প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে ভারতবর্ষে গঙ্গাঋদ্ধি নামে একটি জাতি বা রাজ্য ছিল। ঐতিহাসিক সাহিত্যে গঙ্গাঋদ্ধি শব্দটি বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হয়—গঙ্গারিডি, গঙ্গারিডাই, গঙ্গারিদাই, গঙ্গারিডেই, গঙ্গারিদিম, গঙ্গারাইডেস, গঙ্গাহৃদয়, গঙ্গাহৃদি, গঙ্গারাঢ়, গঙ্গারাষ্ট্র ইত্যাদি। ইতিহাসবিদ হাবিবুর রহমান নিজে গঙ্গাঋদ্ধি শব্দটি ব্যবহার করেছেন। তিনি একটি গ্রন্থও রচনা করেছেন গঙ্গাঋদ্ধি থেকে বাংলাদেশ নামে।  ভাষাবিদ মুহম্মদ এনামুল হক হাবিবুর রহমানকে বলেছিলেন গঙ্গার সমৃদ্ধি অর্থে গঙ্গাঋদ্ধি শব্দটি সৃষ্টি হতে পারে। হাবিবুর রহমানের মতে ‘প্রাসিয়াই’, ‘গঙ্গারিডি’ ভৌগোলিক নামগুলো সংস্কৃতভাষীদের কাছ থেকে গ্রিকরা পেয়েছিলেন। গঙ্গাঋদ্ধি শব্দটির নানাভাবে লিপ্যন্তর ঘটেছে।১

আর দশটি প্রাচীন জাতি বা রাজ্যের মতো প্রাচীন গঙ্গাঋদ্ধি আজ আর টিকে নেই। হারিয়ে গেছে, তবে ফুরিয়ে যায়নি। মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে। দেশ বা জাতি মাটির নিচে চাপা পড়েছে তা সহজে বোধগম্য নয়। আসলে দেশ বা জাতি মাটির নিচে চাপা পড়ে না, চাপা পড়ে সেই দেশ বা জাতির মানুষের কীর্তিকর্ম। তাদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র। প্রত্নতাত্ত্বিকরা যাকে বলে প্রত্নবস্তু। আর প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাজ হলো সেই প্রত্নবস্তু খুঁজে আবিষ্কার করা। সেই দেশ বা জাতির ইতিহাস পুনর্নির্মাণ করা প্রত্নতাত্ত্বিকের কাজ। কিন্তু অনেক সময় পূর্বপুরুষদের হারিয়ে যাওয়া কীর্তিকর্ম খুঁজে পাওয়া সহজ হয় না।

