হেমেন্দ্রনাথ মজুমদারের জন্ম ১৮৯৪ সালে। ভ্যান গঘ মারা গেছেন আট বছর আগে। রাজা রবি ভার্মা তখন কাজ করছেন আর অমৃতা শেরগিল কয়েক বছর পরই জন্মাবেন। এসব হিসাব থেকে দেখা যায়, হেমেনের জন্মটা ছিল এক সন্ধিক্ষণে—পশ্চিমে আধুনিক রীতির চিত্রশিল্পীরা তুমুল কাজ করছেন আর ভারতে রবি ভার্মার হাত ধরে পাশ্চাত্য চিত্রশৈলীর প্রবেশ ঘটেছে। কিন্তু রবির বিষয়বস্তু একেবারে ভারতীয়ই ছিল। তার তুলিতে ভারতের নারী, দেবী, পুরাণের কাহিনী নতুন আঙ্গিকে ধরা দিয়েছিল।
ভারতে প্রাচীনকাল থেকেই শিল্পকলার অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল নিরাবরণ নারীদেহ। রবি ভার্মার কাজে আমরা দেখি শাড়ির পেছনে নারীর সৌন্দর্য। কিন্তু ততদিনে ভারতে হাজির হয়ে গেছে ভিক্টোরিয়ান মোরালিটি। নারীদের নানা রূপে আঁকা হলেও তাদের শরীরে এবার মোটা, লম্বা পোশাক জুটেছে। নগ্ন শরীর ব্রাত্য হয়ে গেল।
১৮৯৬ সালের ৬ জুলাই ই বি হ্যাভেল কলকাতার সরকারি আর্ট স্কুলের দায়িত্ব নেন। তিনি স্বদেশী চেতনার উন্মেষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলায় চিত্রশিক্ষার মডেল তৈরি করেছিলেন। তার পাশে ছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কিন্তু পাশ্চাত্যের চিত্রশিল্পের যে বিপুল, দিগন্ত বিস্তৃত বিকাশ, তাকে গ্রাহ্যে না নেয়ায় আর্ট স্কুলের অনেকেই বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিলেন। পাশ্চাত্য রীতি-কৌশলকে এড়িয়ে শুধু ভারতীয় শিল্পচর্চা, তাও আবার ভিক্টোরীয় মোরালিটির ছায়ায়—এমন পরিস্থিতিকে গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুলেরই কিছু ছাত্র মেনে নিতে পারেননি। তারা বলেছিলেন, পাশ্চাত্যের শিল্পকলা যে উচ্চতায় উঠেছে, তার স্পর্শ ছাড়া ভারতে চিত্রচর্চা অর্থহীন। এ বিরোধের ফলাফল হিসেবে ১৮৯৭ সালে কলকাতায় আরেকটি আর্ট স্কুল জন্ম নেয়—‘জুবিলি আর্ট একাডেমি’। এ ধারার নেতৃত্বে ছিলেন রণদাপ্রসাদ গুপ্ত। চিত্রকাল নিয়ে দুই মতধারার এ বিরোধের কালেই জন্মালেন হেমেন্দ্রনাথ।
হেমেন্দ্রনাথ ১৮৯৪ সালে কিশোরগঞ্জ জেলার গচিহাটা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা দুর্গানাথ মজুমদার ময়মনসিংহের আঠারবাড়ি এস্টেটের কর্মচারী ছিলেন। ছেলেবেলা থেকেই ছবি আঁকার ঝোঁক ছিল হেমেনের। কিন্তু এ ঝোঁককে পরিবার ইতিবাচক চোখে দেখেনি। পরিবারের সঙ্গে এ নিয়ে ঝামেলা বাড়ছিল। হেমেন তখন ময়মনসিংহের সিটি স্কুলে দশম শ্রেণীর ছাত্র। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন বাড়ি ছাড়ার। কারণ শিল্পী হওয়াই তার ধ্যান। গচিহাটার মজুমদার বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে কলকাতায় হাজির হলেন, উঠলেন অখিল মিস্ত্রি লেনে দিদি হৈমলতার বাড়িতে। বোনজামাই রমেশ সোম সমঝদার মানুষ, হেমের শিল্পী হওয়ার আগ্রহটা বুঝতে পারলেন। তিনি হেমেন্দ্রনাথকে অবনীন্দ্রনাথের গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। এটা ছিল ১৯১০ সালের ঘটনা। কিন্তু এ সরকারি আর্ট স্কুলে দ্রুতই হেমেন্দ্রনাথের মোহভঙ্গ হলো। তিনি বুঝলেন গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুলে শিল্পচর্চা স্বাধীন নয়। তুলিটা ইচ্ছেমতো চালানো যাবে না। শিল্পী হতে গিয়ে যিনি স্কুলজীবনেই বাড়ি ছেড়ে এসেছিলেন, সেই স্বাধীন আর ক্ষুব্ধ আত্মার পক্ষে তো এ বিধিনিষেধ মেনে নেয়া সম্ভব নয়! একই সময় আরেকটা ঘটনা ঘটেছিল, ১৯১১ সালে দিল্লি দরবার উপলক্ষে আসা পঞ্চম জর্জের সম্মানে কলকাতায় তোরণ তৈরি হবে। কিন্তু হেমেন এর বিরুদ্ধে ছিলেন। সব মিলিয়ে ছেড়ে দিলেন গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজ।
ভারতীয় চিত্র শিরোনামের নিবন্ধে হেমেন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “প্রাচীন চিত্র বা মূর্তি দেখিলে তাহাতে ‘ভারতীয় পদ্ধতি’ বলিয়া সনাতন কোনো লক্ষণ বা প্রকাশভঙ্গি ছিল না...।” এরপর ভারতীয় কলা নিবন্ধে লিখেছেন, “সর্বাপেক্ষা মিথ্যা ও হাস্যকর ব্যাপার—এই ‘ভারতীয় পদ্ধতি’ শব্দটি। যিনি সর্বপ্রথম এই শব্দটি উচ্চারণ করিয়াছিলেন, তাঁহার মধ্যে সত্বুদ্ধির একান্ত অভাব ছিল। আরো আশ্চর্যের বিষয় এমন অসার কথা দেশের গাত্রে বিলক্ষণ দাগ কাটিয়াছে।” ভারতীয় কলা নিবন্ধে হেমেন্দ্রনাথ মজুমদার স্পষ্টত দুটি বক্তব্য রাখলেন। এক. আর্নেস্ট বিনফিল্ড হ্যাভেল এবং অবনীন্দ্রনাথের নব্যভারতীয় শিল্পকলা; যা গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুলে শেখানো হতো তা ছিল ‘অসার’। আর দ্বিতীয় যে কথাটা তিনি স্বীকার করেছেন তা হলো এই, নব্যভারতীয় শিল্পকলার যথেষ্ট প্রভাব ছিল সমকালীন সময়ে। গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুলের সেই বদ্ধ কুয়োর ব্যাঙ হওয়া হেমেনের পক্ষে সম্ভব ছিল না। প্রিয় বন্ধু অতুল বসুর পরামর্শে তিনি রণদাপ্রসাদ গুপ্তের জুবিলি আর্ট একাডেমিতে ভর্তি হলেন। ১৯১১ থেকে ১৯১৫ পর্যন্ত তিনি কলকাতার জুবিলি একাডেমিতে শিক্ষা গ্রহণ করেন। অবশ্য শোনা যায় জুবিলি একডেমিতে হেমেন শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন তিন বছর।
