সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন: অ্যালভিন টফলার। অনুবাদ: শওকত হোসেন

[ভ্লাদিমির নবোকভের জন্ম রাশিয়ায় সেন্ট পিটার্সবার্গে, ২২ এপ্রিল ১৮৯৯ সালে—মৃত্যু ২ জুলাই ১৯৭৭, তিনি ছিলেন একাধারে ঔপন্যাসিক, কবি, অনুবাদক ও পতঙ্গবিজ্ঞানী। তিনি প্রথম নয়টি উপন্যাস লিখেছিলেন রুশ ভাষায়, পরে আমেরিকায় বসে তিনি ইংরেজিতে সাহিত্য করেন। ইংরেজিতে লিখে তিনি দ্রুত আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি পান। নবোকভের লোলিতা (১৯৫৫) মডার্ন লাইব্রেরির ২০০৭ সালে তৈরি করা সেরা ১০০টি  উপন্যাসের তালিকায় চতুর্থ স্থানে রয়েছে, তার পেইল ফায়ার আছে ৫৩তম স্থানে। আর তার স্মৃতিকথা স্পিক, মেমোরি র্যানডম হাউজের বিশ শতকের শ্রেষ্ঠ নন-ফিকশন তালিকায় অষ্টম স্থানে আছে।  নবোকভ ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড ফর ফিকশন পুরস্কারে সাতবার ফাইনালিস্ট ছিলেন।]

প্রশ্ন: ১৯৫৮ সালে লোলিতার আমেরিকান প্রকাশনার ভেতর দিয়ে বলতে গেলে সাহিত্যামোদীদের ভেতর ৩০ বছরেরও বেশি সময় ভোগ করে আসা খ্যাতির চূড়া থেকে রাতারাতি একটি মাত্র আলোড়ন তোলা বইয়ের লেখক হিসেবে আপনার নাম এবং নিন্দা যুগপৎ বিস্তৃত হয়েছে। এ বিতর্কিত চাঞ্চল্যকর ঘটনার পর আপনি কি কখনো লোলিতা লেখার কারণে দুঃখ বোধ করেছেন?

নবোকভ: উল্টো। পেছনে তাকিয়ে এখন যখন ১৯৫০ এবং ফের ১৯৫১ সালে হাম্বার্ট হাম্বার্টের ছোট কালো ডায়েরিটা পুড়িয়ে ফেলার অবস্থায় পৌঁছে যাওয়ার কথা ভাবি, আমি শিউরে উঠি। না, আমি কখনই লোলিতা লিখেছি বলে দুঃখ করব না। সে (লোলিতা) একটা চমৎকার ধাঁধা রচনার মতো—আপনার দেখার ভঙ্গির ওপর নির্ভর করে যুগপৎ রচনা ও সমাধান, যেহেতু একটি আরেকটির প্রতিবিম্ব। অবশ্যই সে আমার অন্য সব রচনাকে গ্রাস করে নিয়েছে, অন্তত যেগুলো আমি ইংরেজিতে লিখেছিলাম: দ্য রিয়েল লাইফ অব সেবাস্তিয়ান নাইট, বেন্ড সিনিস্টার, আমার ছোটগল্পগুলো, আমার স্মৃতিকথা; তবে ওর প্রতি বিদ্বেষ বোধ করতে পারব না আমি। ওই কাল্পনিক যৌনাবেদনময়ীর এক ধরনের অদ্ভুত মৃদু আকর্ষণ রয়ে গেছে।

প্রশ্ন: বহু পাঠক ও সমালোচক ওর আকর্ষণকে মৃদু হিসেবে মানতে অমত করলেও অল্পজনই ওর অদ্ভুত হওয়ার কথা অস্বীকার করবেন, বিশেষ করে পরিচালক স্ট্যানলি কুবরিক লোলিতা নিয়ে চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনার প্রস্তাব রাখার পর আপনাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে: ‘অবশ্যই ওদের প্লট পাল্টে ফেলতে হবে। হয়তো লোলিতাকে বামনে পরিণত করবে ওরা। কিংবা ওকে ১৬ আর হাম্বার্টকে ২৬ বছর বয়সী বানাবে।’ যদিও শেষমেশ আপনি নিজেই চিত্রনাট্য লিখেছিলেন, বেশ কয়েকজন সমালোচক ছবিটিকে মূল সম্পর্ক হালকা করার দায়ে দুষেছেন। চূড়ান্ত ফল নিয়ে কি আপনি সন্তুষ্ট ছিলেন?

নবোকভ: ছবিটাকে আমার কাছে পুরোপুরি প্রথম শ্রেণীর বলেই মনে হয়েছে। প্রধান চারজন কুশীলব সর্বোচ্চ প্রশংসার দাবি রাখেন। নাশতার ট্রে নিয়ে আসা অথবা ছেলেমানুষি ঢঙে গাড়ির ভেতর স্যুয়েটার ধরে টানতে থাকা স্যু লিয়ন—এগুলো অবিস্মরণীয় অভিনয় এবং পরিচালনার মুহূর্ত। কুইলটির হত্যাকাণ্ড একটা মাস্টারপিস, আবার মিসেস হেযের মৃত্যুও। যদিও আমার অবশ্যই স্পষ্ট করা উচিত যে আসল প্রডাকশনের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্কই ছিল না। থাকলে আমি হয়তো এমন কিছু বিষয়ের ওপর জোর দেয়ার দাবি করতাম, যা দেয়া হয়নি; যেমন ওদের অবস্থানের বিভিন্ন মোটেল। আমি স্রেফ চিত্রনাট্য লিখেছি, তার একটা বিরাট অংশ কুবরিক কাজে লাগিয়েছেন।

প্রশ্ন: লোলিতার দ্বিমুখী সাফল্য ভালো না মন্দভাবে আপনার জীবনকে প্রভাবিত করেছে বলে মনে করেন?

নবোকভ: শিক্ষকতা বাদ দিয়েছি আমি—পরিবর্তন বলতে এইটুকই। মনে রাখবেন, আমি শিক্ষকতা ভালোবাসতাম। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় আমার পছন্দের ছিল। রাশিয়ান লেখক ও ইউরোপীয় মহান বইয়ের ওপর লেকচার তৈরি ও দিতে পছন্দ করতাম। কিন্তু ষাটের কাছাকাছি বয়সে, বিশেষত শীতকালে শিক্ষকতার দৈহিক প্রক্রিয়া কঠিন ঠেকতে শুরু করে। হররোজ একটা নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে ওঠা, ড্রাইভওয়ের তুষারের সঙ্গে লড়াই, দীর্ঘ করিডোর ধরে ক্লাসরুমের উদ্দেশে জোর কদমে এগোনো, ব্ল্যাকবোর্ডে জেমস জয়েসের আমলের ডাবলিনের ম্যাপ আঁকা কিংবা ১৮৭০-এর দশকের গোড়ার দিকে পিটার্সবার্গ-মস্কো এক্সপ্রেসের সেমি-স্লিপিং কার জোগাড় করা—যেটা বাদে ইউলিস কি আনা কারেনিনা কোনোটাই কোনো অর্থ বহন করে না। যেকোনো কারণেই হোক আমার উজ্জ্বল স্মৃতিগুলো পরীক্ষাসংক্রান্ত। গোল্ডউইন স্মিথের বিশাল অ্যাম্ফিথিয়েটার। সকাল ৮টা থেকে সকাল সাড়ে ১০টা অবধি পরীক্ষা। প্রায় ১৫০ জন ছাত্র—গোসলবিহীন, দাড়ি-গোঁফ না কামানো তরুণ এবং কিছুটা গোছানো তরুণী। একঘেয়েমি এবং বিপর্যয়ের সাধারণ একটা বোধ। সাড়ে ৮টা। একটু কাশি, ভীরু গলা খাঁখারির শব্দ, শব্দের জটলায় ভেতরে ঢোকা, কাগজের খসখসানি। কোনো কোনো শহীদ মাথার পেছনে হাত রেখে ধ্যানে মগ্ন হয়ে যেত। নিষিদ্ধ জ্ঞানের উৎস হিসাব, আশা ও ঘৃণা নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকা ভোঁতা দৃষ্টির মোকাবেলা করেছি। চশমা চোখে মেয়েরা আমার ডেস্কের কাছে এগিয়ে এসে জানতে চাইত, ‘প্রফেসর কাফকা, আপনি কি আমাদের একথা বলতে চাইছেন যে...? কিংবা আপনি কি চান আমরা কেবল প্রশ্নের প্রথম অংশের উত্তর দিই?’ সি-মাইনাসের বিরাট সংঘ, জাতির মেরুদণ্ড অবিচল লিখে যাচ্ছে। যুগপত্ভাবে গেঁয়ো কেউ উঠে দাঁড়াচ্ছে, বেশির ভাগই ব্লুবুকের পাতা ওল্টাচ্ছে, চমৎকার টিমওয়ার্ক। ঝিম ধরে যাওয়া কব্জির মোচড়, কালি উল্টে পড়া, ভেঙে পড়া ডিওডোরেন্ট। আমার দিকে স্থির হয়ে থাকা কারো চোখ ধরা পড়লে নিমেষে গভীর ধ্যানে সেগুলো ছাদের দিকে স্থির হয়ে যায়। ঘোলাটে জানালার কাচ। দ্রুত চুইংগাম চিবোচ্ছে মেয়েরা। ১০ মিনিট, ৫, ৩, সময় শেষ।

