যমুনা বহুমুখী সেতু না হলে ঢাকার সঙ্গে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে রেল যোগাযোগ সম্ভব ছিল না। এদিক দিয়ে ১৯৯৮ সালে চালু হওয়া সেতুটি মানুষের জন্য ছিল আশীর্বাদস্বরূপ। যদিও সেতু পারাপার ছিল কঠিন এক কাজ। সক্ষমতা কম থাকায় প্রায়ই সেতু পারাপারের জন্য যাত্রী নিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থাকত ট্রেন। অপেক্ষার পর সেতুতে উঠে ট্রেন চলত ধীরগতিতে। ৫ মিনিটের মধ্যে যে সেতু দিয়ে যানবাহন পারাপার হয়, সেই একই সেতু দিয়ে ট্রেন পার হতে সময় লাগত ২০-২৫ মিনিট। উপায়ান্তর না থাকায় দুর্ভোগ মেনেই পশ্চিমের পথে ট্রেনে ভ্রমণ করত যাত্রীরা। যমুনায় নির্মিত নতুন রেলসেতু যাত্রীদের দুর্ভোগ বলতে গেলে হাওয়ায় মিলিয়ে দিয়েছে। রেলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আজ থেকে এ সেতু পার হতে একটি ট্রেনের সাড়ে তিন মিনিট সময় লাগবে। পারাপারের জন্য কোনো ট্রেনকে আর কখনই অপেক্ষায় থাকতে হবে না।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি যমুনা রেলসেতুর একটি লাইন দিয়ে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। আজ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের পর দুটি লাইনেই শুরু হবে ট্রেন চলাচল।
রোববার রাতের একটি ট্রেনে যমুনা সেতু দিয়ে ভ্রমণ করেন কলেজ শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম। ভ্রমণের অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি ফেসবুকে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘এই এক সেতু পার হতে এক-দেড় ঘণ্টা লেগে যেত। আর আজ সেতু পার হলাম তিন মিনিটে। রেলপথে নতুন বাংলাদেশের সূচনা করেছে যমুনা রেলসেতু।’
২০২০ সালের ২৯ নভেম্বর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় যমুনা রেলসেতুর নির্মাণকাজ। এ হিসাবে সেতুর কাজ বাস্তবায়নে সময় লাগল প্রায় সাড়ে চার বছর। প্রকল্পের প্রধান কার্যাবলির মধ্যে ছিল ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল সেতু নির্মাণ। সেতুর দুই পাশে দশমিক শূন্য ৫ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট (উড়ালপথ), ৭ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার রেলওয়ে অ্যাপ্রোচ এমব্যাংকমেন্ট, লুপ সাইডিংসহ ৩০ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণ; পাশাপাশি সেতুর দুই পাড়ের স্টেশন ভবন আধুনিকীকরণ ও ইয়ার্ড রিমডেলিং, সিগনাল ও টেলিকমিউনিকেশন ব্যবস্থা আধুনিকায়ন, রেলওয়ে ব্রিজ মিউজিয়াম নির্মাণ, সেতু রক্ষণাবেক্ষণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য অফিস ও আবাসন নির্মাণ এবং নদী শাসনকাজ করা হচ্ছে একই প্রকল্পে।
প্রকল্পটির সুফল সম্পর্কে বাংলাদেশ রেলওয়ে জানিয়েছে, সেতুটি ডুয়াল গেজ ডাবল ট্র্যাক হওয়ায় রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে চলাচলকারী সংশ্লিষ্ট ট্রেনগুলোকে ক্রসিংজনিত কারণে আগের মতো স্টেশনগুলোয় অপেক্ষা করতে হবে না। ফলে সংশ্লিষ্ট ট্রেনগুলোর রানিং টাইম আনুমানিক ২০ মিনিট কমবে, রেলওয়ের পরিচালন ব্যয় কমবে এবং রেলওয়ের আয় বাড়বে। মিটার গেজ ও ব্রড গেজ উভয় ট্রেনগুলো পূর্ণাঙ্গ ট্রেন কম্পোজিশন ও সেকশনাল গতিতে (ব্রড গেজ ট্রেন ১২০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা ও মিটার গেজ ট্রেন ১০০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা) চলাচল করতে পারবে। লাইন ক্যাপাসিটি বাড়ার ফলে এ সেকশনে আগের তুলনায় অধিকতর যাত্রীবাহী ট্রেন ও পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনা করতে পারবে।
এ সেতুর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সেকশনে কনটেইনার ট্রেন পরিচালনার কার্যক্রম শুরু করা যাবে বিধায় রেলওয়ের আয় বাড়বে। সংশ্লিষ্ট রেলওয়ে ট্র্যাক, সিগনালিং ও ইন্টারলিংক ব্যবস্থার অবকাঠামোগত উন্নতি সাধন হবে, যা রেলওয়ের অপারেশনাল দক্ষতা বাড়াবে। নিরাপদ, নিরবচ্ছিন্ন ট্রেনযাত্রা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বিধায় জনসাধারণ রেল ভ্রমণে অধিকতর আগ্রহী হবে। সংশ্লিষ্ট সেকশনে দুর্ঘটনার সংখ্যা কমবে। স্বল্প সময়ে অপেক্ষাকৃত অধিকসংখ্যক ট্রেন পরিচালনার মাধ্যমে সড়কপথে যানজট ও বায়ুদূষণের মাত্রা কমবে। বর্তমানে ৩৮টি ট্রেনের স্থলে সেতুর নির্মাণকাজ সমাপ্ত হলে ৮৮টি ট্রেন চলাচল করতে পারবে। সেতুতে গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন স্থাপনের ফলে জনসাধারণকে অধিকতর গ্যাস ব্যবহারের সুবিধা দেয়া যাবে। এ সেতু দিয়ে পূর্বাঞ্চলের ডেড লোকোমোটিভগুলো পার্বতীপুরের কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানায় মেরামতের জন্য কোনো ধরনের বিধিনিষেধ ছাড়াই পরিবহন করা সম্ভব হবে।










