কভিডকালীন বিপর্যয়ের পর বৈশ্বিক এয়ারলাইনস শিল্পের প্রবৃদ্ধির গতি অনেকটা পুনরুদ্ধার হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক উত্তেজনা ও ভোক্তা আস্থার পতনে সে গতি কিছুটা বাধাগ্রস্ত বলে জানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইএটিএ)। এ কারণে বৈশ্বিক এয়ারলাইনস খাতের জন্য আগে দেয়া আয় ও মুনাফার পূর্বাভাস সংশোধন করে কমিয়ে এনেছে সংস্থাটি। সেই সঙ্গে জেটলাইনার সরবরাহে ‘অগ্রহণযোগ্য বিলম্বের’ তীব্র সমালোচনা করেছে আইএটিএ, এটিও খাতটির প্রবৃদ্ধি পরিকল্পনাকে ব্যাহত করছে বলে মনে করছে সংস্থাটি। খবর রয়টার্স।

আইএটিএ জানিয়েছে, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক এয়ারলাইনসগুলোর সম্মিলিত মুনাফা দাঁড়াতে পারে ৩৬ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলার, যা গত ডিসেম্বরে দেয়া পূর্বাভাস ৩ হাজার ৬৬০ কোটি ডলারের চেয়ে কিছুটা কম। যখন পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল তখনো হোয়াইট হাউজে প্রবেশ করেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরপর তিনি বিশ্বের ওপর কঠোর বাণিজ্যযুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছেন এবং মার্কিন সীমান্তে আরো কড়াকড়ি করেছেন।

গত বছর বৈশ্বিক এয়ারলাইনস খাত ৩ হাজার ২৪০ কোটি মুনাফা করেছে। এ হিসাবে পূর্বাভাস সংশোধনের পরও ২০২৪ সালের তুলনায় চলতি বছর মুনাফা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। এর পেছনে প্রধান প্রভাবক হতে পারে জ্বালানি তেলের কম দাম ও রেকর্ড সংখ্যক যাত্রী।

ভারতের নয়াদিল্লিতে গতকাল শেষ হওয়া আইএটিএর বার্ষিক সম্মেলনে এ পূর্বাভাস প্রকাশ হয়েছে। এতে সংস্থাটির তিন শতাধিক সদস্য অংশ নেয়। আইএটিএর মহাপরিচালক উইলি ওয়ালশ এক বিবৃতিতে বলেন, ‘৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের মুনাফা অর্জন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মুনাফার এ পরিমাণ প্রতি যাত্রায় যাত্রীপ্রতি মাত্র ৭ ডলার ২০ সেন্টে এসে দাঁড়ায়।’

তিনি আরো বলেন, ‘মুনাফার এ আকার ভবিষ্যৎ চাহিদার ধাক্কা বা করের বিরুদ্ধে খুবই দুর্বল নিরাপত্তা বলয়। বিশেষ করে মহামারীর পর এয়ারলাইনস শিল্পে হঠাৎ চাহিদা বৃদ্ধির পর এখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছে।’

শক্তিশালী কর্মসংস্থান ও মূল্যস্ফীতি হ্রাসের কারণে চলতি বছর বৈশ্বিক এয়ারলাইনস খাতের আয় ২০২৪ সালের তুলনায় ১ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও এ শিল্পে মোট আয় ১ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ কোটি ডলারে পৌঁছবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু সে লক্ষ্য চলতি বছর পূর্ণ হবে না। কারণ আগের পূর্বাভাস থেকে ২ দশমিক ১ শতাংশ কমে আয় দাঁড়াতে পারে ৯৭ হাজার ৯০০ কোটি ডলার, এটিও সর্বকালের সর্বোচ্চ।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যাপক শুল্ক আরোপ বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক শ্লথগতির আশঙ্কা তৈরি করেছে। এতে ভোক্তাদের অতিরিক্ত খরচের ক্ষমতা সংকুচিত হয়ে আসছে। বিশেষত মার্কিন অনেক ভোক্তা ভ্রমণ পরিকল্পনা স্থগিত বা কমিয়ে দিয়েছে। আবার ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতির পাশাপাশি এ শিল্পের নিজস্ব কিছু সমস্যা প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধির লাগাম টেনে ধরেছে।

