নব্বইয়ের দশকের শুরুতে যাত্রা করে দেশের প্রথম রফতানিমুখী জুতা উৎপাদনকারী কারখানা এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেড। আর এ প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী। বাংলাদেশে জুতার এ বৈশ্বিক কারিগর গতকাল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও এপেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ৩১ মিনিটে, বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টা ৩১ মিনিটে তার মৃত্যু হয়। বেশ কিছুদিন ধরে তিনি বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন। সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর ছেলে সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর জানান, মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি ও তার বোন মুনিজে মঞ্জুর বাবার শয্যার পাশেই ছিলেন। ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি প্রাঙ্গণে আজ সকাল সাড়ে ১০টায় সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। দ্বিতীয় জানাজা হবে জোহর নামাজের পর রাজধানীর গুলশান ২-এর আজাদ মসজিদে। এরপর তাকে দাফন করা হবে বনানী কবরস্থানে স্ত্রী নিলুফার মঞ্জুরের কবরের পাশে।

সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে ১৯৯৬ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারে যোগাযোগ, নৌ-পরিবহন, বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন, ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারে কৃষি, নৌ-পরিবহন, মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন।

বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানিতে কাজ করলেও সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী দেশ স্বাধীন হওয়ার পর চামড়া ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৭২ সালে মঞ্জুর ইন্ডাস্ট্রিজ নামে কোম্পানি করে কমিশনের ভিত্তিতে চামড়া বিক্রির ব্যবসা শুরু করেন তিনি। চার বছর পর ১৯৭৬ সালে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ওরিয়েন্ট ট্যানারি কিনে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন এপেক্স ট্যানারি। তারও ১৪ বছর পর যাত্রা শুরু করে এপেক্স ফুটওয়্যার।

ফুটওয়্যারের আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশ প্রবেশ করে নব্বই দশকের শুরুতে। এর প্রথম অনুপ্রেরণা মেলে ১৯৮৯ সালে। সে সময় চামড়া প্রদর্শনী হতো হংকংয়ে। এতে অংশ নেয় এপেক্স ট্যানারি নামে একটি প্রতিষ্ঠান। হংকং-জাপান যোগাযোগ সুবিধার কারণে প্রদর্শনীতে অনেক জাপানি ক্রেতা আসতেন। তাদের মধ্যে এপেক্সের চামড়ার বড় ক্রেতারাও ছিলেন। এপেক্সের স্বত্বাধিকারী সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর সঙ্গে ‘মারুটোমি’ নামের এক জাপানি জুতা বিক্রেতা কোম্পানির সংযোগ ঘটিয়ে দিলেন তারা। প্রতিষ্ঠানটির তখন শুধু খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রই ছিল প্রায় ১ হাজার ১০০টি।

ওই সময় ভারত বা অন্যান্য উৎস থেকে জুতা কিনতে শুল্ক পরিশোধ করতে হতো। অন্যদিকে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ থেকে শুল্কমুক্তভাবে পণ্য আমদানির সুযোগ ছিল ক্রেতাদের। এ কারণে এপেক্সের জাপানি ক্রেতারা সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীকে পরামর্শ দিলেন দেশেই জুতা কারখানা গড়ে তোলার। অন্যদিকে মারুটোমিও এ শুল্ক সুবিধার সুযোগ নিতে বাংলাদেশ থেকে জুতা কিনতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।

তখন পর্যন্ত দেশে স্থানীয় উদ্যোগে জুতা উৎপাদন হয়েছে অনেকটা কুটির শিল্পের মতো করে। এক্ষেত্রে একমাত্র লক্ষ্য ছিল দেশের বাজারের চাহিদা পূরণ। এ কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানির উপযোগী জুতার কারখানা তখনো একটিও গড়ে ওঠেনি।

রফতানিমুখী জুতা উৎপাদনকারী কারখানা হিসেবে এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের যাত্রা ১৯৯০ সালে। যদিও প্রতিষ্ঠানটির ভিত্তি তৈরি হয়েছিল সত্তরের দশকের মাঝামাঝি। সে সময় লোকসানি প্রতিষ্ঠান ওরিয়ন ট্যানারিকে নিলামে তোলে সরকার। ১২ লাখ ২২ হাজার ডলারে ট্যানারিটি কিনে নেন উদ্যোক্তা সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী। এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় এপেক্স ট্যানারি।

সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর হাতে পড়ে চামড়াজাত জুতার ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ হিসেবে শক্তিশালী অবস্থান গড়ে নিতে সক্ষম হয় প্রতিষ্ঠানটি। ফলে জুতার রফতানিমুখী প্রথম কারখানা হিসেবে যাত্রা করলেও ক্রেতাদের আস্থা অর্জনে খুব একটা বেগ পোহাতে হয়নি এপেক্স ফুটওয়্যারকে।

চামড়া রফতানির সূত্র ধরে ইতালীয় ক্রেতাদের সঙ্গে প্রথম সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল এপেক্স ট্যানারির। প্রকৃতপক্ষে ইতালীয়রাই ছিল ট্যানারিটির প্রক্রিয়াজাত চামড়ার প্রথম ক্রেতা। কিন্তু বাংলাদেশের পাদুকা শিল্পের সম্ভাবনা নিয়ে তাদের বেশ উন্নাসিক মনোভাব ছিল। পরে ক্রাস্ট লেদার বা প্রক্রিয়াজাত চামড়া রফতানির সুবাদে এপেক্সের সঙ্গে জাপানিদেরও ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বাংলাদেশে চামড়ার মূল্য সংযোজনের সম্ভাবনা নিয়ে জাপানিদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বেশ অনুপ্রেরণাদায়ক।

ওই ক্রেতারা এক পর্যায়ে সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীকে প্রশ্ন করে বসেন—সারা জীবন শুধু চামড়া রফতানি করবেন? মূল্য সংযোজন করতে হবে না? ক্রেতাদের এ কথা মনে দাগ কাটল সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ২০২১ সালের মার্চে এপেক্স ফুটওয়্যারের চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা প্রয়াত সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী বণিক বার্তাকে বলেছিলেন, ১৯৮৯ সালের কথা বলছি, যখন জুতার একটিও রফতানিমুখী কারখানা ছিল না। প্রক্রিয়াজাত চামড়া রফতানিতে আমরা ছিলাম পথিকৃৎ প্রতিষ্ঠান। রফতানিমুখী ফুটওয়্যারেও পথিকৃৎ হওয়ার সুযোগ এলে সেটাও গ্রহণ করলাম। সফিপুরে কারখানা গড়ে তোলা হলো। কিন্তু উৎপাদন, বিপণন সবদিক বিবেচনায় দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন দেখা দিল, যা বাংলাদেশের ছিল না। এ বিষয়ে জাপানিরা সহযোগিতা দিয়ে বলল, তারাই উৎপাদিত জুতা কিনবে। ফলে বিপণন জটিলতাও রইল না। এরপর কারখানা কার্যক্রম শুরু হলো। প্রথমে উৎপাদন সক্ষমতা ছিল দৈনিক ১ হাজার জোড়া। সে সময় পাঁচ-ছয়জন জাপানি বাংলাদেশে এসে বসবাস শুরু করলেন। পণ্যের মান নিয়ে জাপানিদের খুঁতখুঁতে মনোভাব আমাদের কারখানার উৎপাদন মানকে উন্নত পর্যায়ে নিয়ে গেল। জাপানে রফতানির মাধ্যমে রফতানিমুখী প্রথম কারখানা হিসেবে যাত্রা করল এপেক্স ফুটওয়্যার।