প্রশ্ন: লোলিতায় আপনার এইমাত্র বর্ণনা দেয়া দৃশ্যের প্রসঙ্গেই বহু সমালোচক বইটিকে আমেরিকার প্রহসনমূলক সামাজিক ভাষ্য বলে উল্লেখ করেছেন। তাদের এ ধারণা কি ঠিক?

নবোকভ: বেশ, আমি স্রেফ আবার বলতে পারি আমার নৈতিক কি সামাজিক প্রহসন রচয়িতা হওয়ার বিলকুল ইচ্ছা নেই। সমালোচকরা লোলিতায় আমি মানবীয় মূর্খতাকে উপহাস করেছি মনে করুন বা না-করুন, আমি নেহাতই নির্লিপ্ত। তবে আমি আমেরিকাকে উপহাস করছি বলে মহান সুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ায় বিরক্তই হয়েছি।

প্রশ্ন: কিন্তু আপনি কি নিজেই লেখেননি যে ‘আমেরিকান অবুদ্ধিজীবীসুলভ অশ্লীলতার চেয়ে বেশি উল্লাসকর আর কিছু নেই?’

নবোকভ: নাহ, আমি এ কথা বলিনি। ওই বুলিটা প্রেক্ষাপট থেকে আলগা করে নেয়া এবং গভীর সাগরের গোলগাল মাছের মতো এ প্রক্রিয়ায় বিস্ফোরিত হয়েছে। আপনি উপন্যাসের শেষে জুড়ে দেয়া ‘অন আ বুক এনটাইটেল্ড লোলিতা’ নামে আমার খুদে উপসংহারটি পড়লে দেখবেন অবুদ্ধিজীবীসুলভ অশ্লীলতা সম্পর্কে আমি আসলে যা বলেছি—যাকে সবচেয়ে উল্লাসকর মনে করি—আমেরিকান ও ইউরোপীয় আচরণের ভেতর কোনো তফাত নেই। আমি আরো বলেছি যে শিকাগো থেকে হাজির হওয়া প্রলেতারিয়ান যেকোনো ইংরেজ ডিউকের মতোই অবুদ্ধিজীবীসুলভ হতে পারে।

প্রশ্ন: বহু পাঠক সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে আমেরিকার যৌন রীতিনীতিকেই আসলে আপনি সবচেয়ে উল্লাসজনক অবুদ্ধিজীবীসুলভ আবিষ্কার করেছেন বলে মনে হয়।

নবোকভ: প্রতিষ্ঠান হিসেবে, সাধারণ ধারণা হিসেবে, সমস্যা হিসেবে, বুলি হিসেবে যৌনতাকে শব্দের পক্ষে বড় বেশি ক্লান্তিকর আবিষ্কার করি আমি। যৌনতার কথা বাদ দেয়া যাক।

প্রশ্ন: প্রসঙ্গ নিয়ে বিশদ আলোচনা না করার জন্যই কোনো কোনো সমালোচক মনে করেন আমেরিকান অ্যানালিস্টদের প্রয়োগ করা ফ্রয়েডিয়ানিজমের চল নিয়ে আপনার কটু মন্তব্য পরিচয়ভিত্তিক অসন্তোষের কথাই বোঝায়।

নবোকভ: স্রেফ কেতাবি পরিচয়। খোদ ঝামেলাটা কৌতুক মনে করার পক্ষে বড় বেশি হাস্যকর এবং বিরক্তিকর। ফ্রয়েডিজনম এবং এর উদ্ভট প্রভাব এবং কৌশলে কলংকিত সবকিছু আমার কাছে লোকের নিজেদের এবং অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেয়া জঘন্যতম প্রতারণা বলে মনে হয়েছে। আমি এখনো অজ্ঞ, প্রথাবাদী বা খুবই অসুস্থদের ভীষণ পছন্দের আরো কিছু মধ্যযুগীয় ব্যাপারের সঙ্গে একেও সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করি।

প্রশ্ন: খুবই অসুস্থদের প্রসঙ্গে লোলিতায় আপনি যৌনাবেদনময়ীদের জন্য হাম্বার্টের ক্ষুধা ছেলেবেলার অপূর্ণ ভালোবাসার পরিণাম বুঝিয়েছেন; ইনভাইটেশন টু আ বিহেডিংয়ে এমি নামে ১২ বছরের এক মেয়ের কথা লিখেছেন, যে কিনা ওর দ্বিগুণ বয়সী একজন পুরুষের প্রতি যৌনাত্মকভাবে আগ্রহী এবং বেন্ড সিনিস্টারে আপনার নায়ক ‘অজান্তেই একটা নাটকের মহড়ায় মেরিয়েট (তার মেইড) ওর কোলে বসার সময় কিঞ্চিৎ চোখমুখ কোঁচকানো উপভোগ করার’ স্বপ্ন দেখছে, ‘যার তার মেয়ের ভূমিকায় অভিনয় করার কথা।’ আপনার কিছু সমালোচক আপনার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে সূত্রের খোঁজে আপনার রচনায় নজর বোলাতে গিয়ে আপনার তরফে বয়ঃসন্ধিকালের কিশোরী এবং মাঝবয়সী পুরুষদের ভেতর যৌন আকর্ষণের এক ধরনের অসুস্থ বিকারের প্রমাণ হিসেবে বারবার দেখা যাওয়া এ ভাবনার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। এ অভিযোগের কোনো ধরনের সত্যতা আছে মনে করেন?

নবোকভ: আমার মনে হয়, একথা বলাই আরো বেশি ঠিক হতো যে আমি লোলিতা না লিখলে পাঠকরা আমার অন্যান্য লেখায় এবং আপন ঘরে যৌনাবেদনময়ী কিশোরীর খোঁজ করতে যেতেন না। কোনো বন্ধুসুলভ ভদ্রলোক আমাকে যখন জিজ্ঞেস করেন—সম্ভবত বন্ধু  ও ভদ্রতা দেখাতেই—তার ভাষার ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে ‘মিস্টার নবোরকভ’ বা ‘মিস্টার নাবাহকভ’ কিংবা ‘মিস্টর নাবরভ’ অথবা ‘মিস্টার নাবোহকভ,’ ‘আমার একটা ছোট মেয়ে আছে, একদম লোলিতার মতো,’ তখন বেশ আমোদ পাই। লোকে যেন আমার রচনায় ধারাবাহিক সত্তার বিবর্তনে আমার কল্পনা ও ক্ষমতাকে খাটো করে দেখতে চায়। ...ধরুন কেউ একজন হাম্বার্টের রিভিয়েরায় বালক বয়সের রোমান্সের সঙ্গে ছোট্ট কোলেত্তের স্মৃতিচারণে অর্থপূর্ণ সাযুজ্য খুঁজে পেল, আমার ১০ বছর বয়সে যার সঙ্গে বিয়ারিটযে বালুর দুর্গ বানিয়েছিলাম। গম্ভীর হাম্বার্ট অবশ্যই ১৩ বছর বয়সী এবং মোটামুটি বাড়াবাড়ি রকম যৌন উত্তেজনার ভেতর ছিল অথচ কোলেত্তের সঙ্গে আমার রোমান্সে কোনো যৌনাকাঙ্ক্ষা ছিল না, নেহাতই নিখাদ মামুলি ও স্বাভাবিক ব্যাপার। অবশ্যই ৯ বা ১০ বছর বয়সে ওই পটভূমিতে এবং ওই সময়ে আমরা জীবনের মিথ্যা বাস্তবতার কথা কিছুই জানতাম না, যেসব আজকাল প্রগতিশীল মা-বাবারা শিশুদের শিক্ষা দিয়েছেন।

