মার্ক পেন্ডারগ্রাস্ট। অনুবাদ: শওকত হোসেন

কোকা-কোলার একটা পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনার শুরুর মুহূর্তে আসল সূত্রের দেখা মিলে যাবে, বিশেষ করে খোদ কোম্পানিরই অভ্যন্তরে, তার তিলমাত্র ধারণাই ছিল না আমার। হাজার হোক এটা আবার পৃথিবীর সবচেয়ে গোপন ব্যবসায়িক বিষয়, দুই দফা বিচারিক নির্দেশ সত্ত্বেও কোম্পানি যেটা প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ১৯৭৭ সালে কোম্পানি নাছোড় সরকারের কাছে পবিত্র এই সূত্র তুলে দেয়ার বদলে ভারত থেকেই পাততাড়ি গুটিয়েছিল। তবু আমার গবেষণার একপর্যায়ে একদিন জনৈক কর্মী আমার কাছে প্লাস্টিকের ভেতরে খুব যত্নের সঙ্গে জোড়া লাগানো লেমিনেট করা হলদেটে ছেঁড়াখোঁড়া কাগজের একটা ফাইল নিয়ে আসে। এটাই ১৯৪০-এর দশকে কোম্পানিকে দান করা জন পেম্বারটনের ফর্মুলা খাতার অবশিষ্টাংশ বলে জানায় সে। 

এ ফর্মুলা খাতার পেছনের রহস্য আগে থেকেই আমার জানা ছিল। তরুণ বয়সে জন পি. টার্নার নিজ শহর জর্জিয়ার কলাম্বিয়া থেকে জন পেম্বারটনের শেষ কয়টি বছরে তার সঙ্গে শিক্ষানবিশী করতে যান। পেম্বারটনের মৃত্যুর পর টার্নার ওই ফর্মুলা খাতাটা জর্জিয়ায় নিয়ে আসেন। এখানে তিনি অনেক বছর ফার্মাসিস্ট হিসেবে কাজ করেন। ১৯৪৩ সালে টার্নারের ছেলে ওই খাতার ফর্মুলাঅলা পাতাটা খুলে কোকা-কোলার পরিচালনা পর্ষদের এক সদস্যকে দেখান। ওই সদস্য টার্নারের ছেলেকে খাতাটা তাকে দিয়ে দেয়ার জন্য সাধাসাধি করেন। ‘হায় খোদা!,’ ফর্মুলা দেখার পরে জোরে বলে ওঠেন কোম্পানির চেয়ারম্যান হ্যারিসন জোন্স। ‘এটা পেলেন কোথায়?’ এবং এরপর আর ওটার দেখা পায়নি কেউ।

 কোকা-কোলার আর্কাইভসে আমার পাওয়া ফাইলে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘এটা কলম্বাসের ড্রাগিস্ট থাকার সময় ডক্টর জে.এস. পেম্বারটনের হিসাব ও ফর্মুলা খাতা,’ কিন্তু সেটা নিশ্চিতভাবেই সঠিক নয়, কারণ সেরিলি-কোলার একটা রেসিপিতে কোকা-কোলার নাম উপকরণ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল, তো নিঃসন্দেহে এটা ১৮৮৮ সালেরই হবে। কেননা মৃত্যুর সময় পেম্বারটন সেরেলি পানীয় নিয়েই কাজ করছিলেন। দুরুদুরু বুকে সংরক্ষিত পাতাগুলো ওল্টাচ্ছিলাম আমি, তবে ধরে নিয়েছিলাম যে কোম্পানি গুরুত্বপূর্ণ কোনো জিনিস কোথাও গোপন ভাণ্ডারে লুকিয়ে রেখেছে। পরিণামে পৃষ্ঠার মাথায় স্রেফ ইংরেজি ‘এক্স’ হরফ-সংবলিত কোকা-কোলার রেসিপি বলে মনে হওয়া জিনিসটা দেখে অবাক হয়ে যাই।

 

সাইট্রেট ক্যাফেইন এক্সট. ভ্যানিলা ফ্লেভারিং    ১ আউন্স

এক্সট. ভ্যানিলা                                ১ আউন্স

ফ্লেভারিং                                         ২ ১/২ আউন্স

এফ.ই. কোকো                                ৪ আউন্স

সাইট্রিক অ্যাসিড                              ৩ আউন্স

লাইম জুস                                        ১ কোট

চিনি                                                ৩০ পাউন্ড

পানি                                               ২ ১/২ গ্যালন   

ক্যারামেল পর্যাপ্ত পরিমাণ

 

