বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতির পরিবর্তনে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো নিজেদের উৎপাদন ও সাপ্লাই চেইন নিয়ে নতুন করে ভাবছে। ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় স্মার্টফোন উৎপাদন খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
২০২৫ পঞ্জিকাবর্ষে বিশ্বব্যাপী স্মার্টফোন উৎপাদন গত বছরের তুলনায় ১ শতাংশ কমতে যাচ্ছে বলে বাজার গবেষণা সংস্থা কাউন্টাপয়েন্ট রিসার্চের প্রক্ষেপণে উঠে এসেছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রতিবেদন বলছে, আগে চীনের মতো যেসব দেশ স্মার্টফোন ও প্রযুক্তিপণ্য তৈরিতে অনেক এগিয়ে ছিল, তারা এখন কিছুটা পিছিয়ে পড়ছে। মার্কিন শুল্কনীতি বা বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার ফলে তাদের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকা ভারত, ভিয়েতনামের মতো কিছু দেশ এখন নতুন বিনিয়োগ, রফতানি চাহিদা ও কম খরচে উৎপাদন সুবিধা পাওয়ার কারণে দ্রুত এগিয়ে আসছে। ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী স্মার্টফোন উৎপাদনের চিত্র নতুনভাবে গড়ে উঠবে বলে ধারণা করছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা।
কাউন্টারপয়েন্ট বলছে, চলতি বছর বৈশ্বিক স্মার্টফোন উৎপাদন ১ শতাংশ কমে যেতে পারে। ২০২৪ সালে এ খাতে ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও শুল্ক ও শিল্পে সামগ্রিক মন্দার কারণে এবার পতন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০২৪ সালে চীন, ভারত ও ভিয়েতনাম মিলিয়ে বিশ্বের ৯০ শতাংশের বেশি স্মার্টফোন তৈরি করেছে, যেখানে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন প্রবৃদ্ধি ছিল ভারতের।
আন্তর্জাতিক সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, এ বছর শুল্কের কারণে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মোবাইল উৎপাদনকারী দেশ চীন। ফলে এখানে স্মার্টফোন তৈরি হ্রাস পাবে এবং স্থানীয় বাজারেও দুর্বল ফলাফল দেখা যেতে পারে।
কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের সিনিয়র অ্যানালিস্ট আইভান ল্যাম এ প্রবণতা নিয়ে বলেন, ‘করোনা মহামারীর পর থেকে বৈশ্বিক স্মার্টফোন উৎপাদনের স্থানবদল আরো দ্রুত হয়েছে, কিন্তু শুল্কের প্রভাবে যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী, পণ্য আমদানিকারক, পরিবেশক, ব্র্যান্ড এবং প্রস্তুতকারকসহ শিল্পের প্রতিটি স্তরে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ও আরো হবে।’
তার ভাষ্য, এমন পরিস্থিতিতে চীনের বাইরে উৎপাদন সরানো ছাড়া ব্র্যান্ডগুলোর আর কোনো উপায় নেই। ফলে অন্য দেশে অধিক উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলতে হচ্ছে। এতে মূল সুবিধাভোগী হলো ভারত ও ভিয়েতনাম। দুইটি দেশই ভৌগোলিকভাবে চীনের কাছাকাছি। ইলেকট্রনিকস পণ্য তৈরির ও রফতানির একটি বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে ভিয়েতনাম এরই মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। তবে দুই দেশের মধ্যে চলতি বছর স্মার্টফোন উৎপাদনে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে ভারত। বছরজুড়ে দেশটিতে উৎপাদন বাড়াতে পারে ১০ শতাংশের বেশি। এ প্রবৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রাখবে অ্যাপল ও স্যামসাংয়ের রফতানি চাহিদা।
অন্যদিকে স্যামসাং ও মটোরোলার মতো কোম্পানির কারণে উল্লেখযোগ্য হারে উৎপাদন বাড়বে ভিয়েতনামও।
ভারতের বিষয় কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের সিনিয়র অ্যানালিস্ট প্রচীর সিং বলেছেন, ‘সাম্প্রতিক উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে দেশটির স্থানীয় উৎপাদন ক্ষমতা অনেক উন্নত হয়েছে। বিশ্বখ্যাত ইলেকট্রনিকস ম্যানুফ্যাকচারিং সার্ভিস (ইএমএস) কোম্পানিগুলো ভারতে বিনিয়োগ চালিয়ে যাচ্ছে এবং দেশীয় ইএমএস কোম্পানিরাও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছে। প্রায় এক দশকের পরিশ্রমের ফলে দেশটি এখন উচ্চতর উৎপাদন চাহিদা মেটাতে সক্ষম।’
অন্য দেশের ক্ষেত্রে যেখানে স্থানীয় বাজার ছোট ও সীমিত এবং স্মার্টফোনের চাহিদাও কমছে, সেসব দেশের উৎপাদন আরো কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করছে কাউন্টারপয়েন্ট। এ কারণে বৈশ্বিক স্মার্টফোন উৎপাদনে কিছু দেশের অংশগ্রহণও ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে। সার্বিকভাবে ট্যারিফ বা শুল্কের প্রভাব, স্থানীয় বাজারের দুর্বলতা ও চাহিদার পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে স্মার্টফোন উৎপাদন শিল্পকে মন্দার দিকে নিতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।










