প্রযুক্তির ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সাইবার অপরাধ বেড়েই চলছে। বিশ্বজুড়ে প্রতি ৩৯ সেকেন্ডে একটি সাইবার আক্রমণ ঘটছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। একসময় বন্ধু কিংবা পরিবারের সঙ্গে সংযোগের মাধ্যম ছিল সোশ্যাল মিডিয়া। তবে এখন হ্যাকারদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে এসব প্লাটফর্ম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাইবার হামলার হার বিপজ্জনকভাবে বাড়ছে। বিশ্বব্যাপী ৩০৭ কোটির বেশি ব্যবহারকারী নিয়ে এ তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ফেসবুক।
ডিজিটাল মার্কেটিং প্লাটফর্ম ক্রপইংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ফেসবুকে হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটেছে ৩ কোটি ৪০ লাখ। এর মধ্যে অধিকাংশই হয়েছে ফিশিং লিংক ও ভুয়া লগইন পেজের মাধ্যমে। এরপর দ্বিতীয় সর্বাধিক আক্রান্ত প্লাটফর্ম হলো ইনস্টাগ্রাম, যেখানে দুই কোটির বেশি হ্যাকিংয়ের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এ সময় এক্সে প্রায় দেড় কোটি এবং লিংকডইন ও টিকটকেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক হ্যাকিং আক্রমণ ঘটেছে।
পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি পাঁচটি সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টের মধ্যে একটি হ্যাকিং চেষ্টার শিকার হয় প্রতি বছর। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, সোশ্যাল মিডিয়া এখন অনলাইন নিরাপত্তার অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র। এখানে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য ও পাসওয়ার্ড হ্যাকারদের মূল লক্ষ্য।
বিশ্ব জনসংখ্যার একটি বড় অংশ প্রায় ৬৪ শতাংশ মানুষ বিভিন্ন প্লাটফর্মে সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছে। ব্যবহারকারীরা দিনে গড়ে ২ ঘণ্টা ২১ মিনিট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যয় করে। তাদের মধ্যে অর্ধেকই মূলত বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সংযুক্ত থাকার জন্য এসব প্লাটফর্ম ব্যবহার করে।
ডিজিটাল মার্কেটিং ও ডাটা অ্যানালিটিকস প্রতিষ্ঠান কেপিওসের ২০২৪ সালের হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, বিশ্বব্যাপী সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫২২ কোটি। শতকোটি ব্যবহারকারী ও ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করার প্রবণতার কারণে হ্যাকাররা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে প্রধান লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় হ্যাকিংয়ের অন্যতম কারণ হলো পূর্বে ফাঁস হওয়া পাসওয়ার্ড ও লগইন তথ্য বারবার ব্যবহার।
প্রতিবেদন আরো বলছে, ৮০ শতাংশ হ্যাক হওয়া সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে হ্যাকাররা আগে চুরি হওয়া লগইন তথ্য দিয়েই প্রবেশ করে। আরো উদ্বেগজনক বিষয় ২৫ শতাংশ হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটে ম্যালওয়্যার বা কিলগার নামে সফটওয়্যার ব্যবহার করে, যা চুপিসারে ব্যবহারকারীর ডিভাইসে টাইপ করা তথ্য সংগ্রহ করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একবার কোনো অ্যাকাউন্ট হ্যাক হলে তা প্রতারণা, পরিচয় চুরি বা ডার্ক ওয়েবে বিক্রির জন্য ব্যবহার করা হয়। এসব চুরি করা অ্যাকাউন্ট কেবল ৩০ ডলার মূল্যে ডার্ক ওয়েবে বিক্রি হয়ে যায়।
নিরাপদ থাকতে ব্যবহারকারীদের কিছু পরামর্শ দেন তারা, যেমন সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক করা এড়িয়ে চলা এবং তথ্য ফাঁস বা অ্যাকাউন্ট হ্যাক হলে নতুন পাসওয়ার্ড তৈরি করা।
একসময় সোশ্যাল মিডিয়া বলতে ফেসবুককেই চিনত সবাই। সময়ের সঙ্গে প্লাটফর্মের সংখ্যা যত বাড়ছে, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার প্রয়োজন ততই বেড়ে চলেছে। কিন্তু এখনো এতসব সোশ্যাল মিডিয়ার ভিড়েও হ্যাকিংয়ের ক্ষেত্রে ফেসবুক সবচেয়ে বড় লক্ষ্যবস্তু।
ক্রপইংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে সোশ্যাল মিডিয়াভিত্তিক ফিশিং আক্রমণ ৪৭ শতাংশ বেড়েছে। এ সময় হ্যাকাররা প্লাটফর্ম সিকিউরিটি অ্যালার্টের ছদ্মবেশে ব্যবহারকারীর পাসওয়ার্ড চুরি করেছে। এছাড়া ভুয়া গিভএওয়ে স্ক্যাম বেড়েছে ৬৫ শতাংশ, যেখানে ব্যবহারকারীকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে লগইন তথ্য চুরি করা হচ্ছে। তবে ব্যক্তিগত থেকে ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে হ্যাকিংয়ের প্রবণতা বেশি লক্ষণীয়। গত বছর সোশ্যাল মিডিয়া সম্পর্কিত সাইবার আক্রমণের শিকার হয়েছে ৫২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান। সেই সঙ্গে প্রতিটি আক্রমণে গড়ে ক্ষতি হয়েছে ২ লাখ ডলার।