হেমেন, অতুল পাস করার পর ছোটখাটো কাজ করে জীবিকা ধারণ করতে শুরু করেন। এসব কাজের মধ্যে ছিল থিয়েটারের জন্য চিত্রকর্ম আঁকা, পরিবারের মৃত সদস্যদের ছবি থেকে প্রতিকৃতি এঁকে দেয়া।
১৯১৯ সালে হেমেন্দ্রনাথ বন্ধু অতুল বসু, যামিনী রায় ও ভবানীচরণ লাহাকে নিয়ে বিডন স্ট্রিটে চালু করেন ইন্ডিয়ান একাডেমি অব আর্ট নামে একটি চারুকলা প্রতিষ্ঠান। ১৯২০ সালে এ প্রতিষ্ঠানের ত্রৈমাসিক জার্নাল ইন্ডিয়ান একাডেমি অব আর্ট প্রকাশিত হয়। তাদের লক্ষ্য ছিল, শিল্পকে কেবল ধনীদের অধিকার থেকে মুক্ত করে সাধারণ মানুষের নাগালে নিয়ে আসা। সারা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের পাশ্চাত্য রীতি অনুসরণকারী শিল্পীদের কাজ নিয়ে প্রদর্শনীরও আয়োজন করেন।
ইন্ডিয়ান একাডেমি অব আর্টের পাঠক বৃদ্ধিতে তারা নানা উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সাদামাটা কাগজে ছাপা হলেও এর নকশায় ছিল আকর্ষণীয় সব আয়োজন। শিল্প সমালোচনামূলক প্রবন্ধের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট খবর, গসিপ, ভ্রমণবৃত্তান্ত, ছোটগল্প, কৌতুকসহ নানা ধরনের লেখা প্রকাশিত হতো। জার্নালের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল হেমেন্দ্রনাথ মজুমদার, অতুল বসু ও যামিনী রায়ের চিত্রকর্ম প্রকাশ। এদের পুরস্কারজয়ী চিত্রগুলো কালার প্লেটে ছাপা হতো। এ জার্নালেই হেমেনের প্রথম আলোচিত ছবি পল্লী প্রাণ প্রকাশিত হয়। এ পল্লী প্রাণে দেখা যায় জলসিক্ত শাড়িতে এক পল্লী নারীকে। এ ভেজা শাড়িতে নারীকে উপস্থাপনাই হেমেনকে স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছে।
ইন্ডিয়ান একাডেমি অব আর্ট জার্নালটি অর্থাভাবে একসময় বন্ধ হয়ে যায়। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে এমন পরিচ্ছন্ন মুদ্রণ ও রঙিন ছবিতে পূর্ণ চিত্রশিল্পের পত্রিকা সম্ভবত ভারতে আগে আর প্রকাশিত হয়নি। এরপর তারা করলেন সোসাইটি অব ফাইন আর্টস, এটি বেশ সাফল্যের মুখ দেখেছিল। খেয়াল করার বিষয় হচ্ছে, এ সময়টা ছিল স্বদেশী যুগ, বাংলার শিল্পকলার স্থানীয় ঘরানারই তখন একচ্ছত্র প্রভাব। এটাই ছিল ভারতে প্রথম জাতীয়তাবাদী শিল্প আন্দোলন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং তার শিষ্যরা বিভিন্ন পদ থেকে একাডেমিক বা পাশ্চাত্য রীতি অনুসরণকারীদের বিতাড়িত করেন। পাশ্চাত্য রীতি এবং প্রাচ্য রীতির এ দ্বন্দ্ব গুরুতর আকার ধারণ করেছিল। প্রাচ্য রীতির বাহকদের মূল কেন্দ্র ছিল ইন্ডিয়ান সোসাইটি অব ওরিয়েন্টাল আর্ট, যা পরিচালনা করতেন অবনীন্দ্রনাথ ও গগনেন্দ্রনাথ। তারা প্রতিষ্ঠানটির ওপর শক্ত নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিলেন এবং এখান থেকে পাশ্চাত্যপন্থী শিল্পীদের বের করে দেন। লক্ষ করার বিষয়, অবনীন্দ্রনাথের মতো প্রভাবশালী শিল্পীর সামনে থেকেও হেমেন তাকে দিয়ে প্রভাবিত না হয়ে স্বতন্ত্র যাত্রাপথ বেছে নিয়েছিলেন।