প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে দীর্ঘ সময়, শ্রম, মেধা ও অর্থ প্রয়োজন। হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার প্রায়ই কোনো সূত্র  থাকে না, তবে কোনো কোনো সময় কিছু কিছু সূত্র পাওয়া যায়। মহাকবি হোমারের মহাকাব্যে একটি নগরের নাম ও বর্ণনা ছিল। একসময় সমৃদ্ধ নগরটি ধ্বংস হয়। নগরের পরিচয় চলে যায় মানুষের চোখের আড়ালে। পরবর্তী কালের মানুষ ভাবতে থাকে মহাকবি হোমার কল্পনাপ্রসূত নগরের ছবি এঁকেছেন। কারণ হোমার ছিলেন অন্ধ। প্রকৃত দৃশ্য দেখে বর্ণনা করে লেখার সাধ্য তার ছিল না। কিন্তু দৃশ্যমান বস্তুর বর্ণনা শুনেও যে লেখা যায়, সাধারণ মানুষ তা অনেক সময় খেয়াল করে না। কিন্তু যারা অসাধারণ তাদের ভাবনা বহুমাত্রিক। এদেরই একজন ছিলেন হেনরিক স্লিমান, জার্মান বংশোদ্ভূত আমেরিকান প্রত্নতাত্ত্বিক। তিনি চিন্তা করতে লাগলেন ট্রয় নগর সম্পর্কে কবি হোমারের এত চমৎকার বর্ণনা নিছক কাল্পনিক হতে পারে না। নিশ্চয় তিনি বাস্তব কোনো সুন্দর নগরের বর্ণনা দিয়েছেন। প্রত্নতাত্ত্বিক হেনরিক স্লিমানের যেই ভাবনা সেই কাজ। শুরু হয় প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান। তার কঠোর শ্রম ও নিরলস সাধনায় আবিষ্কৃত হলো মহাকবি হোমারের সমৃদ্ধ সেই ট্রয় নগর এশিয়া মাইনরে। হেলেন অব ট্রয় সিনেমার জন্য যা পৃথিবীব্যাপী ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। প্রিয় পাঠক, ভাবতে পারেন ধান ভানতে শিবের গীত কেন? কারণ আমরাও খুঁজছি হারিয়ে যাওয়া গঙ্গাঋদ্ধি নামে একটি রাজ্য বা জাতিকে। প্রাচীন ভারতবর্ষের কোথায় ছিল সেই গঙ্গাঋদ্ধি রাজ্য বা গঙ্গাঋদ্ধি জাতির বাস? গঙ্গাঋদ্ধি নিয়ে এখনো কোনো প্রাচীন লিপি বা তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হয়নি। আশ্চর্যজনকভাবে ভারতবর্ষের কোনো উৎসে গঙ্গাঋদ্ধির কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না; রামায়ণ, মহাভারত, বেদ, পুরাণ, ধর্মশাস্ত্র গঙ্গাঋদ্ধি বিষয়ে একেবারে নীরব। গঙ্গাঋদ্ধি রয়েছে গ্রিক, রোমান ও মিসরীয় লেখক ও ইতিহাসবিদদের বর্ণনায়। প্রশ্ন জাগে এতদূরের পণ্ডিতরা ভারতবর্ষের গঙ্গাঋদ্ধির কথা জানলেন কেমন করে?

ইতিহাসের পেছনের ইতিহাস খোঁজার জন্য আমাদের যেতে হবে প্রায় আড়াই হাজার বছর পেছনে। গ্রিস মুলুকে এক রাজ্য ছিল নাম ছিল তার মেসিডোনিয়া। মেসিডোনিয়ার রাজা ছিলেন ফিলিফ। রাজা ফিলিফের পুত্র আলেকজান্ডার। পরবর্তীকালে ইউরোপীয়দের কাছে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট নামে যিনি বেশি পরিচিত। আলেকজান্ডারের নেশা চাপল বিশ্বজয়ের। তিনি বেরিয়ে পড়লেন রাজ্যজয়ে। প্রথমে জয় করলেন প্রাচীন পারস্য। তারপর পারস্যের পথ ধরে ভারতবর্ষে ছুটলেন। অবশ্য ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিম অংশ খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে পারস্য সম্রাটের অধীনে ছিল। আলেকজান্ডারের অভিযানের প্রাক্-কালে ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে কোনো শক্তিশালী রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল না। ছিল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক রাজ্য। ঐক্য ছিল না এদের মধ্যে। বরং ছিল নিরন্তর বিরোধ। বলা হয় বিদেশী কোনো আক্রমণ প্রতিহত করার মতো কোনো শক্তি ছিল না এ অঞ্চলের শাসকদের। খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ অব্দে আলেকজান্ডার হিন্দুকুশ পর্বত অতিক্রম করে ভারতবর্ষে প্রবেশ করা মাত্র কয়েকজন রাজা তার বশ্যতা স্বীকার করেন। এরপর আলেকজান্ডার সিন্ধু নদ পার হলে তক্ষশীলার রাজা অম্ভি বিনা যুদ্ধে তার বশ্যতা স্বীকার করেন। কিন্তু আলেকজান্ডার প্রথমে প্রতিরোধের সম্মুখীন হন রাজা পুরুর রাজ্যে। পুরুর রাজ্য ছিল তক্ষশীলার পূর্বে বিতস্তা ও চন্দ্রভাগা নদীর মধ্যস্থলে। খ্রিস্টপূর্ব ৩২৬ অব্দে আলেকজান্ডার বিতস্তা পর্যন্ত অগ্রসর হয়ে পুরু রাজ্য আক্রমণ করেন। রাজা পুরু বিপুল বিক্রমে দিগ্বিজয়ীর গতিরোধ করেন। কিন্তু রণকুশল আলেকজান্ডারের বিরুদ্ধে তার সব প্রতিরোধ-প্রয়াস ব্যর্থ হয়। তুমুল যুদ্ধে বহু রক্তক্ষয়ের পর পুরুরাজ পরাজিত ও বন্দি হন। রাজা পুরুর মর্যাদা নিয়ে একটি কথা আজও লোকমুখে প্রচলিত আছে সেটি উল্লেখ না করলে নয়। বন্দি রাজা পুরুকে আলেকজান্ডার প্রশ্ন করেন তার কাছে কী চাই? রাজা পুরু বলেছিলেন একজন রাজার সঙ্গে রাজোচিত ব্যবহার। আলেকজান্ডার তার শৌর্য বীর্যে এত প্রীত হন যে তিনি হৃতরাজ্য প্রত্যর্পণ করে তার সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করেন। রাজার মর্যাদা বিষয়ে উপর্যুক্ত ঘটনাটি কিংবদন্তি হয়ে আছে। পুরুর সঙ্গে মৈত্রী স্থাপনের পর আলেকজান্ডার পাঞ্জাবের বিপাশা নদী পর্যন্ত

