চোখের সামনে দিগন্তপ্রসারী পর্বতের ওই সানুদেশ থেকে বয়ে আসছে নির্ঝর। তার স্বচ্ছ রেতের ধারায় পড়ছে মাখন-মোলায়েম রোদ। সে রোদে চিকচিক করছে পাহাড়ের শীর্ষে চিনার-সফিদারের শাখায় জমে থাকা বরফ। তার শুভ্র আভার সঙ্গে গলা মিলিয়ে পাদদেশে বইছে শীতল বায়ু, বেশ ঢিমেতেতালায়। দূর থেকে পান্নারঙা সরোবরের জল স্থানটিকে করে রেখেছে মনোহর। পাহাড়ি মরীচিকার ভ্রমে অতি দূরের কুটিরগুলো বেশ নিকটে সরে এসে যেন ডাকছে। সহজে এড়ানো যাচ্ছে না সে কুহকী ডাক। চিরায়ত এ দৃশ্য ভূস্বর্গ কাশ্মীরের। তার নামটি এমন যেন তা কানে এলেই নিতান্ত ঘরকুনো ব্যক্তির ওপরও ওয়ান্ডারলাস্টের ভূত সওয়ার হয়।
অনন্যসাধারণ এ সৌন্দর্যই হয়তো কাশ্মীরের জন্য কাল হয়েছে। সুপ্রাচীন সময় থেকে কত শত হিংস্র নৃপতি যে এর প্রতি থাবা বিস্তার করেছে কল্হণ ও জোনরাজের রাজতরঙ্গিনী, অনামা রচনাকারের বাহারিস্তান-ই-শাহী, আলি কাশ্মীরির তোহফাতুল আহবাব প্রভৃতি প্রাচীন গ্রন্থ সেসবের সাক্ষ্য বহন করছে। অবশ্য কাশ্মীরকে ভুবনজোড়া খ্যাতি এনে দিয়েছে কাশ্মীরি শাল। শাহতুশ আর পশমিনা নামে এগুলো পুরো বিশ্বের মানুষের কাছে জনপ্রিয় ছিল। এদের সুতোয় সুতোয় কাশ্মীর তার দুর্ভাগ্য এখনো বুনন করে চলছে। রক্তের আখরে রচিত কাশ্মীরের ভাগ্য বিড়ম্বনার যুগ যেন শেষ হতেই চায় না।
কাশ্মীরি শালের অতুলনীয় ও বহুমূল্য দুটি প্রকারভেদ হলো শাহতুশ ও পশমিনা শাল। শাল মূলত ফারসি ভাষার একটি শব্দ। ফারসিতে এর অর্থ হলো আবরণ-বস্ত্র। ব্যাপক অর্থে কাঁধ থেকে ঝুলিয়ে দেয়া উলনির্মিত বস্ত্রবিশেষ হলো শাল। এমন উল বেশ মোলায়েম ও উষ্ণতা প্রদানকারী হয়ে থাকে। কাশ্মীর অঞ্চলে শালকলা অর্থাৎ যাকে আমরা শালের বুনন কৌশল বলতে পারি তার ঐতিহ্য অতি প্রাচীন। মহাভারতে বর্ণিত আছে, যখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পাণ্ডবদের অভিমত নিয়ে কৌরবদের কাছে গিয়েছিলেন তখন ধৃতরাষ্ট্র তাকে অন্য উপঢৌকনের সঙ্গে পার্বত্য প্রদেশে বুনন হওয়া এক ধরনের শাল উপহারস্বরূপ দিতে চেয়েছিলেন। স্পষ্টতই এ শাল পশমিনা শালকে নির্দেশ করে।
ঐতিহ্যগতভাবে কাশ্মীরি শাল বলতে অভিজাত শ্রেণীর লোকেরা শাহতুশ ও পশমিনাকেই বোঝাত। ফারসি শব্দ শাহতুশ মানে হলো রাজ-উল। তিব্বত ও লাদাখের এক প্রকার বিশেষ মৃগের সূক্ষ্ম লোম থেকে এ উলগুলো আসে। মূলত অন্য সব উলের তুলনায় এগুলো শ্রেষ্ঠ বিধায় শাহতুশ তকমা মিলেছে এর কপালে। চিরু নামে পরিচিত এ মৃগের শিং কাস্তে আকারের হয়ে থাকে। এ প্রাণীগুলো প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় বিয়োগ ৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় হিমালয়ের উঁচুতে থাকতে পারে। শীতের সময়ে এরা প্রায় পাঁচ হাজার মিটার উঁচুতে চলে যায় যেখানে গায়ের মিহি লোম প্রাণীগুলোকে সেখানে বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় উমের