মহাকাশে প্রথমবারের মতো স্যাটেলাইট পাঠিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন, নাম ছিল স্পুটনিক-১। দিনটি ছিল ১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর। এরপর কেটে গেছে ৬৮ বছর। তবে অনেকেই দাবি করেন, স্পুটনিক-১ মহাকাশে পাঠানো প্রথম উপগ্রহ নয়। এ ঘটনার হাজার হাজার বছর আগে থেকে মহাকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে আরেকটি উপগ্রহ! পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে মাত্র ১৯৩০ কিলোমিটার দূরে থাকা এর নাম দেয়া হয়েছে ব্ল্যাক নাইট স্যাটেলাইট। প্রচলিত আছে, এটি মহাকাশে পাঠিয়েছে কোনো ভিনগ্রহের বাসিন্দারা। কেউ কেউ আবার দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেছেন, ১৩ হাজার বছর আগে সেই উপগ্রহ মহাকাশে পাঠানো হয়েছে মঙ্গল গ্রহ থেকে!

অনেকেরই দাবি, এই উপগ্রহের মাধ্যমে নাকি এক সময় পৃথিবীর সব তথ্য পৌঁছে যেত মঙ্গলে। যদিও ব্ল্যাক নাইট দেখতে আদতে উপগ্রহের মতোও নয়। তবে ব্ল্যাক নাইটকে নিয়ে প্রচলিত আছে নানা গল্প, তর্ক-বিতর্ক ও কিংবদন্তি!

ব্ল্যাক নাইটকে ঘিরে তর্কের শুরুটা হয় মূলত ১৯৫০ এর দশকেই। এর অন্যতম কারণ ছিল বিজ্ঞানী নিকোলা টেসলার ১৮৯৯ সালের একটি দাবি। যেখানে তিনি বলেছিলেন, কলোরাডো স্প্রিংসে রেডিও পরীক্ষার সময় তিনি মহাকাশ থেকে অদ্ভুত এক ‘সংকেত’ পেয়েছিলেন। টেসলার বিশ্বাস ছিল, সেই সংকেত পাঠিয়েছে মঙ্গলগ্রহের বাসিন্দারা। সংখ্যার মাধ্যমে মঙ্গলগ্রহবাসীরা মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছিল বলেও দাবি করেছিলেন তিনি।

১৯০১ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক প্রতিবেদনে টেসলা তার অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে লেখেন, ‘আমার কাছে সংখ্যার মাধ্যমে যে সংকেত পাঠানো হয়েছিল, তাতে আমি অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করেছি। আমার বিশ্বাস, আমিই প্রথম এক গ্রহ থেকে অন্য গ্রহে পাঠানো সংকেত লক্ষ্য করেছিলাম।’

তবে অনেক বিজ্ঞানীই মনে করেন, নিকোলা টেসলা সংকেত পেয়েছিলেন এ কথা সত্য হলেও সেটা ভিনগ্রহের কোনো সংকেত নয়। কারণ, মহাকাশে থাকা সমস্ত জিনিসেরই নিজস্ব ‘তরঙ্গ’ রয়েছে। তাই কোনো মহাজাগতিক বস্তু থেকে সংকেত পাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালে কিছু সংবাদপত্রের প্রতিবেদন দাবি করে, পৃথিবীর কক্ষপথে একটি অজানা বস্তু ঘুরছে। তবে, এ ধরনের দাবির কোনো শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

১৯৬০ এর দশকে, আমেরিকার প্রতিরক্ষা বিভাগ একটি রহস্যময় বস্তু পর্যবেক্ষণের কথা ঘোষণা করে। সে সময় অনেকেই সেটিকে ‘ব্ল্যাক নাইট’ স্যাটেলাইট হিসেবে চিহ্নিত করেন।

বিজ্ঞানীদের মতে, ১৯৫৪ এবং ১৯৬০ সালে দেখা বস্তুগুলোর বেশিরভাগই মহাকাশ আবর্জনার অংশ হতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে কৃত্রিম উপগ্রহ ট্র্যাক করার উন্নত প্রযুক্তি না থাকায়, অনেক বস্তু ভুলভাবে অজানা স্যাটেলাইট হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছিল।

এছাড়া, ১৯৯৮ সালে আন্তর্জাতিক মহাকাশ গবেষণা সংস্থার (নাসা) একটি মিশনের সময় কিছু ছবি প্রকাশিত হয়। সেখানেও একটি অদ্ভুত আকৃতির বস্তু দেখা যায়। সেই কালো বস্তুর নাম দেয়া হয় এসটিএস০০৮-৭২৪-৬৬। নাসার পক্ষ থেকে সেটিকে মহাকাশে থাকা ধ্বংসাবশেষ হিসেবেই উল্লেখ করা হয়। নাসা দাবি করে, ছবিতে দেখা বস্তুটি আসলে কোনো মহাকাশযানের ‘থার্মাল ব্ল্যাঙ্কেট’, যা দুর্ঘটনাবশত মহাকাশে হারিয়ে গিয়েছিল এবং পরে সেটিকে ব্ল্যাক নাইট স্যাটেলাইট হিসেবে ভুল ব্যাখ্যা করা হয়।

মূলত, ‘ব্ল্যাক নাইট’ আবিষ্কারের পর থেকেই এটা নিয়ে অনেক রকম গুজব ঘুরে বেড়াচ্ছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানমহলে। ২০১৭ সালে এমনও দাবি করা হয়েছে যে, ‘ব্ল্যাক নাইট’ উপগ্রহটিকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। পৃথিবীর বুকে থাকা গোপন সংস্থা ‘ইলুমিনাটি’ এই কাণ্ড ঘটিয়েছে। ‘ব্ল্যাক নাইটকে’ ঘিরে নানা কল্পকাহিনীর জনপ্রিয়তা সময়ে সময়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে, আবার কখনো কখনো স্রেফ গুজব হিসেবে সেগুলোতে ভাটাও পড়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান মহল থেকে একেবারে মুছে ফেলা যায়নি এর নাম।

এ কথা সত্যি যে ব্ল্যাক নাইট স্যাটেলাইট সম্পর্কিত বিতর্ক এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো পপুলিস্ট কালচারে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে বর্তমানে বিজ্ঞানীরা কিন্তু নিশ্চিত যে, এটি কোনো বাস্তব স্যাটেলাইট নয়, বরং একাধিক ঘটনা ও ভুল ব্যাখ্যার সমন্বয়ে তৈরি হওয়া একটি ‘মিথ’।