প্রশ্ন: মিথ্যা কেন?&dquote;&dquote;

নবোকভ: কারণ একটা ছোট শিশুর কল্পনা—বিশেষত শহুরে শিশু—একটা মৌমাছি সম্পর্কে তাকে যেসব অদ্ভুত কথাবার্তা বলা হয়, তাকে নিমেষে বিকৃত, স্টাইলাইজ কিংবা অন্যভাবে বদলে ফেলে, যেখানে সে কি তার মা-বাবার কেউই একটা মৌমাছিকে মদ্দা মৌমাছি থেকে আলাদা করতে পারবে না।

প্রশ্ন: একজন সমালোচক যাকে আপনার ‘বাক্যবন্ধ, ছন্দ, মূর্ছনা এবং শব্দের দ্যোতনার প্রতি প্রায় বিকারগ্রস্ত মনোযোগ’ বলে আখ্যায়িত করছেন, সেটা এমনকি আপনার নিজস্ব বিখ্যাত মৌমাছি ও ছেলে মৌমাছির নাম নির্বাচনেও স্পষ্ট: লোলিতা ও হাম্বার্ট হাম্বার্ট। নামগুলো কীভাবে আপনার মাথায় এল?

নবোকভ: গীতিময়তা আছে এমন সংক্ষিপ্ত একটা নাম দরকার ছিল আমার। অন্যতম নির্মল ও আলোকিত হরফ হচ্ছে ‘এল’। প্রত্যয় ‘-ইতা’র প্রচুর লাতিন কমনীয়তা রয়েছে এবং এরও দরকার ছিল। তাই লোলিতা। অবশ্য আপানারা বেশির ভাগ আমেরিকান যেভাবে উচ্চারণ করে থাকেন, সেভাবে উচ্চারণ করা ঠিক না: লোও-লি-তা, ভারি, আঠালো ‘এল’ এবং একটা দীর্ঘ ‘ও’ দিয়ে। উঁহু, প্রথম অংশটুকু ‘লোলিপপে’র মতো হতে হবে, ‘এল’, তরল এবং সূক্ষ্ম, ‘লি’ খুব বেশি তীক্ষ নয়। স্প্যানিয়ার্ড এবং ইসরায়েলিরা অবশ্যই একদম ঠিকঠাক প্রয়োজনীয় বুদ্ধি ও যত্নের সঙ্গে উচ্চারণ করে থাকে। আরেকটা বিবেচনা ছিল এর উৎস নামের সমাদৃত গুঞ্জন, ঝরনার নাম: ‘ডলোরেসে’র গোলাপ এবং অশ্রু। আমার ছোট মেয়েটির হূদয়বিদারক ভাগ্যকে সৌন্দর্য এবং নির্মলতার সঙ্গে মিলিয়ে বিবেচনায় নেয়া দরকার ছিল। ডলোরেস ওকে আরো সরল, অনেক বেশি পরিচিত এবং শিশুসুলভ সংক্ষিপ্ত নাম জুগিয়েছে: ডলি, যেটা পদবি ‘হেয’-এর সঙ্গে চমৎকার মিলে যায়, যেখানে আইরিশ কুয়াশা একটা জার্মান বানির—মানে একটা ছোট জার্মান খরগোশ—সঙ্গে মেলে।

প্রশ্ন: আরেক সমালোচক আপনার সম্পর্কে লিখেছেন, ‘ওই বহুভাষিক স্মৃতি থেকে নেড়েচেড়ে শব্দের সঠিক পরম্পরা নির্বাচন এবং সেগুলোর বহুল দ্যোতনার উপযুক্ত অদলবদল দৈহিকভাবেই ক্লান্তিকর কাজ হতে বাধ্য।’ এই অর্থে আপনার সব বইয়ের ভেতর কোনটা লেখা সবচেয়ে কষ্টকর ছিল?’

নবোকভ: ওহ, স্বভাবতই লোলিতা। প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাব ছিল আমার—সেটা ছিল প্রাথমিক সমস্যা। আমি কোনো ১২ বছর বয়সী আমেরিকান মেয়েকে চিনতাম না আর আমেরিকাও চিনতাম না; আমেরিকা ও লোলিতাকে উদ্ভাবন করতে হয়েছে। রাশিয়া ও পশ্চিম ইউরোপ আবিষ্কারে আমার প্রায় ৪০ বছর লেগেছিল এবং এখন হাতে অপেক্ষাকৃত কম সময় নিয়ে একই ধরনের কাজের মুখোমুখি হয়েছিলাম। ৫০ বছর বয়সে আমাকে ব্যক্তিক কল্পনায় গড়পড়তা ‘বাস্তবতা’ যোগ করার সুযোগ দেবে এমন স্থানীয় উপকরণ জোগাড় আমার তারুণ্যের ইউরোপের চেয়ে ঢের বেশি কঠিন প্রক্রিয়া ছিল।&dquote;&dquote;

প্রশ্ন: রাশিয়ায় জন্ম নিলেও আপনি বহু বছর আমেরিকা ও ইউরোপেই বাস করেছেন। আপনি কি জাতীয় পরিচয়ের কোনো জোরালো অনুভূতি বোধ করেন?

নবোকভ: আমি রাশিয়ায় জন্ম নেয়া আমেরিকান লেখক। ইংল্যান্ডে ফরাসি সাহিত্যের ওপর পড়াশোনা করে তারপর ১৫ বছর কাটিয়েছি জার্মানিতে। আমি আমেরিকায় এসেছি ১৯৪০ সালে এবং আমেরিকার নাগরিক হয়ে আমেরিকাকেই আমার দেশ করে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। এমন হলো যে আমি অচিরেই আমেরিকার সর্বসেরা, এর সমৃদ্ধ বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন এবং এর অনায়াস, চমৎকার পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। নিজেকে আমি এর মহান লাইব্রেরি আর গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে মগ্ন করেছি। ইউরোপে আমার যত বন্ধু ছিল, তার চেয়ে বেশি বন্ধু পেয়েছি। আমার বইগুলো—পুরনো এবং নতুন—কিছু সমীহযোগ্য পাঠক পেয়েছে। আমি কর্তেযের মতো স্থ্থূলকায় হয়ে গেছি, তার মূল কারণ আমি ধূমপান ছেড়ে এর বদলে বেশি বেশি মোলাসেস ক্যান্ডি খেতে শুরু করেছিলাম। তাতে ফল দাঁড়িয়েছে, আমার ওজন স্বাভাবিক ১৪০ থেকে বিশাল এবং প্রীতিকর ২০০-তে ঠেকেছে। পরিণামে আমি এক-তৃতীয়াংশ আমেরিকান—চমৎকার আমেরিকান মাংস আমাকে উষ্ণ ও নিরাপদ রাখছে।

প্রশ্ন: আমেরিকায় আপনি ২০ বছর কাটিয়েছেন কিন্তু কখনই বাড়ির মালিক হননি বা ওখানে আপনার কোনো স্থায়ী আবাস ছিল না। আপনার বন্ধুরা বলেন যে আপনি বিভিন্ন মোটেল, কেবিন, ফার্নিশড অ্যাপার্টমেন্ট এবং অবকাশে থাকা প্রফেসরদের ভাড়া করা বাড়িতে অস্থায়ীভাবে থেকেছেন। আপনি কি নিজেকে এতটাই অস্থির কিংবা ভিনদেশী ভাবেন যে কোথাও থিতু হওয়ার ধারণা আপানাকে বিরক্ত করে?