ক্যাফেইন অ্যাসিড ও লাইম জুস ১ কুইন্টাল উত্তপ্ত পানিতে মেশানোর পর ঠাণ্ডা হলে ভ্যানিলা ও ফ্লেভারিং যোগ করুন।

ফ্লেভারিং

অয়েল অরেঞ্জ                        ৮০

লেবু তেল                               ১২০

জায়ফল তেল                        ৪০

দারচিনি তেল                         ৪০

ধনে তেল                                ২০

গোলমরিচ তেল                      ৪০

অ্যালকোহল                          ১ কুইন্টাল

২৪ ঘণ্টা রেখে দিন।

 

ফ্লেভারিং অংশটুকু নিশ্চিতভাবেই ফর্মুলার ‘৭এক্স’ অংশ, যদিও উপকরণ রয়েছে ছয়টি (যদি না আপনি অ্যালকোহল হিসেবে ধরেন, এটা মিক্সারের কাজ দেয়, কোনো অর্থপূর্ণ পরিমাণে চূড়ান্ত পণ্যে থাকে না)। সম্ভবত পরে সাত নম্বর উপকরণ হিসেবে ফ্লেভারিং অংশে ভ্যানিলা যোগ করেন তিনি। ‘এফ.ই.কোকো’ মানে কোকোর তরল নির্যাস, কিন্তু কোলা-নাটের কথা উল্লেখ করা হয়নি, কেবল ‘সাইট্রেট ক্যাফেইন’। পেম্বারটন প্রায় নিশ্চিতভাবেই জার্মানির ডার্মস্ট্যাডেটের মার্ক থেকে ক্যাফেইন জোগাড় করতেন, কারণ কোলা-নাটের এক ধরনের উদ্দীপক ধরন উৎপাদনের জন্য ওই প্রতিষ্ঠানের তারিফ করেছিলেন তিনি।

দলিলটা আমি ফটোকপি করে নিয়েছিলাম, কিন্তু কোম্পানিরই কেউ মূল সূত্রটি আমার হাতে তুলে দিতে পারেন, বিশ্বাস করতে পারিনি। নির্ঘাত এটা আসল বস্তুটির পূর্বসূরি হয়ে থাকবে। এরপর অপ্রত্যাশিত নিশ্চয়তা পেয়ে যাই যে, আমার জানার চেয়েও মূল্যবান একটা কিছুর দেখা পেয়েছি। রাশিয়ান জেনারেল যুকোভের জন্যে ‘হোয়াইট কোক’ প্রস্তুতকারী কারিগরি পরামর্শক ম্লাদিন যুরুবিকার সাক্ষাত্কার নেয়ার সময় আমার কাছে একটা ফর্মুলা থাকার কথা বলি আমি। ‘আচ্ছা, তাই নাকি,’ বলেন তিনি। ‘আমার কাছেও আছে। যুকোভের জন্য রঙ আলাদা করার সময় কোম্পানি আমাকে দিয়েছিল। দেখবেন?’ সত্যিই দেখতে চেয়েছি। তার ৪ জানুয়ারি, ১৯৪৭-এর ফটোকপি আসার পর দেখা গেল হুবহু আমার আর্কাইভসে পাওয়া ফর্মুলা— একই পরিমাণ, একই ফরম্যাট, এমনকি ভুল বানানে ‘এফ.এই. কোকো’ও। একমাত্র তফাত, যুরুবিকার ফর্মুলা ছিল অসম্পূর্ণ,  ৭এক্সের উপকরণগুলোর শেষ দুটো বাদ পড়েছে (ধনে এবং গোলমরিচ)। মনে হলো যেন কোম্পানির কর্মকর্তারা পূর্ণাঙ্গ সূত্র ফাঁস করতে রাজি ছিলেন না, তাই এভাবে পাল্টে দেয়ার সতর্কতা অবলম্বন করেছেন।

