সুন্দরবন বদ্বীপের নদ-নদীগুলোর বিশ্লেষণে পণ্ডিত ও গবেষকদের রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন মত। বিশেষ করে নদীর গতিপথ নিয়ে। বিদেশী লেখকদের মতে, গঙ্গা প্রবাহিত হয়েছে প্রাসী, মল্ল, তাম্রলিপ্ত ও কেন্দ্রীয় কলিঙ্গের সীমানাঘেঁষে। ধারণা করা হয়, এটি উল্লেখিত এলাকাগুলোর পূর্ব দিকের সীমানা জুড়ে ছিল। আবার অনেক গবেষক মনে করেন, গঙ্গারিডাইয়ের অধিবাসীরা গঙ্গারিডাইয়ের শেষ সীমানায় বাস করত। মেগাস্থিনিস, ডিওডোরাস, টলেমি, প্লিনির মতো প্রাচীন গ্রিক উৎস এবং আরো অনেক বিশেষজ্ঞ গঙ্গারিডাইকে গঙ্গা অববাহিকার শেষ অংশ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। যদিও গঙ্গার অনেক উপনদী রয়েছে। তবে এর মূল প্রবাহ গঙ্গারিডাই দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। প্রাচীন মানচিত্র দেখে গঙ্গারিডাই সভ্যতা সম্পর্কে ধারণা করা যায়। এ বসতি গঙ্গা নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল বলেই মনে করা হয়।

গঙ্গারিডাই পুরো বদ্বীপ অঞ্চলকে নিয়ে গড়ে উঠেছিল।  টলেমি বলেছিলেন, গঙ্গা অববাহিকায় মোট পাঁচটি মুখ রয়েছে। তাঁর মতে, গঙ্গা নদী ছিল গঙ্গারিডাইয়ের পূর্ব সীমান্তে এবং তিনি আরো বলেছিলেন, ভাগীরথী ছিল তাম্রলিপ্ত ও মল্ল অঞ্চলের পশ্চিম সীমানা ঘেঁষে। টলেমি যে মানচিত্র এঁকেছেন সেখানে গঙ্গা নদীর নিচে দুটি উপনদী আছে। ক্যাম্বিসাম ও অ্যান্টিবোলা। ক্যাম্বিসাম পশ্চিম দিক থেকে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয় এবং অ্যান্টিবোলা পূর্ব থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়। অবশেষে তারা বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়। গঙ্গার পাঁচটি মুখ শনাক্তকরণে পণ্ডিত ও গবেষকরা নানান মত জানিয়েছেন। নলিনীকান্ত ভট্টশালীর মতে, ক্যাম্বিসাম হলো তাম্রলিপ্তের সামনে গঙ্গাসাগর অঞ্চল। কিন্তু হেমচন্দ্র রায় চৌধুরী বলেছেন, এটি কাশিকা বা কাসাঁই বা কালিদাসের উল্লেখিত কংসবতী নদী। জেমস রেনেলের মতে, একসময় সরস্বতী নদীটির শেষ অংশ চণ্ডীতলা, আমতা, কালীঘাটের মধ্য দিয়ে বয়ে চলেছিল। সরস্বতী ও আদিম সরস্বতী ভাগীরথীর শেষ অংশে যুক্ত হয়েছিল। এটিই ছিল গঙ্গা নদীর আদি প্রবাহ। সুতরাং টলেমি ও বর্তমান ভৌগোলিক অবস্থা তুলনা করে বলা যেতে পারে যে ক্যাম্বিসাম হলো ভাগীরথী এবং অ্যান্টিবোলা হলো পদ্মা নদীর পুরনো খাঁড়ি। নিম্ন ক্যাম্বিসাম নদীর দক্ষিণ-পূর্ব অংশ হলো মেঘনা নদী। হেমচন্দ্র রায় হুগলী নদীকে ম্যাগনাম উপাধি দিয়েছেন। ম্যাগনাম অর্থ হলো মহান। কারণ হুগলী নদী ছিল পশ্চিমের সর্ববৃহৎ নদী। এই নদীকে ঘিরে একটি বৃহৎ বন্দর গড়ে উঠেছিল। এই বন্দরের স্থানীয় নাম এখনো অজানা থাকলেও এর অবস্থান কংসবতী-হলদী নদীর মোহনা এবং হুগলী নদীর মধ্যে অবস্থিত ছিল। ধারণা করা হয়, এটি হয়তো হলদিয়া বন্দর হতে পারে।