নব্বইয়ের দশকে আন্তর্জাতিক বাজারে যাত্রা করলেও পশ্চিমা বাজারে বাংলাদেশের জুতা সরবরাহ হয় ১৯৯৫ সালের দিকে। জাপানে রফতানি শুরুর পর প্রায় আড়াই বছর বেশ ভালো ব্যবসা করে এপেক্স ফুটওয়্যার। কিন্তু প্রথম দুর্ঘটনা ঘটে ১৯৯৩-৯৪ সালে। ওই সময় জাপানের অর্থনীতিতে ধস নামল। এপেক্স ফুটওয়্যারের একমাত্র ক্রেতা কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে গেল। বন্ধ হয়ে গেল ১ হাজার ১০০ বিক্রয়কেন্দ্র। বিষয়টি এপেক্সের জন্য দেখা দিল মহাবিপদ হয়ে। কোনো ক্রয়াদেশ ছিল না। তবে এ পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার সুযোগও চলে এল। ওই সময় পূর্বপরিচয়ের সুবাদে জাপানে রফতানীকৃত জুতার নমুনা নিয়ে ইউরোপে গেল এপেক্স। তবে ইতালিতে বাজার স্থাপনে বাধা হয়ে দাঁড়াল নকশার ভিন্নতা। ইতালি ও জাপানে পরিধেয় জুতার নকশা যেমন ভিন্ন, তেমনি ব্যবহারের দিক থেকেও ছিল চর্চাগত ভিন্নতা। জাপানে বাসাবাড়ি, রেস্টুরেন্টসহ অনেক ক্ষেত্রেই জুতা না পরার চর্চা রয়েছে। জাপানে এজন্য ফিতাসহ জুতার ব্যবহার হয় কম। এ কারণে ইতালির ক্রেতারা প্রথম কাজ দিতে চাইলেন না। পরে নমুনা তৈরির আহ্বানে সাড়া পাওয়া গেল। কিন্তু একাধিকবার নমুনা তৈরি করেও আকৃষ্ট করা গেল না ক্রেতাকে।

নব্বই দশকের শুরুতেই এপেক্সের প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর সন্তান নাসিম মঞ্জুর তার শিক্ষাজীবন শেষ করে ব্যবসায় যোগ দেন। তার উৎসাহে এপেক্স ফুটওয়্যার নিয়ে নতুন সম্ভাবনা উন্মোচনের সাহস করলেন সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী। ওই সময় ইতালির একটি জুতা প্রদর্শনীতে অংশ নেয় এপেক্স। পরিচয় হয় ইতালির বৃহৎ জুতা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান অ্যাডেলকির সঙ্গে। প্রতিষ্ঠানটি ইতালিতে দৈনিক ৫০ হাজার জোড়া জুতা উৎপাদন করত। কর্মী ছিল ১২ হাজার। কিন্তু কোম্পানিটি ইতালিতে জুতা উৎপাদন করে পোষাতে পারছিল না। এপেক্সের সঙ্গে ব্যবসার আলোচনায় আগ্রহ দেখালেন অ্যাডেলকির মালিক। কিন্তু বাংলাদেশের নাম শুনেই পিছপা হলো অ্যাডেলকি। বলল চীনে কারখানা সরিয়ে নেবে।

এ বিষয়ে প্রয়াত সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী বণিক বার্তাকে বলেছিলেন, আমি পীড়াপীড়ি করে অ্যাডেলকির মালিককে বাংলাদেশে কারখানা দেখাতে নিয়ে এলাম। তখন তিনি চীনে কারখানা দেখে এসে হতাশ হয়ে ফেরার পথে বাংলাদেশে এসেছিলেন। তিনি এপেক্সের কারখানা পছন্দ করলেন। কিন্তু প্রথম নমুনা ক্রয়াদেশ দিলেন ৫০০ জোড়ার। এ সময় দক্ষ কারিগরি লোকবল প্রয়োজন হলো। অ্যাডেলকি সে লোকবল দিল। অ্যাডেলকির কাছেই মানসম্পন্ন রফতানিমুখী কারখানা প্রতিষ্ঠার অনেক খুঁটিনাটি শিখলাম। দৈনিক এক হাজার জোড়া থেকে এখনকার ১২ হাজার জোড়ায় যাওয়ার পথে সেই যাত্রা হলো। আমাদের সর্বোচ্চ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল প্রায় ১৬ হাজার জোড়া। এখন রফতানির মূল বাজার ইউরোপ। মোট রফতানির ৩০-৩৫ শতাংশই হয় জার্মানিতে।

এপেক্স ফুটওয়্যারের এখনকার কর্মীসংখ্যা ১০ হাজারেরও বেশি। কালে কালে কোম্পানিটির মতো এপেক্স গ্রুপেরও কলেবর বেড়েছে। এ গ্রুপের আওতাধীন অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো হলো এপেক্স ফার্মা, ব্লু ওশান ফুটওয়্যার, এপেক্স এন্টারপ্রাইজ, এপেক্স ইনভেস্টমেন্ট, গ্রে অ্যাডভারটাইজিং ইত্যাদি।