খুবই অবাক হয়েছিলাম। কোম্পানির আর্কাইভসে আমি কেবল পেম্বারটনের মূল ফর্মুলার দেখাই পাইনি, বরং এর আবিষ্কর্তা সেটিকে অ্যাসিডিফাই কাগজে লেখার ৬০ বছর পরেও দৃশ্যত অপরিবর্তিত অবস্থায় টিকে ছিল। অবশ্য, এটা সত্যিই একটা রহস্য ছিল। হাওয়ার্ড ক্যান্ডলার তার বাবা আসার কোকা-কোলা তৈরির কায়দা উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে ফেলার যে দাবি করেছেন, তার সঙ্গে মেলে না। এবং যুরুবিকার ফর্মুলা কী কারণে কোকামুক্ত কোকো পাতা বা কোম্পানির সাইট্রিক অ্যাসিডের বদলে ফসফোরিক ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেনি? অথবা ক্যাফেইনের পরিমাণে পরিবর্তন করার কথা? এবং এটাই ফর্মুলার একমাত্র পরিবর্তন ছিল না। প্রবীণ আসা সম্ভবত ৭এক্স নিয়েও কাজকর্ম করেছিলেন। বছর পরিক্রমায় সুইটেনারের পরিমাণ ও ধরনেও পরিবর্তন ঘটেছে।

মনে হয়, এমনকি মূল উপকরণ ও অনুপাত জানাজানি হওয়ার পরেও ফর্মুলাকে ঘিরে রাখা রহস্য অব্যাহত রয়ে গেছে। আমার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: কোম্পানি ১৯৪৭ সালে আসলে ম্লাদিন যুরুবিকাকে কোকা-কোলার চলমান ফর্মুলা দেয়নি, এমনকি এর আংশিক ভাষ্যও নয়। বরং যুরুবিকা তার কেমিস্টের পক্ষে বাদামি কোকোকে সাদা করার কায়দা বোঝার জন্য যথেষ্ট মূল ফর্মুলার একটা পরিবতির্ত ভাষ্য হাতে পেয়েছিলেন। কোম্পানি কী কারণে আমার হাতে এর নিজস্ব আর্কাইভসের অবশিষ্টাংশ তুলে দিয়েছিল, সেটা রহস্যই রয়ে গেল। আমি কেবল অনুমান করতে পারি যে, টার্নারের খাতায় কোকা-কোলার রেসিপির আরেকটা গুপ্ত পরিষ্কার লেবেল সাঁটা রেসিপি ছিল, কিন্তু কেউই বাকি ফর্মুলা নিবিড়ভাবে যাচাই করেনি, ফলে ‘এক্স’ পার্থক্যটুকু পিছলে বেরিয়ে গেছে।

আসা ক্যান্ডলার থেকে শুরু করে কোম্পানির কেউই নাম ধরে উপকরণের কথা বলেননি। বরং চিনির নাম ছিল মার্চেন্ডাইজ #১; কোকো পাতা, মার্চেন্ডাইজ# ২, ক্যাফেইন, মার্চেইন্ডাইজ# ৩; ফসফোরিক অ্যাসিড, মার্চেইন্ডাইজ #৪; কোকো পাতা ও নাট এক্সট্রাক্ট, মার্চেন্ডাইজ #৫; ৭এক্স ফ্লেভারিং মিশ্রণ, মার্চেন্ডাইজ # ৭; ভ্যানিলা, মার্চেন্ডাইজ # ৮। এ নামকরণ রয়ে যায়, যদিও ক্যান্ডলার আমল থেকেই ৬ এবং ৯ নম্বর— সম্ভবত লাইম জুস এবং গ্লিসারিন— একপাশে পড়ে যায়, সম্ভবত ৭এক্স বা অন্য কোনো উপাদানের সঙ্গে মিশে গেছে।

ফর গড, কান্ট্রি অ্যান্ড কোকা-কোলা গ্রন্থের মূল অংশে আমি কোকো পাতা এবং কোলা-নাটের প্রভাব উল্লেখ করেছি, কিন্তু প্রতিটি উপাদানের স্বল্প পরিমাণ এবং প্রাচীন উেসর প্রশ্নসাপেক্ষে সত্যতার পরিপ্রেক্ষিতে অনিশ্চিত হলেও অন্যান্য উপকরণ ঘিরে থাকা বিভিন্ন ভেষজ গুণের কাহিনী দারুণ। যেমন— দারচিনি আর্থ্রাইটিস, ক্যান্সার, ঠাণ্ডাগর্মি, ডায়াবেটিস, গলগণ্ড, মাথা ধরা এবং পেটব্যথার ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। জায়ফল চতুর্দশ শতকে ভারতে পেটের পীড়া, পেট ফাঁপা, ম্যালেরিয়া, কুষ্ঠ, গেঁটেবাত, সায়াটিকা এবং পেটব্যথার ওষুধ হিসেবে দেয়া হয়। ভ্যানিলা নানাভাবে কামোদ্দীপক, উত্তেজক বা খিঁচুনি হ্রাসকারী, হিস্টিরিয়া সারায়, ক্যাভিটি রোধ করে এবং পেট ফাঁপা কমায়। এবং অন্যান্য উপকরণের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে।

