বিশ শতকের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক বিতর্ক ছিল, মানুষের জন্য সর্বোত্তম কোনটি— সমাজতান্ত্রিক শাসনে বসবাস, না গণতান্ত্রিক শাসনে বসবাস, না একনায়কতান্ত্রিক শাসনে বসবাস?

বিশ শতকের শেষে এসে মোটামুটি ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হলো, মূলত তারাই সুখী মানুষ, যারা যা পেতে চায় তা পেতে পারে।

কোকা-কোলা পেতে চাইলে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সমাজতান্ত্রিক বাজারে কোক পাওয়া সম্ভব নয়। আর একনায়ক হিটলার তো ঘোর বিরোধিতা করেছেনই, এমনকি নেপোলিয়নের উত্তরসূরিদের হাতে থাকা ফ্রান্সও। কিন্তু গণতান্ত্রিক-ধনতান্ত্রিক অর্থনীতিতে যে কারোয় কোকা-কোলা কেনার মতো ন্যূনতম পয়সা থাকলে সে তা পাবেই।

দারুণ ব্যাপার! সুখের একটি বড় সূচক পাওয়া গেল কোক-কেনার স্বাধীনতা।

আপনি কি কোক-স্বাধীন? এর উত্তরণ বলে দেবে আপনার রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিচিতি।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেমন সত্যিই ‘গ্লোবাল পাওয়ার’ হয়ে উঠল, তেমনি ‘গ্লোবাল প্রডাক্ট’-এ পরিণত হলো কোকা-কোলা।

পৃথিবীতে কোকা-কোলাইজেশন ঘটে গেছে। কেউ বলছেন এটা আসলে কোকা-কলোনাইজেশন।

বোতলের বিশ্বায়ন

প্রতি সেকেন্ডে পৃথিবীতে কোকা-কোলা কোম্পানির ১০ হাজার বোতল/ক্যান কোমলপানীয় সেবন করা হচ্ছে। ১৮৮৬ সালে ফার্মাসিস্ট জনএস পেম্বারটন এ পানীয়কে ওষুধ হিসেবে বাজারে ছেড়েছিলেন। ওষুধটি তার নিজেরই দরকার ছিল, যুদ্ধাহত সৈনিক হিসেবে আঘাতের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে মরফিন সেবন করতেন। মরফিন থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তিনি একটা বিকল্প খুঁজছিলেন। সেসঙ্গে মাথাব্যথার কথাও ভাবলেন আর সবকিছু ছাপিয়ে ক্লান্তিমোচন। তার উদ্ভাবিত ওষুধকে বাজার গ্রহণ করে। এটিই পানীয়তে রূপান্তর হয়।

শুরুতে কোকেইন মেশানো হতো, প্রতি গ্রামে নয় মিলিগ্রাম। ১৯০৫ থেকে কোকেইন পুরোপুরি বর্জন করা হলো। কোকা-কোলা এবং এ কোম্পানির অন্যান্য পানীয় প্রতিদিন ১৯০ কোটি বোতল/ক্যান/গ্লাস খাওয়া হয়।

কোকা-কোলা খাওয়া হয় দুইশরও বেশি দেশে। আনুষ্ঠানিকভাবে কেবল কিউবা ও উত্তর কোরিয়ায় কোকা-কোলা প্রবেশ করতে পারেনি।

১৯৯৬ সালে কোকা-কোলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রবার্তো গুইজুয়েতা বলেন, আন্তর্জাতিক আর দেশীয় বলে কিছু নেই— কোকা-কোলা বৈশ্বিক;

‘গ্লোবালাইজড ওয়ার্ড’-এর প্রতীক কোকো-কোলার বোতল।

কোল্ড ওয়ার

শীতল কিংবা স্নায়ুযুদ্ধ সরাসরি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ নয়— এটা প্রক্সি ওয়ার; দুদেশ কিংবা এক দেশেরই দুই অংশ কিংবা এক দেশেরই দুই অংশ কিংবা একাধিক দেশকে যুদ্ধে লেলিয়ে দিয়ে অস্ত্র থেকে শুরু করে সৈন্য যা দরকার, দিয়ে কিংবা না দিয়ে এ দুই বড় শক্তির অংশগ্রহণ—এটাই কোল্ড ওয়ার।