অগ্রসর হলে তার রণক্লান্ত সেনাদল আর অগ্রসর হতে অনিচ্ছা জানায়। উপরন্তু রণক্লান্ত সেনাদল খবর পায় যে বিপাশা নদীর অন্যদিকে আছে প্রাসিয়ই নামে এক রাজ্য এবং প্রাসিয়ইয়ের পূর্বে আছে গঙ্গাঋদ্ধি রাজ্য। গঙ্গাঋদ্ধির রয়েছে বিশাল সামরিক বাহিনী। ছয় হাজার পদাতিক, এক হাজার অশ্বারোহী ও সাতশ হস্তীবাহিনী মতান্তরে সামরিক শক্তি আরো বেশি। এ খবর জেনে সম্রাট আলেকজান্ডারের জয়ের নেশা বাড়ল কিন্তু রণক্লান্ত সেনাদের  মানাতে পারলেন না সম্রাট আলেকজান্ডার, ভগ্নমনোরথ হয়ে ফিরে গেলেন। একমাত্র পাশ্চাত্য সূত্রেই গঙ্গাঋদ্ধির পরিচয় জানা যায়, কারণ সম্রাট আলেকজান্ডারের সঙ্গে ভারতবর্ষে আসেন অনেক ইতিহাসবিদ ও পণ্ডিত। রহস্যজনকভাবে প্রাচ্যের সূত্রে গঙ্গাঋদ্ধির কোনো পরিচয় জানা যায় না।

পাশ্চাত্য পণ্ডিত ডিওডোরাস সিন্ধু-পরবর্তী দেশ সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে গঙ্গা পেরিয়ে যে অঞ্চল সেখানে প্রাসিয়ই ও গঙ্গাঋদ্ধিদের আধিপত্য। কুইনটাস কারটিয়াস রুফাস গঙ্গা পেরিয়ে পরবর্তী তীর অঞ্চলটিতে দুটি জনগোষ্ঠীর বসবাসের কথা বলেছেন, গঙ্গাঋদ্ধি ও প্রাসিয়ই। স্ট্রাবোর তথ্যানুযায়ী গঙ্গা ‘গঙ্গাঋদ্ধি’-এর ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে, যা তার পূর্ব সীমানা গঠন করেছে। প্লিনি লিখেছেন যে গঙ্গার শেষ অংশ ‘গঙ্গাঋদ্ধি’-এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।... ভার্জিল অবস্থানের কোনো ইঙ্গিত না দিয়ে গঙ্গাঋদ্ধির উল্লেখ করেছেন। তিনি ভেবেছিলেন তার জন্মভূমি মালটুলায় ফিরে গিয়ে এক মর্মর-মন্দির স্থাপন করবেন এবং মন্দির চূড়ায় স্বর্ণ-গজ-দন্তে গেঁথে দেবেন গঙ্গাঋদ্ধি বীরত্বগাথা। মিসরীয় ভূগোলবিদ টলেমি গঙ্গাঋদ্ধির অবস্থান সম্পর্কে কিছুটা বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। তার মতে, গঙ্গার সব মোহনা গঙ্গাঋদ্ধি নামের অধিবাসীদের দেশভুক্ত। কেউ কেউ বলেন গঙ্গাঋদ্ধি গঙ্গা প্রদেশের লোক। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কেউ কেউ প্রাসিয়ই বলতে বোঝেন প্রাচ্যরাষ্ট্র, আবার কেউ কেউ মগধকে প্রাসিয়ই মনে করেন। গ্রিক ও রোমান উৎস বিশ্লেষণ করে নীহাররঞ্জন রায় বাঙ্গালীর ইতিহাস গ্রন্থে বলেন যে খ্রিস্টের জন্মের চতুর্থ শতকের তৃতীয় পাদে কিংবা তার আগে কোনো সময় প্রাচ্য ও গঙ্গা রাজ্য দুটি হয় সংঘবদ্ধ হয়, না হয় একই রাজার অধীনে ছিল। তিনি আরো মনে করেন প্রাচ্য ও গঙ্গারাষ্ট্র একত্র করেন পুরাণে উল্লিখিত মহাপদনন্দ, মহাবোধিবংশ গ্রন্থে যাকে বলা হয়েছে উগ্রসেন