গঙ্গা অববাহিকা নদীর মুখ ছিল ক্যাম্বেরিকাম। নলিনীকান্ত, হেমচন্দ্র ও নীহাররঞ্জন রায়ের মতে ক্যাম্বেরিকাম ছিল কুমার ও হরিণঘাটার মিলনস্থল। কিন্তু হরিণঘাটা নদীর সম্মুখ প্রান্ত পদ্মা নদীর উপনদী মধুমতী নদীর শেষ অংশ হিসেবে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিলিত হয়েছে। টলেমি তাঁর জিওগ্রাফি গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, মধুমতী ও হরিণঘাটার মিলনস্থল, যা এখন ধোবলঘাটা নামে পরিচিত। দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত জেলায় রয়েছে সুন্দরবন। এটি বদ্বীপ হিসেবেই সুপরিচিত। ঘন জঙ্গল ও অসংখ্য বণ্য প্রাণী দ্বারা বেষ্টিত একটি অঞ্চল। এখানকার অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক অবশেষ এখনো অনাবিষ্কৃত। পরেশনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় তার লেখা ‘বাংলার পুরাবৃত্ত’ বইয়ে যশোর জেলায় গঙ্গানগরের অবস্থান বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সতীশচন্দ্র মিত্র মনে করেন গঙ্গানগর উত্তর গঙ্গায় অবস্থিত। তার বই যশোর-খুলনার ইতিহাসে এ তথ্য পাওয়া যায়। পেরিপ্লাসের"অজানা গ্রিক নাবিকের দৈনিক জার্নাল অনুসারে ওড়িশা পরিদর্শন করার পরে জাহাজে করে পূর্ব দিকে যেতে হবে এবং সামনে অগ্রসর হতে থাকলেই মিলবে গঙ্গা উপকূল। যেখানে লোকালয় আছে এবং এখানেই ভারতের বৃহত্তম গঙ্গা বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। নদীর পাশেই গাঙ্গে নামের একটি বাণিজ্য কেন্দ্র রয়েছে; যেখানে প্রবাল, মুক্তা, স্বর্ণ ও অতীব সুন্দর মসলিন সিল্ক রয়েছে। এগুলো এখানে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত। গ্রিক নাবিকের সঙ্গে মিল রেখে বলা যায়, গঙ্গানগর গঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত ছিল। কিন্তু যজ্ঞেশ্বর মনে করেন অজানা নাবিকের গঙ্গা ছিল আসলে ভাগীরথী নদী।

স্ট্রাবো, টলেমির মানচিত্র ও পেরিপ্লাসের আলোচনা অনুসারে অনুমান করা যায় যে গঙ্গানগর ভাগীরথী নদীর তীরে এবং গঙ্গার মূল প্রবাহে ছিল।  কল্যাণ রুদ্রের দেয়া অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশের পরিমাপ প্রমাণ করে যে গঙ্গানগর, হরিনারায়ণপুর প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হতে পারে।