নবোকভ: মূল কারণ, পেছনের কারণ, আমার মনে হয়, আমার ছেলেবেলার পরিবেশের অনুকৃতি ছাড়া অন্য কিছুই আমাকে সন্তুষ্ট করতে পারবে না, আমি কখনই আমার স্মৃতিগুলোকে ঠিকমতো সামাল দিতে পারব না—তো কেন অযথা কাছাকাছি পৌঁছানোর ঝামেলায় যাওয়া? তারপর কিছু বিশেষ বিষয়ও আছে, যেমন উদ্দীপনার প্রশ্ন রয়েছে, প্রেরণার স্বভাব। রাশিয়া থেকে নিজেকে আমি এত প্রবলভাবে, এমন অত্যুগ্র শক্তিতে বের করে এনেছি, তখন থেকেই চলার ওপর আছি। সত্যি, তৃপ্তিকর বিষয় ‘পূর্ণাঙ্গ প্রফেসর’ হতে বেঁচে ছিলাম আমি কিন্তু অন্তরে বরাবর একজন ছিপছিপে ‘অতিথি লেকচারারই’ রয়ে গেছি। অল্প কয়েকবার নিজেকে বলেছি: ‘এটা কিন্তু স্থায়ী বাসার জন্য চমৎকার জায়গা,’ পরক্ষণেই মনের ভেতর এক তুষার ধসের প্রচণ্ড আওয়াজ শুনতে পাই, স্রেফ পৃথিবীর বুকে একটা বিশেষ কোণে বসতি করে আমি হয়তো ধ্বংস করে ফেলব দূরের এমন আরো শত শত জায়গা ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এবং শেষে আসবাবপত্র, টেবিল চেয়ার, ল্যাম্প, গালিচা এবং এ-জাতীয় জিনিসের খুব একটা পরোয়া করি না—এর কারণ সম্ভবত আমার সচ্ছল ছেলেবেলায় আমাকে যেকোনো বস্তুগত সম্পদের সঙ্গে অতিরিক্ত আসক্তিকে আমোদিত বিতৃষ্ণার সঙ্গে দেখতে শেখানো হয়েছিল, যে কারণে বিপ্লব ওই সম্পদ ধ্বংস করলেও আমার কোনো দুঃখ হয়নি।

প্রশ্ন: আপনি ২০ বছর রাশিয়ায় ছিলেন, ২০ বছরের মতো পশ্চিম ইউরোপে এবং আমেরিকায় ২০ বছর। কিন্তু ১৯৬০ সালে লোলিতার সাফল্যের পর ফ্রান্স ও সুইজারল্যান্ডে চলে যান, তারপর আর আমেরিকায় ফেরেননি। এর মানে কি আমেরিকান লেখক হিসেবে আপনার আত্মস্বীকৃতি সত্ত্বেও নিজের আমেরিকান পর্ব শেষ হয়ে গেছে মনে করেন?

নবোকভ: নেহাত ব্যক্তিগত কারণে সুইজারল্যান্ডে আছি আমি—পারিবারিক কারণ এবং বিশেষ কিছু পেশাগত কারণও, যেমন একটা বিশেষ বইয়ের জন্য গবেষণা। শিগগিরই আমেরিকায়—এর লাইব্রেরির স্তূপ আর পাহাড়ি পথে—ফেরার আশা রাখি। আদর্শ ব্যবস্থা হবে নিউইয়র্কে কোনো টপ ফ্লোরে একেবারে সাউন্ডপ্রুফ ফ্ল্যাট—মাথার ওপর কেউ হেঁটে বেড়াচ্ছে না, আশপাশে মৃদু গান হচ্ছে না; আর দক্ষিণ-পশ্চিমে একটা বাংলো। আমার মনে হয়, কোনো একটা বিশ্ববিদ্যালয়কে অলংকৃত করা মজাদারই হবে, ওখানে থেকে লেখালেখি করা, পড়ানো নয়, অন্তত নিয়মিতভাবে পড়ানো নয়।

প্রশ্ন: এদিকে আপনার হোটেল সুইটে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছেন, সব ধরনের খবর থেকে কিছুটা স্থবির। কীভাবে আপনার সময় কাটে?

নবোকভ: শীতকালে সকাল ৭টার দিকে ঘুম থেকে উঠি আমি: একটা আলপাইন কাক হচ্ছে আমার অ্যালার্ম—লম্বা হলদে ঠোঁটঅলা বিরাট, চকচকে, কালো একটা জিনিস—বেলকনিতে এসে সবচেয়ে সুরেলা হাসি দেয়। কিছুটা সময় বিছানায় পড়ে থেকে মনে মনে সবকিছু উল্টেপাল্টে দেখে পরিকল্পনা করি। আটটা নাগাদ শেভ, নাশতা, ধ্যান আর গোসল—এ ধারাক্রমেই। এরপর স্টাডিতে লাঞ্চ পর্যন্ত কাজ করি, সংক্ষিপ্ত সময় বের করে আমার স্ত্রীকে নিয়ে লেকের তীরে যাই। বস্তুত উনিশ শতকের সব বিখ্যাত রাশিয়ান লেখকই কোনো এক সময় এখানে সময় কাটিয়েছেন। ঝুকোভস্কি, গোগোল, দস্তয়েভস্কি, তলস্তয়—হোটেলের চেম্বারমেইডদের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর ভাবতেন তিনি—এবং বহু রাশিয়ান কবি। তবে নিস এবং রোম সম্পর্কেও একই কথা বলা যেতে পারে। ১টার দিকে লাঞ্চ করি আমরা এবং দেড়টা নাগাদ আবার ডেস্কে ফিরে একটানা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত কাজ করি। তারপর ইংরেজি পত্রিকার জন্য হাঁটতে হাঁটতে পত্রিকা স্ট্যান্ডে যাওয়া; ৭টায় ডিনার। ডিনারের পর আর কোনো কাজ নয়। ৯টার দিকে বিছানায়। সাড়ে ১১টা পর্যন্ত পড়ি, তারপর থেকে রাত ১টা পর্যন্ত ইনসমনিয়ার সঙ্গে যুঝি।

প্রশ্ন: এটা কি সত্যি যে আপনি টাইপরাইটারের বদলে দাঁড়িয়ে বড় হাতের হরফে লেখেন?

নবোকভ: হ্যাঁ, আমি কখনো টাইপ করা শিখিনি। সাধারণত আমার স্টাডির একটা পুরনো আমলের লেকটার্নে দাঁড়িয়ে দিন শুরু করি। পরে যখন টের পাই যে মাধ্যাকর্ষণ আমার থোড়মাংসে কামড় বসাচ্ছে, একটা মামুলি রাইটিং ডেস্কে আরামদায়ক আর্মচেয়ারে বসে পড়ি। সব শেষে মাধ্যাকর্ষণ মেরুদণ্ড বেয়ে উঠতে শুরু করলে আমার ছোট স্টাডির কোণে একটা কাউচে শুয়ে পড়ি। এটা একটা প্রীতিকর দৈনিক রুটিন। কিন্তু যখন তরুণ ছিলাম, আমার ২০ আর ৩০-এর কোটার গোড়ার দিকে, প্রায়ই সারা দিন দাঁড়িয়ে থাকতাম, সিগারেট খেতাম আর লিখতাম। এখন অবস্থা পাল্টে গেছে।

প্রশ্ন: আপনি আমাদের কোনো বইয়ের অঙ্কুরোদ্গমের আসল সৃজনশীল প্রক্রিয়া সম্পর্কে আরো কিছু বলতে পারেন—চলমান কোনো কাজ থেকে বিশেষ অংশ কিংবা কিছু দৈবচয়িত নোট পড়ে?