গোপন ফর্মুলা থেকে বিস্ময়কর অংকের টাকা প্রবাহিত হওয়ায় পানীয়টির উপকরণ সম্পর্কে কোম্পানির কেউই আমার কাছে মুখ খুলতে রাজি না হওয়ায় অবাক হইনি। শেষ পর্যন্ত একজন সিনিয়র সাইকোনিউট্রিশিয়ান হ্যারি ওয়ালাড্রপের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি দেয়া হয় আমাকে। এককালে তিনি একটি অভিজাত টেস্ট-টেস্টার প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন এবং কোকা-কোলা ক্ল্যাসিকের বিভিন্ন ব্যাচের স্বাদ গ্রহণ করেছেন।

প্যানেল সদস্যরা স্বাদের পাশাপাশি গন্ধ দিয়ে ৭এক্স চেনেন এবং সময়ের কারণে সূক্ষ্ম পরিবর্তনও ধরতে পারেন। ঠিক যেভাবে মদ পরীক্ষকরা ১৯৪৫ সালের মাউটন-রথসচাইল্ড চেখেই ১৯৪৬ সালের সঙ্গে এর তফাত ধরে ফেলেন। ওয়ালড্রপ দুই মাসের পুরনো কোক সিরাপের ব্যাচ চিহ্নিত করতে পারেন। ‘আমরা ঠিক জিনিসের স্বাদ ও গন্ধ চিনি,’ বলেছেন ওয়ালাড্রপ, ‘কিন্তু সেটা বলে বোঝানো মুশকিল। বর্ণনা দিতে গেলে আর এগোয় না।’ উদাহরণস্বরূপ তাদের অপছন্দের কিঞ্চিৎ তিক্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে প্যানেল সদস্যরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে যেতে পারেন। সব উপকরণই গ্যাস ক্রোমাটোগ্রাফি এবং অন্যান্য বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডে যত্নের সঙ্গে পরিমাপ করা হলেও ওয়ালড্রপ কম্পিউটার মানুষের জায়গা নিতে পারবে বলে মনে করেন না। ‘কোনো ইলেকট্রনিক নাক সূক্ষ্মতা, পুলক ধরতে পারে না,’ জোর দিয়ে বলেছেন তিনি।

বিজ্ঞানীরা হয়তো কোকা-কোলার বিভিন্ন উপকরণ আলাদা করতে পারবেন, এমনকি কাছাকাছি পরিমাণও অনুমান করতে পারবেন, কিন্তু কোম্পানির কর্মকর্তাদের মতে, তারা সঠিক মিশ্রণ বের করতে পারবেন না। ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কোম্পানির সঙ্গে সক্রিয় মাত্র দুজন মানুষ ৭এক্স মেশানোর কায়দা জানেন। এটা কোকের উপকরণ জোগানো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বেশকিছু কনসেন্ট্রেট ফ্যাক্টরিতে তাদের যাতায়াতের সংখ্যা বাড়িয়ে তোলে। অবশ্যই কেউই এ ধরনের লজিস্টিকের কথা বলতে যাবে না।

আমার বইয়ের আগের সংস্করণগুলোয় এ ‘এক্স’ ফর্মুলা প্রকাশের পর ২০০৫ সালে ফ্রাংক রবিনসনের প্রপৌত্রী লরা রবিনসন ভ্যানওয়াগনারের কাছ থেকে একটা ফোনকল পাই আমি। ফ্রাংক রবনিসনই সেই নাম না জানা নায়ক, যিনি কোকা-কোলার নামকরণ করেছেন, বিখ্যাত স্পেনসিরিয়ান স্ক্রিপ্ট রচনা করেছেন এবং পানীয়টি তৈরি ও বিপণন করেছেন। আমাকে বিস্মিত করে লরা তার পরদাদার  লাল রেখাঅলা হলুদ কাগজে পরিষ্কার হাতে লেখা সেই ফর্মুলা খাতাটা আমার হাতে তুলে দেন। ওতে ফ্রেঞ্চ ওয়াইন কোকা, গ্লিসারিন, ইন্ডিয়ান কুইন হেয়ার ডাই এবং কোকা-কোলার রেসিপি ছিল।