এবং পাশ্চাত্য সূত্রে Agrammes/Xandrammes. নীহাররঞ্জন রায়ের মতে, উগ্রসেন ছিলেন প্রাচ্যের রাজা, তিনি গঙ্গারাষ্ট্রকে প্রাচ্যভুক্ত করেন। উগ্রসেনের সমবেত প্রাচ্য-গঙ্গারাষ্ট্রের সুবৃহৎ সৈন্য ও প্রভূত ধনরত্ন পরিপূর্ণ রাজকোষের সংবাদ আলেকজান্ডারের শিবিরে পৌঁছেছিল।২  ইতিহাসবিদ হাবিবুর রহমানও অনেকটা একই ধরনের মত পোষণ করেন। তিনি আরো এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বলেন, হয়তো নন্দরাজদের প্রথম উত্থান ঘটে গঙ্গাঋদ্ধি অঞ্চলে এবং পরে তারা উত্তরাপথের আকর্ষণে পাটালীপুত্রে রাজধানী স্থাপন করেন, যেমন করেছিলেন বরেন্দ্রর রাজারা।৩  বরেন্দ্রর রাজা বলতে হাবিবুর রহমান পাল শাসকদের বুঝিয়েছেন। পালদের শাসনামলে বাংলা ও বিহার একটি রাজ্য পরিণত হয় এবং মগধ হয় এর প্রশাসনিক কেন্দ্র। 

কার্তিয়াস, ডিওডোরাস, প্লুটার্ক প্রমুখ গ্রিক লেখকের ইতিবৃত্তে, স্ট্রাবো ও টলেমির ভূগোল-বৃত্তান্তে ও ভার্জিলের মহাকাব্যে গঙ্গাঋদ্ধি ভাস্বর হয়ে রয়েছে। কিন্তু ভারতবর্ষের স্থানীয় সূত্র—ধর্মশাস্ত্র-পুরাণ-উপাখ্যানে আশ্চর্য রকমভাবে উপেক্ষিত এই গঙ্গাঋদ্ধি। খ্রিস্টপূর্বাব্দ সময়ের গঙ্গা নদীর তীরবর্তী এই শক্তিশালী রাজ্যের অবস্থান কোথায়? প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাসের গবেষকদের যথার্থ নজর এড়িয়ে বিষয়টি দীর্ঘদিন অনেকটা অন্ধকারেই ছিল। 

ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের মতে, ‌গ্রিসীয় ও ল্যাতিন সাহিত্যে ‘গঙ্গারিদাই’ বা এই সংশ্লিষ্ট যে নামগুলির উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলির মূল ভারতীয় নাম ছিল ‘গঙ্গারিদ’। গ্রীসীয় ভাষায় কর্তৃকারকের বহুবচনে যার রূপান্তর হতো ‘গঙ্গারিদাই’। এই মূল ‘গঙ্গারিদ’ নামটির সঙ্গে গঙ্গার যোগ আছে। কথাটির অর্থ হচ্ছে ‘গঙ্গা যার অর্থাৎ যে দেশের হৃদয়ে’ (গঙ্গহৃদ>গঙ্গারিদ)।৪  