এ দুই শক্তির প্রত্যক্ষ মদদ এবং স্নায়ুযুদ্ধকালে মোট মৃত্যু ১১ মিলিয়ন— ১ কোটি ১০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে।

স্নায়ুয়ুদ্ধ সৃষ্টি করেছে ‘লৌহ পর্দা’— আয়রন কার্টেইন। ইউরোপকে কমিউনিস্ট ও নন-কমিউনিস্ট দু’ভাগে ভাগ করেছে এ লৌহ পর্দা।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ যখন শেষ হলো, পরাজিত ও বিজয়ী দেশগুলোর প্রভূত জনবল ও সম্পদ ক্ষয় হলো; যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রইল দুটি মহাশক্তি, দুটি মহামোড়ল যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। দুই মোড়লই ‘ইন্টারন্যাশনাল অর্ডার’ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চায়, কিন্তু দুপক্ষের ভাবনা ও পরিকল্পনা সাংঘর্ষিক।

মহাযুদ্ধ চলাকালে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে দুটো আণবিক বোমা নিক্ষেপ করে আমেরিকা প্রমাণ করেছে, আমেরিকা চাইলে পারে।

তাহলে কি সোভিয়েত ইউনিয়ন পারে না?

‘জার অব বোম্বা’ নামের একটি বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। এ বোমার নির্গত শক্তি ৫০ মেগাটন ট্রাইনাইট্রোটলুইন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় সারা পৃথিবীতে যত বোমা বিস্ফোরিত হয়েছে, সবগুলোর সম্মিলিত শক্তির চেয়ে শক্তিশালী এই ‘জার অব বোম্বা’।

কোল্ড ওয়ারের একটি চূড়ান্ত অবস্থা ছিল কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস—  এ রকম আত্মবিধ্বংসী অবস্থায় পৃথিবী আগে কখনো পৌঁছেনি। বাকি ছিল কেবল বাটন টেপার কাজটি।

কোল্ড ওয়ারের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রক্সি-যুদ্ধ হয় ভিয়েতনামে, নিহত হয় ৩৫ লাখ মানুষ, দ্বিতীয় স্থানে তিন বছর মেয়াদি কোরিয়ান যুদ্ধ, লোকক্ষয় ৩০ লাখ।

বিশ শতকের শুরুটাতে যুক্তরাষ্ট্র তেমন গুরুত্বপূর্ণ কোনো দেশ ছিল না, এমনকি প্রথম মহাযুদ্ধও এ দেশটির গুরুত্ব খুব বাড়াতে পারেনি। এ অবস্থাটাই ১৯৪০ পর্যন্ত বহাল থাকে। তারপর এ সঙ্গে আমেরিকার গুরুত্ব এবং আমেরিকার প্রতি ঘৃণা— উভয়ই প্রবলভাবে বাড়তে থাকে। ইউরোপিয়ানরা আমেরিকাকে দেখেছে ‘হীন সভ্যতা, হীন সমাজ এবং হীন সংস্কৃতি’ হিসেবে। মিত্রশক্তি হলেও সমাজতন্ত্রী রাশিয়া আমেরিকাকে দেখেছে ধনতান্ত্রিক দানব ও সাম্রাজ্যবাদী দেশ হিসেবে। যে ফ্রান্সকে হিটলার বাহিনী থেকে মুক্ত করতে আমেরিকা যুদ্ধ করেছে, বহু সংখ্যক আমেরিকান নিহত হয়েছে, ইউরোপে অ্যান্টি-আমেরিকানিজম সূচিত হয় সেখানেই। সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রকাশ্যেই জানিয়ে দেয় আমেরিকা হচ্ছে ‘চূড়ান্ত ধনতান্ত্রিক শক্তি’, সে কারণে সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘অনিবার্য শত্রু’।