এসব রেসিপির কথা আমি জানতাম। লরার বড় ভাই দ্বিতীয় ফ্রাংক রবিনসন ১৯৯১ সালে বইয়ের প্রথম সংস্করণের জন্য গবেষণা চালানোর সময় আমার সঙ্গে লুকোচুরি খেলেছিলেন, রেসিপিগুলোয় পলকের জন্য চোখ বোলাতে দিলেও আমার হাতে দেননি। তারপর ১৯৯৬ সালে বিবাহ বিচ্ছেদের সময় ওই ফর্মুলার জন্য ফ্রাংকের স্ত্রী তার বিরুদ্ধে মামলা করেন, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এবং অন্যান্য পত্রিকায় তখন রসাল শিরোনাম হয়েছিল খবরটা। ফ্রাংক ওই দলিল নিজের কাছেই রেখে দিয়েছিলেন এবং পাঁচ বছর পর ক্যান্সারে মৃত্যুবরণের সময় বোনকে দিয়ে যান। লরা সেগুলো কোকা-কোলা আর্কাইভসে দিয়ে দেয়ার কথা বললেন, কিন্তু আমার কাছেও এর ফটোকপি থাকা উচিত বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। এখানে পূর্বসূরি ফ্রেঞ্চ ওয়াইন কোকার পাশাপাশি রবিনসনের কোকা-কোলা ফর্মুলা দেয়া হলো।

 &dquote;&dquote;

সিসি ৩৬ গ্যালনের জন্য

২১৬ #(পাউন্ড) চিনি

১৮ গ্যাল. পানি

২৯ আউন্স লাইম জুস

২৯ আউন্স সাইট্রিক অ্যাসিড

১৮ আউন্স ক্যাফেইন

২৯ আউন্স ফ্লেভারিং

৩ কোয়ার্টস রঙ

১৫ কোয়ার্টস এফ.ই. [ফ্লুইড এক্সট্রাক্ট]

 &dquote;&dquote;

কোকা-কোলা ফ্লেভার

১ ১/২ কোয়ার্ট অ্যালকোহল

১২ আউন্স এফ.ই. [ফ্লুইড এক্সট্রাক্ট]

১৯ আউন্স এক্সট. ভ্যানিলা

১৩ ডি [অস্পষ্ট-‘ড্রপ?’]  লেবু তেল

১০ ডি দারচিনি তেল।

১২ ডি. জায়ফল

১৫ ডি ধনে

১২ ডি গোলমরিচ

 

ফ্রাংক রবিনসনের আগের ফর্মুলা বিভ্রান্তিকর। কেন এখানে জায়ফলকে দু-দুবার, একবার ফ্লুইড এএক্সট্রাক্ট এবং আরেকবার গুরুত্বপূর্ণ তেল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে? ‘এক্স’ ভাষ্যের মতো এটাও ভ্যানিলা, লাইম জুস, কোকা পাতা এক্সট্রাক্ট, ক্যাফেইন, চিনি, ক্যারামেল কালারিং এবং লেবু, দারচিনি, ধনে এবং গোলমরিচের আবশ্যিক তেল যোগ করলেও কমলা তেল বাদ দিয়েছে।

সবকিছু আরো ঘোলাটে করে তুলতে একটি জনপ্রিয় রেডিও অনুষ্ঠান দিস আমেরিকান লাইফ ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১১ প্রচারিত এক শোতে আরো একটি পুরনো কোকা-কোলা ফর্মুলার কথা প্রকাশ করে। উপস্থাপক ইরা গ্লাস এ অনুষ্ঠান উপলক্ষে আমার সাক্ষাত্কার নেয়ার সময় ১৯৭৯ সালে আটলান্টা জার্নাল কনস্টিটিউশন-এ চার্লস সল্টারের কলামে পাওয়া একটা ফর্মুলা সম্পর্কে আমার মতামত জানতে চান। জন পেম্বারটনের সমসাময়িক এবং বন্ধু ড্রাগিস্ট আর.আর. ইভান্সের একটা পুরনো চামড়ায় বাঁধাই করা রেসিপি বইতে সল্টার ‘কোকা-কোলা ইম্প্রুভড’-এর ফর্মুলা পান:

 

এফ.ই. কোকা ৩ ড্রাম ইউএসপি

সাইট অ্যাসিড ৩ আউন্স

সাইট ক্যাফেইন ১ আউন্স

চিনি ৩০ # [পাউন্ড]

অ্যাকুয়া: ২.৫ গ্যালন

লাইম জুস: ২ পাইন্ট

ভ্যানিলা: ১ আউন্স

 &dquote;&dquote;

ফ্লেভার ৫ গ্যালন সিরাপে ২ আউন্স

অ্যালকোহল: ৮ আউন্স

কমলা তেল: ২৩ ফোঁটা

লেবু তেল: ৩০ ফোঁটা

জায়ফল তেল: ১০ ফোঁটা

ধনে তেল: ৫ ফোঁটা

গোলমরিচ তেল: ১০ ফোঁটা

দারচিনি তেল: ১০ ফোঁটা

রঙের জন্য ১ ১/২ আউন্স ক্যারামেল ব্যবহার করুন।

 

ওই অনুষ্ঠানে ইরা গ্লাসকে বলেছিলাম, সল্টারের ফর্মুলা হুবহু কোকা-কোলা আর্কাইভসে আমার পাওয়া ‘এক্স’ ভাষ্যের মতো এবং ওটাকে আমি মূল ফর্মুলারই একটা সম্ভাব্য রূপ ধরে নিয়েছিলাম। গ্লাস তার ফর্মুলা বানিয়েছিলেন (সম্ভবত কোকেইন ছাড়া) এবং বলেছেন, ‘সত্যি ওষুধের মতো...কমলা সুবাসের বাচ্চাদের অ্যাসপিরিনের মতো,’ তার জানা কোকা-কোলার মতো নয়। তত্ত্বগতভাবে আধুনিক ফ্লেভারগুলো খাঁটি এবং শক্তিশালী, সোভেরেইন ফ্লেভারের ওরা ফ্লেভারিং চার ভাগের এক ভাগ কমিয়েও কোকা-কোলার বেশ কাছাকাছি একটা কিছু তৈরি করেছিলেন। এটা অনেকটা ফাঁকি দেয়ার মতো যেন। কিন্তু এমনকি কোক আর্কাইভিস্ট ফিল মুনি স্বীকার করে গেছেন যে, সল্টারের ভাষ্যটি সম্ভবত ‘মূল ফর্মুলার অগ্রদূত’ হয়ে থাকতে পারে। এর পরই আমি জানতে পারি যে, সোভেরেইন ফ্লেভারের লোকজন আবশ্যিক ড্রামের বদলে তেলের ফোঁটা ব্যবহার করেছেন, যা অতিরিক্ত ঝাঁঝাল ফলের কারণ হতে পারে।

আমি ১৯৯৩ সালে বইটির প্রথম সংস্করণে ‘এক্স’ ফর্মুলা প্রকাশ করলেও এবং সল্টার ফর্মুলা ১৯৭৯ সাল থেকেই মুদ্রিত অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও রেডিও শোটি আন্তর্জাতিকভাবে সাড়া জাগায়। প্রতিক্রিয়া এতটাই বিস্ময়কর ছিল যে, বেশ কয়েক দিনের জন্য দি আমেরিকান লাইফের শক্তিশালী ওয়েবসাইট অচল হয়ে যায়। পরে নিউইয়র্ক টাইমস এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়া আমার সাক্ষাত্কার গ্রহণ করে।

