ভারতে দুই জাতের ছাগলের লোম থেকে পশমিনা তৈরি করা যায়। একটি চাংথাঙ্গি ও অন্যটি চেগু। জম্মু ও কাশ্মীরের একটি অংশের মানুষ বিশেষভাবে পশমিনার কাজ করে থাকে। বলে রাখা ভালো পশমিনা কথাটি পশম থেকে এসেছে। কেবল বিশেষ ধরনের ছাগলই নয়, এর জন্য প্রয়োজন বিশেষ আবহাওয়া ও বিশেষ পরিচর্যা। এ কারণে পশমিনা-ছাগলের (চাংথাঙ্গি ও চেগু জাতের ছাগলকে ‘পশমিনা ছাগল’ বলা হয়) প্রজনন ও চারণক্ষেত্র আলাদা করে রাখা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই এ সীমানার মধ্যে বাইরের মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ। লেহ জেলার চাংথাং সাবডিভিশন, লাহুলের টড ও মিন্নার জেলা, চাম্বার (হিমাচল প্রদেশ) পাঞ্জি উপত্যকায় পশমিনার প্রাথমিক কাজ হয়। এসব অঞ্চলের একটি বিশেষত্ব হলো এগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে তিন থেকে পাঁচ হাজার মিটার পর্যন্ত উঁচু। এখানকার আবহাওয়া পশমিনা তৈরির উপযুক্ত। অঞ্চলটিকে এককথায় বা সহজে প্রকাশের ক্ষেত্রে ‘পশমিনা বেল্ট’ বলা হয়। আর জম্মু ও কাশ্মীরের চাংপা জনগোষ্ঠীর প্রধান কর্ম ও জীবিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে পশুপালন ও লোম সংগ্রহ।
কোমলতার
কারণে পশমিনা বিখ্যাত। মূলত পশুলোম থেকে তৈরি সুতোর মধ্যে পশমিনা কোমলতম, হালকা ও দীর্ঘস্থায়ী। নানা ধরনের শৌখিন ও প্রয়োজনীয় পোশাক তৈরিতে পশমিনা ব্যবহার করা হয়। পশমিনার ইতিহাস দীর্ঘ। এর মধ্যে নানা সময়ে পশমিনার উন্নতি হয়েছে। কোনো কোনো বাহ্যিক কারণে এর আবেদন বেড়েছে। তিব্বতি অ্যান্টিলোপ চিরুর পশম থেকে ‘শাহতোষ’ নামে একধরনের ফাইবার তৈরি করা হতো। এটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে গিনেস বুকে পশমিনা বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান ফাইবারের জায়গাটি লাভ করে।
পশমিনার
এ উৎপাদন প্রক্রিয়ার বেশকিছু ধাপ রয়েছে। প্রাথমিক ধাপটিতে চাংপা জাতি উল্লেখযোগ্য। পশমিনা তৈরির জন্য এ অঞ্চলে পশুপালন করা হয়। বলা চলে চাংপা জাতি পশুপালনকেই তাদের জীবিকা করে নিয়েছে। চাংথাঙ্গি ছাগল বাদেও চাংলুক ভেড়া থেকেও পশমিনা তৈরি করা হয়। মূলত শীতপ্রধান এ অঞ্চলে পশুর মাংস খাদ্য এবং পশুলোম থেকে সুতা তৈরি করা অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে খরচ জোগান দেয়। শুষ্ক আবহাওয়ার এ অঞ্চলে পশুপালক যাযাবররা পুরনো ধারার কাজের ওপর নির্ভর করেন। ভারতের শুষ্ক অঞ্চলের আয়তন প্রায় চার লাখ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ দশ হাজার বর্গকিলোমিটার অঞ্চলে এ চাংপা জনগোষ্ঠী ও পশমিনার উৎপাদনের কাজটি হয়।