নবোকভ: অবশ্যই না। কোনো ভ্রূণেরই পরীক্ষামূলক অপারেশনের ভেতর দিয়ে যাওয়া উচিত নয়। তবে ভিন্ন কিছু করতে পারি। এ বাক্সে পেইল ফায়ার লেখার সময় বাতিল করা মোটামুটি সাম্প্রতিক বিভিন্ন সময়ে আমার নেয়া নোট আছে। এটা প্রত্যাখ্যানের একটা ছোট ব্যাচ। অল্প কয়েকটা পড়ছি [কার্ড থেকে পড়ছেন]:

...‘আমরা শব্দ দিয়ে নয়, বরং শব্দের ছায়া ভাবি। জেমস জয়েসের এমনিতে অসাধারণ মানসিক স্বগতোক্তির ভুল হচ্ছে, তিনি শব্দকে বড় বেশি মৌখিক বস্তু দিয়েছেন’...‘সৌজন্যের প্যারোডি: অতুলনীয় ‘প্লিজ’—দয়া করে তোমার সুন্দর—‘যেসব প্রতিষ্ঠান নিজেদের উদ্দেশ করে লোকদের পণ্যের ফরমাশ দিতে বোকার মতো ফর্ম ছাপায়।’

‘একটা কুয়াশায় ঢাকা বিরান রেলওয়ে স্টেশন প্লাটফর্মে গভীর রাতে হতশ্রী চেহারার ক্রেটে আনাড়ি, বিরতিহীন, পিপ-পিপ আওয়াজ’...‘ট্যাবলয়েডের শিরোনাম, ‘নরসো কিলার মে বিট চেয়ার’ যার তর্জমা করা যেতে পারে: ‘সেলুই কুই আন বাস্তে পিউত বিয়েন বাত্তয়ে উনে চেইজে’...পত্রিকার হকার, আমার খবরসহ কাগজ তুলে দিচ্ছে আমার হাতে: ‘দেখতে পাচ্ছি আপনি গুছিয়ে ফেলেছেন।’

‘তুষার পড়ছে, তরুণ বাবা ছোট্ট শিশুকে নিয়ে বেরিয়েছে, ওর নাকটা গোলাপি চেরির মতো। মা-বাবা কেন ওদের সন্তানের উদ্দেশে হাসলেই তাকে একটা কিছু বলে? ‘নিশ্চয়ই,’ আমি পাশ কাটানোর সময় না হাসলে বেশ কিছুক্ষণ ধরে চলা ওই হাসি নিঃশব্দে ঝরে চলা তুষারে ঝরে পড়তে দেয়া হতো, শিশুটির প্রশ্নবোধক হাসির উত্তরে বলল বাবা,’...।

প্রশ্ন: কোন জিনিসটা এ ধরনের অসংলগ্ন অনভূতি এবং উদ্ধৃতি ধরে রাখতে ও সংগ্রহে অনুপ্রাণিত করেছে?

নবোকভ: ইনডেক্স কার্ডে গল্প-উপন্যাস লিখতে পছন্দ করি, গোটা সেট সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর নম্বর বসাই। প্রত্যেকটা কার্ড বহুবার লেখা হয়েছে। মোটামুটি তিনটা কার্ড একটা টাইপ করা কাগজের সমান হয়, শেষে যখন মনে হয় আমার ভাবনার ছবিটা বাস্তবিক যতদূর সম্ভব বিশ্বস্ততার সঙ্গে কপি করা হয়েছে—হায়, সামান্য কিছু ফাঁকা জায়গা সবসময়ই থেকে যায়—তখন আমার স্ত্রীকে দিয়ে শ্রুতিলিখন করাই, সে তিন কপি করে টাইপ করে সেটা।

প্রশ্ন: কী অর্থে আপনি উপন্যাসের ‘ভাবনার ছবি’ কপি করেন?

নবোকভ: একজন সৃজনশীল লেখককে অবশ্যই সর্বশক্তিমানসহ তার প্রতিদ্বন্দ্বী লেখকদের লেখা সযত্নে পাঠ করতে হবে। তার অবশ্যই অস্তিত্ববান বিশ্বে কেবল নববিন্যাসই নয়, বরং নবসৃষ্টির জন্মগত ক্ষমতা থাকতে হবে। শ্রমের দ্বৈততা এড়িয়ে এটা পর্যাপ্তভাবে করতে শিল্পীর বাস্তব বিশ্বকে জানতে হবে। জ্ঞানহীন কল্পনা আদিম শিল্পকলার পেছনের উঠোন, দেয়ালের গায়ে বাচ্চা ছেলের আঁকিবুঁকি এবং বাজার এলাকার উন্মাদের বুলির চেয়ে বেশি দূর নিয়ে যাবে না। শিল্পকর্ম কখনই সহজ ছিল না। আমার লেকচারের দিনগুলোয় ফিরে যাই: কোনো ছাত্র ‘আন্তরিক ও সহজ’-এর মতো ভয়ংকর বাক্যবন্ধ ব্যবহার করলেই তাকে কম নম্বর দিতাম—‘গুস্তাভ ফ্লবেয়ার এমন একটা কৌশলে লিখতেন, যেটা সবসময়ই ছিল আন্তরিক ও সহজ’—এমনটা ভাবা হতো যে এটাই গদ্য ও পদ্যের জন্য সর্বসেরা প্রশংসা। বাক্যবন্ধটা আমি কেটে দেয়ার সময়—কাজটা এত ক্রোধের সঙ্গে করতাম যে কাগজ ছিঁড়ে যেত—শিক্ষক এটাই সবসময় তাকে শিখিয়েছে বলে অভিযোগ করত ছাত্র: ‘শিল্পকলা সহজ, শিল্পকলা আন্তরিক।’ কোনো একদিন আমি অবশ্যই এ অশ্লীল অসম্ভাব্যতার গোড়া খুঁজে বের করব।

প্রশ্ন: আধুনিক শিল্পকলার নিরিখে সমসাময়িক বিমূর্ত পেইন্টিংয়ের আন্তরিকতা বা প্রতারণাময়তা, সারল্য বা জটিলতার ব্যাপারে সমালোচনামূলক মতামত বিভাজিত। আপনার মত কী?

 নবোকভ: আমি বিমূর্ত ও আদিম শিল্পকর্মের ভেতর আবশ্যিক কোনো পার্থক্য দেখি না। দুটোই সহজ এবং আন্তরিক। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের এসব বিষয়ের সরলীকরণ করা ঠিক হবে না। তবে আমরা একটা মুহূর্তের জন্য ‘আধুনিক শিল্পকর্মে’র প্রচলিত ধারণাকে মেনে নিলে আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে অতি মামুলিত্ব, অনুকরণীয় এবং একাডেমিক হওয়াই এর সমস্যা। অস্পষ্টতা এবং ছোট স্রেফ ১০০ বছর আগের গণসৌন্দর্য, ইতালীয় মেয়েদের ছবি, সুদর্শন ভিখিরি, রোমান্টিক ধ্বংসস্তূপ এসবকে প্রতিস্থাপিত করেছে। কিন্তু স্রেফ ওইসব গতানুগতিক তেলচিত্রের ভেতরই আরো সমৃদ্ধ আলো-ছায়ার খেলা নিয়ে সহিংসতা বা কোমলতার ছোঁয়াসহ একজন সত্যিকারের শিল্পীর কাজ থেকে যেতে পারে যেমন, তেমনি আদিম ও বিমূর্ত শিল্পের ভেতরও বিরাট প্রতিভার মুখোমুখি হতে পারে কেউ। পেইন্টিং এবং বইয়ে কেবল প্রতিভাই আমার আগ্রহ সৃষ্টি করে। মামুলি ধারণা নয়, বরং ব্যক্তিগত অবদান।

প্রশ্ন: সমাজের প্রতি অবদান?