এপেক্সের পর আরো বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ফুটওয়্যার রফতানিতে বাংলাদেশের অবস্থানকে এগিয়ে নেয়। এর মধ্যে বে ফুটওয়্যার, এফবি ফুটওয়্যার, এবিসি ফুটওয়্যার ইত্যাদির নাম উল্লেখযোগ্য। প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত অবদান বাংলাদেশকে ফুটওয়্যার রফতানির শীর্ষ দশের তালিকায় নিয়ে এসেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে দুই ধরনের জুতা বিশ্ববাজারে রফতানি হয়—চামড়াজাত ও চামড়াবহির্ভূত। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে মোট ফুটওয়্যার রফতানি হয়েছে ৯৬ কোটি ডলারের। এর মধ্যে শুধু চামড়াজাত জুতাই রফতানি হয়েছে ৫৪ কোটি ডলারের। নীতিনির্ধারকদের লক্ষ্য, অচিরেই বাংলাদেশ থেকে বার্ষিক ফুটওয়্যার রফতানি ৫০০ কোটি ডলারে উন্নীত হবে। অথচ এক সময় আন্তর্জাতিক বাজারে শুধু চামড়া রফতানি হতো। চামড়ার মূল্য সংযোজিত বা প্রক্রিয়াজাত পণ্যের বাজারে কোনো অবস্থানই ছিল না বাংলাদেশের। মূলত ব্যক্তি খাতের অংশগ্রহণই এ পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছে।

একজন সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী

সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী বাংলাদেশের অন্যতম সফল উদ্যোক্তা, সমাজসেবক এবং দক্ষ সংগঠক; যিনি তরুণ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার প্রতীক।

জন্ম ও শৈশব

কলকাতার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৯৪২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী। বাবা স্যার সৈয়দ নাসিম আলী ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং ব্রিটিশ সরকারের নাইট উপাধিতে ভূষিত। পরিবারটি শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং নীতিবোধে পরিপূর্ণ ছিল। তবে মাত্র পাঁচ বছর বয়সে বাবা মারা যাওয়ায় বড় ভাইরা অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেন। তারাও ছিলেন স্বনামধন্য পেশাজীবী—কেউ আইনজীবী, কেউবা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা।

শিক্ষাজীবন

শিক্ষাজীবনের শুরু কলকাতায়। অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৬৪ সালে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ছাত্র রাজনীতিতে (ছাত্র ইউনিয়ন) ছিল তার সক্রিয় ভূমিকা। সেই নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা তার ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে প্রভাব ফেলেছিল।

কর্মজীবনের শুরু

চাকরি না করার স্বপ্ন দেখলেও ১৯৬৫ সালে করপোরেট জগতে তার কর্মজীবন শুরু হয়। যোগ দেন পাকিস্তান টোব্যাকো কোম্পানিতে (বর্তমানে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো)। প্রথমে করাচিতে দুই বছরের প্রশিক্ষণ নেন, যেখানে শর্ত ছিল ওই সময়ে তিনি বিয়ে করতে পারবেন না। প্রশিক্ষণ শেষে দায়িত্ব পালন করেন ফাইন্যান্স ম্যানেজার হিসেবে। তবে ১৯৭০ সালে বাংলাদেশের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাকে ঢাকায় বদলি করা হয়।

উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প

ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল চাকরি করবেন না; ব্যবসা করে নিজের পায়ে দাঁড়াবেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর তিনি উপলব্ধি করেন যে দেশের শিল্প ও বাণিজ্যে নেতৃত্বের ঘাটতি রয়েছে। করপোরেট চাকরির স্থায়িত্ব ছেড়ে নতুন কিছু করার পরিকল্পনা করেন। ১৯৭২ সালে রেমন্ড ক্লেয়ার নামের এক ফরাসি ব্যবসায়ীর সঙ্গে দেখা হওয়া তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ক্লেয়ার তাকে চামড়া বিক্রির কমিশন ব্যবসায় অংশীদার হতে বলেন। এ প্রস্তাব গ্রহণের আগে স্ত্রী ও বড় ভাইয়ের সঙ্গে আলোচনা করেন। যদিও তারা এ উদ্যোগে সম্মতি দেননি। সমর্থন জানান কেবল শ্বশুর।