জনপ্রিয়ভাবে প্রচলিত যে পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক সীমানায় প্রাচীন গঙ্গাঋদ্ধি রাজ্য ছিল। পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ও উত্তর চব্বিশ পরগনা, হুগলি, হাওড়া ও মেদিনীপুর জেলা এবং বর্ধমান জেলার কিছু অংশ নিয়ে ছিল এই রাজ্য। ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের মতে, বর্তমান বাংলাদেশের পদ্মার (অর্থাৎ পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার সম্মিলিত ধারার) মুখ পর্যন্ত অর্থাৎ বাংলাদেশের সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চল গঙ্গাঋদ্ধি অঞ্চলের মধ্যে ছিল।৫  টলেমির তথ্যনুযায়ী তিনি বলেন, গঙ্গাঋদ্ধিকে শনাক্ত করা যায় বর্তমান ভারতের পশ্চিম বাংলা ও বাংলাদেশের গঙ্গার প্রধান দুটি শাখার মধ্যবর্তী অঞ্চলটিতে।

প্রাচীন গঙ্গাঋদ্ধি রাজ্য হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের উপর্যুক্ত ভৌগোলিক সীমানা অনুমিত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রত্নস্থানকে গঙ্গাঋদ্ধি রাজ্য হিসেবে সুনিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। হাবিবুল্লা পাঠান প্রথম প্রশ্ন উত্থাপন করেন যে গঙ্গাঋদ্ধি জাতির বসতি কি উয়ারী-বটেশ্বরে ছিল?৬ পেশাদার প্রত্নতাত্ত্বিক অথবা ঐতিহাসিকদের বাইরে তিনি যে প্রশ্নটি উত্থাপন করেছিলেন তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ এবং গবেষণার বিষয়। কিন্তু দীর্ঘ দুই দশক আগে হাবিবুল্লা পাঠান এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলেও কেউই এ বিষয়ে দৃষ্টিপাত করেননি।

জানা যায় যে বিখ্যাত সমুদ্রবন্দর গাঙ্গে ছিল গঙ্গাঋদ্ধির রাজধানী। গাঙ্গে ছিল বাণিজ্য কেন্দ্র। সেই বন্দর থেকে সুদূর পশ্চিমে মসলিন কাপড় রফতানি হতো। রাজধানীর কাছে ছিল সোনার খনি। পশ্চিমবঙ্গের চন্দ্রকেতুগড় এবং তাম্রলিপ্তিকে অনেকে প্রাচীন গাঙ্গে বন্দর হিসেবে শনাক্ত করার চেষ্টা করেছেন। তবে তথ্য অপ্রতুলতার কারণে ‘গাঙ্গে’ নগরটির সুনির্দিষ্ট অবস্থান এখনো শনাক্ত করা যায়নি।

সাম্প্রতিক আবিষ্কৃত প্রত্নতাত্ত্বিক উপাত্তের ভিত্তিতে বলা যায়, উয়ারী-বটেশ্বর অঞ্চল ছিল সেই বিখ্যাত গঙ্গাঋদ্ধি রাজ্য বা জাতি। গঙ্গা নদীর নিম্ন-প্রবাহ যে অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে তার আশপাশের বিরাট এলাকাই গাঙ্গেয় বদ্বীপ হিসেবে পরিচিত। উয়ারী-বটেশ্বর ব্রহ্মপুত্র নদের নিকটবর্তী হলেও ভৌগোলিকভাবে এ অঞ্চল গাঙ্গেয় বদ্বীপ নামেই বেশি পরিচিত। সে হিসেবে উয়ারী-বটেশ্বর গঙ্গা তীরবর্তী বলা যায়।  