তাই এসব তথ্য ও যুক্তির ভিত্তিতে অনেক গবেষক মত দিয়েছেন যে গঙ্গানগর বা সাগরদ্বীপ ছিল আদি গঙ্গারিডাই। উগ্রসেন বা মহাপদ্মানন্দ ছিলেন মগদের রাজা আনুমানিক ৪০০ খ্রিস্টপূর্বে। সেই সময় নিম্ন গঙ্গা একটি সাহসী জাতি দখল করেছিল, যার রাজধানী ছিল গঙ্গানগর। আলেকজান্ডার বিপাশা নদীর পর আর যাত্রা করতে সাহস করেননি। কারণ তিনি জানতেন নিম্ন গঙ্গা অববাহিকায় একটি দুর্ধর্ষ জাতির আবাসস্থল আছে। নিম্ন গঙ্গা অববাহিকার অপরাজেয় জাতি ছিল গঙ্গারিডাইয়ের মানুষ। প্রাচীন গ্রিস, রোম ও মিসরে গঙ্গারিডাইয়ের পরিচিতি ছিল। সেখানে মগধের লোকেরা প্রসি বা প্রাসী নামে পরিচিত ছিল। গঙ্গারিডাই তাদের যুদ্ধের দক্ষতার জন্য বিখ্যাত ছিল। বিদেশী অনেক রোমান কবিও গঙ্গারিডাই জাতিকে তাদের সাহসিকতা ও যুদ্ধ দক্ষতার জন্য প্রশংসা করেছিলেন। হাতি ও নৌযুদ্ধে দক্ষ ছিল তারা। ৩০০ খ্রিস্টপূর্বে মেগাস্থিনিস লিখেছেন, গঙ্গারিডাই জনপদে প্রচুরসংখ্যক যুদ্ধ প্রশিক্ষিত হাতি ছিল এবং সে কারণেই কোনো জাতি তাদের আক্রমণ করতে খুব বেশি সাহস করেনি। প্লুটার্ক বলেন প্রাসী ও গঙ্গারিডাই আলাদা। বিদেশী অনেক গবেষক ধনন্দকে প্রাসীর রাজা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাদের রাজধানী ছিল পাটালীপুত্র। সেই প্রেক্ষাপটে, প্রাসী হলো মগধ ও বিহারের পাটনার গয়া জেলায় অবস্থিত। বাংলা সাহিত্যেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। গঙ্গারিডাই ও এর রাজধানী সম্পর্কে বিভিন্ন মত রয়েছে। যদিও গ্রিক ও রোমান লেখকরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন গঙ্গারিডাই এবং এ জাতির অবস্থান নিশ্চিত করতে। তবে দেশীয় সাহিত্যিকদের কাছে গঙ্গারিডাই নিয়ে তেমন কোনো তথ্য নেই। 

প্রাচীন ভ্রমণকারী, ঐতিহাসিক ও ভূগোলবিদরা গঙ্গারিডাই শব্দটি ব্যবহার করেছেন। শব্দটি পৃথিবীজুড়ে সুপরিচিত। তাই গঙ্গারিডাই নামে যে সভ্যতা ছিল তা সত্য। গ্রিক অর্থ অনুসারে গঙ্গারিডাই অর্থ গঙ্গা ঋদ্ধ বা সমৃদ্ধ। মেগাস্থিনিস ও অন্যান্য গ্রিক লেখক গঙ্গারিদেশ ও গঙ্গারিডাই শব্দগুলো ব্যবহার করেছেন। বঙ্গ উপদ্বীপের বিশাল অংশে প্রাচীনকালে বিভিন্ন শক্তির অধীনে অনেক মুক্ত রাষ্ট্রের আবির্ভাব হয়েছিল। গ্রিক ও রোমান লেখক দ্বারা বর্ণিত গঙ্গারিডাই ছিল একটি সাহসী যোদ্ধা শ্রেণী, যাদের অধীনে ছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। গঙ্গা শব্দটি বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন কখনো এটি একটি জাতি হিসেবে, কখনো একটি অঞ্চল হিসেবে অথবা কখনো একটি রাজ্য হিসেবে। 