অন্যদের চোখে আমেরিকা হয়ে ওঠে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। আমেরিকার অপরাধ কী? রম্যলেখক আর্ট বাখওয়াল্ড ১৯৫৭ সালে বললেন: আমেরিকা জনসমক্ষে উঁচু গলায় কথা বলে, বেশি বেশি টাকা-পয়সা খরচ করে, প্রাক-ঔপনিবেশিক যুগের নীতি অনুসরণ করে, ব্রিটিশদের সুয়েজ অভিযান সমর্থন করে, তেল নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে ফাজলামো করে, সারা দিন চুইংগাম খায়... এ রকম আরো অনেক বিষয়। বিরোধটা শুরুতে মনস্তাত্ত্বিক হলেও আমেরিকান আচরণ সত্যিই দুঃসহ হয়ে ওঠে। সাহিত্যিক হারমান হেসে তার বন্ধু-সাহিত্যিক টোমাস মানকে বলেন, ‘জার্মানিতে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অপরাধী, অপরাধ চক্র, মর্ষকামী ও গ্যাংস্টাররা নািস নয়, তারা জার্মান ভাষাও জানে না, তারা আমেরিকান।’

সাহিত্যিক গ্রাহাম গ্রিন আমেরিকাকে বলেন, ‘বিবেকহীন কনজিউমার সোসাইটি’। ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকার অংশগ্রহণ দেশে ও বিদেশে আমেরিকার ইমেজ সংকট সৃষ্টি করে। জর্জ অরওয়েল আমেরিকান বুদ্ধিজীবীদেরও ছাড় দেন না; তারা নিজ দেশের সরকার ও অর্থনীতি, সমাজ ও যুদ্ধনীতির যে সমালোচনা করেন, তা আসলে প্যারট ক্রাই— তোতাক্রন্দন। জ্য পল সার্ত্রে আমেরিকানিজমের নিন্দা করেন।

‘আমেরিকা ইজ আ ম্যাড ডগ’— এই চিত্কারও ওঠে। দেশে দেশে আমেরিকান কোকা-কোলার প্রচার, প্রসার ও ক্রমবর্ধমান বাজারের বিরুদ্ধে যখন বুদ্ধিজীবীরা হাঁকডাক দিতে শুরু করেন, আর্থার কোয়েসলার বলেন, ‘ব্রিটিশরা যেভাবে ভারত শাসন করেছে, যুক্তরাষ্ট্র তো সেভাবে ইউরোপ শাসন করতে আসেনি, তারা যেভাবে আফিম যুদ্ধ করেছে, আমেরিকা তো কারো গলায় পা দিয়ে কোক ঢুকিয়ে দেয়নি।’

পুরো বিষয়টিই পছন্দ। মানুষ পছন্দ করেই কোকা-কোলা বেছে নিয়েছে।

ব্যাপারটি অবশ্য এমন সরল নয়, বাজারের শক্তি ব্যক্তির পছন্দের শক্তিকে হরণ করে বাজারের নির্দেশ অনুযায়ী পছন্দ করেছে।

ফ্রান্স কোকা-কলোনাইজড হতে চায়নি, সেজন্য আন্দোলন করেছে, শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি।

কোক মার্শাল জুকভ&dquote;&dquote;

১৯৮৫-এর আগে বৈধভাবে সৌভিয়েত ইউনিয়নে কোকা-কোলা পাওয়া সম্ভব ছিল না। তবে জর্জ অরওয়েলের ‘অ্যানিমেল ফার্ম’ তত্ত্ব অনুযায়ী যেহেতু ‘সব জন্তুই সমান, কিন্তু কোনো কোনো জন্তু বেশি সমান’, ‘বেশি সমান’রা কোকের চোরাই সরবরাহ পেয়ে থাকতেন।

যে সোভিয়েত সেনাপতি প্রবল বিক্রমে পূর্ব ইউরোপে প্রবেশ করে এগোতে এগোতে বার্লিন দখল করে ফেললেন, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় দু-এক ঢোক কোক মুখে দিতে দিতে তার নেশা ধরে গেল। তিনি মার্শাল গ্রেগরি জুকভ। তখন আমেরিকার নেতৃত্বাধীন মিত্রবাহিনীকে চাঙ্গা করতে কোকা-কোলার সার্বক্ষণিক সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। সে সময় কোকা-কোলা কোম্পানির জন্য চিলির রেশনিং প্রত্যাহার করা হয় এবং রণাঙ্গনের কাছাকাছি ‘কোক বোটলিং প্লান্ট’ স্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়।

অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সৈন্যদের কাছে এই পানীয় ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রতীক। সুতরাং এটা স্পর্শ করা যাবে না। কিন্তু মার্শাল জুকভের কথা আলাদা; তিনি রুশ সামরিক ইতিহাসে সর্বোচ্চ খেতাবপ্রাপ্ত সৈনিক। তিনি কোক চাইলে কোক আসবেই। তবে তিনি সতর্ক ছিলেন কোক হাতে তাকে যেন অন্যরা দেখতে না পায়, বিশেষ করে সাংবাদিকরা।

মার্শাল জুকভ মিত্রবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করলেন এবং গোপনে রাশিয়ায় তার কাছে কোক সরবরাহের অনুরোধ জানালেন। এ অনুরোধ পৌঁছাল খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুমানের কাছে, তিনি কোকা-কোলা কোম্পানিকে নির্দেশ দিলেন।

সোভিয়েত নৈতিকতা নিয়ে যাতে প্রশ্ন না ওঠে সেজন্য কোম্পানির কেমিস্টকে নির্দেশ দেয়া হলো স্বাদ ও ঝাঁঝ অক্ষুণ্ন রেখে কোকের ঐতিহ্যবাদী রঙ সরিয়ে ফেলতে হবে, আর সরবরাহ করতে হবে ভিন্ন ধরনের বোতলে। তৈরি করা হলো সাদা পানীয়, বোতলটা সোজা আর ক্যাপ সাদা, ক্যাপের মাঝখানে একটি লাল তারা। প্রথমবার জুকভের জন্য শিপমেন্ট করা হলো ৫০ কেইস। স্নায়ুযুদ্ধের শুরুতে ছদ্মবেশে কোকা-কোলাই নির্মাণ করল রুশ-মার্কিন সম্পর্কের প্রথম সেতু।

কোকা-কোলা কর্নেল

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের যখন শুরু, তখন পৃথিবীর ৪৪টি দেশে কোকা-কোলার উৎপাদন হচ্ছে। মহাযুদ্ধ যখন শুরু হয়ে গেল, জাপান মার্কিন জমিনে অবস্থিত পার্ল-হারবার বন্দর আক্রমণ করে বসল। আমেরিকা নিজের ঘোমটা খুলে ফেলল, চারদিকে জার্মান-জাপান অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে  সৈন্য পাঠাতে শুরু করল। তত দিনে কোকা-কোলা কোম্পানি বিনে পয়সায় প্রতিটি আমেরিকান সৈন্যকে অন্তত একটি করে বোতল তুলে দিয়েছে। এ সৈন্যরাই হয়ে উঠল কোম্পানির শ্রেষ্ঠ কমার্শিয়াল অ্যাম্বাসেডর।

কোক সৈনিকদের এতটাই প্রিয় হয়ে উঠল যে, তারা রসদের সঙ্গে এ পানীয়ের দাবিও জানাতে থাকে। সরকারও দেখল— অতি সামান্য খরচে সৈনিকদের সন্তুষ্ট রাখা যাচ্ছে। তাই প্রথম দিকে বিদেশী মার্কিন গ্যারিসনে কেইসভর্তি কোক পাঠানো শুরু হলো। আফ্রিকা, এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন স্থান থেকে কোক পাঠানোর জোর দাবি আসতে থাকে। সরবরাহ দিয়ে কুলিয়ে ওঠা যাচ্ছে না, আবার খরচও পড়ছে বেশি। কোম্পানিই এগিয়ে এল। আমেরিকান মিলিটারি বেইজের কাছাকাছি মোটামুটি নিরাপদ জায়গায় তারা কোকা-কোলা বোটলিং প্লান্ট স্থাপন করতে শুরু করল। কোকা-কোলার টেকনিশিয়ান, কর্মচারীরা সৈনিকদের প্রিয় মানুষ। তারা তাদের ডাকতে শুরু করল কোকা-কোলা কর্নেল। যুদ্ধের সময় কর্নেলরা তিন মহাদেশে ৬৪টি বোটলিং প্লান্ট স্থাপন করে।