উয়ারী-বটেশ্বর যে প্রাচীন নদী বন্দর ও বাণিজ্য কেন্দ্র আমাদের সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় তা বেরিয়ে আসছে।৭ সে হিসেবে অনুমিত হয় যে উয়ারী-বটেশ্বরই ছিল গঙ্গাঋদ্ধির রাজধানী গাঙ্গে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে দীলিপ কুমার চক্রবর্তী উয়ারী-বটেশ্বরকে টলেমি উল্লিখিত সৌনাগড়া বলে অনুমান করেছেন।৮ নাম যাই হোক না কেন আড়াই হাজার বছর আগে উয়ারী-বটেশ্বর যে একটি সমৃদ্ধ নগর-বন্দর ছিল তা এরই মধ্যে নিশ্চিত হওয়া গেছে।    

উয়ারী-বটেশ্বর গঙ্গাঋদ্ধি রাজ্যে বা রাজ্যের অংশ হলে উয়ারী-বটেশ্বর দুর্গ-নগর সৌনাগড়া না হয়ে গাঙ্গে নগরও হতে পারে; কারণ টলেমির বর্ণনায় এশিয়ার অনেক নগরের সঙ্গে সৌনাগড়া এবং গাঙ্গে দুটি নগরের নাম পাওয়া যায়। আরো জানা যায় যে গাঙ্গে বন্দর থেকে মসলিন রফতানি হতো। মসলিন কাপড়ের আদি উৎপাদনস্থল হিসেবে ব্রহ্মপুত্র নদ-তীরবর্তী অঞ্চল বিখ্যাত। ঢাকাই মসলিন কথাটি এখনো প্রচলিত। আবদুল করিম লিখেছেন, ‘‌ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী কোনো কোনো এলাকায় ফুটি নামে এক প্রকার তুলা জন্মাত। এর সুতা থেকে তৈরি হতো সবচেয়ে সূক্ষ্ম মসলিন বস্ত্র।’৯ এ এলাকাটি ছিল মূলত বৃহত্তর ঢাকা জেলার বিভিন্ন অংশ, যেখানে মসলিন উৎপন্ন হতো। উয়ারী-বটেশ্বর বৃহত্তর ঢাকার মধ্যে অবস্থিত প্রাচীন বন্দর ও বাণিজ্য নগর যা ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী। এসব প্রামাণিক উপাত্তের ভিত্তিতে ইঙ্গিত মিলছে যে উয়ারী-বটেশ্বর হতে হয়তো মসলিন রফতানি হতো। খ্রিস্টপূর্বাব্দ পাঁচ শতকে গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডটাস উল্লেখ করেন যে ভারতবর্ষের মসলিন দিয়ে মিসরের মমি মোড়ানো হতো।১০  

এরই মধ্যে বেশকিছু প্রত্নবস্তু যেমন রোলেটেড মৃৎপাত্র, এক বর্ণিল টানা কাচের পুঁতি, হাইটিন ব্রোঞ্জ, স্যান্ডউইচ কাচের পুঁতি প্রভৃতি উয়ারী-বটেশ্বর থেকে আবিষ্কৃত হয়েছে, যা ভূমধ্যসাগরীয় ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক নির্দেশ করে। কার্বন-১৪ পরীক্ষার মাধ্যমে উয়ারী-বটেশ্বরের বয়স পাওয়া গিয়েছে প্রায় আড়াই হাজার বছর। অর্থাৎ এ কথা এখন নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে খ্রিস্টপূর্ব পাঁচ শতকে উয়ারী-বটেশ্বরে নগর ব্যবস্থা বিকাশ লাভ করেছিল। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এ এলাকায় হাজার হাজার জনপদ ও সাম্রাজ্যিক শ্রেণীর ছাপাঙ্কিত রৌপ্যমুদ্রা পাওয়া যায়। ভারত উপমহাদেশে প্রাপ্ত ছাপাঙ্কিত রৌপ্যমুদ্রাগুলো প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ছয় শতক থেকে মৌর্য কালপর্বের। জনপদ শ্রেণীর ছাপাঙ্কিত রৌপ্যমুদ্রা আবিষ্কৃত হওয়ায় মনে করা হয় যে প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ছয় শতক থেকে চার শতক পর্যন্ত উয়ারী-বটেশ্বর ছিল একটি জনপদ এবং উয়ারী-বটেশ্বর দুর্গ-নগর ছিল সেই জনপদের রাজধানী। খ্রিষ্টপূর্ব চার শতকের পর হয়তো উয়ারী-বটেশ্বর মৌর্য সাম্রাজ্যভুক্ত হয়। জনপদ ও সাম্রাজ্যিক শ্রেণীর প্রচুর ছাপাঙ্কিত রৌপ্যমুদ্রা আবিষ্কার প্রমাণ করে যে জনপদ এবং মৌর্য কালপর্বে  উয়ারী-বটেশ্বর একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ জনপদ ছিল। 

