অনেক দিন ধরেই এক মুষ্টিযোদ্ধা আরেক মুষ্টিযোদ্ধাকে যেমন কেবল মার না খাওয়ার জন্যই জড়িয়ে ধরে, যে আলিঙ্গনে সামান্য সময়ের যতি প্রার্থনা ছাড়া আর কিছু নেই, তেমন করেই তারা হয়তো জড়িয়ে ধরছিল একে অন্যকে। শরীরে, শরীরের বাইরে সংসারের কর্মযজ্ঞে। এসব সময়ে লোকে পরনারী বা পরপুরুষের কাছে গিয়ে মৃদু বিষণ্ন স্বরে বলে, ‘সে আমাকে একদম বোঝে না।’ একেবারে শৈশবের ‘চয়নিকা’ বইটার মতো পাঠ্য হয়ে গেছে তারা, বড় বেশি বোধ্য একে অন্যের কাছে, বড় বেশি বুঝতে পারলে আর ভালো লাগে না, এমন কথা সবাই লুকোতে চায়। লুকোতে চায় এতদিনের দীর্ঘ সহবাসে অর্জিত অভ্যাসগুলোকে কুমোরের আঙুলের মতো একঠায় রেখে তাদের সঙ্গীরাই আকার দিয়েছে, লুকোতে চায় এই জীর্ণ-ছিন্নপ্রায় সম্বন্ধের আড়ালে চাপা পড়ে আছে কতদিনের প্রীতি, কত সান্নিধ্য আর বোঝাপড়া। শুধু রৌদ্রসমক্ষে মেলে দিতে চায় জীর্ণ যা কিছু কাঁথাকানি, মনে সাধ দমকা কোনো বাতাস উড়িয়ে নেবে এই ছেঁড়া টুকরোটুকু।

প্রথম প্রথম তারা খুব ঝগড়া করত, ঝগড়া কাজ করত আরকের মতো। তারপর সেই টনিকের ক্ষমতা কমতে লাগল। ঝগড়ার পর আর কেউ কাউকে খুঁজত না আড়ি ভাঙবে বলে। নৈঃশব্দ্য দীর্ঘ হতে লাগল, বিস্তৃত হতে লাগল। স্তব্ধতা মানেই অন্য কোথাও কাকলী শোনা যাবে, অন্য কোনো ভোরের। এ সন্দেহ তাদের কুরে কুরে খেতে থাকল। একে অন্যের দেরি করে ফেরা, চেনা মানুষের সাথে আদিম সখ্যতা আর অচেনা মানুষের সাথে নতুন সখ্যতা এসব খতিয়ে দেখতে লাগল তারা। খতিয়ে দেখতে তারা এত সঞ্চয় ভাঙতে থাকল যে, তারা ভালোবাসাবাসিতে নিস্পৃহ আর অক্ষম হয়ে যেতে থাকল। তারপর একদিন সচকিত হয়ে তারা আবিষ্কার করল, তারা একই প্রতীক্ষায় অপেক্ষমাণ। কেউ এসে তাদের একজনকে ভাসিয়ে নিয়ে যাক। অন্য কোনো দিকে।

গল্পটা এত কমন যে, এটা মুনা আর মাহবুবের হতে পারে। হতে পারে শ্রীজিত আর দেবলীনার। হতে পারে মুনা আর শ্রীজিতেরও। অতএব এটুকু বেনামিতে লেখাই যেতে পারে। এরকম করে সর্বনামযোগে। এভাবে লেখার অসুবিধা হচ্ছে, শব্দগুলো ব্যাকুল হতে থাকলে মনে হতে পারে, এ আমারই গল্প। কিন্তু এটা আমার গল্প নয়। এটা তোমাদের গল্প। তীর্থ আর সুরাইয়া। তোমরা এমন একটা সমাজে বাস করো, যেখানে বিবাহবিচ্ছেদ আবিষ্কৃত হয়েছে বহুকাল হয়। এসব বৈকল্য যেন আস্ত জীবনটাকেই খেয়ে নিতে না পারে, সেজন্য। যেন বৈকল্য মানে একটা পৌরাণিক মাছ নয়, যে পয়গম্বর অবধি খেয়ে ফেলতে পারে, আর জীবন! উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার সুবাদে রক্ত দেয়া যায় আরেক দেহে, ডিম্ব ধার দেয়া যায় আরেক জরায়ুতে, দেয়া যায় চোখ, দেয়া যায় যকৃত, দেয়া যায় অস্থিমজ্জা, একদিন নিশ্চয়ই জীবনও অদলবদল করা যাবে। এই ধরো তীর্থ গিয়ে মাহবুবের সাথে জীবন বদলাবদলি করে ফেলতে পারবে, মানে শুধুই একরাত্রির স্ত্রী অদলবদল করা টাইপ ব্যাপার না। আমূল জীবন। জিভের লক্ষ লক্ষ স্বাদকোরকে তীর্থ যে স্বাদ নিতে থাকবে সেটা মাহবুবের, মাহবুব আড্ডায় মার্কেজ কপচাতে কপচাতে হঠাৎ এক রকমের নিরর্থকতার সামনাসামনি হতে থাকবে সেটা তীর্থর। মুনার মাথার ভেতরে যা ড্রাগনফ্রুট রঙের জর্জেট শাড়ির সাথে একচিলতে সাদা-কালো বলপ্রিন্টের ব্লাউজ পরতে বলবে সেটা দেবলীনার মাথার প্ররোচনা। দেবলীনা যে স্মৃতি ভেবে রাতে ঘুম ভেঙে কেঁদে জেগে উঠবে সেটা মুনার। দাসের হাটের মতো করে আবার জীবন বিকিকিনি হবে ধরো। এবার শুধু শারীরিক সক্ষমতা নয়, দাস বেচবে তার আশীরপদনখ জীবন, ধরা-অধরা সব। এসব ভবিষ্যদ্বাণী করতে থাকলেই তীর্থ আমাকে অবশ্যম্ভাবী প্রশ্নটা করবে, আমি কার সাথে আমার জীবন অদলবদল করতে চাই। এ প্রশ্নের জবাব আমার কাছে নেই, থাকলেও দেব না। অতএব আমি এখন প্রসঙ্গ বদলাব।