কোকা-কোলা আমেরিকান সেনাবাহিনীরও একটি প্রতীকে পরিণত হয়। যুদ্ধের পর এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের প্লাটগুলো রয়ে যায়। কোম্পানি এবার বেসামরিক সরবরাহের দিকে মনোযোগ দেয়। কোকা-কোলা সামনে রেখে গণতন্ত্র এ ধনতন্ত্রের জয়ধ্বনি দেয়া, আবার বিরোধীরা একে বিবেচনা করে সাম্রাজ্যবাদী প্রতীক হিসেবে।

কোককে এমনভাবে প্রচার করা হয়— এটিই হচ্ছে ‘অল আমেরিকান প্রডাক্ট’— কোক ও আমেরিকাকে সমার্থক মনে নয়। কোকা-কোলার একজন নির্বাহী বলেন, ‘পৃথিবী যখন গণতন্ত্রের কথা ভাবে, কোকা-কোলার কথা ভাবে।’

সীমিত সামর্থ্যে ভোগ ও আয়েশের কথা যারা ভাবে, তারাও কোকা-কোলার কথাই ভাবে। ট্রান্সন্যাশনালগুলোর দৌরাত্ম্যের কথা যারা ভাবে, তারাও কোকা-কোলার কথাই ভাবে।

অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত কোকা-কোলায়ন যেমন হয়েছে, একই সঙ্গে কোকা-কলোনাইজেশনও হয়েছে। গোটা পৃথিবীই কোক-উপনিবেশে পরিণত হয়েছে। ঔপনিবেশকৃত মনও মুক্তি পাচ্ছে না, উপনিবেশ স্থাপনকারীর আচরণেও পরিবর্তন আসছে না।

মার্ক পেন্ডারগ্রাস্ট আটলান্টায় অবস্থিত কোকা-কোলা কোম্পানির সদর দপ্তরের একটি চিত্র তুলে ধরেছেন: ১৯৯১-এর মে মাসে একজন উঁচুপদ নির্বাহী এবং একজন সাক্ষাত্প্রার্থী কথা বলছেন, এমন সময় কেউ এসে তাদের আলোচনা কিঞ্চিৎ বাধাগ্রস্ত করে জানিয়ে গেলেন, একটু আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী নিহত হয়েছেন।

নির্বাহী বিড়বিড় করে বললেন, সেটা তো আমাদের জন্য খুব ভালো কিছু হলো না। এটি একটি মানসিকতারই প্রকাশ— অমানবিককৃত মানসিকতা— লুকিং থ্রু দ্য গ্লাস অব কোক-বোটল।

কোকা-কোলার বিরুদ্ধে ফরাসি বিপ্লব!

২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৫০ ফ্রেঞ্চ ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে কমিউনিস্ট ডেপুটি ও জনস্বাস্থ্য-বিষয়ক মন্ত্রীর বিতর্কের একটি ছোট্ট অংশ:

ডেপুটি: মঁশিয়ে মন্ত্রী, আপনি কি জানেন প্যারিসের বুলেভারে কোকা-কোলা বিক্রি হচ্ছে?

মন্ত্রী: এটা আমার জানা আছে।

ডেপুটি: আপনার জানা আছে অথচ এ রকম গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার নিয়ে আপনি কিছুই করছেন না।

মন্ত্রী: এ মুহূর্তে আমার কিছু করার যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই।

ডেপুটি: এটা কেবল সাধারণ অর্থনৈতিক কোনো বিষয় নয়, এমনকি জনস্বাস্থ্য নিয়ে উত্থাপনের মতো প্রশ্নই— এটা একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রশ্নও। আমরা জানতে চাই— যদি রাজনৈতিক কারণেই হয়ে থাকে, আপনার ফ্রেঞ্চ পুরুষ ও নারীদের এই বিষ কেন খাওয়াচ্ছেন?