এমন পরিস্থিতিতে পাশ্চাত্যপন্থী শিল্পীরা কলকাতায় তাদের প্রদর্শনী করতে পারছিলেন না, তাই তারা তাদের কাজ বাংলার বাইরে পাঠাতে বাধ্য হচ্ছিলেন। কিন্তু অনেক শিল্পীর সে সামর্থ্য ছিল না। ইন্ডিয়ান সোসাইটি অব ওরিয়েন্টাল আর্টের আধিপত্যকে খর্ব করতে জন্ম হলো সোসাইটি অব ফাইন আর্টসের। এ সোসাইটি ১৯২১-২২ সালে প্রথম প্রদর্শনীর আয়োজন করে এবং সেটা ছিল এক বিরাট আয়োজন। ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাশ্চাত্য রীতি চর্চাকারী শিল্পীদের এক হাজারের বেশি চিত্রকর্ম নিয়ে এ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।
১৯২৪ সালে অতুল বসু স্থায়ীভাবে ইংল্যান্ডে চলে গেলে হেমেনদের দলটি ভেঙে যায়। বিদ্রোহ আর অ্যাক্টিভিজমের পর এবার হেমেনের পেশাদার শিল্পীজীবন শুরু হয়ে যায়। নারীকে কেন্দ্রে রেখে তিনি তার চিত্রকর্মগুলো তৈরি করতে থাকেন। এখানে বিশেষভাবে লক্ষ করা যায় নারীর অবসর এবং তার মনের বিভিন্ন অবস্থা। দিবাস্বপ্নে মগ্ন নারীকে আঁকেন তার রোজ অর থর্ন?-এ। ছবিটির দিকে একবার তাকালেই হেমেনের দক্ষতা দৃষ্টিগোচর হয়। এ ছবিতে ভঙ্গির নয়, বরং ভাবের খেলা দেখা যায়। আর ভঙ্গির চেয়ে ভাবকে ফুটিয়ে তোলা যে কঠিন, সে তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না! ছবিতে সিল্ক পরিহিতা নারীর পেছনে থাকা গোলাপ প্রেমের আনন্দ-বেদনাকে প্রকাশ করছিল। ১৯৩৬ সালে কলকাতায় প্রদর্শিত হয়। এরপর ১৯৫২ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় অনুষ্ঠিত দুনিয়ার সেরা সুন্দরীদের পোর্ট্রেট নিয়ে আয়োজিত প্রদর্শনীতে ছবিটি ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছিল।
হেমেনের আঁকা নারীর শরীরে যৌনতার আভাস আছে। ভেজা শাড়ির ওপর ফুটে ওঠা নারীর শরীরের ভাঁজ, বাঁক, পেশি, হাড় মুগ্ধ নয়নে দেখবেন যেকোনো পুরুষই, এমনকি অনেক নারীও চোখ ফেরাতে পারবেন না নিশ্চিত। এখানে আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় আছে, হেমেনের আঁকা নারীরা কেউই ষোড়শী বা অষ্টাদশী উদ্ভিন্নযৌবনা নন; বরং তারা বেশ প্রাপ্তবয়স্ক এবং মনে হয় বিবাহিতা। দি উন্ডেড ভ্যানিটি, ব্লু সারি, হারমোনি ও ইমেজ এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য।