জোগান দেয়। গ্রীষ্মকালে এরা বিস্তীর্ণ চারণভূমিতে নেমে আসে। এ সময়ে এদের গায়ে বিশেষ রকমের এক পোকার জন্ম হয় যার কারণে এরা পাথর ও ঝোঁপের সঙ্গে গা ঘষতে থাকে। ফলে লোমগুলো আরো মিহি হতে থাকে। তবে মৃত্যুর পরই লোমগুলোর গুণগত মান বৃদ্ধি পেয়ে থাকে বলে শাহতুশের জন্য এ বিরল প্রজাতির হরিণটিকে হত্যা করা হয়। একটি শাহতুশ শাল বানাতে অন্তত চারটি চিরু হরিণকে মারার প্রয়োজন পড়ে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে রানী ভিক্টোরিয়া ও মহারানী জোসেফিনের কাছে যে শাল পৌঁছেছিল সেগুলো মূলত এ শাহতুশ শালই ছিল। মোঘল আমলে এগুলোকে আংঙ্গুঠি শাল বা রিং শাল বলা হতো। এক মিটার বাই দুই মিটার এমন একটি শাল সাধারণত একটি আঙুলের আংটি দিয়ে গলে বেরিয়ে যেতে পারত। বর্তমানে বিরল প্রজাতির হরিণটির শিকার নিষিদ্ধ হওয়ায় শালটির দেখা মেলা ভার। একটি শাহতুশ শালের মূল্য নাকি ২ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত হয়ে থাকে।
এদিকে পশমিনা শব্দটি উদ্ভূত হয়েছে ফারসি পশম থেকে। উল বুননের এক ধরনের বিশেষ রীতিকে ফারসিতে পশম বলা হয়ে থাকে। পশমিনা শালের বুননে ব্যবহূত এ উল আসে চাংথাঙ্গি নামের এক বিশেষ তিব্বতি বকরি থেকে। লাদাখের পূর্বাংশে ভারত-চীন সীমান্তের তিব্বতি মালভূমিতে এদের বসবাস। এদের লোম চিরুনি দিয়ে আঁচড়ে সংগ্রহ করা হয় যা থেকে চরকা কেটে উল তৈরি করা হয়। এর পর বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় পশমিনা শাল তৈরি হয়। পশমিনা শাল তৈরিতে বকরিটিকে মারা হয় না। বরং একই বকরি থেকে পরের বছর আবার উল তৈরি করা যায়।
কাশ্মীর প্রদেশে যে পূর্বকাল থেকেই শালকলার প্রচলন ছিল বিভিন্ন ঘটনায় তার প্রমাণ পাওয়া যায়। এর বুনন শিল্পের উল্লেখ পাওয়া যায় খ্রিস্টপূর্ব একাদশ শতাব্দীতে। হয়তোবা শিল্পটি এর থেকেও বেশ পুরনো হয়ে থাকবে। কেউ কেউ বলেছেন, অশোকের রাজত্বকালে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দী থেকেই এটি প্রসিদ্ধ হয়। এর পূর্বে এটি শীত থেকে বাঁচতে উষ্ণ পোশাক হিসেবে ব্যবহূত হতো। এর মধ্যে খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে এসে এগুলো ফ্যাশনের জন্য ব্যবহূত হতে শুরু হয়। কারণ এরই মধ্যে শালের মর্যাদা ও গুণমানের প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়। অভিজাত শ্রেণীর লোকদের জন্য এবং রফতানির লক্ষ্যে শালগুলো এ সময়ে বাজারজাত হতো। এছাড়া এ শিল্পকে বিকশিত করার লক্ষ্যে পঞ্চদশ শতাব্দীতে কাশ্মীরের সুলতান জয়নুল আবেদিনের উদ্যোগের কথা বিস্মৃত হওয়ার নয়।