 

অনেক বিতর্কের পর সেদিন সন্ধ্যায় ফ্রেঞ্চ পার্লামেন্ট এ সিদ্ধান্ত নেয়— কোকা-কোলা পান করা যদি স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর হয়ে থাকে, তাহলে সরকার এ পানীয়কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করবে।

কাজ হয়নি, কোকা-কোলার অগ্রযাত্রা রোধ করা যায়নি।

নািসদের কব্জায় আনতে কোম্পানি একসময় বোতলে সোয়াস্তিকা প্রতীকও ব্যবহার করেছে।

 

কোকা-কোলার বিরুদ্ধে মক্কা-কোলা&dquote;&dquote;

২০০৩ সালের ২৫ নভেম্বর বার্নিংহাম ও লন্ডনের রিজেন্ট পার্ক মসজিদে মুসল্লিদের মধ্যে হাজার হাজার ক্যান সফট ড্রিংক বিতরণ করা হয়। নতুন এ ড্রিংকের নাম মক্কা কোলা।

এক বছর আগে ২০০২ সালের নভেম্বরে ফ্রান্সে এর উদ্বোধনী বিক্রি শুরু হয়।

এটি কোকা-কোলা ও পেপসি কোলার রাজত্বের বিরুদ্ধে আরো একটি ইসলামী কোলা। ইরানের জমজম কোলা যথেষ্ট জনপ্রিয়তা পেয়েছে, আরবে আরো একটি পানীয় কিবলা কোলাও রয়েছে।

ফ্রেঞ্চ ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যাক্তা তওফিক মাথলুফি তার ১০ বছর বয়সী ছেলেকে কোকা-কোলা, পেপসি কোলা খাওয়া থেকে নিবৃত্ত করতে পারছিলেন না। ছেলে জিজ্ঞেস করে তাহলে খাবটা কী?

আমেরিকান কারপোরেট দানবের কাছ থেকে দূরে সরে এসে তিনি মক্কা-কোলা প্লাট স্থাপন করলেন। তিনি প্রথমে ইরানের জমজম কোলা কোম্পানির সঙ্গে মক্কা কোলা বিতরণ নেটওয়ার্ক স্থাপনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। তারপর নিজেই বিতরণ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। তার কোম্পানির সদর দপ্তর দুবইয়ে স্থানান্তর করেন। মূলত মুসলিম চ্যারিটির স্বল্পতা মাথায় রেখে তিনি তার লভ্যাংশের ১০ ভাগ ব্যয় করতে শুরু করেন প্যালেস্টাইনি শিশুদের জন্য স্কুল স্থাপনে, ১০ ভাগ লভ্যাংশ দেন যেসব দেশে মক্কা কোলা বাজারজাত করা হচ্ছে, সেখানকার দাতব্য প্রতিষ্ঠানে। মক্কা কোলার মূল বাজার কিন্তু আরবের কোনো মুসলিম দেশ নয় বরং যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও ভারত। ধর্মীয় নাম ব্যবহার করায় যুক্তরাষ্ট্র এর ট্রেডমার্ক রেজিস্ট্রেশন দেয়নি।  কোকা-কোলা বা পেপসি কোলার বিরুদ্ধে খুব সফল না হলেও তাদের কিছুটা বাজার মক্কা কোলা নিঃসন্দেহে দখল করতে পেরেছে।

কোলাকুলির ফাঁক দিয়ে কোকের মেগাভ্যান

এ কার্টুনটি নিশ্চয়ই অনেকের চোখে পড়েছে। উত্তর কোরিয়ায় কিম আমেরিকার ট্রাম্পকে বলছেন, ‘আমি আমেরিকা ধ্বংস করে ফেলব’।

ট্রাম্প মুখ খিঁচিয়ে জবাব দিলেন দিস ইজ অ্যান আমেরিকান জব। এ কাজের জন্য আমিই যথেষ্ট। বাইরের কাউকে এ কাজ করতে দেয়া হবে না।’