হেমেন নারীর শরীর ও নগ্নতাকে প্রাধ্যান্য দিয়ে আঁকলেও তার ছবিতে নারীকে পূর্ণ নগ্ন চেহারায় দেখা যায় না। তবে গায়ের কাপড় যেন আবরণের চেয়ে প্রকাশেই বেশি সাহায্য করে। উজ্জ্বলকুমার মজুমদার লিখেছেন, ‘দেহের যে অংশে বসন লেগে আছে এবং যে অংশে বসন লেগে নেই তার মধ্যে রংয়ের শেড এর সূক্ষ্ম তারতম্য এনে যৌবন-লাবণ্যের আভাস দেওয়াতে তাঁর (হেমেন) জুড়ি ছিল না।’
হেমেন মজুমদার পরপর তিন বছর অভিজাত বোম্বে আর্ট সোসাইটি থেকে তিনটি পুরস্কার জেতেন। এর মধ্যে ১৯২১ সালে স্মৃতি শিরোনামের চিত্রকর্মটির জন্য তাকে স্বর্ণপদক দেয়া হয়। ১৯২২ সালে ‘বর্ণঝঙ্কার’ এবং ১৯২৩ সালে ‘কর্দমে কমল’ ছবির জন্য হেমেন পুরস্কার জেতেন। হেমেনের এ পদকপ্রাপ্তিতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় বোম্বে ক্রোনিকালে সাংবাদিক কানহাইয়ালাল ওয়াকিল লেখেন, ‘কলকাতার এক হেমেন মজুমদার প্রদর্শনীতে তিনবার প্রথম পুরস্কার জিতেছেন। এটা বোম্বের শিল্পীদের জন্য মর্যাদাহানিকর... হয় এই জুরি বোর্ড অযোগ্য নয়তো প্রদর্শনীর জন্য জনাব মজুমদার বেশি যোগ্য।’
এ পুরস্কারগুলো জেতার পর স্বাভাবিকভাবেই হেমেনের খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলায় বিভিন্ন পত্রিকায় তার আঁকা ছবি ছাপা হতে শুরু করে। বোম্বে, মাদ্রাজ, সিমলা, দিল্লিসহ আরো অনেক শহর থেকে হেমেনের ছবি প্রদর্শিত ও পুরস্কৃত হয়। অনেক বিখ্যাত মানুষ এ সময় হেমেন্দ্রনাথের ছবি কিনতে শুরু করেন। ময়ূরভঞ্জের মহারাজা পূর্ণচন্দ্র দুই বছরে হেমেনের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকার ছবি কিনেছিলেন।
১৯২৬ সালে হেমেন মজুমদার জীবনের প্রথম আর্থিক সাফল্য পেলেন—একটি কমার্শিয়াল ফার্ম বেশ ভালো মূল্য দিয়ে তার একটি ছবির রিপ্রডাকশন রাইটস কিনে নেয়। কোম্পানিটির বার্ষিক ক্যালেন্ডারের অন্যতম আকর্ষণ ছিল হেমেনের ছবিটি।
হেমেন স্বল্পবসনা নারীর চিত্র আঁকিয়ে শিল্পী হিসেবে খ্যাতি কিংবা কুখ্যাতি অর্জন করেন। হেমেনের চিত্রকর্ম জয়পুর, বিকানের, কোটাহ, কাশ্মীর, কোচবিহার, ময়ূরভঞ্জ, পাটিয়ালা এবং অন্যান্য দেশীয় রাজাদের আকর্ষণ করে। এদের মধ্যে পাটিয়ালার মহারাজা স্যার ভূপিন্দ্রনাথ সিং (১৮৯১-১৯৩৮) ছিলেন সবচেয়ে নিবেদিত। কাশ্মীরের মহারাজা ১৯৩১ সালে হেমেনকে ছবি আঁকার জন্য তার দরবারে নিয়ে যান। এরপর পাটিয়ালার মহারাজা স্যার ভূপিন্দ্রনাথ সিং পাঁচ বছরের জন্য মোটা বেতনে হেমেনকে রাজচিত্রকর হিসেবে নিয়োগ দেন। এ অর্থ দিয়ে তিনি কলকাতায় একটি স্টুডিও খোলেন।
হেমেন মজুমদার কী অর্জন করলেন? এ প্রশ্নের জবাব শোনা যাক বিশিষ্ট শিল্প সমালোচক রানা মিত্তরের লেখা থেকে—
