অনুবাদ: মুম রহমান

পরিবারের কলঙ্ক

 

একটা দেশ ছিল, যেখানে সবাই চোর ছিল।

প্রত্যেক রাতে সবাই অতি অবশ্যই সর্বতালার চাবি আর আচ্ছাদিত লণ্ঠন নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ত আর প্রতিবেশীর বাড়িতে যেত এবং চুরি করত। সকালেই তারা ফিরে আসত, দেখত যে তাদের বাড়িতেও চুরি হয়েছে।

তাই সবাই একসঙ্গে সুখেই বাস করত, কেউ সর্বস্ব হারাত না, যেহেতু প্রত্যেকেই অন্যের কাছ থেকে চুরি করত এবং অন্যরাও চুরি করত অন্যদের থেকে আবার, আর এমনই চলত এবং এভাবে শেষ লোকটা পর্যন্ত চলতে থাকত, যে কিনা প্রথমজনের কাছ থেকে চুরি করেছিল। সে দেশে ব্যবসা ছিল ভয়াবহা জোচ্চুরিতে ভরপুর, ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের দিক থেকেই। সরকার ছিল একটা অপরাধী সংগঠন, যে তার সদস্যদের কাছ থেকে চুরি করত আর সদস্যরাও তাদের পাওনা বুঝে নিত সরকারের সঙ্গে জোচ্চুরি করে। এভাবে জীবন চলছিল মসৃণ, কেউ ধনী ছিল না আর কেউ গরিব ছিল না।

একদিন কী করে কী হলো আমরা জানি না, এমনটা ঘটল যে একজন সেলাক এখানে বসবাস করতে এলেন। রাতে তার লণ্ঠন আর গাট্টিবোঁচকা নিয়ে বাইরে না গিয়ে তিনি ঘরে বসে ধোঁয়া ফুঁকতে লাগলেন আর উপন্যাস পড়তে লাগলেন।

রাতে চোরেরা এল, আলো জ্বালানো দেখল আর চলে গেল।

কিছুদিনের মতো এমন চলল। তারপর তারা বাধ্য হলো তাকে বোঝাতে যে সে যদি কিছু না করে থাকতে চায় থাকুক, কিন্তু অন্যকে কিছু করতে না দেয়ার কোনো কারণ তো নেই। প্রত্যেক রাতে তার ঘরে কাটানোর অর্থ হলো কোনো একটা পরিবারের পরের দিন না খেয়ে থাকা।

সেলাকটির পক্ষে কঠিন হলো এ যুক্তির বিরোধিতা করা। তিনি ওদের মতোই সন্ধ্যায় বেরিয়ে যেতে লাগলেন এবং পরদিন সকালে ফিরে আসতে লাগলেন, কিন্তু তিনি চুরি করতেন না। তিনি সৎ ছিলেন আর এটা নিয়ে তো আর কিছু করার নেই। তিনি সেই দূরের সেতু পর্যন্ত যেতেন আর নিচে পানির বয়ে যাওয়া দেখতেন। যখন তিনি ঘরে ফিরতেন তখন দেখতেন যে তার ঘরে চুরি হয়ে গেছে।

এক সপ্তাহেরও কম সময়ে সেলাকটি দেখলেন, তার কাছে একটি পয়সাও নেই, তার খাবারও নেই আর ঘরটাও একদম শূন্য। কিন্তু এটাও বড় কোনো সমস্যা না, যেহেতু এটা তার নিজেরই দোষ; না, সমস্যাটি হলো তার স্বভাব সবাইকে হতাশ করল। কারণ তার যা কিছু ছিল, অন্যদের উনি সেসব চুরি করতে দিয়েছেন, কিন্তু নিজে কারো কাছ থেকে কিচ্ছু চুরি করেননি। ফলে সবসময় এমন একজন লোক রয়ে যেত, যে সকালে বাড়ি ফিরে দেখত যে তার বাড়ির জিনিসপত্র অক্ষত আছে: যে বাড়িতে আসলে তার চুরি করার কথা ছিল। কিছুদিন পর কোনো ঘটনা ছাড়াই যার বাড়িতে চুরি হতো না, সে অন্যদের চেয়ে ধনী হয়ে যেত এবং সে আর চুরি করতে চাইত না। পরিস্থিতিতে আরো খারাপ হলো, যখন কেউ সেলাকটির বাড়িতে চুরি করতে আসত, তখন সে বরাবরই ঘরটি শূন্য পেত। ফলে তারা গরিব হতে লাগল।