সম্ভবত রেডিও শোর প্রভাব কোকের গোপন ফর্মুলার শক্তিশালী আকর্ষণ সম্পর্কে কোক নির্বাহীদের টনক নাড়ায়। কয়েক মাস বাদে ২০১১ সালের বড়দিনের আগে আগে কোম্পানি ফর্মুলাটি সান ট্রাস্ট ব্যাংক থেকে আটলান্টায় ওয়ার্ল্ড অব কোকা-কোলা মিউজিয়ামের এক নতুন প্রদর্শনীর একটা ভল্টের ভেতর সরিয়ে নেয়। কয়েক দিন পর আমিও যাই সেখানে। দুর্দান্ত বিপণন কৌশল ছিল এটা। আপনাকে একটা অন্ধকার ঘরে নিয়ে যাওয়া হবে, সেখানে রাজ্যের নিগূঢ় গাণিতিক ফর্মুলা মেঝেয় ঘূর্ণি খেয়ে চলে আর অপার্থিব সংগীত বাজে। এটা অনেকটা কোক হোলি অব হোলিজ কামরা। ‘কোকা-কোলার মূলে একটা রহস্য আছে, শত বছরেরও বেশি সময় ধরে সুরক্ষিত, মাত্র কয়েকজন সেটা জানেন,’ একটা নাটকীয় অশরীরী কণ্ঠ বলে, ‘এখন আপনি এখানে এসেছেন। সেই রহস্য আপনার নাগালে। এগিয়ে যান, পান করুন।’ চারপাশের দেয়ালে আপনি বরফের ওপর কোকা-কোলা গড়িয়ে পড়তে দেখেন, যাতে আপনার মনে হয় একটা গ্লাসের ভেতর আছেন। এটা পুরনো কোকা-কোলার বিজ্ঞাপনের কেলাইডোস্পিক ঘূর্ণির একটা পথ খুলে দেয়। সব শেষে একটা ওয়াল প্যানেল গড়িয়ে রহস্যময় পাক খাওয়া ধোঁয়ার কুণ্ডলিঅলা স্বল্পালোকিত একটা ভল্ট উন্মুক্ত করে। ‘কোকা-কোলার গোপন ফর্মুলা রয়েছে এখানেই,’ বলে কণ্ঠটি, ‘তো একটা কোক নিন। জাদুর অংশ হয়ে যান। আমরা রহস্য গোপন রেখে দেব। কারণ রহস্য গোপন রাখলে জাদুমন্ত্র টিকে থাকে।’ আপনার পক্ষে আটলান্টা যাওয়া সম্ভব না হলে ইউটিউবে একটা ডিজিটাল ভিডিও দেখতে পারেন— স্রেফ খোঁজ করুন, ‘কোকা-কোলা ভল্ট মার্ক পেন্ডারগ্রাস্ট।’

 

বিখ্যাত ফর্মুলা ঘিরে গড়ে তোলা সব রহস্য এবং হেঁয়ালি সত্ত্বেও একদিন একজন কোম্পানি মুখপাত্রের কাছে আমি এ বইতে পরিষ্কার করে লেখা আসল ফর্মুলা প্রকাশ করে বসলে কী হবে জানতে চাইলে তিনি বিনা সংকোচে বলেন, ‘মার্ক, ধরে নিতে পারেন, আজকের দিনটা আপনার জন্য সৌভাগ্যের। আমার টেবিলেই একটা ফর্মুলা রাখা আছে।’ ড্রয়ার খুলে একটা ভৌতিক দলিল আমার হাতে তুলে দেন তিনি। ‘এই যে নিন। এখন ওটা নিয়ে কী করবেন?’

‘বেশ, আমার বইতে জুড়ে দেব।’

‘তারপর?’

‘কেউ হয়তো কোকা-কোলা কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে পারে।’

‘তা তখন ও পণ্যের নাম কী রাখবে?’

‘বেশ, কোকা-কোলা তো রাখতে পারবে না। কারণ আপনারা মামলা ঠুকে দেবেন। ধরুন, নাম রাখল ইয়াম-ইয়াম, মামলার ঝুঁকি ছাড়াই জোরের সঙ্গে বোঝাল যে ইয়াম-ইয়ামই আসল ফর্মুলা।’

‘বেশ তো। তখন? বিনিময়ে কী দাম হাঁকবে ওরা? বিলিবণ্টন করবে কীভাবে? বিজ্ঞাপন করবে কেমন করে? কিসের কথা বলছি বুঝতে পারছেন? ওই ব্র্র্যান্ড নেম তৈরির পেছনে আমরা একশ বছরেরও বেশি সময় অজ্ঞাত পরিমাণ টাকা-পয়সা খরচ করেছি। আমাদের মতো আর্থিক মাত্রা এবং অবিশ্বাস্য বিপণন ব্যবস্থা ছাড়া যেই আমাদের পণ্য নকল করার চেষ্টা করুক না কেন, কোনো লাভ হবে না। ওদের অনেক বেশি দাম হাঁকতে হবে। কী কারণে কেউ স্রেফ কোকা-কোলার মতো কিন্তু তার চেয়ে বেশি দামি জিনিস কিনতে যাবে, যেখানে আসল জিনিসই দুনিয়ার যেকোনো জায়গায় কিনতে পারছে?’

বলার মতো কিছু খুঁজে পাইনি আমি।