বিশ্বের প্রায় ১ হাজার ৩০০টি বড় প্রযুক্তি কোম্পানির সুদসহ ঋণ গত দশকে চার গুণ বেড়েছে। টেক জায়ান্টগুলোর ঋণের পরিমাণ গত জুন পর্যন্ত দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলার। জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (জেনএআই) পরিষেবার ব্যাপক চাহিদা এবং তা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ডাটা সেন্টারে বিনিয়োগ এ ঋণ বাড়ার মূল কারণ। খবর নিক্কেই এশিয়া।
কুইক ফ্যাক্টসেটের তথ্যানুযায়ী ২০২১ সালের পর থেকে টেক জায়ান্টগুলোর ঋণের পরিমাণ দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকে। কভিড-১৯ মহামারীর সময় সুদের হার কম থাকায় বড় কোম্পানিগুলো ঋণ নেয়ায় উৎসাহী হয়। এআইয়ের উত্থান এ ঋণগ্রহণের গতিকে আরো জোরালো করে তোলে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের জুন পর্যন্ত টেক জায়ান্টগুলোর ঋণ বেড়েছে ১৬ শতাংশ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, কোম্পানিগুলো সফটওয়্যার থেকে এআইয়ে বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি চালাতে বড় বড় ডাটা সেন্টার প্রয়োজন, যা অতিরিক্ত খরচ ও ঋণের বোঝা তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রযুক্তি কোম্পানি ওরাকলের সুদসহ ঋণ গত এক দশকে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ১১ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি বড় প্রযুক্তি কোম্পানি অ্যামাজন, মাইক্রোসফট, অ্যাপল, মেটা ও গুগলের প্যারেন্ট কোম্পানি অ্যালফাবেটের মোট সুদসহ ঋণ এখন ৪৫ হাজার ৭০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা ১০ বছর আগের তুলনায় ২ দশমিক ৮ গুণ। পাশাপাশি চীনের ইন্টারনেট জায়ান্ট টেনসেন্ট হোল্ডিংসের সুদসহ ঋণ বেড়ে এখন ৫ হাজার ৭৫০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা ১০ বছর আগের তুলনায় ৪ দশমিক ৫ গুণ।
মেটা এখন এআই ও ডাটা সেন্টারসহ বড় বড় প্রকল্পে ব্যাপক অর্থ বিনিয়োগ করছে। বড় খরচের সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করে কোম্পানির সিইও মার্ক জাকারবার্গ বলেন, ‘বিনিয়োগ যদি সঠিকভাবে ব্যবহার না হয় বা প্রত্যাশিত ফলাফল না আনে, তাহলে কোম্পানির জন্য এটা বিরাট ক্ষতি বয়ে আনবে।’
টেলিগ্রাম ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই ডাটা সেন্টার প্রযুক্তি খাতে শুধু ঋণের বোঝাই নয়, বরং বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ফলে চাপ তৈরি হচ্ছে বিশ্বব্যাপী পরিবেশ ও বিদ্যুৎ সরবরাহে। যেমন আয়ারল্যান্ডে মোট ব্যবহৃত বিদ্যুতের ২০ শতাংশ যায় ডাটা সেন্টারে। চিলিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূগর্ভস্থ পানির উৎস (অ্যাকুইফার) দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় ডাটা সেন্টারগুলো বিদ্যুৎ গ্রিডে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যুৎ বিভ্রাট একটি বিরাট সমস্যা।
অ্যাপলিয়ার্ড লিসের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী ডাটা সেন্টারগুলো প্রায় ৪১৫ টেরাওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছে, যা বিশ্বের মোট বিদ্যুতের প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ।
ওপেনএআই, অ্যামাজন, গুগল, মাইক্রোসফটের মতো কোম্পানিগুলো যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে ডাটা সেন্টার নির্মাণ করছে। এসব অবকাঠামো তৈরিতে একদিকে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে, অন্যদিকে এগুলো পরিবেশের ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে। তাই সম্প্রতি বেশকিছু কোম্পানি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি তৈরি ও সুরক্ষার জন্য উদ্যোগ নিচ্ছে।
পরিবেশ কর্মী রোজি লিওনার্ড বলছেন, ‘ডাটা সেন্টার এমন জায়গা, যেখানে পরিবেশগত ও সামাজিক সমস্যা একসঙ্গে গিয়ে মেলে। আমাদের বোঝানো হচ্ছে যে ডাটা সেন্টার কতটা প্রয়োজনীয়। কিন্তু বাস্তবে এগুলো কতটা সংকট তৈরি করবে, তা অনেকেই জ্ঞাত নয়।’