জম্মু-কাশ্মীরে পশমিনা ছাগল পালন ও পশমিনা উৎপাদনের পুরো অঞ্চলকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়—কারজোক, নিয়োমা, দারবুক। এখানে মোট ১৭টি গ্রামের প্রায় তিন হাজার পরিবারের মধ্যে দুই হাজারের বেশিসংখ্যক পরিবার পশমিনা ছাগল পালনের সঙ্গে জড়িত। জম্মু-কাশ্মীর সরকারের ২০০৬ সালের এক হিসাব অনুসারে লাদাখের অর্থনীতি তথা আয়ের ৬০ শতাংশই আসত গৃহপালিত পশু থেকে। চাংথাঙ্গির উঁচু এলাকায় ছাগল ও ভেড়া চড়ে বেড়ায়। এ অঞ্চলের আবহাওয়া ছাগলের লোমকে কোমল রাখে, যা পশমিনার জন্য প্রয়োজনীয়। চাংপারা ষাঁড়ও পালন করে কিন্তু মোট গৃহপালিত পশুর তুলনায় এর সংখ্যা কম। এ অঞ্চলে ঘোড়া, গাধাসহ আরো কিছু পশুপালন করা হয়, যা সাধারণত পশমিনা ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনেই ব্যবহূত হয়।
চাংপারা
মূলত তিব্বত থেকে এসেছিলেন। এরপর জম্মু-কাশ্মীর, লাদাখ, লেহ অঞ্চলে বসবাস করতে থাকেন। যাযাবর এ জাতির মাধ্যমেই পশমি বস্ত্রের ব্যবসাটি শুরু হয়। বলা চলে তিব্বতের সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশের বহির্বাণিজ্যের সূচনা হয়। এ অঞ্চলের প্রতিটি পরিবার আনুমানিক ৫০টির মতো ছাগল পালন করে। কারো কারো তিন শতাধিক ছাগলও আছে। এখানেও সামাজিক অবস্থান ও বিত্তের প্রভাব রয়েছে। ছাগল চড়ানোর পাশাপাশি পরিবারগুলো এর রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিচর্যা করে থাকে। capra
hircus নামে এই ছাগলগুলো তাদের ‘গার্ড হেয়ারের’ জন্য বিখ্যাত। ছাগলগুলো মাঝারি আকারের। উচ্চতায় ৬০ থেকে ৮০ সেন্টিমিটার। ছাগ ও ছাগীর ওজন যথাক্রমে ৪০-৪৫ ও ৩০-৩৫ কেজি হয়। এদের একটি বিশেষত্ব হচ্ছে নানা রঙের হওয়া। এগুলো ধবধবে সাদা যেমন হয় তেমনি কালো, ক্রিম, ধূসর, খয়েরি, লালও হয়ে থাকে।
চাংথাঙ্গি
ও চেগু জাতের ছাগলের কয়েকটি ভাগ রয়েছে। পশ্চিমা, পূর্বদিকের, উত্তরের এবং পশমিনা ও মোহাইর ক্রসব্রিড। পশ্চিমা ছাগলগুলো মূলত কিরগিজ গোত্রের। এ জাতের ছাগলের আন্ডারকোট ফাইবারের দৈর্ঘ্য হয় ৯-১১ সেন্টিমিটার এবং ব্যাস হয় ১৮-২০ মাইক্রোমিটার। ইন্টার্ন বা মঙ্গোলিয়ান জাতের ছাগলের পশম কিরগিজের হিসেবে তুলনামূলক উঁচু মানের। নর্দার্ন জাতের ছাগল তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে পশমিনা-মোহাইর জাতের ছাগলের লোম সবচেয়ে লম্বা হয়। এ ছাগলগুলো নিয়ে লাদাখের চাংপা জাতির লোকেরা এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায়। নতুন নতুন তৃণভূমি খুঁজে নিয়ে সেখানে ছাগল চড়ায়।
এসব
কারণে চাংপাদের ঘর আমাদের শহুরে কিংবা স্থায়ী ঘরের মতো নয়। তারা বসবাস করে তাঁবুতে। গোলাকার এ তাঁবুগুলো রেবো নামে পরিচিত। ছাগলগুলো সারা দিন ময়দানে ঘুরে রাতে ফিরে আসে। পশুপাল নিয়ে পালকরা ঘুরে বেড়ায় কিন্তু এদের গ্রীষ্ম ও শীতকালীন চারণভূমি মোটামুটি নির্দিষ্ট। স্বাভাবিকভাবেই শীত নিবারণের উদ্দেশ্যে এদের গায়ে তুলনামূলক লম্বা পশম তৈরি হয়। এদের গায়ে গ্রীষ্মকাল থেকে পশম গজাতে শুরু করে এবং শীত পর্যন্ত এসে পশম সবচেয়ে বড় হয়। জুন থেকে এ পশুদের প্রজনন ঋতু শুরু হয়। নভেম্বর ও ডিসেম্বরে এরা বংশবৃদ্ধি করে এবং প্রসবের সময় এপ্রিল-মে। পশুমৃত্যুর হার খুবই কম হওয়ায় চাংপা জনগোষ্ঠী লাভবান হয়। অবশ্য এর পেছনে পশুদের অভিযোজন ক্ষমতা ও চাংপা গোষ্ঠী কর্তৃক গৃহীত যত্ন উভয়েরই অবদান আছে।