উষ্ণতা, হালকা ওজন এবং বিশিষ্ট নকশার জন্য এর ব্যবসা ধীরে ধীরে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে উচ্চবিত্তের চমকদার পোশাক হিসেবে এর প্রকাশ ঘটে এবং ষোড়শ শতাব্দীতে মোগল ও ইরানি সম্রাটদের ব্যক্তিগত পরিচ্ছদে এবং দরবারের সদস্যদের খিলাত প্রদানপূর্বক সম্মানিত করতে এটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে এটি ব্রিটেনে ও ফ্রান্সে পৌঁছে এবং রানী ভিক্টোরিয়া ও মহারানী জোসেফিনের বিলাসিতার বস্তু হিসেবে ব্যবহূত হতে শুরু হয়। এভাবে এটি স্থাননামের সমার্থক যায়।
কাশ্মীরি শালের উৎপত্তি নিয়ে বেশ বিতর্কও রয়েছে। ১৫২৯ সালে কাশ্মীরের শাসক হন সুলতান নাজুকশাহ। তার রাজত্বকালে কাশ্মীরের মির্জা হায়দারের বাবুর্চি নক্শবেগ কাশ্মীরে এসেছিলেন এবং স্বীয় যোগ্যতায় কাশ্মীরের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। পরবর্তী সময়ে তিনি কাশ্মীরের উজির-এ-আলা নিযুক্ত হয়ে যখন স্বীয় মালিক মির্জা হায়দার শাহর কাছে উপহার নিয়ে যান তখন সে অনুপম বস্তু দেখে তার মনিব অত্যন্ত প্রসন্ন হলেন এবং তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, এটা কী বস্তু? নক্শবেগ উত্তরে বলেছিলেন, হুজুর। এ বস্তুটির নাম শাল। আপনার জন্য এটি আমি কাশ্মীর থেকে তৈরি করে নিয়ে এসেছি।
কাশ্মীরের শালকলার ঐতিহ্য অবশ্য এর থেকেও অনেক পুরনো হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কাশ্মীরের বিখ্যাত সুলতান জয়নুল আবেদিনের আমল থেকে ইতিহাসে এর দেখা মেলে। বলা হয়ে থাকে, ১৩৯৮ সালে তৈমুর লং ভারত আক্রমণ করেন। আর সে সময়ে সুলতান সিকান্দার শাহ কাশ্মীরের রাজা ছিলেন। তিনি তৈমুর লংকে অনেক মহার্ঘ্য বস্তু উপহারস্বরূপ প্রদান করেছিলেন। সুলতান সিকান্দার যেন তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে না বসেন সেজন্য সুলতানের পুত্র জয়নুল আবেদিনকে তৈমুর লং সাথে করে সমরখন্দ নিয়ে যান। মনোহর সে শহরে বিচরণ করার অনুমতি জয়নুল আবেদিন ঠিকই পেয়েছিলেন কিন্তু শহরের পরিসীমা পার হওয়ার অনুমতি তাকে দেয়া হয়নি। তৈমুর লং ছিলেন শিল্পের গুণগ্রাহী ও পৃষ্ঠপোষক। যখন যে দেশ জয় করতেন স্বদেশে ফিরে আসার সময় সে দেশ থেকে শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের সঙ্গে করে সমরখন্দ নিয়ে আসতেন তিনি। রাজপুত্র জয়নুল আবেদিনের প্রবাসজীবন সমরখন্দে জড় করা এসব শ্রেষ্ঠ শিল্পীর সান্নিধ্যে অতিবাহিত হয় এবং তাদের কাছ থেকে তিনি শিল্পে দীক্ষা লাভ করেন। তৈমুরের মৃত্যুর পর জয়নুল আবেদিন বন্দিদশা থেকে মুক্তি লাভ করেন। কিন্তু সমরখন্দের শিল্পীদের প্রেমে তিনি আরো কিছু কাল সেখানে থেকে যান। এ সময়ে তার সঙ্গে কাশ্মীর যেতে অনেক শিল্পীকে তিনি রাজি করান এবং সফলকামও হন। কাশ্মীরে এসে এসব শিল্পী সম্রাটের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। রাজ্যের পক্ষ থেকে সব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ায় তারা কাশ্মীরে বসবাস শুরু করেন। জয়নুল আবেদিন যখন কাশ্মীরের সুলতান হলেন তখন তিনি