চীনে সেমিকন্ডাক্টর চিপ রফতানিতে আরোপিত বিধিনিষেধ সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। চলমান বাণিজ্য আলোচনা স্বাভাবিক রাখার জন্য এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে এ বছর সম্ভাব্য বৈঠক সুনিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। খবর এফটি।

শুধু সেমিকন্ডাক্টর চিপ নয়, প্রযুক্তি পণ্য বাণিজ্য নিয়ে আপাতত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির বাণিজ্য বিভাগের রফতানি নিয়ন্ত্রণ পরিচালনাকারী সংস্থা ‘ব্যুরো অব ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড সিকিউরিটিকে (বিআইএস)’ সম্প্রতি চীনের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ না নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এর উদ্দেশ্য হচ্ছে বাণিজ্য আলোচনায় কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি না করা।

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা সুইডেনের স্টকহোমে তৃতীয় দফার বাণিজ্য আলোচনায় বসবেন। এর আগে এ আলোচনা হয়েছে জেনেভা ও লন্ডনে। আলোচনার লক্ষ্য ছিল দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য উত্তেজনা কমিয়ে আনা।

এ বছরের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিপ নির্মাতাপ্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার তৈরি এইচ২০ চিপ রফতানি বন্ধের কথা জানিয়েছিল। চিপটি চীনের বাজারের জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছিল।

এর আগে চীনে উন্নত চিপ রফতানিতে ব্যাপক মাত্রায় কড়াকড়ি আরোপ করেছিল বাইডেন প্রশাসন। তবে এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াংয়ের সরাসরি চাপের পর ট্রাম্প সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।

অন্যদিকে এ সিদ্ধান্তকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের ডেপুটি ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজর ম্যাট পটিংগারসহ ২০ জন সাবেক কর্মকর্তা এক চিঠিতে সতর্ক করেন। তাদের দাবি, এইচ২০ চিপ চীনের সামরিক সক্ষমতা, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অস্ত্র ও নজরদারি ব্যবস্থায় ব্যবহার হতে পারে। এ চিপ রফতানি চীনের সামরিক আধুনিকীকরণকে ত্বরান্বিত করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে।

চিঠিতে অন্যান্য স্বাক্ষরকারী হিসেবে ছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সাবেক প্রযুক্তি কর্মকর্তা ডেভিড ফেইথ, লিজা টোবিন ও হেইম্যান ক্যাপিটালের প্রতিষ্ঠাতা কাইল বাস।

তবে এনভিডিয়া অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, এইচ২০ চিপ সামরিক কাজে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এ চিপ যুক্তরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক এআই ডেভেলপারদের আস্থা অর্জনে সহায়তা করবে। তারা জানায়, প্রতিটি রফতানি অনুমোদনের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।

তবে অনেক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এ সিদ্ধান্তকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করছেন। তাদের মতে, এইচ২০ চিপের মেমরি ব্যান্ডউইডথ অন্যান্য চীনা চিপের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে, যা বড় আকারের এআই উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে চীনের এআই সক্ষমতা দ্রুত উন্নত হতে পারে।

ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্য নীতিকে নিয়ে অন্যান্য কর্মকর্তাও অসন্তুষ্ট। তারা মনে করছেন, সরকার চীনের বিরুদ্ধে কঠোর রফতানি নিয়ন্ত্রণ আরোপে পিছিয়ে পড়েছে; যা বাণিজ্য আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দুর্বল করছে এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি সুরক্ষার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করছে।

সাবেক হোয়াইট হাউজ কৌশলবিদ স্টিভ ব্যানন এ সিদ্ধান্তকে ‘বড় ভুল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো বহু বছর ধরে চীনের হাতে প্রযুক্তির মূল্যবান সম্পদ তুলে দিয়েছে, অথচ জাতীয় নিরাপত্তার কোনো সুরক্ষা নিশ্চিত হয়নি।’

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগ নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেনি। তবে জানা গেছে, কিছু চীনা চিপ নির্মাতার সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে ‘এন্টিটি লিস্ট’ বা কালো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা রফতানি নিয়ন্ত্রণ জোরদার করবে।