নবোকভ: কোনো শিল্পকর্মেরই সমাজের পক্ষে কোনো গুরুত্ব নেই। এটা কেবল ব্যক্তির কাছেই গুরুত্বপূর্ণ এবং কেবল ব্যক্তি পাঠকই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমি গোষ্ঠী, সম্প্রদায়, জনতা ইত্যাদির পরোয়া করি না। আমি ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ স্লোগানের তোয়াক্কা না করলেও।

প্রশ্ন: আপনি আপনার রচনা ‘উইপোকা আর মরচে থেকে নিরাপদ’ থাকার আশা করেন?’

নবোকভ: বেশ, এ সাফল্যের ব্যাপারে অবশ্যই আমার ৩৫ বছর মেয়াদি কোনো কর্মসূচি নেই। তবে আমার সাহিত্যিক পরকাল সম্পর্কে মোটামুটি ভালো ধারণা আছে। আমি বিশেষ প্রতিশ্রুতির আভাস পেয়েছি। সন্দেহ নেই উত্থান-পতন, মন্দার দীর্ঘ কাল থাকবে। শয়তানের সঙ্গে যোগসাজশে আমি ২০৬৩ সালের একটা খবরের কাগজের পাতা উল্টে ‘বইয়ের পাতা’র কোনো একটা লেখায় দেখতে পাই: ‘আজকের দিনে কেউ নবোকভ বা ফালমারফোর্ড পড়েন না।’ মারাত্মক প্রশ্ন: হতভাগ্য ফালমারফোর্ডটা কে?

প্রশ্ন: আত্মমূল্যায়নের প্রসঙ্গে আছি যখন, লেখক হিসেবে কোন জিনিসটাকে—বিস্মৃতি বাদে—আপনার মূল ব্যর্থতা মনে করেন? আর নিজেকে কীভাবে দেখেন আপনি?

নবোকভ: স্বতঃস্ফূর্ততার অভাব; সমান্তরাল ভাবনার উপদ্রব; দ্বিতীয় চিন্তা, তৃতীয় ভাবনা; গোসলের সময়, মনে মনে, নিজের ডেস্কে হতচ্ছাড়া প্রতিটি বাক্য তৈরি না করে কোনো ভাষাতেই নিজেকে প্রকাশ করার অক্ষমতা।

(নিজেকে কীভাবে দেখেন) আমার ধারণা নিজের সম্পর্কে আমার প্রিয় সত্যি হলো, আমি কখনো কোনো সমালোচকের আবোলতাবোল কথায় হতাশ হইনি এবং আমার জীবনে একবারও সমালোচনার জন্য কোনো সমালোচককে বলিনি বা ধন্যবাদ জানাইনি। রসবোধ ও নৈপুণ্যের মাস্টারপিস না হলে আমি সাধারণত আমার সম্পর্কে কোনো সমালোচনা বিশেষ আগ্রহ বা মনোযোগ দিয়ে পড়ি না। এবং কখনই দ্বিতীয়বার পড়তে যাই না। যদিও আমার স্ত্রী ওসব জমিয়ে রাখে এবং যদিও আমার যৌনাবেদনময়ী কিশোরীর দুর্দশার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস রচনার জন্য হয়তো লোলিতার আরো হাস্যকর বিভিন্ন আইটেম ব্যবহার করতেও পারি। আমার অবশ্য ৩০ বছর আগে আমার প্রথমদিকের উপন্যাস সম্পর্কে লেখা রাশিয়ান অভিবাসী সমালোচকদের বিশেষ আক্রমণের কথা বেশ ভালোই মনে আছে। এমন নয় তখন আমি আরো বেশি নাজুক ছিলাম কিন্তু আমার স্মৃতি নিশ্চিতভাবেই অনেক বিস্তৃত ও উদ্যমী ছিল এবং আমিই নিজের সমালোচক ছিলাম। ১৯২০-এব দশকে মোচুলস্কি নামে এক লোকের হামলার শিকার হই আমি, সংগঠিত অতীন্দ্রিয়বাদ, ধর্ম, গির্জার—যেকোনো গির্জা—প্রতি আমার চরম নির্লিপ্ততা কিছুতেই হজম করতে পারেননি তিনি। অন্য সমালোচকরাও ছিলেন, যারা সাহিত্যিক ‘আন্দোলন’ থেকে দূরে থাকায়, তাদের কাঙ্ক্ষিত কবিদের অনুভূত ‘উত্কণ্ঠা’ প্রকাশ করতে না পারায় এবং প্যারিসের বিভিন্ন ক্যাফের পেছন কামরায় সাধারণ অনুপ্রেরণার সভায় মিলিত হওয়া কবিদের সেইসব কোনো গোষ্ঠীতে থাকতে না পারায় আমাকে ক্ষমা করতে পারেননি। জর্জি ইভানভের মজার ঘটনাও ছিল, ভালো কবি কিন্তু অমার্জিত সমালোচক। আমি কখনই তার সঙ্গে বা তার সাহিত্যিক স্ত্রী ইরিনা ওদিওভস্তির সঙ্গে দেখা করিনি কিন্তু একদিন ১৯২০-এর দশকের শেষের দিকে বা ১৯৩০-এর গোড়ার দিকে—আমি তখন বার্লিনে এক অভিবাসী সাময়িকীর জন্য নিয়মিত পুস্তক সমালোচনা লিখি—প্যারিস থেকে আমাকে ‘রাজা, রানী ও গোলামের জন্য ধন্যবাদ’ মন্তব্যসহ তার একটা উপন্যাসের কপি পাঠান। আমি সহজেই বুঝতে পারি যে এর মানে, ‘ওই বইটি লেখার জন্য ধন্যবাদ,’ কিন্তু যেটা তাকে আবার অজুহাতও জোগাতে পারে: ‘আমাকে আপনার বই পাঠানোর জন্য ধন্যবাদ,’ যদিও আমি কখনই তাকে কিছু পাঠাইনি। দেখা গেল তার বইটা দুঃখজনকভাবেই তুচ্ছ। আমার সংক্ষিপ্ত ও বিশ্রী সমালোচনায় সে কথাই বললাম। ইভানভ রীতিমতো আমার ব্যক্তিগত বিষয় আর আমার লেখালেখি নিয়ে নিবন্ধ লিখে বদলা নেন। সাহিত্যিক সমালোচনার ভেতর দিয়ে ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব বা অবন্ধুসুলভ অনুভূতি প্রকাশ শিল্পকর্মকে এমন ভারসাম্যহীন করে তুলেছে।

প্রশ্ন: সংগীত ভাবনা?

নবোকভ: সংগীত আমি বুঝি না, এ ঘাটতির জন্য তিক্ততার সঙ্গে দুঃখ করি। কোনো কনসার্টে গেলে—বছর পাঁচেকের ভেতর একবার হয় সেটা—শব্দের ধারাক্রম এবং সম্পর্ক বোঝার চেষ্টা করি কিন্তু অল্প কয়েক মিনিটের বেশি সেটা ধরে রাখতে পারি না। অচিরেই বাদকদের নড়াচড়ায় সীমাহীন একঘেয়েমিতে ভুগতে শুরু করি। সংগীত সম্পর্কে আমার বিদ্যা খুবই হালকা। আমার অজ্ঞতা ও অক্ষমতাকে এত দুঃখজনক, এত অন্যায় হিসেবে আবিষ্কারের বিশেষ কারণ আছে: আমার পরিবারে দুর্দান্ত একজন গায়ক আছে—আমারই ছেলে। দারুণ প্রতিভা ওর। কিন্তু সংগীতের এক বিচিত্র বিকল্প খুঁজে পেয়েছি দাবায়।

প্রশ্ন: আরেকটি বিকল্প হচ্ছে আপনার মধুর গদ্য আর পদ্য। একাধিক ভাষায় আলংকারিক ভঙ্গিতে অল্প কয়েকজন লেখকের একজন হিসেবে আপনি কীভাবে রাশিয়ান ও ইংরেজি ভাষার টেক্সচুয়াল পার্থক্যকে বৈশিষ্ট্যায়িত করবেন, যে দুটো ভাষায় আপনি সমান পারঙ্গম?