আচ্ছা, আমি মানছি, মানুষ মানুষকে অনেক অধরা এখনো সংক্রমণ করে দেয়। এই ধরো তীর্থর মা-বাবার সাথে তীর্থর ছোট খালা থাকত। এই বিধবা ছোট খালা রাতের বেলা তীর্থর মা-বাবার সাথে এক বিছানায় ঘুমোতে যেত, কখনো যেতে না চাইলে তীর্থর বাবা জোর করে এসে নিয়ে যেত। তীর্থরা চার ভাই-বোনই আশৈশব এ কথা জানে। এখন, তীর্থ যে অসম্ভব হূদয়হীন ব্যবহার মাঝে মাঝে মুনার সাথে, সরি সুরাইয়ার সাথে করে ফেলত, সেটা শিশুবেলায় সংক্রমিত নয়? তখনকার অসহ স্মৃতির তাড়না নয়? হূদয়হীনতার এই ম্যাগনিচ্যুডের সাথে শৈশবস্মৃতির সম্বন্ধ তো আছে। তীর্থর বাবার এমন ব্যবহারের সাথেও হয়তো এভাবে আর কারো দেয়া দুঃসহ স্মৃতি আছে। এসব একটা তীব্রতায় পৌঁছে গেলেই মানুষ অন্য মানুষের সাথে জীবন বদলে ফেলতে পারবে, তারপর আরেকজনের সাথে, তারপর আরেকজন, জীবন একটা মাপসই জুতোর মতো হয়ে উঠবে, পায়ে গলিয়ে নিলেই হলো, পা বের করে অন্য জুতোয় পা গলালেই হলো।

আমার এ চিন্তাটা তীর্থকে বলতেই সে উত্ফুল্ল হয়ে উঠল একদিন। একদিন ধরো আমার মনে হলো, তীর্থকে আমি জড়িয়ে ধরে আদর করতে চাইছি, এই প্ররোচনাটা সুরাইয়ার। কিন্তু এ বিষয়টা তাকে ভালো করে বুঝিয়ে বলতে বলতেই আমার মনে হলো, ধরো আমি মুনার সাথে জীবন বদলাতে যাচ্ছি, মনেই হচ্ছে মুনার মাথার ভেতরে ড্রাগনফ্রুটরঙা জর্জেটগুলোর সাথে (ওহো, এটা না দেবলীনার মাথায় ছিল?) আমি ভাল থাকব, কিন্তু মুনার জীবনে প্রবেশ করেই দেখলাম, আমি লোহার বাসরঘরে ঢুকেছি, ফোঁস ফোঁস করে অজস্র সুতাশঙ্খ সাপ ঢুকছে শুধু... প্রথম মানুষের শরীরে রুহ ঢোকার পরই যেমন দপ করে নিবে গেছিল রুহের স্পৃহা, ভয়ে বলে ফেলেছিল আমিই স্বয়ম... (ঠিক বলছি কিনা সেটা তীর্থর বাবাকে জিজ্ঞেস করে নিতে হবে, ওঁর এসব খুব জানা)। তেমন একটা ভয় আমাকে ধরো বিহ্বল করে দিল। আমি ভুলে গেলাম, জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠলেই আমি ফের জীবন পাল্টাতে পারব, ভুলেই গেলাম আরেকবার খুশিয়াল রঙে আঁকা আরেকটা জীবনে ঢুকে গেলেই হবে। তখন আমার কী হবে? মুনার ওই জর্জেটগুলোর ভেতরে আটকা পড়ে থাকব?

