বিশ্বজুড়ে হোয়াটসঅ্যাপ, সিগন্যাল ও টেলিগ্রামের মতো এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপগুলোর ব্যবহারকারী কয়েক কোটি ছাড়িয়েছে। এসব অ্যাপে এন্ড টু এন্ড এনক্রিপশন সিস্টেম থাকায় ব্যবহারকারীর বার্তাগুলো নিরাপদ ও গোপন থাকে। তবে ব্যবসায়িক দিক থেকে অ্যাপগুলোকে কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে এনক্রিপশন প্রযুক্তি। কারণ কোম্পানিগুলো অ্যাড বা ডাটা ব্যবহার করে সহজে আয় করতে পারছে না। যে বৈশিষ্ট্য অ্যাপগুলোকে মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য ও মূল্যবান বানায়, সেটাই কোম্পানির ব্যবসায়িক মুনাফার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। খবর দ্য ন্যাশনাল।
এন্ড টু এন্ড এনক্রিপশন প্রযুক্তিতে কোনো বার্তা পাঠক ও প্রেরকের বাইরে কোনো তৃতীয় পক্ষের কাছে যায় না। এমনকি প্লাটফর্ম নিজেও সেসব বার্তা দেখতে পারে না। এ পদ্ধতি ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। তবে এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো বার্তা স্ক্যান করে লক্ষ্যভিত্তিক (টার্গেটেড) বিজ্ঞাপন দেখাতে পারে না, যা অধিকাংশ ডিজিটাল প্লাটফর্মের মূল আয়ের উৎস।
ফ্রান্সের ফন্টেনব্লোর ইনসিয়াড বিজনেস স্কুলের স্ট্র্যাটেজি সহকারী অধ্যাপক মিখায়েল বিকার্ড বলছেন, ‘ব্যবহারকারীর বার্তার বিষয়বস্তু বিজ্ঞাপনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এন্ড টু এন্ড এনক্রিপশনের কারণে এটি সম্ভব হয় না। এনক্রিপশনের কারণে প্রচলিত বিজ্ঞাপন থেকে আয় করতে না পারায় কোম্পানিগুলোকে বিকল্প আয়ের উৎস খুঁজতে হচ্ছে।’
মিখায়েল সতর্ক করে বলছেন, ‘বিজ্ঞাপনের আয় ছাড়া প্রযুক্তি খাতের তুমুল প্রতিযোগিতার মধ্যে এসব অ্যাপ দীর্ঘ সময় ধরে লাভজনকভাবে নাও চলতে পারে। এক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের সাবস্ক্রিপশন ফি দিতে হতে পারে। ডাটা শেয়ারিংয়ে নতুন সমঝোতা করতে হতে পারে বা অ্যাপগুলো ‘‘সুপার-অ্যাপ’’ মডেলে রূপান্তরিত হতে পারে। ফলে সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তন হয়ে যাবে ব্যবহারকারীদের মেসেজিং অভিজ্ঞতা।’
চলতি বছর প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) ফল প্রকাশের সময় মেটার প্রধান নির্বাহী (সিইও) মার্ক জাকারবার্গ জানান, বিশ্বজুড়ে হোয়াটসঅ্যাপের মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারী ৩০০ কোটি ছাড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, প্লাটফর্মটি থেকে কোম্পানির বার্ষিক আয় ১০০ কোটি ডলারের বেশি। হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাপটি ব্যবসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে সফল অর্থোপার্জনকারী প্লাটফর্ম হিসেবে বিবেচিত।
সহকারী অধ্যাপক মিখায়েল বিকার্ড জানাচ্ছেন, হোয়াটসঅ্যাপ এখনই নতুন আয় উৎস খুঁজছে। সম্প্রতি অ্যাপটি স্ট্যাটাস ও আপডেট ট্যাবে বিজ্ঞাপন দেখানো শুরু করেছে এবং পেইড চ্যানেল সাবস্ক্রিপশন চালু করেছে। তার মতে, হোয়াটসঅ্যাপ জনপ্রিয় সুপার-অ্যাপগুলোর মতো অনেক ফিচারযুক্ত অ্যাপে রূপান্তরিত হচ্ছে।
তবে তিনি আরো উল্লেখ করেছেন, হোয়াটসঅ্যাপ সরাসরি বিজ্ঞাপন থেকে আয় না করলেও প্লাটফর্মের কনটাক্ট নেটওয়ার্ক ও ডিভাইস তথ্য ব্যবহার করে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে বিজ্ঞাপন আরো কার্যকর করছে মেটা।
এদিকে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের কাছে সিগন্যাল নামটি খুব বেশি জনপ্রিয় নয়। প্লাটফর্মটি অলাভজনক সিগন্যাল ফাউন্ডেশন দ্বারা পরিচালিত এবং এর অর্থায়ন আসে মূলত অনুদান থেকে। অ্যাপটিও কোনো বিজ্ঞাপন বা ব্যবহারকারীর ডাটা বিক্রি করে না।
২০২১ সালে হোয়াটসঅ্যাপের গোপনীয়তা নীতিকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হলে অনেক ব্যবহারকারী সিগন্যালে ঝুঁকেছিলেন। সেন্সর টাওয়ারের তথ্য অনুযায়ী ওই সময় এক সপ্তাহে অ্যাপটির ডাউনলোড সংখ্যা ১ কোটি ৭ লাখে পৌঁছায়।
দীর্ঘমেয়াদে আয়ের কোনো শক্তিশালী উৎস না থাকায় হোয়াটসঅ্যাপের মতো ব্যবহারকারী সংখ্যা বাড়াতে পারছে না সিগন্যাল।
এবার আসে আরেকটি জনপ্রিয় অ্যাপ টেলিগ্রামের কথা। ডাটা বিশ্লেষণ প্লাটফর্ম ডিমান্ডসেইজের তথ্য অনুযায়ী টেলিগ্রামের মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারী সংখ্যা ১০০ কোটির বেশি। অ্যাপটি আয় করে প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন ও স্পন্সরড পোস্টের (অর্থের বিনিময়ে প্রচার) মাধ্যমে। এছাড়া স্টারস নামে ভার্চুয়াল মুদ্রার মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা অ্যাপের মধ্যে ডিজিটাল পণ্য ও সেবা কিনতে পারেন।
তবে রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী পরিসর বড় হলেও টেলিগ্রামের আয় আশানুরূপ নয়।