মেগাস্থিনিসের ‘‌ইন্ডিকা’ গঙ্গারিডাই জাতির ইতিহাসের একমাত্র উৎস। যদিও গ্রিক ও রোমান লেখকরা তাকে মিথ্যাবাদী উপাধি দিয়েছিলেন। তবে এটি সত্য যে মেগাস্থিনিসই প্রথম ব্যক্তি যিনি ভারতীয়দের জীবন পর্যবেক্ষণ ও উপলব্ধি করেছেন। ভারতীয়দের ছোট ছোট অভ্যাস তার বর্ণনায় পাওয়া যায়। মেগাস্থিনিসের লেখা থেকে নিম্ন গঙ্গার অববাহিকায় বসবাসরতদের নিয়ে তথ্য পাওয়া যায়। মেগাস্থিনিসের মতে, পাটালীপুত্র এবং গঙ্গা ও বঙ্গোপসাগরের মিলনস্থলের মধ্যে দূরত্ব ৭৪৩ কিলোমিটার। হিলনের লেখায় এর দূরত্ব ৬৩৪ কিলোমিটার বলা হয়েছে। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে দূরত্ব পরিবর্তিত হয়। আবার উপকূলীয় ক্ষয়ও দূরত্বের পার্থক্য তৈরি করতে পারে। গঙ্গা ও বঙ্গোপসাগরের মিলনস্থল বা গঙ্গানগর আগে দক্ষিণে অবস্থিত ছিল। মেগাস্থিনিসের বর্ণনায় জলপথের পরিমাপ হলো প্রায় দেড় কিলোমিটার। বর্তমান সড়কপথের চেড়ে বড়। দেউলপোতা ও হরিনারায়ণপুরে প্রাচীন সভ্যতার অনেক নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। সুন্দরবন অঞ্চলে মন্দিরতলাও তার মধ্যে একটি। এর থেকেই প্রমাণ পাওয়া যায় যে প্রাচীনকালে সাগরদ্বীপ ছিল গঙ্গা ও বঙ্গোপসাগরের মিলনস্থল। মেগাস্থিনিসের কথা থেকে প্লিনি লিখেছিলেন, কলিঙ্গ জাতি উপকূলীয় এলাকায় বসবাস করত। মন্ডি ও মল্ল জাতি কলিঙ্গের উত্তরে এবং গঙ্গারিডাই জাতি গঙ্গার নিম্ন অববাহিকায় বাস করত। প্লিনি কেন্দ্রীয় কলিঙ্গকে তাম্রলিপ্তের দক্ষিণ অংশের উৎকলে বলে বর্ণনা করেছেন। প্রাচীনকালে সরস্বতী উপনদীটি দক্ষিণ তাম্রলিপ্ত থেকে মেদিনীপুরের পিংলা, খড়গপুর, নারায়ণগড় এবং আরো কিছু অঞ্চল পর্যন্ত চলে গেছে এবং বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে মিলিত হয়ে আদিগঙ্গা থেকে জলপথে শ্রীচৈতন্য নারায়ণগড়ে পৌঁছেছিল।

পেরিপ্লাসের মতে, গঙ্গানগর ছিল গঙ্গারিডাইয়ের রাজধানী। গঙ্গানগরের অস্তিত্ব অস্বীকার করা যায় না। গঙ্গানগরের সঙ্গে বাকি অঞ্চলগুলোকে মিলিয়ে ফেলা যাবে না। প্লিনি, টলেমি ও মেগাস্থিনিসের মতে, কলিঙ্গ, অন্ধ্র, তাম্রলিপ্ত ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চল। তাম্রলিপ্ত বা মল্লকে কখনো কখনো প্রাসী বা গঙ্গারিডাই নামে বিদেশী শাসকরা অন্তর্ভুক্ত করলেও কোনো বিদেশী শাসক কিন্তু কখনো গঙ্গারিডাই দখল করতে সাহস করতে পারেননি। টলেমির মতে, গঙ্গা অববাহিকার শেষ পূর্ব মোহনা পদ্মা, বুড়িগঙ্গা-মেঘনা মিলিত প্রবাহ ছিল গঙ্গারিডাইয়ের পূর্ব সীমান্ত। প্রতিটি বিদেশী লেখকের বর্ণনায় গঙ্গারিডাইকে গঙ্গা অববাহিকার শেষ অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র অনুসারে শতানন্দ ছিলেন বঙ্গের রাজা। প্রাচীন পুণ্ড্র ও বঙ্গ বাদে দক্ষিণ পুণ্ড্রবর্ধন, চন্দ্রদ্বীপকে গঙ্গারিডাই বলা হয়। মেঘনা নদীর উত্তর দিকে ছিল পুণ্ড্রনগর। তাই বলা যায় হাওড়া, উত্তর-মেদিনীপুর, দক্ষিণ নদীয়া, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর ও বাকেরগঞ্জ জেলা মিলে গঙ্গারিডাই রাজ্য গঠিত। টলেমির বর্ণনা অনুসরণ করলেও এমনটা পাওয়া যায়। সুতরাং গঙ্গারিডাই ও বঙ্গোপসাগর পূর্ব সীমান্তেই মিলিত হয়েছে। তাই নিম্ন গঙ্গা অববাহিকা ছিল গঙ্গারিডাই জাতির দেশ—এমনটা মত কোনো কোনো গবেষকের। গঙ্গারিডাই সভ্যতা ধ্বংসের অনেক পরে সুন্দরবন বদ্বীপের সৃষ্টি হয়েছে। সুন্দরবন অঞ্চল তথা সাগরদ্বীপ গঙ্গারিডির কেন্দ্র ছিল কিনা তা এখনো নিশ্চিত করে বলার সময় আসেনি। বরং এ মত এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। তবে ভবিষ্যৎ গবেষণায় এ বিষয়ে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।

ফারিহা আজমিন: লেখক