কার্টুন যা-ই বলুক, কিম ও ট্রাম্পের বৈঠক যতই পিছিয়ে যাক, কোকা-কোলা কিন্তু পিছিয়ে নেই। কিম ও ট্রাম্পের মোলাকাত আসন্ন। ক’দিন আগে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী সীমান্তে করমর্দন করেছেন।

তারও আগে ২০০০ সালের জুনে উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং-ইল দক্ষিণ কোরিয়ার তখনকার প্রেসিডেন্ট কিম দায়ে জংকে পিয়ংইয়ং বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানালেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে দুজন কোলাকুলি করলেন।&dquote;&dquote;

যখন তারা কোলাকুলি করছেন, দক্ষিণের শুভেচ্ছা উপহার হিসেবে উত্তর কোরিয়া চীন সীমান্তের ড্যাডং থেকে এসে পৌঁছে মেগাভ্যান বোঝাই কোকা-কোলা। ২৫০ এমএল, ৩৩০ এমএল, ১ লিটার ১.৫ লিটার, ২ লিটার— হরেক রকমের কোকা-কোলা; বোতল আছে, ক্যান আছে, ডায়েট কোকও আছে, মধুমেহ রোগগ্রস্ত কোরিয়ানরাও যেন বঞ্চিত না হয়।

কোক যাতে ঘাঁটি গাড়তে না পারে, সে আন্দোলন সমাজতান্ত্রিক সব দেশে— এমনকি ধনতান্ত্রিক ফ্রান্সেও হয়। কোকা-কোলা হচ্ছে ধনতন্ত্রের প্রতীক, (গণতন্ত্রের প্রতীক!) ন্যাস্টি আমেরিকারও প্রতীক। কাজেই এটা প্রতিহত করার আন্দোলন তো হবেই। উত্তর কোরিয়া কোকের ওপর নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয়নি, তবে কোকের চোরাচালান ঠেকিয়েও রাখতে পারেনি।

কোরিয়ার জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে দেশটিকে উত্তর আর দক্ষিণ— এ দুভাগে ভাগ করা হয়নি। সমাজতন্ত্রী শিবিরের বুদ্ধিজীবীরা মনে করেন, কোরিয়া দ্বিখণ্ডিত হয়েছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে, আর গণতন্ত্রী শিবিরের বুদ্ধিজীবীরা বলেন, রুশ সম্প্রসারণবাদীরা দেশটিকে দুই টুকরো করেছে। স্বার্থ দুই শক্তির, স্বার্থ ছিল না কেবল দেশটির। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ এই তিনসনা যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছে ৫০ লাখ লোক। কোকা-কোলাবিরোধী উত্তর কোরিয়া বলতেই পারে— কোক পান করা আর শহীদের রক্ত পান করা একই কথা।

বিশ্বায়নের বাজারের এমনই গুণ যে, কিম বেশি দিন ঠেকিয়েও রাখতে পারবেন না।

কোকের পেছনে বিগম্যাক নিয়ে ছুটবে ম্যাকডোনাল্ড’স, ভায়াগ্রা নিয়ে ছুটবে ফাইজার। পৃথিবী শাসন করছে কমবেশি ৩৯ হাজার ট্রান্সন্যাশনাল করপোরেশন। রাষ্ট্র মুখ থুবড়ে পড়েছে এবং আরো পড়বে ট্রান্সন্যাশনাল করপোরেশনগুলোর কাছে। টিনএজ পূজার অর্ঘ্য হয়ে উঠেছে কোকা-কোলা।

পুং যৌনতাবান্ধব পানীয়!

কোকা-কোলার বাজার সম্প্রসারণে কথিত কোক-গবেষক বহু বছর আগে রায় দিয়েছেন। ‘মোস্ট ওয়ান্ডারফুল ইনভিগরেটর অব সেক্সুয়াল অর্গানস’।

কিন্তু সত্যটি কী?

