কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) আর অটোমেশনের দ্রুত অগ্রগতি আগামী দশকে যুক্তরাজ্যের শ্রমবাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে। নতুন এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রায় ৩০ লাখ স্বল্প দক্ষতার চাকরি বিলীন হয়ে যেতে পারে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর এডুকেশনাল রিসার্চের (এনএফইআর) এক প্রতিবেদনে বলে হয়েছে, এআই ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কারণে বহু পেশা ঝুঁকিতে পড়লেও একই সময়ে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে নতুন করে প্রায় ২৩ লাখ চাকরি সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এসব নতুন সুযোগের বণ্টন হবে অসমভাবে। খবর ইন্ডিয়া টুডে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যেসব পেশায় পুনরাবৃত্তিমূলক বা পূর্বনির্ধারিত কাজ বেশি, সেগুলোই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। স্বল্পদক্ষতানির্ভর বিশেষ কিছু পেশা, মেশিন পরিচালনা, প্রশাসনিক সহায়তা—এসব ক্ষেত্রের কর্মীরাই বেশি বিপদে পড়তে পারেন। প্রশাসনিক সহকারী, কারখানা বা মেশিন অপারেটর, গুদামকর্মী, ক্যাশিয়ার এবং প্লাম্বিং, রুফিং বা ইলেকট্রিশিয়ানের মতো কিছু বাণিজ্যিক পেশাকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কাজ সহজেই মেশিন বা সফটওয়্যারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে করা সম্ভব।

অন্যদিকে যেসব পেশায় দক্ষতা, সৃজনশীলতা, জটিল সিদ্ধান্ত নেয়া বা মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের প্রয়োজন, সেসব পেশার ক্ষেত্রে চাহিদা আরো বাড়তে পারে। প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মী, ব্যবস্থাপক ও মনোবিজ্ঞানীদের চাহিদা বাড়তে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। কারণ প্রযুক্তির ব্যবহারে এসব খাতে উৎপাদনশীলতা বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এ ক্ষেত্রগুলোয়ও এআই বড় পরিবর্তন আনবে। যেমন আইনজীবী, পরামর্শক বা গবেষণানির্ভর পেশায় এআইয়ের ব্যবহার বাড়ায় জুনিয়র কর্মীদের চাহিদা কমে যেতে পারে।

গবেষণা প্রতিবেদনের সহকারী লেখক জুড হিলারি বলেন, ‘এআইয়ের কারণে ব্যাপকহারে চাকরি হারানোর বিষয়টি নিয়ে এখনো নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। এআই ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি নিয়ে অনেক আলোচনা চলছে, কিন্তু বাস্তবে কীভাবে এবং কত দ্রুত পরিবর্তন আসবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। অনেক নিয়োগকর্তাই এ বিষয়ে উদ্বিগ্ন, কিন্তু নিশ্চিত নন।’ তার মতে, কম দক্ষ কর্মীদের পুনরায় দক্ষতা অর্জন করাটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। শ্রমবাজারে যে নতুন চাকরি সৃষ্টি হচ্ছে, তার বেশির ভাগই পেশাদার বা আধা পেশাদার পর্যায়ে। ফলে যে ১০-৩০ লাখ কর্মী চাকরি হারাতে পারেন, তাদের জন্য নতুন সুযোগ পাওয়া কঠিন হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

শ্রমবাজারে এআইয়ের প্রভাব নিয়ে সাম্প্রতিক আরো কিছু গবেষণাও একই ধরনের ইঙ্গিত দেয়। কিংস কলেজের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, উচ্চ বেতনভুক্ত জ্ঞাননির্ভর পেশাগুলোয়ও বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। ২০২১-২৫ সালের মধ্যে এসব খাতে প্রায় ৯ দশমিক ৪ শতাংশ কর্মসংস্থান কমেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যার বড় অংশই ২০২২ সালের শেষ দিকে চ্যাটজিপিটির আবির্ভাবের পর।

শুধু বিশ্লেষণে নয়, বাস্তব ক্ষেত্রেও এআই-সংক্রান্ত পরিবর্তন লক্ষণীয়। সম্প্রতি লন্ডনের ক্লিফোর্ড চ্যান্স ব্যবসায়িক পরিষেবা বিভাগ থেকে ১০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাই করেছে। একইভাবে অ্যাপল ও গুগলও সম্প্রতি নির্বাচিত কিছু বিভাগে কর্মী কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। পিডব্লিউসিও তাদের দীর্ঘমেয়াদি নিয়োগ পরিকল্পনা সংশোধন করেছে।

তবে এনএফইআরের জুড হিলারি মনে করেন, বর্তমান ছাঁটাইয়ের পেছনে শুধুই এআই নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থবিরতাও ভূমিকা রাখছে। আপাতত যুক্তরাজ্যের শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ মিশ্র প্রকৃতির হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। অর্থাৎ কিছু পেশা টিকে থাকবে, কিছু হারিয়ে যাবে; আর লাখো মানুষকে টিকে থাকতে নতুন দক্ষতা অর্জন করতে হবে।