“হেমেন বাঙালি সৌন্দর্যের প্রকার তৈরি করেছিলেন, যা সেকালের বাঙালি জনতাকে সেগুলোর পরিচিত ভাব ও অকপটতার জন্য দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। ছবিগুলো আর্ট স্কুল থেকে পড়ে আসা কোন শিল্পীর আঁকা নৈর্ব্যক্তিক ছবি ছিল না, বরং ছিল অনুভবযোগ্য, শ্বাস নেয়া জীবন্ত নারী। ভারতীয় শিল্পে নারীচিত্রের ইতিহাস দীর্ঘ এবং জটিল। কোনমতে গায়ে ফেলে রাখা লাস্যময়ী অপ্সরা, ইয়াকশি থেকে ভারতীয় মন্দিরে দেবী মূর্তি। মন্দিরগাত্রে যৌনকর্মেরও প্রচুর ভাস্কর্য আছে। এসব অকপট দৃশ্য-ভাস্কর্য প্রাচীন সময়ের সাধারণ স্পিরিটের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই তৈরি হয়েছিল, পঞ্চম শতকের কবি কালিদাসের কবিতা-নাটকেও এমন অবাধ দৃশ্যের হাজিরা পাওয়া যায়। হিন্দু ও বৌদ্ধ শাসনের অবসানে শিল্পকলায় নারীর উপস্থাপনায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি হাজির হয়। মুসলিম সংস্কৃতির প্রভাবে ‘অভিজাত/সম্মানিত’ নারী বিবসনা হয়ে আর সামাজিক পরিসরে হাজির হতে পারলেন না। কিন্তু কৃষক সমাজে এই সংস্কৃতির বাধা ছিল না। আবার কেরালার নায়ার সমাজের অভিজাতদের ওপরও এসব নিষেধাজ্ঞার কোন প্রভাব ছিল না, তারা বিশ শতকের শেষভাগেও উন্মুক্ত বক্ষে চলাফেরা করতেন। তুর্কি-আফগান থেকে মোগল আমলে মিনিয়েচার চিত্রকর্মে নগ্ন নারীর দেখা পাওয়া যেত না বললেই চলে। শুধু ব্যতিক্রম ছিল রাজস্থান ও পাহাড়ি মিনিয়েচার।
পরিস্থিতি একেবারে বদলে যায় ব্রিটিশ রাজের শাসনামলে। উনিশ শতকে খ্রিস্টান মিশনারীরা তাদের বিবেচনায় হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন অনৈতিক বিষয়ের বিরুদ্ধে জোর প্রচারণা শুরু করে। ভিক্টোরীয় এভানজেলিজমের প্রভাবে পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত ভারতীয়রা পোশাক, আচরণের ক্ষেত্রে বিশুদ্ধতাবাদী মনোভাবে গ্রহণ করে—নারীর সজ্জায় যুক্ত হয় ব্লাউজ, পেটিকোট।
এমন পরিস্থিতিতে শিল্পকলায় দেহের উপস্থাপনা নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়। ইংরেজরা হিন্দু মন্দিরের নগ্ন ভস্কর্যকে অনুমোদন না করলেও ভিক্টোরিয়ান অ্যাকাডেমিক ন্যুড আর্টকে সম্মান জানাত।...শাসকরা শালীনতার নতুন ধারণাকে চাপিয়ে দিলেন। শালীনতা বজায় রেখে শরীরের কতটা প্রদর্শন করা যাবে তা নির্দিষ্ট করা হল।
পাশ্চাত্য রীতিতে কাজ করা ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত শিল্পী হলেন রাজা রবি ভার্মা (১৮৪৮-১৯০৬)। তিনি নারীর সৌন্দর্য প্রকাশে একটি নতুন ধারণা সৃষ্টি করেছিলেন, যেখানে নগ্নতা ছিল একেবারেই দুর্লভ। এদিকে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে (১৮৭১-১৯৫১) বেঙ্গল স্কুল অব পেইন্টিং ফিগার ড্রইংকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
