্যাপ্টেন করিম, সার্জেন্ট আলম ও মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী। সিপিবির শাহ আলম ও আ হ ম নাসির উদ্দিন দায়িত্বে ছিলেন বোয়ালখালীতে। বোয়ালখালীর থানা কমান্ডার ছিলেন এফএফের সোলায়মান। প্লাটুন ও কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন আবুল বশর। পটিয়ার নুরুল ইসলাম ও দীলিপ দাস মূলত যুদ্ধ করেছেন রাউজানে। ওখানে সার্জেন্ট আলম, ক্যাপ্টেন করিমরাই চালিয়েছেন। বাঁশখালীতে এফএফ কমান্ডার ছিলেন মোকতার আহমদ। যুদ্ধ করেছেন হাটহাজারী। পথ ব্লক করে রেখেছিলেন। আনোয়ারায় বিএলএফের কমান্ডার ছিলেন সেলিম চৌধুরি। এফএফ কমান্ডার ভিন্নভাবে কেউ ছিলেন না বোধ হয়। সার্জেন্ট আলম ও ক্যাপ্টেন করিমের উপস্থিতিতে নতুন করে কোনো কমান্ড প্রস্ফুটিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। উনারাই নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাদের আন্ডারেই বিএলএফের যে কেউ চলে যেতেন। যুদ্ধ করতেই তো এসেছেন সবাই। ওখানে জাতির প্রয়োজন মিটিয়েছেন তারা। সামনে থেকে এগিয়ে নিয়েছেন আলম, ক্যাপ্টেন করিম ও শাহজাহান। বৃহত্তর চট্টগ্রামের চালচিত্র ছিল এটাই। দোহাজারিতে বিএলএফ কমান্ডার ছিলেন আবু তাহের ও খসরু। সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ায় বিএলএফ কমান্ডার মনির আহমদ। চট্টগ্রামে কাট্টলী ট্রেনে অপারেশনটা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। রইসুল হক বাহারের নেতৃত্বে হয়েছে অপারেশনটি। কমান্ড সেক্টরটা ছিল আমাদের। ঘটনাটি ঘটে নভেম্বরের দিকে। হিট অ্যান্ড রানের পরিকল্পনা নিয়েই এগিয়েছি। সত্যি বলতে গেরিলা যুদ্ধ সবার জন্য না। এখানে অংশগ্রহণ করত শুধু তরুণেরা। তবে ফয়’স লেকে টাওয়ার উড়িয়ে দেয়ার অপারেশনটা ছিল মনে রাখার মতো। মূলত সেটি ছিল একটা ট্রেনিং প্রোগ্রাম। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল দুইটা। প্রথমত পাকিস্তানি বাহিনীদের মধ্যে ভয় ধরানো। দ্বিতীয়ত ঢাকার লাইন বিচ্ছিন্ন করা। সত্তর-আশিজন ছিল ওখানে। সব গ্রুপ মিলিয়ে অপারেশন কমান্ডার ছিলেন হারুন ভাই। আসলে তখন কেউ কমান্ডার হওয়ার জন্য লালায়িত ছিল না, চাইত যুদ্ধ করতে। অপারেশনটিতে বিশেষভাবে লক্ষণীয় ছিল দেশীয় প্রযুক্তির ব্যবহার। টাইম ডিলে ডিভাইস হিসেবে মশার কয়েল ব্যবহার করা হয়েছে তখন। গেরিলা আক্রমণ সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বরের দিকেই বেশি হয়েছে। এতটা অপারেশন হয়েছে ফায়ার ব্রিগেডের দিকে। আমরা বসে ছিলাম পাকিস্তানি আর্মি আসবে, আসেনি। ওটা উড়িয়ে দিয়ে এসেছি। মুহাম্মদ আলির বাড়ি আক্রমণ করেছিলেন হারুন ভাই। প্রতিটা অপারেশনই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ১ ডিসেম্বর একযোগে চট্টগ্রামে একই সময়ে একশটা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। ছয়শ সদস্য যুক্ত ছিল অপারেশনে। গোটা শহরের সমস্ত গ্রুপ এতে জড়িত ছিল। এখানে এফএফ-বিএলএফ কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না। যুদ্ধের মাঠে কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না। এক গ্রুপের সদস্য অনায়াসে অন্য গ্রুপের অধীনে যুদ্ধ করত।

গেরিলা যুদ্ধের উদ্দেশ্যই হলো মনোবল ভেঙে দেয়া। কোনো ক্যাম্পে অ্যাটাক করার ইচ্ছে আমাদের ছিল না। একা ক্যাম্পের পাশে মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ একটা গুলি ছুড়ে চলে আসবে। পরে দেখা যেত সারা রাত ক্যাম্প থেকে গুলি ছোড়া হচ্ছে। এটাই তাদের আতঙ্ক তুলে ধরে। এলাকায় যুদ্ধ করবে নিয়মিত বাহিনী। গেরিলাদের অপারেশনের কাজ আঘাত করো ও পালিয়ে যাও।

চট্টগ্রামে বিএলএফ ও এফএফের কার্যক্রম কেমন ছিল?

