জন্ম ও শৈশব

কলকাতার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৯৪২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী। বাবা স্যার সৈয়দ নাসিম আলী ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং ব্রিটিশ সরকারের নাইট উপাধিতে ভূষিত। পরিবারটি শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং নীতিবোধে পরিপূর্ণ ছিল। তবে মাত্র পাঁচ বছর বয়সে বাবা মারা যাওয়ায় বড় ভাইরা অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেন। তারাও ছিলেন স্বনামধন্য পেশাজীবী—কেউ আইনজীবী, কেউবা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা।

শিক্ষাজীবন

শিক্ষাজীবনের শুরু কলকাতায়। অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৬৪ সালে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ছাত্র রাজনীতিতে (ছাত্র ইউনিয়ন) ছিল তার সক্রিয় ভূমিকা। সেই নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা তার ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে প্রভাব ফেলেছিল।

কর্মজীবনের শুরু

চাকরি না করার স্বপ্ন দেখলেও ১৯৬৫ সালে করপোরেট জগতে তার কর্মজীবন শুরু হয়। যোগ দেন পাকিস্তান টোব্যাকো কোম্পানিতে (বর্তমানে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো)। প্রথমে করাচিতে দুই বছরের প্রশিক্ষণ নেন, যেখানে শর্ত ছিল ওই সময়ে তিনি বিয়ে করতে পারবেন না। প্রশিক্ষণ শেষে দায়িত্ব পালন করেন ফাইন্যান্স ম্যানেজার হিসেবে। তবে ১৯৭০ সালে বাংলাদেশের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাকে ঢাকায় বদলি করা হয়।

উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প

ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল চাকরি করবেন না; ব্যবসা করে নিজের পায়ে দাঁড়াবেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর তিনি উপলব্ধি করেন যে দেশের শিল্প ও বাণিজ্যে নেতৃত্বের ঘাটতি রয়েছে। করপোরেট চাকরির স্থায়িত্ব ছেড়ে নতুন কিছু করার পরিকল্পনা করেন। ১৯৭২ সালে রেমন্ড ক্লেয়ার নামের এক ফরাসি ব্যবসায়ীর সঙ্গে দেখা হওয়া তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ক্লেয়ার তাকে চামড়া বিক্রির কমিশন ব্যবসায় অংশীদার হতে বলেন। এ প্রস্তাব গ্রহণের আগে স্ত্রী ও বড় ভাইয়ের সঙ্গে আলোচনা করেন। যদিও তারা এ উদ্যোগে সম্মতি দেননি। সমর্থন জানান কেবল শ্বশুর।

১৯৭২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর, নিজের ৩০তম জন্মদিনে চাকরি ছেড়ে ব্যবসা শুরু করেন। প্রথমদিকে হাজারীবাগ থেকে চামড়া সংগ্রহ করে রেমন্ড ক্লেয়ারের কোম্পানির কাছে বিক্রি করতেন। কয়েক বছরের মধ্যেই সফল হন এবং ১৯৭৬ সালে ওরিয়েন্ট ট্যানারি কিনে নেন। এটি ছিল তার প্রতিষ্ঠিত এপেক্স ট্যানারির ভিত্তিপ্রস্তর।

এপেক্স ট্যানারির মাধ্যমে চামড়া প্রক্রিয়াকরণের কাজ শুরু করেন। ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপন করেন জাপানি ক্রেতাদের সঙ্গে। ১৪ বছর চামড়া রফতানির পর বুঝতে পারেন, চামড়ার চূড়ান্ত ব্যবহার হয় জুতা তৈরিতে। ভাবতে লাগলেন, যেহেতু চামড়ার সর্বশেষ গন্তব্য হচ্ছে জুতার কারখানা; তাহলে কেন সেটি হবে না। গাজীপুরের সফিপুরে ৫০ বিঘা জমিতে জুতার কারখানা স্থাপনে হাত দেন। প্রথমে রফতানিমুখী কারখানা হিসেবে যাত্রা শুরু করে, যেখানে প্রতিদিন এক হাজার জোড়া জুতা উৎপাদন হতো। যদিও প্রথমদিকে মান এবং সময়মতো সরবরাহ করতে না পারায় সমস্যার সম্মুখীন হন। ধৈর্য এবং পরামর্শকদের সাহায্যে তিনি সে সমস্যা কাটিয়ে ওঠেন। ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠানটি পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে যায়।

ব্যবসায়িক সাফল্য

তার প্রতিষ্ঠিত এপেক্স গ্রুপ বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় চামড়া ও জুতা রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান। এপেক্স ট্যানারি এবং এপেক্স ফুটওয়্যার ছাড়াও তিনি আরো অনেক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা; যার মধ্যে এপেক্স ফার্মা লিমিটেড, ব্লু ওশান ফুটওয়্যার লিমিটেড, এপেক্স এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড, এপেক্স ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড, গ্রে অ্যাডভারটাইজিং (বাংলাদেশ) লিমিটেড, কোয়ান্টাম কনজিউমার সলিউশনস লিমিটেড, সানবিমস স্কুল লিমিটেড, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, মেগা ওশান ফুটওয়্যার লিমিটেড উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে এপেক্স গ্রুপে ১৭ হাজারের বেশি কর্মী কাজ করেন। সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি) পিএলসির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। তিনি সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) ও ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি অব বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিআরএবি) পরিচালক এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান ছিলেন। ব্যবসা ও শিল্প ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য বিভিন্ন পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী।

সংগঠক

একজন দক্ষ সংগঠকও ছিলেন সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ঢাকার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যও ছিলেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীকে কেবল সফল ব্যবসায়ীর গণ্ডির মধ্যে রাখলে ভুল হবে। একজন বিশিষ্ট শিল্পপতি হিসেবে তিনি তার নেতৃত্বগুণ, পেশাদারত্ব এবং নিরপেক্ষতার কারণে দুইবার (১৯৯৬ ও ২০০১) সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি মনে করতেন, দক্ষ জনবল তৈরির মাধ্যমে বেকারত্ব দূর করা সম্ভব। তাই আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবতার সঙ্গে সংযুক্ত নয়। দক্ষ লোকের অভাবেই বাংলাদেশে বিদেশীরা কাজ করছে, যা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।’

বয়সের হিসাবে জীবনের শেষবেলায় এসেও মানুষটি মনেপ্রাণে ছিলেন বেশ তরুণ। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বণিক বার্তাকে তিনি বলেছিলেন, ‘জীবন নিয়ে আমার কোনো আফসোস নেই। একজন মানুষের কত আর প্রয়োজন? কোথাও না কোথাও তো দাঁড়ি টানতে হয়...।’