তারপর ধরো, মাহবুব খুব আগ্রহ করে চিত্রনায়ক তমালের জীবনে ঢুকে গেল, এন্তার মেয়েমানুষ নাড়াচাড়া করবে বলে। অথচ গিয়ে দেখল, তমালের নিরুদ্যম জীবনে সে আর মাহবুবের স্পৃহা খুঁজে পাচ্ছে না, সব আলুনি লাগছে, মানে অবশ্যই মাহবুব তীর্থর কাছে বা এমনকি দেবলীনার কাছেও গিয়ে জীবন বদল করতে পারবে, করতেই থাকবে। কিন্তু যখন ইচ্ছা তখনই জীবন বদলাতে পারলে মাহবুব-শ্রীজিত বা তীর্থ এ জীবনের দুরূহ দিকগুলো সামাল দিতে চাইবে তো? বোধ করি চাইবে না। এসব ‘উদ্যম বিহনে কার পুরে মনোরথ’ মার্কা কবিতার লাইনের কী হবে তখন! তার চেয়ে বড় কথা, মুনা বাড়ি ফিরে এসে দেখবে মাহবুব নেই, আছে শ্রীজিত। শ্রীজিত ছুটিতে বালি যাওয়ার আগাম টিকিট করবে দেবলীনার সাথে যাওয়ার জন্য, অথচ যাবে সুরাইয়ার সাথে। আচ্ছা, একটা কথা তো ভাবতে ভুলেই গেছিলাম, জীবন বদলাতে জানলে এবং ক্রমাগত জীবন পাল্টাতে পারলে কার অপরাধে কার কারাদণ্ড হবে, কার মৃত্যুদণ্ড বিধান করা হবে? অবশ্য তদ্দিনে মৃত্যুদণ্ডের মতো ব্যাপারগুলো থাকবে বলে মনে হয় না।

এসব নিয়ে মাথা ঘামাই বলেই তুমুল বৃষ্টির রাতে ভালোবাসাবাসির সময় আমিই তীর্থকে জিজ্ঞেস করে ফেলি, আমি কে? সুরাইয়া না চামেলী খালা? আমি তীর্থকে বিশ্বাস করাতে ব্যর্থ হই যে, এটা আমার নিতান্ত ভালোমানুষি জিজ্ঞাসা, আমি তো জানতে চাইতেই পারি, তীর্থ এই যে আমাকে সজল চোখে তার শৈশবে তাকে মরা তেলাপোকা দেখিয়ে ভয় ধরানোর গল্পটা বলল, সেটা আমাকে কে ভেবে বলল। মানে, আমি চাইতে পারি না যে, শৈশবের গল্প ভাগাভাগির এই নিবিড় সখ্য যেন গরঠিকানায় না যায়? এসব প্রশ্নের ফলাফল ভালো হয় না। তীর্থ তার জীবন বদলাতে চায়, আমিও আমার, কিন্তু এখনো বিজ্ঞান অদ্দূর গেল না বলে আমাদের যার যার জীবনে বসে থাকতে হয়।

পাশ ফিরতে ফিরতে আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, সেটা এখনো আমার। অন্ধকারে ঝুপঝুপ বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে আমার মনে হয়, তীর্থ যার কথা ভেবে আমার ওপর সহিংস হয়, তার জীবনটা আমার নয়। ভাগ্যিস। এই যে মাথার ভেতরে দমবন্ধ উত্তেজনায় ‘হুজ অ্যাফ্রেইড অব ভার্জিনিয়া উলফ’ দেখার স্মৃতি, শৈশবে চকা নিকোবর হাঁস আমাকে শিখিয়েছিল ‘সমস্যা’ শব্দটা সংস্কৃত মন্ত্রের মতো উচ্চারণ করতে হয় এমনি তার ওজন, প্রথম দিন তীর্থকে দেখে মনে মনে বলা ‘বাহ!’... এসব আমার যুধিষ্ঠিরের কুকুর, এদের ছেড়ে আমি অন্য দেহে কী করে যেতে পারি। স্থানান্তরযোগ্য নয় এরা, এরা স্থাবর। কাল আমি অনলাইনে খুঁজব ড্রাগনফ্রুটরঙা জর্জেট শাড়ি সত্যি পাওয়া যায় কিনা। ড্রাগনফ্রুট কাটলেই যেমন সাদা-কালো বীজের ম্যাট্রিক্স থাকে, মানে যেটা আসলেই ফলটুকু, ব্লাউজের জন্য তেমন একটা ছিটের কাপড় পাওয়া কোনো ব্যাপারই না। মুনা বা দেবলীনা এ কম্বিনেশন ভাবতে পারবে না, মানে আমার সাথে জীবন না বদলালে।