আরব ও ইরান থেকে অনেক সিদ্ধহস্ত শিল্পীকে স্বীয় রাজ্যে আমন্ত্রণ করেন এবং বিশেষ প্রলোভন দিয়ে তাদের কাশ্মীরে চিরস্থায়ী করেন। তিনি তুরস্ক থেকেও দক্ষ তাঁতিদের আমন্ত্রণ করেন। তার ঐকান্তিক আগ্রহে এসব শিল্পী কাশ্মীরে স্থায়ী নিবাস গাড়েন এবং এ শিল্পের সামগ্রিক উন্নতি সাধন করেন। এভাবেই কাশ্মীরি শালের বিজয় পতাকা দূরে বহুদূরে উড্ডীন হয় এবং এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়।
মোগল আমলেও কাশ্মীরের শাল শিল্পের প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়। বিদেশ থেকে মোগল সম্রাটরাও অনেক তাঁতিদের কাশ্মীরে স্থায়ীভাবে নিয়ে আসেন। ১৫২৬ সালে সম্রাট বাবর ভারতে মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং তার দরবারের সদস্যদের খিলাত দেয়ার প্রথা প্রচলন করেন। খিলাত হলো সাধারণত মহার্ঘ্য কাপড়ের তৈরি এক সেট সম্মাননীয় পোশাক, যা রাজাদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রথার অন্তর্ভুক্ত একটি বিষয় হিসেবে গণ্য হতো। সম্রাটের পেয়ারের লোকদের কাছে এটি রাজ অনুগ্রহ হিসেবে বিবেচিত হতো। খিলাতের সেটের মধ্যে পাগড়ি, লম্বা কোট, গাউন, সজ্জিত জ্যাকেট, স্যাশ, শাল, পাতলুন, শর্ট ও দোপাট্টা শামিল ছিল। এগুলোর একটি বা সবই পশমিনার তৈরি ছিল। স্বর্ণের সুতা দিয়ে সেলাই করা হতো সব। ১৫৮৬ সালে বাবরের পৌত্র আকবর কাশ্মীর জয় করেন। তার সময়ে এক জোড়া কাশ্মীরি শাল খিলাতের উপঢৌকন হিসেবে অত্যাবশ্যকীয় ছিল। শাহতুশ শালের প্রতি আকবরের বিশেষ প্রেম ছিল বলে জানা যায়। কাশ্মীর বিজয়ের পর তিনি পুরো শরীর ঢাকার জন্য পর্যাপ্ত লম্বা শাল তৈরির হুকুম করেন। এ থেকেই জামবার শালের উদ্ভব বলে ধরে নেয়া হয়। আইন-ই-আকবরিতে উল্লেখ রয়েছে, সম্রাট আকবর কাশ্মীরি শালগুলোর অনুরাগী ছিলেন। বলা হয়ে থাকে, তার নিজের কাছে শালের এক মহাভাণ্ডার ছিল। আবুল ফজলের মতে, কাশ্মীরের শালকলা সম্রাট আকবরের শাসন আমলে প্রভূত উন্নতি সাধন করে। শাহতুশ শালের উন্নতি এ সময়েই হয়ে থাকে। মূলত আংটির ভেতর দিয়ে এ শালকে সহজেই যাতায়াত করানো যেত। শাহজাহানের রাজত্বকাল পর্যন্ত শাহতুশ শাল মোগল সম্রাটদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। আর এর থেকে কম মূল্যের পশমিনা শাল রাজপরিবারের বাইরের কুলীন লোকদের খিলাত হিসেবে প্রদান করার রীতি ছিল।
ষোড়শ শতাব্দী থেকে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত ইরানের সাফাবিদ, জান্দ ও কাজার সম্রাটরা কাশ্মীরি শাল পরতেন। ইরানি অভিজাত শ্রেণী ওপরের ঢিলেঢালা পোশাক হিসেবে কাশ্মীরি শালের তৈরি বুটিদার কাপড় পরিধান করতেন। সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীর কাশ্মীরে বিরাজমান অস্থিরতা শাল শিল্পকে ব্যাহত করেছিল। এ সময়ে কাশ্মীর আফগান ও শিখ শাসনের অধীনে আসে। আফগান