ভারতে
উৎপাদিত মোট পশমিনার মধ্যে লাদাখ থেকে আসে প্রায় ৪০ টন। এর জন্য প্রয়োজন হয় প্রায় দেড় লাখ ‘পশমিনা ছাগল’। পশম দেয়া ছাগলগুলোর দুধ প্রদানক্ষমতা কম। এক একটি ছাগী প্রতিদিন গড়ে মাত্র ২০০ থেকে ৫০০ মিলিলিটার দুধ দিতে পারে। পশমের ক্ষেত্রে প্রতিটি ছাগল থেকে প্রথমবার ৮০ গ্রাম, দ্বিতীয়বার ১৫০ গ্রাম, তৃতীয়বার ২৩০ গ্রাম, চতুর্থ ও পঞ্চমবারে যথাক্রমে ২০০ ও ২১০ গ্রাম পশম পাওয়া যায়। ছাগ থেকে ছাগীর তুলনায় বেশি পরিমাণে পশম পাওয়া যায়। উল্লেখ্য, বছরে একবারই পশম তোলা যায় এবং একটি ছাগল থেকে চার বা পাঁচ বছর পশম আহরণ করা সম্ভব।
পশম
গ্রহণের সময় বসন্ত। প্রতি বসন্তে ছাগলগুলো তাদের পশম ঝরিয়ে ফেলে। এর আগেই পালকরা পশম কামিয়ে নেয়। তবে এ কামানোর বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন। পশম কেটে নেয়া হয় না, বরং আঁচড়ানোর মাধ্যমে পশম আহরণ করা হয়। গৃহপালিত এ পশুগুলোকে এদের পালকরা নির্দিষ্ট সময়ে ছাগলের ‘আন্ডারকোট’ আঁচড়িয়ে পশম তুলে নেয়া হয়। বলা চলে এটিই প্রথমত পশমিনার কাঁচামাল এবং দ্বিতীয়ত চাংপা জনগোষ্ঠীর মূল অর্থকরী পণ্য। চাংপারা এ পশম কাশ্মীরে প্রেরণ করে। এ নিয়ে একটি আলাদা ব্যবসা গড়ে উঠেছে। পশম কেনাবেচার ব্যাপারটি মূলত অন্য যেকোনো পণ্যের বিনিময়ের মতো করেই করা হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে চাংপারা পশমিনা তৈরি করে বা ছাগল থেকে পাওয়া পশম প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করে।
পশমিনা
থেকে নানা ধরনের বস্ত্র তৈরি হয়। এর মধ্যে উপমহাদেশে পশমিনা শাল ও মাফলার বিখ্যাত। এছাড়া শীতের টুপি, হাতমোজা প্রভৃতিও তৈরি হয়। তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো পশমিনা শাল। কোনো কোনো শাল বহুমূল্যও হয়ে থাকে। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যায় শালের তুলনায় পশমের মূল্য খুবই কম। এ দিয়ে আজকের দিনে পশুপালক তথা পশমিনার ফাইবার উৎপাদকদের জীবনধারণ কঠিন। ২০১৯ সালের একটি হিসাব অনুসারে, একটি ছাগল থেকে বছরে ২০০ গ্রাম পশম পাওয়া যায়। এক কেজি পশমের জন্য প্রয়োজন অন্তত পাঁচটি ছাগল। এক কেজি পশমের মূল্য ২৫০০ রুপি।
যার পশুর পরিমাণ বেশি তার পক্ষে বেশি আয় করা সম্ভব। কিন্তু সে আয় আসবে বছরভিত্তিক।
চাংপা
জনগোষ্ঠী পশমিনা উৎপাদকদের একটি ছোট অংশ। পশমিনার বেশির ভাগ তৈরি হয় চীন, মঙ্গোলিয়া ও তিব্বতে। কিন্তু ভারতের হিসাব করলে জম্মু ও কাশ্মীর পশমিনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কেবল পশমিনাই নয়, পশমিনার কারণে এখানে তৈরি হয়েছে পশুপালক গোষ্ঠীর আবাস এবং তার ফলে সীমান্তে তৈরি হয়েছে পশুপালক ও ব্যবসায়ীদের ভিন্ন ধরনের বাণিজ্য। একদিকে পশম, প্রক্রিয়াজাত পশম ও অন্যদিকে সরাসরি পশু কেনাবেচাও হয়। শাল বা ঐতিহ্য তো আছেই, সীমান্ত বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও তাই লাদাখের চাংপারা রাখছে বিশেষ ভূমিকা।
আসরার আবেদিন: প্রাবন্ধিক