এরই মধ্যে যারা ধনী হয়ে উঠল, তারা সেলাকের মতো রাতে সেতুর ধারে গিয়ে নিচে প্রবাহিত পানি দেখত। এতে বিশৃঙ্খলা আরো বাড়ল। কারণ এর অর্থই হলো আরো অনেক লোক ধনী হতে থাকল এবং আরো অনেক লোক গরিব হতে থাকল।

এখন ধনী লোকগুলো দেখল যে তারা যদি প্রতি রাতে সেতুতে যায়, তাহলে তারা দ্রুত গরিব হয়ে যাবে। এবং তারা ভাবল, ‘কিছু গরিব লোককে পয়সা দেয়া যাক অন্যদের ওখান থেকে আমাদের জন্য চুরি করে আনতে।’ তারা চুক্তি করল, বেতন ঠিক করল, লভ্যাংশ ঠিক করল: তারা অবশ্যই তখনো চোর ছিল এবং তারা তখনো একে অন্যকে ঠকানোর চেষ্টাই করে যেত লাগল। কিন্তু এমনটা ঘটতে থাকল, ধনীরা ধনী হতে লাগল আর গরিবরা গরিব হতে লাগল।

কেউ কেউ এত ধনী হয়ে গেল যে তাদের আর চুরি করার প্রয়োজন হলো না কিংবা তাদের ধনী থাকতে অন্য কারো চুরি করার প্রয়োজন রইল না। কিন্তু তারা যদি চুরি থামিয়ে দেয়, তাহলে তারা আরো গরিব হয়ে উঠবে। কেননা গরিবরা তাদের কাছ থেকে চুরি করে। তাই তারা একেবারে হতদরিদ্রদের পয়সা দিতে লাগল, যাতে অন্য দরিদ্রের থেকে তাদের সম্পদ সুরক্ষিত হয় এবং এর মানে হলো, একটা পুলিশ বাহিনী আর কয়েদখানা বানানো হলো।

তো, সেলাকটা আসার কয়েক বছর পরই মানুষ আর চুরির কথা আর চুরি হওয়ার কথা বলত না, কিন্তু তারা কেবল ধনী লোক আর গরিব লোক নিয়ে কথা বলত; কিন্তু তারা তখনো সবাই চোর ছিল।

একমাত্র শুরুর সেলাকটাই বাদে কিন্তু সে দ্রুতই মরে গেল ক্ষুধায়।

যে লোকটি তেরেসা বলে চেঁচাচ্ছিল

 

আমি ফুটপাত থেকে নামলাম, কয়েক কদম পেছালাম, আর রাস্তার মাঝখান থেকে আমার হাত দুটো মুখের কাছে এনে মাইকের মতো করলাম এবং দালানের সবচেয়ে উঁচু তলার দিকে মুখ করে চিত্কার করলাম:

‘তেরেসা!’

আমার ছায়া চাঁদের আলোয় আতঙ্কগ্রস্ত হলো এবং পায়ের কাছে গুটিয়ে রইল।

কেউ একজন পাশে এল। আমি আবার চেঁচিয়ে উঠলাম: ‘তেরেসা!’ লোকটা আমার কাছে এল আর বলল, ‘তুমি যদি জোরে না চেঁচাও, ও তো তোমার কথা শুনতে পাবে না। চলো দুজনই চেষ্টা করি। তাই তিন গুণে আমরা চেঁচিয়ে উঠব।’ তারপর সে বলল, ‘এক, দুই, তিন।’ আমরা চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘তে-রেএএএ-সাআ!’

নাটক দেখে বা ক্যাফে থেকে একদল বন্ধু পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমাদের ডাকতে দেখেছিল। তারা বলল, ‘আসো, আমরা তোমাদের সাথে চিত্কার করব।’ তারপর তারাও আমাদের সঙ্গে যোগ দিল, প্রথমজন আবার এক থেকে তিন বলল, তারপর সবাই একসঙ্গে চেঁচাল, ‘তে-রেএএএ-সাআ!’