হেমেন তার আঁকার বিষয়বস্তু হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন গোসল শেষে ভেজা কাপড়ে বাড়ি ফিরতে থাকা পল্লী গাঁয়ের কুমারীকে। এতে তিনি ভেজা পোশাকের মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠা নারীর শরীরকে উপস্থাপনার সুযোগ পান। অবশ্য হেমেন এসব কাজ করেছিলেন স্টুডিওতে বসে। এজন্য তিনি আলোকচিত্রের সহায়তা নিতেন। এভাবে তিনি ভারতে ফিগার পেইন্টিং এর একটি নতুন রীতি উদ্ভাবন করেন—আধা স্বচ্ছ কাপড়ের ওপর ফুটে ওঠা আবেদনময় মাংসল শরীরের রেখা। রাজা রবি ভার্মার ভাই রাজা ভার্মা এ বিষয়ে প্রথম কিছু কাজ করেছিলেন কিন্তু সেগুলো জনপ্রিয় হয়নি কিংবা পরবর্তী শিল্পীরা তাকে আর অনুসরণ করেননি। এদিকে হেমেন একটি স্বতন্ত্র রীতি তৈরি করেছিলেন এবং তার কিছু অনুসরণকারীও সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন। হেমেনকে অনুসরণকারীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন পাঞ্জাবের ঠাকুর সিং। হেমেন উজ্জ্বল রংয়ের অভিজাত বাঙালি নারীর যৌন আবেদনকে ক্যানভাসে তুলতে আগ্রহী ছিলেন। খুব সম্ভবত তার আঁকা বিভিন্ন নারীচিত্রের প্রেরণা ছিলেন তার স্ত্রী, তবে ছবির মডেলে তিনি স্ত্রীর সঙ্গে তেমন সাদৃশ্য রাখেননি।”
হেমেন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর তার হাতে লেখা কিছু প্রবন্ধ-নিবন্ধের পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায়, যা ‘ছবির চশমা’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। নামটি তিনি নিজেই লিখে রেখেছিলেন। এসব লেখার উদ্দেশ্য নিয়ে হেমেন লিখেছিলেন—‘দুনিয়ার সব বিদ্যারই পরীক্ষা আছে। জহুরী জহর চিনিতে পারে—কাচ ও কষ্টিপাথরের সাহায্যে, বিজ্ঞানের দান—অশেষ পরীক্ষারই ফল, সঙ্গীতের পরীক্ষক—নিপুণ শ্রবণেন্দ্রিয়, আর কলাবিদ্যার পরীক্ষক—অসাধারণ দৃষ্টিশক্তি। দৃষ্টিহীনতায় চশমার ব্যবহার আবশ্যক, তাই ছবির চশমার সৃষ্টি।’
মানবজীবন-সমাজে শিল্পের গুরুত্ব, অবস্থান নিয়ে হেমেন্দ্রনাথ আলোচনা করেছেন। ছবি আঁকায় তিনি বেছে নিয়েছিলেন তেল রঙ, যা তৎকালের ভারতীয় শিল্পীদের কাছে পাশ্চাত্য রীতি বলে অচ্ছুত। হেমেনের কথায়, “‘ভারতীয় পদ্ধতি’র দল বলবেন, তৈলচিত্রটা বৈদেশিক সম্ভার, তাহাতে আলেখ্য নির্মিত হইলে তাহা খাঁটি ভারতীয় হয় না ইত্যাদি...এসব অপযুক্তির কোন মূল্য নাই।...