নবোকভ: কেবল শব্দ সংখ্যার বিচারেই ইংরেজি রাশিয়ান ভাষা থেকে ঢের বেশি সমৃদ্ধ। বিশেষ করে বিশেষ্য ও বিশেষণে এটা লক্ষযোগ্য। রাশিয়ান ভাষার একটা খুবই বিরক্তিকর দিক হলো টেকনিক্যাল পরিভাষার অভাব, অস্পষ্টতা এবং আনাড়িপনা। যেমন মামুলি শব্দবন্ধ ‘গাড়ি পার্ক করা’ রাশিয়ান থেকে তর্জমা করা হলে দাঁড়াবে ‘কোনও গাড়ি লম্বা সময়ের জন্য দাঁড় করিয়ে রাখা’। এভাবে ‘যৌনতা’র রাশিয়ান শব্দ—পলোভয়—কিছুটা অশোভন হওয়ায় যত্রতত্র বলে বেড়ানো যাবে না। একই কথা খাটে ইংরেজি আলাপে হরহামেশা পরিচিত ভঙ্গিতেই প্রয়োগ করা বিভিন্ন অ্যানাটমিক্যাল ও বায়োলজিক্যাল শব্দের ক্ষেত্রেও। অন্যদিকে নড়াচড়া, ভঙ্গিমা এবং আবেগের বিশেষ দ্যোতনা প্রকাশক এমন কিছু শব্দ আছে, যেগুলো রাশিয়ান ভাষা অনন্য। ...বাক্য গঠনশৈলীর দিক থেকে ইংরেজি দারুণ স্থিতিস্থাপক মাধ্যম। কিন্তু রাশিয়ান ভাষাকে আরো সূক্ষ্ম জটিলতা জোগানো যায়। রাশিয়ান ভাষাকে ইংরেজিতে অনুবাদ ইংরেজি থেকে রাশিয়ানে অনুবাদের চেয়ে কিছুটা সহজ। আবার ইংরেজি থেকে ফরাসিতে তর্জমার চেয়ে ১০ গুণ সহজ।

প্রশ্ন: বলেছেন আর কখনই রাশিয়ান ভাষায় আর উপন্যাস লিখবেন না। কেন?

নবোকভ: রাশিয়ান ভাষায় আমার লেখা বছরে আমাকে কয়েকশ ডলারের বেশি জুগিয়েছে বলে মনে হয় না। কিন্তু আমি হাতির দাঁতের মিনার চাই এবং মাত্র একজন লেখককে খুশি করতেই লিখছি—নিজের জন্য। আমার বইগুলো ওখানে নিষিদ্ধই থাকবে যতদিন পুলিশি রাষ্ট্র আছে। না, আমি আর রাশিয়ান ভাষায় কোনো উপন্যাস লিখব না, যদিও কখনো কখনো দু-একটা খুবই ছোট কবিতা লিখতে দিচ্ছি নিজেকে। পোয়া শতক আগে আমার শেষ রাশিয়ান ভাষার উপন্যাস লিখেছি। তবে আজ ক্ষতিপূরণ হিসেবে আমার সামান্য আমেরিকান আমেজের প্রতি ন্যায়বিচারের লক্ষ্যে ভিন্ন কিছু করছি। তবে সেটা বোধহয় এত আগেভাগে না বলাই ভালো।

একদিনের কথা বলি, জাপানি, ফিনিশ, আরবির মতো আমি পড়তে জানি না, এমন বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত লোলিতার তর্জমার মুড়ির দিকে তাকিয়ে আছি—হঠাৎ মনে হলো, এসব বইয়ের ভুলগুলো একসঙ্গে করা হলে যেকোনো একটির চেয়ে ঢাউস আকার নেবে। ফরাসি অনুবাদ যাচাই করেছি আমি, বেশ ভালো সেটা কিন্তু আমি শুধরে না দিলে অনিবার্য সব ভুলে আকীর্ণ থাকত। কিন্তু পর্তুগিজ বা হিব্রু বা ড্যানিশ ভাষার ব্যাপারে কী করার ছিল আমার? এরপর ভিন্ন কিছু ভাবলাম আমি। আমার মনে হলো, দূর ভবিষ্যতের কোনো একটা সময়ে কেউ হয়তো লোলিতার রাশিয়ান ভাষ্য বের করে বসবে। আমি আমার অন্তঃস্থ টেলিস্কোপটাকে দূর ভবিষ্যতের নির্দিষ্ট সময়ে নিশানা করে দেখতে পেলাম নানা রকম ভুলভ্রান্তিতে প্রতিটি অনুচ্ছেদই ভয়ানক ভুল অনুবাদ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ক্ষতিকর ক্রীতদাসের হাতে লোলিতার রাশিয়ান ভাষ্য অশ্লীল অনুচ্ছেদ কিংবা ভুলে ভেস্তে যেতে পারে। তাই নিজেই তর্জমার সিদ্ধান্ত নিই। 

প্রশ্ন: দস্তয়েভস্কিকে বিশ্বের অন্যতম মহান লেখক মনে করা হয়। কিন্তু আপনি তাকে ‘সস্তা সেনশনালিস্ট, আনাড়ি এবং অশ্লীল’ বলেছেন, কেন?

নবোকভ: অরাশিয়ান পাঠকরা দুটো জিনিস বুঝতে পারেন না: সব রাশিয়ানই দস্তয়েভস্কিকে ভালোবাসেন না, যেমনটা অমেরিকানরা বাসেন। এবং যেসব রাশিয়ান তাকে পছন্দ করেন, তারা তাকে অতীন্দ্রিয়বাদী হিসেবে ভক্তি করেন, শিল্পী নয়। তিনি একজন নবী, বাজে সাংবাদিক এবং হঠকারী কমেডিয়ান। আমি স্বীকার করছি যে তার কিছু কিছু দৃশ্য, কিছু অসাধারণ প্রহসনমূলক লেখা অসাধারণ আমোদপূর্ণ। কিন্তু তার সংবেদনশীল খুনে এবং মায়াবতী বেশ্যারা অন্তত এ পাঠকের কাছে এক মুুহূর্তের জন্যও টেকেনি।

প্রশ্ন: এটা কি ঠিক যে আপনি হেমিংওয়ে এবং কনরাডকে ‘কিশোরদের বইয়ের লেখক’ বলেছেন?

নবোকভ: ওরা ঠিক তা-ই। হেমিংওয়ে নিশ্চিতভাবেই দুজনের ভেতর শ্রেয়তর; তার অন্তত নিজস্ব একটা কণ্ঠস্বর রয়েছে এবং সেটা চমৎকার, ভীষণ শৈল্পিক ছোটগল্প দ্য কিলার্সের জন্য দায়ী। এবং তার বিখ্যাত মাছের গল্পে মাছের বর্ণনা দুর্দান্ত। কিন্তু আমি কনরাডের সুভেনির-শপ স্টাইল, বোতলবন্দি জাহাজ এবং রোমান্টিসিস্ট ক্লিশের ঝিনুকের মালা সহ্য করতে পারি না। এ দুজন লেখকের কারো ভেতরই আমি এমন কিছু পাইনি, যা নিজে লেখার কথা ভাবতে যেতাম। মানসিকতা ও আবেগের দিক থেকে ওরা নৈরাশ্যজনকভাবে কিশোরসুলভ এবং আরো প্রিয় কিছু লেখকের বেলায়ও একই কথা বলা যেতে পারে। কিন্তু ওদের কেউ কেউ এখনো বেঁচে আছেন আর মৃতরা এখনো কবরস্থ হয়নি বলে জীবিত বুড়োদের কষ্ট দিতে চাই না।

প্রশ্ন: আপনি ছোট থাকতে কী পড়তেন?