তারপর অন্য কেউ একজন এল এবং আমাদের সঙ্গে যোগ দিল। মিনিট পনেরোর মধ্যে সেখানে রীতিমতো একটা দল হয়ে গেল, প্রায় ২০ জন। তারপর একটু পর পরই একজন না একজন নতুন কেউ এসে যোগ দিল।

নিজেদের একত্র করে একটা যথোপযুক্ত চিত্কার একসঙ্গে দেয়া খুব সহজ ছিল না। সবসময়ই এমন একজন কেউ থাকত, যে তিন বলার আগেই চেঁচিয়ে উঠেছে কিংবা খুব দীর্ঘ সময় ধরে চেঁচিয়েছে, তবে শেষতক আমরা ঠিকঠাক এবং  সুন্দরমতোই ব্যাপারটা আয়ত্তে আনলাম। আমরা একমত হয়েছিলাম যে ‘তে’ উচ্চারিত হবে ধীরে এবং দীর্ঘ স্বরে, ‘রে’ জোরে এবং দীর্ঘ স্বরে, ‘সা’ ধীরে ও সংক্ষিপ্ত স্বরে। এভাবেই ভালো শোনাচ্ছিল। শুধু কেউ একজন ঝামেলা করলেই হইচই মনে হতো।

আমরা পুরো ব্যাপারটা যখন ঠিকঠাক শুরু করে ফেলেছি, তখন কেউ একজন, যার কণ্ঠটা তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ নয়, কিন্তু মুখটা নিশ্চয়ই বৈশিষ্ট্যময়, সে জিজ্ঞেস করে বসল, ‘কিন্তু আপনি নিশ্চিত মেয়েটি বাড়ি আছে?’

‘না’, আমি বললাম।

‘এট িতো ঠিক না’, আরেকজন বলল, ‘আপনার চাবিটা কি আনতে ভুলে গেছেন?’

‘আসলে’, আমি বললাম, ‘আমার চাবি আমার কাছেই আছে।’

‘তাহলে’, ওরা জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি উপরে যাচ্ছেন না কেন?’

‘আমি তো ওখানে থাকি না,’ আমি উত্তরে বললাম, ‘আমি শহরের অন্য মাথায় থাকি।’

‘বেশ, তাহলে, আমার কৌতূহল মার্জনা করবেন,’ বৈশিষ্ট্যময় একটা কণ্ঠ জিজ্ঞেস করল, ‘তাহলে ওইখানে কে থাকে?’

‘আমি সত্যিই জানি না,’ আমি বললাম।

এটা শুনে লোকজনকে খানিকটা মর্মাহত হয়েছে মনে হলো।

‘তাহলে, দয়া করো বিষয়টা বুঝিয়ে বলেন দেখি,’ খুব ধারালো স্বরে কেউ একজন জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কেন নিচ থেকে তেরেসা তেরেসা বলো চেচাচ্ছেন?’

‘আমার মনে হয়’ আমি বললাম, ‘আমরা চাইলে অন্য কোনো নাম ধরেও ডাকতে পারি, কিংবা অন্য কোনো জায়গায় গিয়েও চেষ্টা করতে পারি আপনারা চাইলে।’

প্রশ্নকারী খানিকটা বিরক্তই হলো।

‘আমি ধরে নিচ্ছি আপনি আমাদের সঙ্গে কোনো চালবাজি করছেন না’—সেই বৈশিষ্ট্যময় লোকটা বলল, তার গলায় সন্দেহ।

‘কী,’ আমি বিরক্তির সঙ্গেই বললাম। ঘুরে দাঁড়ালাম লোকটার দিকে বোঝাতে চাইলাম আমি কোনো চালবাজি করছি না।। লোকটা আর কিছু বলল না।

তবে মুহূর্তের জন্য একটা বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হল।

‘দেখুন’ কেউ একজন তখন বেশ নম্রভাবেই বললেন, ‘আমি বরং তেরেসাকে আরেকবার ডাকি, তারপর ফিরে যাই ঘরে।’

তাই সই, আমরা আরেকবার চেচালাম। ‘এক দুই তিন... তেরেসা!’ কিন্তু এটা খুব ভালোভাবে হলো না। তারপরও লোকেরা সবাই বাড়ির দিকে রওনা হলো, কেউ এদিকে তো কেউ ওদিকে।

আমি এরই মধ্যে চত্বরের দিকে রওনা হয়েছি। তখন মনে হলো একটা কণ্ঠ শুনলাম ‘তে-রেএএএ-সাআ!’

কেউ একজন হয়তো রয়ে গেছে এবং চেঁচিয়ে যাচ্ছে।

কেউ কেউ একরোখা হয়।