বটেশ্বর গ্রামের ২৫টি স্থান থেকে লোহার তৈরি হস্ত-কুঠার (?), বল্লম, ছুরি পাওয়া গেছে। বটেশ্বরসহ পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলো থেকে লোহার তৈরি হাতিয়ার পাওয়া গেছে কয়েক হাজার। লোহার হাস্ত-কুঠারসমূহ (?) যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। হস্ত-কুঠারের (?) প্রশস্ত প্রান্ত বাঁশের মধ্যে আটকিয়ে সরু প্রান্ত শত্রুকে ঘায়েল করার কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। এতদিন পর্যন্ত উয়ারী-বটেশ্বর অঞ্চলে লোহার ব্যবহার কোন সময়ে হয়েছিল সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট তথ্য ছিল না। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে আবিষ্কৃত লোহার বল্লম এবং লোহার হস্ত-কুঠার (?) ছিল এনবিপিডব্লিউ (খ্রিস্টপূর্ব  ছয়-এক শতক) পর্যায়ের। সুতরাং এতটুকু নিশ্চিত করে বলা সম্ভব যে খ্রিস্টপূর্ব কালেই এ অঞ্চলে লোহার হাতিয়ার ব্যবহৃত হতো। 

উয়ারী-বটেশ্বর দুর্গ-নগরের দুর্গ-প্রাচীর, পরিখা, অসম রাজার গড়, যার পশ্চিম প্রান্ত মিশেছে কয়রা নদীর সঙ্গে এবং পূর্ব প্রান্ত মিশেছে আড়িয়ল খাঁ নদীর সঙ্গে। ফলে উয়ারী-বটেশ্বর দুর্গ-নগরের উত্তর ও পূর্ব প্রান্তে নদী এবং পশ্চিম-দক্ষিণ প্রান্ত দ্বিস্তর বিশিষ্ট মাটির তৈরি প্রাচীরের মাধ্যমে দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। 

উয়ারী-বটেশ্বর প্রত্নতাত্ত্বিক খননে প্রাপ্ত প্রবেশদ্বার সংযুক্ত রাস্তায় এবং পরিখায় বেশকিছু পোড়ামাটির নিক্ষেপণাস্ত্র পাওয়া গেছে। পোড়ামাটির নিক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রতিরক্ষার কাজে ব্যবহার করা হতো। পশ্চিমবঙ্গের বানগড় ও ইতালির পম্পেই নগরে এ ধরনের পোড়ামাটির নিক্ষেপণাস্ত্র আবিষ্কৃত হয়েছে।

উয়ারী-বটেশ্বর দুর্গ-প্রাচীরে সম্ভবত পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ছিল। হাবিবুল্লা পাঠান ছেলেবেলায় তার বাবার সঙ্গে স্কুলে যাওয়ার পথে কর্নারগুলো বেশ উঁচু দেখতে পেয়েছিলেন এবং এখনো উত্তর-পশ্চিম কর্নারে ভালোভাবে লক্ষ করলে বোঝা যায় যে এটি একসময় পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ছিল। 

খ্রিস্টপূর্ব পাঁচ শতক থেকে পরবর্তী সময়কালে উয়ারী-বটেশ্বরের সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক অবস্থা, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা কৌশল, প্রাপ্ত বিপুল পরিমাণে লৌহ ও পোড়ামাটির নিক্ষেপণাস্ত্র গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চলে একে একটি দুর্ভেদ্য রাজ্য হিসেবে পরিচিতি এনে দিয়েছিল বলে প্রতীয়মান হয়। যদিও আব্দুল মমিন চৌধুরীর মতে, খ্রিস্টের জন্মের আগে অথবা অব্যবহিত পরে কয়েক শতকে গ্রিক ও লাতিন ক্ল্যাসিক্যাল লেখকদের বর্ণনার সঙ্গে মিলে এমন কোনো সামরিক শক্তিসম্পন্ন রাজ্যের সুনির্দিষ্ট অস্তিত্ব স্থানীয় কোনো উৎসের ভিত্তিতে নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। তবে উয়ারী-বটেশ্বরের সাম্প্রতিক আবিষ্কার প্রমাণ করছে যে উল্লিখিত সময়ে সামরিকভাবে এমনকি অর্থনৈতিকভাবেও উয়ারী-বটেশ্বর ছিল অত্যন্ত ক্ষমতাশালী রাজ্য।