১৯৭২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর, নিজের ৩০তম জন্মদিনে চাকরি ছেড়ে ব্যবসা শুরু করেন। প্রথমদিকে হাজারীবাগ থেকে চামড়া সংগ্রহ করে রেমন্ড ক্লেয়ারের কোম্পানির কাছে বিক্রি করতেন। কয়েক বছরের মধ্যেই সফল হন এবং ১৯৭৬ সালে ওরিয়েন্ট ট্যানারি কিনে নেন। এটি ছিল তার প্রতিষ্ঠিত এপেক্স ট্যানারির ভিত্তিপ্রস্তর।

এপেক্স ট্যানারির মাধ্যমে চামড়া প্রক্রিয়াকরণের কাজ শুরু করেন। ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপন করেন জাপানি ক্রেতাদের সঙ্গে। ১৪ বছর চামড়া রফতানির পর বুঝতে পারেন, চামড়ার চূড়ান্ত ব্যবহার হয় জুতা তৈরিতে। ভাবতে লাগলেন, যেহেতু চামড়ার সর্বশেষ গন্তব্য হচ্ছে জুতার কারখানা; তাহলে কেন সেটি হবে না। গাজীপুরের সফিপুরে ৫০ বিঘা জমিতে জুতার কারখানা স্থাপনে হাত দেন। প্রথমে রফতানিমুখী কারখানা হিসেবে যাত্রা শুরু করে, যেখানে প্রতিদিন এক হাজার জোড়া জুতা উৎপাদন হতো। যদিও প্রথমদিকে মান এবং সময়মতো সরবরাহ করতে না পারায় সমস্যার সম্মুখীন হন। ধৈর্য এবং পরামর্শকদের সাহায্যে তিনি সে সমস্যা কাটিয়ে ওঠেন। ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠানটি পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে যায়।

Untitled-2

ব্যবসায়িক সাফল্য

তার প্রতিষ্ঠিত এপেক্স গ্রুপ বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় চামড়া ও জুতা রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান। এপেক্স ট্যানারি এবং এপেক্স ফুটওয়্যার ছাড়াও তিনি আরো অনেক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা; যার মধ্যে এপেক্স ফার্মা লিমিটেড, ব্লু ওশান ফুটওয়্যার লিমিটেড, এপেক্স এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড, এপেক্স ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড, গ্রে অ্যাডভারটাইজিং (বাংলাদেশ) লিমিটেড, কোয়ান্টাম কনজিউমার সলিউশনস লিমিটেড, সানবিমস স্কুল লিমিটেড, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, মেগা ওশান ফুটওয়্যার লিমিটেড উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে এপেক্স গ্রুপে ১৭ হাজারের বেশি কর্মী কাজ করেন। সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি) পিএলসির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। তিনি সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) ও ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি অব বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিআরএবি) পরিচালক এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান ছিলেন। ব্যবসা ও শিল্প ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য বিভিন্ন পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী।

সংগঠক

একজন দক্ষ সংগঠকও ছিলেন সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ঢাকার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যও ছিলেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীকে কেবল সফল ব্যবসায়ীর গণ্ডির মধ্যে রাখলে ভুল হবে। একজন বিশিষ্ট শিল্পপতি হিসেবে তিনি তার নেতৃত্বগুণ, পেশাদারত্ব এবং নিরপেক্ষতার কারণে দুইবার (১৯৯৬ ও ২০০১) সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি মনে করতেন, দক্ষ জনবল তৈরির মাধ্যমে বেকারত্ব দূর করা সম্ভব। তাই আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবতার সঙ্গে সংযুক্ত নয়। দক্ষ লোকের অভাবেই বাংলাদেশে বিদেশীরা কাজ করছে, যা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।’

বয়সের হিসাবে জীবনের শেষবেলায় এসেও মানুষটি মনেপ্রাণে ছিলেন বেশ তরুণ। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বণিক বার্তাকে তিনি বলেছিলেন, ‘জীবন নিয়ে আমার কোনো আফসোস নেই। একজন মানুষের কত আর প্রয়োজন? কোথাও না কোথাও তো দাঁড়ি টানতে হয়...।’