শাসনকালে এ শিল্পের ওপর অনেক কর চাপানো হলেও এর উন্নতির গতি বহাল থাকে। করারোপের পর প্রতি বছর সরকারের চার লাখ রুপির অধিক উপার্জন হতো। এ সময়ে আফগানিস্তান, তুর্কিস্তান ও রাশিয়া প্রভৃতি দেশ থেকে কাশ্মীরি শালের চাহিদা বাড়তে থাকে। এ যুগেই জামবার, শাহতুশ প্রভৃতি কাশ্মীরি শাল খ্যাতি লাভ করে। ১৮১৯ সালে পাঞ্জাবের রঞ্জিত সিং কাশ্মীর জয় করে একে শিখ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। তার দরবার কাশ্মীরের শাল ও শালনির্মিত কাপড়ে সজ্জিত ছিল। তিনি কাশ্মীরের তাঁতিদের পাঞ্জাবে বসতি গাড়তে অনুপ্রাণিত করেন। স্বীয় অনুসারীদের ভেট প্রদানে, ব্রিটিশসহ অন্য শাসকদের সম্মানের পোশাক প্রদানে এ সময়ে কাশ্মীরের শালগুলো ব্যবহূত হতো।
১৮৩২-৩৩ সময়ে কাশ্মীরে ভয়ঙ্কর দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এর ফলে এ অঞ্চলের শাল শিল্পে দুর্যোগ নেমে আসে। অনেক তাঁতি কাশ্মীর ত্যাগপূর্বক লুধিয়ানা, আম্বালা, অমৃতসর, জলন্ধর পাঞ্জাবের প্রভৃতি শহরে জীবিকার সন্ধানে চলে যান। ডোগরা শাসকদের সময়ে পুনরায় এ শিল্প বিকাশ লাভ করে। মহারাজা গুলাব সিংহের রাজত্বকালে ওই তাঁতিরা পুনরায় কাশ্মীর ফিরে আসতে শুরু করেন এবং রাজ্যের পৃষ্ঠপোষকতায় তারা মনপ্রাণ দিয়ে শাল শিল্পের উন্নতিকল্পে লেগে পড়েন। ঐতিহাসিক হিসাবমতে, মহারাজ গুলাব সিংহের সময়ে প্রায় ২৬ হাজার তাঁতি ১২ হাজার তাঁতযন্ত্রে কাজ করতেন। মহারাজ প্রতাপ সিংহের সময়ে তাঁতির সংখ্যা বেড়ে ৮১ হাজার ৪৬৬ জনে উপনীত হয়।
পশমিনা শাল কাশ্মীরের গৌরব। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর উলে কৃত্রিমতা মিশ্রিত হয়েছে। আসল পশমিনা শালের বৈশিষ্ট্য হলো, এটি স্পর্শে বেশ মোলায়েম ও ওজনে অনেক হালকা হয়। এর উলের তন্তুগুলো আগুনে পুড়লে চুল পোড়ার গন্ধ পাওয়া যায়। আসল পশমিনা শাল আংটির ভেতর দিয়ে এপার-ওপার অতিক্রম করতে পারে। প্রথম প্রথম কাশ্মীরি শাল মূলত শাহতুশ বা পশমিনা উলের বুননের মাধ্যমে তৈরি হতো। বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে কাশ্মীরি শাল বুনন পদ্ধতিতে মধ্যবিত্তদের জন্য শাল তৈরি হওয়া শুরু হয়। তখন মেরিনো নামে আরেক ধরনের উল দিয়ে উচ্চবিত্তদের জন্য শাল তৈরি হতো। প্রথমে এটি ভারতের পুরুষদের বহিরাবরণ রূপে ব্যবহারের জন্য তৈরি হলেও পরবর্তী সময়ে ভারত, ইউরোপ ও আমেরিকার সংস্কৃতিতে আভিজাত্যের প্রতীকরূপে ব্যবহূত হতো। ধীরে ধীরে মেয়েরা বাবার কাছ থেকে বিয়ের উপহারস্বরূপ এটি পেতে শুরু করে এবং আরো পরে গৃহের অভ্যন্তরের নকশায়ও এটি ব্যবহূত হতে থাকে।