বোয়িং বা এয়ারবাসের মতো কোম্পানি উড়োজাহাজ সরবরাহে বিলম্ব করায় এয়ারলাইনস সংস্থাগুলোর পক্ষে অনেক রুটে যাত্রী চাহিদা পূরণ কঠিন হয়ে উঠেছে। পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় পুরনো উড়োজাহাজ ব্যবহার ও সংস্কারের কারণে কোম্পানিগুলোর ব্যয় বাড়ছে। শুধু নতুন উড়োজাহাজের সংকটই নয়, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের সংকটও রয়েছে খাতজুড়ে। পূর্বাভাস প্রকাশের সময় দশকজুড়ে সরবরাহ চেইনের এ বিলম্ব ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে উল্লেখ করেন উইলি ওয়ালশ।

পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে, ২০২৫ সালে এয়ারলাইনস শিল্পে মোট খরচ ৯১ হাজার ৩০০ কোটি ডলারে পৌঁছবে, যা গত বছরের তুলনায় ১ শতাংশ বেশি। এর আগে ৯৪ হাজার কোটি ডলার খরচের পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল। আইএটিএ বলছে, জ্বালানির কম দাম ব্যয়ের বৃদ্ধিতে কিছুটা ভারসাম্য রক্ষা করবে। তবে উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় বাড়ছে।

আইএটিএ আরো পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০২৫ সালে কার্গো পরিবহন বাবদ আয় ৪ দশমিক ৭ শতাংশ কমে ১৪ হাজার ২০০ কোটি ডলারে নেমে আসবে। মূলত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হ্রাস এবং শুল্কের মতো বাণিজ্য প্রতিবন্ধকের প্রভাব পড়বে পণ্য পরিবহনে। উচ্চ শুল্কের বোঝা কে বহন করবে তা নিয়ে দ্বন্দ্ব চললেও উইলি ওয়ালশ স্বীকার করেন, অনেক উড়োজাহাজ নির্মাতা ক্রেতার ওপর খরচ চাপিয়ে দেয়ার লোভে পড়তে পারেন, এতে এয়ারলাইনসের ভাড়া আরো বেড়ে যেতে পারে।

তিনি বলেন, ‘এ শিল্প যে অতিরিক্ত ব্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে, তার খেসারত শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদেরই দিতে হবে।’

বৈশ্বিক পরিবহন খাতে টেকসই বা পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। উড়োজাহাজ শিল্পেও সে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আইএটিএ বলছে, উড়োজাহাজের জন্য টেকসই জ্বালানি (এসএএফ) উৎপাদন চলতি বছর দ্বিগুণ হলেও তা মোট চাহিদার মাত্র দশমিক ৭ শতাংশ পূরণ করবে। এর পরিমাণ ২০ লাখ টন।

উইলি ওয়ালশ জানান, এসএএফের পরিমাণ আকারে ছোট হলেও এটি বৈশ্বিকভাবে জ্বালানি ব্যয়ে অতিরিক্ত ৪৪০ কোটি ডলার যোগ করবে। তাই উৎপাদন বৃদ্ধি এবং খরচ কমাতে চেষ্টা জোরদার করতে হবে।

বেশির ভাগ দেশই নিট জিরো কার্বন নিঃসরণের লক্ষ্য অর্জনে জ্বালানি রূপান্তরের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এ কারণে এসএএফের ব্যবহার বাড়ছে। উইলি ওয়ালশের মতে, টেকসই জ্বালানির উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত সরকারি উদ্যোগ এবং কার্যকর নীতির প্রয়োগ প্রয়োজন।