চট্টগ্রাম শহরে বিএলএফের গ্রুপ ছিল আট-দশটা। অন্যদিকে এফএফের ছিল পনেরো-বিশটা। আমাদের স্বাধীনতা নাম দিয়ে একটা পত্রিকা বের হতো তখন। সেটার দায়িত্ব ছিলেন ডা. আফসারুল আমিন ও আরো তিনজন ডাক্তার। জয়বাংলা নামে আরো একটা পত্রিকা বের হয়েছে সে সময়। ওইখানে সহায়তা করেছেন রহমান এবং লোকমান গ্রুপ, এফএফ। আমরা তখনো আসিনি। ওই পাড়ে ছিলেন ইউনুস। আরেকজন ছিলেন। তাকে মাইঝ্যা মিঞার বাপ বলা হতো। তারা কালা মিঞা সওদাগরের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। অপারেশনগুলো সফল হয়েছিল। বোধ হয় আট-দশটি জাহাজ তারা ডুবিয়েছিলেন। খরস্রোতা কর্ণফুলী নদী পাড় হয়েছেন, মাইন লাগিয়েছেন, আবার ফেরত গেছেন। কল্পনা করতে পারেন, কতটুকু প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকলে এটি সম্ভব। এটি প্রতিশ্রুতির ব্যাপার। গায়ের জোরের কোনো ব্যাপার না। আমি করবই, এ প্রতিজ্ঞা থেকেই তারা এ অসাধ্য সাধন করেছিলেন। এখন তো এগুলো কল্পনাও করা যাবে না। এর ফলে বিশ্ব জানতে পারল যে বাংলাদেশে সাংঘাতিক কিছু হচ্ছে। কমডোর মমতাজ এখানে নেভালের চিফ ছিলেন। বাংলাদেশ সরকারের তাকে পদক দেয়া উচিত। উনি সাংঘাতিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন। এটি আমি নিশ্চিত হয়েছি নুরুল হুদা নামে এক ভদ্রলোকের কাছ থেকে। তিনি নেভালে প্রয়োজনীয় সামগ্রী সাপ্লাই দিতেন। উনার কাছে মুক্তিযোদ্ধারা প্রায়ই আসতেন। একদিন কমডোর মমতাজ উনার বাড়িতে এলেন। এসে কিছু ছেলেপিলে দেখলেন। তখন জিজ্ঞেস করলেন, ‘হুদা, এগুলো কে?’ তিনি ছিলেন উত্তর প্রদেশের লোক। বললেন, কেউ না। তখন কমডোর মমতাজ বললেন, ‘আমি তোমার লবণ খেয়েছি এর আগে। আমি বেইমানি করব না। এগুলো কে ঠিক করে বলো।’ তখন হুদা সাহেব বললেন। কমডোর মমতাজ বললেন, তুমি তাদেরকে আরেকদিন ডাকো। হুদা তখন ভয়ে অস্থির। কী করবেন। তখন মমতাজ বললেন, ‘নির্ভয়ে ডাকো, আমি লবণ খেয়েছি না তোমার।’ ডাকার পরে নাকি তিনি ইচ্ছামতো গালাগালি করতেছিলেন। ‘শালা, এখানে ফুটাও, ওখানে ফুটাও, এতে কি কিছু হবে! জাহাজ ফুটায়ে দাও।’ দেখা গেল, এত বড় একটা অপারেশন, একজন সৈন্যও কিন্তু মারা যান নাই। কমডোর মমতাজ থেকেই তারা ক্যামেরা সংগ্রহ করেছেন। ইঞ্জিনিয়ার আজিজ বলে একজন ছিলেন। ডক্টর তারেক বলে একজন নামকরা ডাক্তার ছিলেন।

আপনার সঙ্গে যেসব কমান্ডার ছিলেন, তারা কি সবাই ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়েছেন?

না না। ভারত থেকে মাত্র দশজন ট্রেনিং নিয়েছেন। আমরাই পরবর্তী সময়ে অন্যদের প্রশিক্ষণ দিয়েছি। আমাকে বলা হতো দলনেতা। আর বাকিদের নেতা বলা হতো। তারাই প্রশিক্ষণ দিয়ে গ্রুপ গঠন করবেন।

তাহলে আপনাদের অপারেশন ছিল শেষের পাঁচ মাস—আগস্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বর?

হ্যাঁ। আগেও কিছু হয়েছিল। তবে মূল অপারেশনগুলো হয়েছিল এ সময়ে। চট্টগ্রাম শহরের মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যারা অন্তত দুইটা থেকে দশটা পর্যন্ত অপারেশন করেছেন, অনেকেই ষোলোটিরও অধিক অপারেশন করেছেন, তাদের ষাট ভাগেরই সরকারি স্বীকৃতি নেই। প্রথম কারণ হলো, তারা অনেকেই আবেদন করেননি। দ্বিতীয়ত, আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই কমিটির কাছে গেছে। এ কমিটির সদস্যরা সাধারণ যোদ্ধা। তাদের পক্ষে গেরিলাদের চেনা সম্ভব নয়। যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে উচিত ছিল, ওইখানে যে কমান্ডারের নাম লেখা থাকে, সে কমান্ডারের একজন অথবা তার প্রতিনিধি থাকবেন। আমিও আমার গ্রুপের সবাইকে একাত্তর সালে চিনতাম না। এটিই গেরিলা যুদ্ধের নিয়ম। আমি ওই দশজনকেই মূলত চিনতাম। ওরা বাকিদের চিনবেন ও দিকনির্দেশনা দেবেন। আমার কোনো নির্দেশ থাকলে দশজনে পাবেন। তারা তাদের কাজ করবেন। সবাই যদি আমাকে চিনে ফেলে, তাহলে আমার ধরা পড়তে খুব বেশি সময় লাগবে না।