কাশ্মীরি শালের মূল দিকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো এর বয়ন কৌশল ও উলের সূক্ষ্মতা। শাল নির্মাণে ব্যবহূত বস্তু, তার মূল্যমান, নির্মাণ পদ্ধতি, উৎপাদনের পদ্ধতি এবং পরিধানকারীর সামাজিক অবস্থান প্রভৃতি বিষয়ের ওপর শালের প্রতীকী অর্থ নির্ভর করে। আজ আর শাহতুশ শাল উৎপাদিত হয় না। কালেভদ্রে আসল পশমিনার দেখা মেলে। কাশ্মীরে উৎপন্ন শালগুলোর মধ্যে কাশ্মীরি নামে আরেকটি বিশেষ শাল রয়েছে। এটির উলও একই চাংথাঙ্গি ছাগলের লোম থেকে আসে। তবে লোমগুলো পশমিনা শালের লোম থেকে মোটা হয়ে থাকে। সাধারণত মানুষের চুল ৭০ মাইক্রনের মতো মোটা হয়। এর সঙ্গে উল্লিখিত শালগুলোর পুরুত্ব তুলনা করলেই এদের মাহাত্ম্য বোঝা যাবে— শাহতুশ ১০-১২ মাইক্রন, পশমিনা ১২-১৬ মাইক্রন, কাশ্মীরি ১২-২১ মাইক্রন, মেরিনো ১৮-২৪ মাইক্রন।
কাশ্মীরি শালের অর্থ ভারতে ও পশ্চিমে ভিন্ন। ভারতে শাল পুরুষরাই ব্যবহার করত। এখানে শালের সৌন্দর্য আভিজাত্যের প্রতীক ছিল। পাশ্চাত্যে ভিন্ন ভিন্ন সময়ের ফ্যাশনের ওপর ভিত্তি করে এর অর্থ ভিন্ন ভিন্ন হতো। সেখানে এ শাল নারীদের বসন হিসেবে অধিক ব্যবহূত হতো। পাশ্চাত্য সমাজের ভ্রমাত্মক অনুকরণের ফলে এটি গৃহসজ্জার উপকরণ হিসেবে পূর্বে প্রাধান্য লাভ করে। পণ্ডিত, ব্যবসায়ী ও সাংবাদিকরা কখনো কখনো ভুলবশত কাশ্মীরি ও পশমিনা শব্দ দুটোকে পরস্পরের প্রতিশব্দ হিসেবে ভুল করে আসছেন। তারা সবাই ধরে নিয়েছেন যে, যেহেতু দুটো বস্তুই পশুর তন্তু থেকে উৎপন্ন হয় সেহেতু তারা এক। প্রকৃতপক্ষে পশমিনা কাশ্মীরি শালের একটি বিশেষ ও উন্নত সংস্করণ। তাই সব পশমিনা কাশ্মীরি শাল কিন্তু সব কাশ্মীরি শাল পশমিনা নয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে পশমিনা সালের যেসব কারিগর পাঞ্জাবে চলে গিয়েছিলেন তারা পশমিনার নকল এক ধরনের শাল তৈরি শুরু করেন। মেরিনো উল ব্যবহার করে এ শাল তৈরি করেন তারা। নতুন এ শালের নাম ছিল র্যাফল। কেউ কেউ এ র্যাফলকে কাশ্মীরি শালের প্রজাতিভুক্ত করে। কিন্তু মোটা উলের বুনন মানেই হলো তাতে কাশ্মীরি শালের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হালকাভাব থাকবে না। অতি সম্প্রতি ১৯৯০ দশকের শেষের দিক থেকে পশ্চিম ইউরোপের ও আমেরিকার বিক্রেতারা সাদাসিদে বুননের শালকে পশমিনা শাল বলে চালিয়ে আসছে। ফলে পশমিনা অভিজাতদের থেকে মধ্যবিত্ত জনপ্রিয়তার কাতারে চলে যায়।
কাশ্মীরের প্রতি সৌন্দর্যপ্রেমীদের মুগ্ধতার কোনো শেষ নেই। অঞ্চলটিতে ঐতিহ্যবাহী ও লাজবাব বহু হস্তশিল্পের সমাহার রয়েছে। রঙ-বেরঙের সাঙপাথর, সেসব পাথরের ওপর করা বিচিত্র অলংকরণ, গালিচা, কম্বল, আখরোট কাঠের কাজ, শাহতুশ ও পশমিনা শাল, পাপিয়ার মাশে প্রভৃতি এর উল্লেখযোগ্য হস্তশিল্প। এগুলোর প্রতিটি কাশ্মীরিদের ইতিহাসের মতোই লোহুর রঙে রঞ্জিত এবং দীর্ঘকালের সঞ্চিত অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার থেকে উৎসারিত। বুনন কৌশল, সৌন্দর্য, প্রকরণ ও রঙের জন্য এগুলোর মধ্যে শাহতুশ ও পশমিনা শাল বিশ্বজুড়ে কদর পেয়েছে।
ইসফানদিয়র আরিওন: লেখক ও অনুবাদক