সার্বিক মূল্যায়নে প্রতীয়মান হয় যে আলেকজান্ডার যে সামরিক গঙ্গাঋদ্ধি জাতি বা রাজ্যের কথা শুনেছিলেন তার একটি অংশ উয়ারী-বটেশ্বর অঞ্চল। পদ্মশ্রী পুরস্কারপ্রাপ্ত ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক-ইতিহাসবিদ-ভাষাবিদ বি এন মুখার্জীর মতে, বাংলাদেশের পদ্মা-মেঘনা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকাব্যাপী গঙ্গাঋদ্ধি বিস্তৃত ছিল। অধ্যাপক আব্দুল মমিন চৌধুরী বাংলাপিডিয়ায় বি এন মুখার্জীর মতকে সমর্থন করেছেন।১১ আমরা প্রত্নতত্ত্বের গবেষক হিসেবে উয়ারী-বটেশ্বরের ভৌগোলিক অবস্থান, সময় ও সমৃদ্ধির কারণে মনে করি যে উয়ারী-বটেশ্বর ছিল গঙ্গাঋদ্ধির অংশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গবেষক জেমস নোভাকের  সাম্প্রতিক লেখনী প্রণিধানযোগ্য—

In 327 BC this force, consisting of a huge army of infantry backed by horses and elephants, stopped Alexander’s advance on the banks of the Beas river.… Alexander’s troops begged him not to fight these Gangaridae, these people of the lower Ganges, who according to Ptolemy lived at the delta of the Ganges in what is now Bangladesh….. What is important is that Bangladesh entered Western History as a Victor.১২


গ্রন্থপঞ্জি

১. মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, গঙ্গাঋদ্ধি থেকে বাংলাদেশ, (ঢাকা, ১৯৮৯)।

২. নীহাররঞ্জন রায়, বাঙ্গালীর ইতিহাস আদিপর্ব, (কলকাতা, ১৪১৬ বাংলাসন)

৩. মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, গঙ্গাঋদ্ধি থেকে বাংলাদেশ, (ঢাকা, ১৯৮৯)

৪. ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, বঙ্গ, বাঙ্গালা ও ভারত, (কলকাতা, ২০০০)

৫. ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, বঙ্গ, বাঙ্গালা ও ভারত, (কলকাতা, ২০০০)

৬. মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন: উয়ারী-বটেশ্বর, (বেলাব, নরসিংদী-১৯৮৯), ৪৭।

৭. সুফি মোস্তাফিজুর রহমান ও মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান রচিত উয়ারী-বটেশ্বর: শেকড়ের সন্ধানে, (ঢাকা, ২০১৭),

৮. Dilip Kumar Chakrabarti, Ancient Bangladesh, University Press Limited, (Dhaka, 1992) and Two examples of Mauryan Art of Bengal, Journal of Bengal Art, Vol. 1, (Dhaka, 1996), 77-80.

৯. আবদুল করিম, মসলিন, সিরাজুল ইসলাম (সম্পা.), বাংলাপিডিয়া, খণ্ড-৮, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি-২০০৩

১০. J. Kennedy, The Early Commerce of Babylonia with India, 700-300 B.C., JARS: (1898), 250-58 cited in M.K. Dhavalikar, Historical Archaeology of India, (New Delhi, 1999), 88.

১১. এ এম চৌধুরী, গঙ্গারিডাই, সিরাজুল ইসলাম (সম্পা.) বাংলাপিডিয়া, খণ্ড-৩, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি-২০০৩

১২. James J. Novak, Bangladesh, (Dhaka, 1993).61

সুফি মোস্তাফিজুর রহমান: অধ্যাপক, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়