নবোকভ: সেইন্ট পিটার্সবার্গে ১০ থেকে ১৫ বছরের মাঝামাঝি বয়সে আমার জীবনের অন্য যেকোনো পাঁচ বছর মেয়াদের তুলনায় অবশ্যই বেশি বেশি গল্প আর কবিতাই পড়েছি—ইংরেজি, রাশিয়ান এবং ফরাসি। আমি বিশেষত ওয়েলস, পো, ব্রাউনিং, কিটস, ফ্লবেয়ার, ভার্লেইন, র্যাঁবো, চেকভ, তলস্তয় এবং আলেক্সান্দার ব্লকের লেখা বেশি উপভোগ করেছি। অন্য এক পর্যায়ে আমার নায়করা ছিলেন স্কার্লেট পিম্পারনেল, ফিলিয়াস ফগ আর শার্লক হোমস। অন্য কথায়, আমি রীতিমতো একটা বিরাট লাইব্রেরিঅলা পরিবারের ত্রিভাষিক সন্তান ছিলাম। পরের দিকে, ইংল্যান্ডের ক্যামব্র্রিজে ২০ থেকে ২৩ বছর বয়সে আমার প্রিয় লেখকরা ছিলেন হাউসম্যান, রুপার্ট ব্রুক, জয়েস, প্রোস্ত ও পুশকিন। এই সবচেয়ে প্রিয়দের বেশ কয়েকজন—পো, ভার্লেইন, জুল ভার্ন, এম্মাস্কা অর্কযি, কোনান ডয়েল ও রুপার্ট ব্রুক—হারিয়ে গেছেন, আমার দিক থেকে তাদের চমক আর রোমাঞ্চ হারিয়েছেন। বাকিরা অক্ষত রয়ে গেছেন। আমার বহু সহকর্মীর মতো ১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকের কবি এলিয়ট ও পাউন্ডের সঙ্গে পরিচিত হইনি। ১৯৪৫ সালে মৌসুমের শেষ দিকে এক আমেরিকান বন্ধুর গেস্টরুমে ওদের পড়ি আমি এবং তাদের প্রতি সম্পূর্ণ নিস্পৃহই থাকিনি, বরং বুঝতেই পারিনি কেন ওদের নিয়ে কেউ মাথা ঘামাতে পারে। তবে আমার মনে হয়, আমার চেয়ে কম বয়সে ওদের আবিষ্কারকারী পাঠকদের পক্ষে ওরা কিছু সেন্টিমেন্টাল মূল্য ধারণ করেন।

প্রশ্ন: এখন আপনার পাঠাভ্যাস কী?

নবোকভ: সাধারণত আমি একসঙ্গে বেশ কয়েকটি বই পড়ি—পুরনো, নতুন, গল্প, নন-ফিকশন, কবিতা, যেকোনো কিছু—বিছানার ধারের দশ-বারোটা বইয়ের ঢিবি দুই বা তিনটায় নেমে এলে, সপ্তাহের শেষ নাগাদ যেমনটা হয়, আরেকটা ঢিবি তৈরি করি। কিছু উপন্যাস আছে যেগুলো কখনো ছুঁয়েও দেখিনি, যেমন রহস্য গল্প, রীতিমতো অপছন্দ করি, আর ঐতিহাসিক উপন্যাস। আমি তথাকথিত ‘শক্তিশালী’ উপন্যাস, আর যা প্রচুর সংলাপে ভরা—অপছন্দ করি।

প্রশ্ন: এমন কোনো সমসাময়িক লেখক আছেন, যাদের লেখা নতুন করে পড়তে ভালো লাগে?

নবোকভ: কয়েকজন প্রিয় লেখক আছেন বটে, যেমন ফরাসি লেখক অ্যালান রোব-গ্রিলিত আর বোর্হেস। ওদের গোলকধাঁধায় কেমন অনায়াস আর কৃতজ্ঞতার সঙ্গেই ঘুরে বেড়াতে পারে কেউ! ওদের চিন্তার সাবলীলতা, নির্ভেজালত্ব আর কাব্য, আয়নার মরীচিকা আমি ভালোবাসি।

প্রশ্ন: অনেক সমালোচক মনে করেন, আপনার নিজের গদ্যের ক্ষেত্রেও এ বর্ণনা মিলে যায়।

নবোকভ: কবিতা অবশ্যই সব ধরনের সৃজনশীল লেখাকে অন্তর্ভুক্ত করে। আমি কখনই কবিতা ও শৈল্পিক গদ্যের ভেতর কোনো উত্পত্তিগত পার্থক্য দেখি না। সত্যি বলতে, আমি যেকোনো দৈর্ঘ্যের একটা ভালো কবিতাকে ভালো গদ্যের ঘনীভূত রূপ হিসেবেই শনাক্ত করতে চাইব, পৌনঃপুনিক ছন্দ আর তাল থাকুক বা না-থাকুক। ছন্দের জাদু আমরা যে অর্থে বলি, তার পুরো আমেজ বের করে এনে উন্নত করে তোলা সম্ভব। কিন্তু সাদামাটা গদ্যেও বিশেষ ধরনের ছন্দের প্যাটার্ন আছে, সুস্পষ্ট গঠনের জাদু, বাগ্ধারা এবং দ্যোতনার পৌনঃপুনিক বৈচিত্র্যের মাধ্যমে তুলে ধরা চিন্তার ছন্দ। আজকের বৈজ্ঞানিক শ্রেণীকরণের মতো বর্তমানে কবিতা ও গদ্য সম্পর্কে আমাদের ধারণায় প্রচুর ছাপিয়ে যাওয়ার ব্যাপার আছে। এদের ভেতরের বাঁশের সাঁকো হলো উপমা।

প্রশ্ন: এ সময়ে বিজ্ঞানের নিখুঁত জ্ঞান অস্তিত্বের সবচেয়ে গভীর রহস্যকেও উন্মুক্ত করতে শুরু করেছে, সেখানে ‘অযৌক্তিকতা’র খুব একটা স্থান নেই। আপনি কি একমত?

 নবোকভ: এ দিকটা খুবই হেঁয়ালিময়। এটা এক ধরনের সাংবাদিকসুলভ বিভ্রম। বাস্তব ক্ষেত্রে কারো বিজ্ঞান যত বিশাল, রহস্যের বোধও তত গভীর। এছাড়া আমি এটা বিশ্বাস করি না যে আজকের কোনো বিজ্ঞানই কোনো রহস্যকে ভেদ করতে পেরেছে। সংবাদপত্রের পাঠক হিসেবে আমরা একজন ইলেকট্রিশিয়ান বা মনোবিদের তুকতাককে ‘বিজ্ঞান’ বলতে চাই। এটা বড়জোর প্রায়োগিক বিজ্ঞান এবং প্রায়োগিক বিজ্ঞানের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে গতকালের নিউট্রন বা আজকের সত্যির আগামীকাল মৃত্যু ঘটে। কিন্তু এমনকি ‘বিজ্ঞানের’ আরো উন্নত অর্থেও—দৃশ্যমান ও স্পর্শযোগ্য প্রকৃতির গবেষণা বা খাঁটি গণিতের কবিতা ও খাঁটি দর্শন—অবস্থা চিরকালের মতোই হতাশাজনকই থেকে যায়। আমরা কখনই প্রাণের উৎস বা জীবনের অর্থ কিংবা স্থান ও সময়ের কিংবা চিন্তার প্রকৃতি জানতে পারব না।

প্রশ্ন: আপনি কি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন?

নবোকভ: পুরোপুরি আন্তরিকভাবে বলতে গেলে—আমি যে কথা বলতে যাচ্ছি, এর আগে কখনো তা বলিনি এবং আশা করি, এটা কিঞ্চিৎ উপকারী শিহরণের কারণ হবে। আমি কথায় যতটা প্রকাশ করতে পারি, তার চেয়ে কিঞ্চিৎ বেশি জানি, আর যতটা প্রকাশ করতে পারি, সেটা বেশি জানা না থাকলে প্রকাশ করা সম্ভব হতো না।

 

 [ঈষৎ সংক্ষেপিত। সাক্ষাৎকারটি প্রথম প্রকাশিত হয় প্লেবয় পত্রিকার ১৯৬৪ সালের জানয়ারি সংখ্যায়। পরে ‘দ্য প্লেবয় ইন্টারভিউ’ গ্রন্থভুক্ত হয়। বইটিতে অ্যালেন গিন্সবার্গ, কুর্ট ফনগাট, টেনিসি উইলিয়ামসসহ আরো অনেকের সাক্ষাৎকার রয়েছে।]