আমাদের ‘ভারতীয় পদ্ধতিওয়ালাগণ’ বক্তৃতার সময় গোঁড়ামির চরমে যান, কিন্তু পরিধানে সেই মিলের বস্ত্র—মুখে ‘কেপসেটন’ সিগারেট ও বাহনটি হাওয়াগাড়ি।...অতীত গৌরবের দৃষ্টান্ত যে জাত মুহুর্মুহু দেয় আর বর্তমানে যে পঙ্গু সাজিয়া অজ্ঞতার আড়ালে মুখ লুকাইয়া বসিয়া থাকে; নিজে অক্ষম, দেশের অন্যান্যেরা যদি কিছু আশার আলো আনে তবে সে আলো বৈদেশিক তাহা সনাতন নয়, তাহা রীতিবিরুদ্ধ ইত্যাদি বলিয়া সে আলোকে ফিরাইয়া দিতে বলে তাহারা ভণ্ড—তাহারা মূর্খ। তাহারা অন্তরে ঠিক জানেন তৈলচিত্র অতি উচ্চাঙ্গের জিনিস।”
আগেই আলোচনা হয়েছে কীভাবে অবনীন্দ্রনাথের মতো প্রভাবশালী মানুষ এবং স্থানীয় রীতির আধিপত্যের সঙ্গে হেমেনকে লড়তে হয়েছে। খুব সম্ভবত ঔপনিবেশিক শাসনে পাশ্চাত্যের চিন্তা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার যে দর্শন, সেটা হেমেনকে ছুঁয়ে গিয়েছিল। স্বদেশী রীতি মানতেই হবে—এমন কোনো সংস্কারে তিনি আচ্ছন্ন ছিলেন না। শিল্পীর স্বাধীনতাকেই হেমেন সবার আগে স্থান দিয়েছেন—‘শিল্পী বা কবির কল্পনা যেমন তাহার স্বাধীন চিন্তার ফল তেমনি সেই কল্পনাকে রূপদান করিবার প্রণালী বা পদ্ধতিও তাহার নিজস্ব নৈপুণ্য। বলা বাহুল্য, নানা মুনির নানা মতের ন্যায় প্রত্যেক শিল্পীর অঙ্কন পদ্ধতি অপর যে কেহ অপেক্ষা ভিন্ন। লক্ষ শিল্পীর লক্ষ পদ্ধতি। কবির কাব্যসৃষ্টি যদি হুকুমের অপেক্ষা রাখে তবে সে কাব্য পড়িবার পূর্বেই অপাঠ্য। তেমনি শিল্পী যদি তাহার শিল্প-নির্মাণ-কার্যে আদেশের অধীন হয় তবে সে চিত্র অঙ্কিত না হইলে ক্ষতি কী?’
তৎকালীন সমাজে চিত্রকর্মের এবং শিল্পীর কদর কেমনতর অবস্থায় ছিল তা পাওয়া যায় হেমেনের লেখায়। নিজেদের দোষগুলোকে হেমেন ক্ষমাহীন বাক্যে উদোম করে দিয়েছেন—‘আমরা ইংরেজের সঙ্গে মিশিয়া তার সদগুণ যে পরিমাণ গ্রহণ করি কুগুণ সংগ্রহ করি তার দশ গুণ। গরীব হইয়াও আমরা ভাল খেতে না পাইলেও ইংরাজী সভ্যতায় মোটরগাড়ি চড়াটা নকল করিয়াছি। কিন্তু সাহেবের ধৈর্য সাহস ও স্বধর্মপ্রীতি শিখিলাম কৈ? এইখানেই রুচির ও সভ্যতার পরীক্ষা। চিত্রপ্রীতির কথা বলিলেই দেশের সকলে একবাক্যে বলিবে—‘অতি গরীব দেশ— ছবি কিনিবার পয়সা কোথায়? কিন্তু যে ব্যক্তির ঘোড়ার গাড়ি চড়াও কর্তব্য নয় তিনি কিনিবেন চার হাজার টাকার মোটরকার! অথচ একশত টাকায় এখানে চিত্র কিনিতে উপরের ঐ যুক্তি প্রদর্শন।’
হেমেন্দ্রনাথ ইডেন গার্ডেনসে অল ইন্ডিয়া একজিবিশনের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন। এতেই শরীর ভেঙে গেল। ১৯৪৮ সালের ২২ জুলাই তিনি অকাল প্রয়াত হন।