৩৩০ এমএল কোকা-কোলা তৈরিতে ব্যবহার হয় ৩৫ গ্রাম চিনি। মানে সাত চা চামচপূর্ণ তিনি।

শুধু সাত চামচ চিনি খেলে ১০ মিনিট পর বমি হবে। কিন্তু ৩৩০ এমএল এক ক্যান বা এক বোতল খাওয়ার পরও বমি হচ্ছে না কেন? কারণ এতে ফসফরিক অ্যাসিড মেশানো হয়, যা মিষ্টত্ব ততটা অনুভব করতে দেয় না। ৫০০ এমএল কোকে চিনির পরিমাণ ১৩ চামচেরও বেশি। যৌন অনুভূতির তীব্রতার মানে যৌনাঙ্গে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি। কার্যত তা চিনির সঞ্চালনও বৃদ্ধি করে এবং তা একসময় ইরেক্টাইল ডিসফাংশন, উত্থান অক্ষমতা— আরো সহজভাবে বলা যায় পুরুষত্বহীনতা সৃষ্টি করে। ডেনমার্কের কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের একটি গবেষণা দেখিয়েছে, যারা প্রতিদিন এক লিটার কোক খাচ্ছেন, তাদের ‘স্পার্ম কাউন্ট’ যারা খাচ্ছে না, তাদের চেয়ে ৩০ শতাংশ কম। সন্তরণশীল স্পার্মের গুণগত মান ও সন্তরণশক্তি হ্রাস পাওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি কোক পানকারীর বন্ধাত্বের সমস্যা দেখা দিতে পারে। কোক এবং অতিরিক্ত চিনির কোনো বুদ্বুদ পানীয় কোনোভাবেই যৌনস্বাস্থ্যের সহায়ক নয়, ক্ষতিকারক। এ বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক বাজারের অজানা নয়।

 &dquote;&dquote;

কোকবিশ্বাসী যৌনকর্মী, কোকবিশ্বাসী যৌনাচারী

গত শতকের শেষ দিকে মরণব্যাধি এইডস যখন ছড়িয়ে পড়ে, কোকা-কোলা নিয়ে আজগুবি সব রটনা কোনো কোনো জায়গায় বিশ্বাসে পরিণত হয়।

মালয়েশিয়ার সারওয়াক রাজ্যের বোর্নিও দ্বীপের যৌনকর্মীরা কোকা-কোলার চাহিদা বাড়িয়ে দেয়। কয়েক বোতল বা কয়েক ক্যান কোক তাদের কাছে মজুত থাকতেই হবে। যৌনকর্মের আগে বেশ করে ঝাঁকিয়ে খানিকটা নিজ যৌনাঙ্গে ঢেলে দেয়। তারা জানে, কোকের ফেনা ও বুদ্বুদ এইডস সৃষ্টিকারী জীবাণু এইচআইভি ধ্বংস করে দেয়।

এইডস আক্রান্ত পুরুষের চিকিৎসায় আফ্রিকার কোনো অঞ্চলে পুরুষ রোগীরা তখন দুটি বিকল্প বেছে নেয়। শ্রেষ্ঠটি হচ্ছে কুমারী কন্যার সঙ্গে সহবাস। তাতে কুমারী এইচআইভি শুষে নেবে, দ্বিতীয় বিকল্প হচ্ছে, যৌনকর্মের পর পরই কোক দিয়ে যৌনাঙ্গ ভালো করে ধুতে হবে।

এ কুসংস্কার এইডসের প্রকোপ বাড়িয়েছে।

স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম বিদেশী অতিথি

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করে বঙ্গভবনের দোতলায় দুটি কক্ষে; সে সময় সম্ভবত বাংলাদেশের প্রথম বিদেশী অনাহূত যে অতিথির আগমন ঘটে, তিনি থ্রি-পিস, স্যুট পরিহিত সুদর্শন ইংরেজ ভদ্রলোক কর্মকর্তা ফারুক চৌধুরীর হাতে তার যে বিজনেস কার্ড তুলে দিলেন, তাতে বোঝা গেল তিনি ব্র্যাড বেরি উইলকনসন কোম্পানির বাণিজ্য প্রতিনিধি।

এ কোম্পানিটি তরবারি প্রস্তুত করার জন্য বিখ্যাত, পরে শেভিং ব্লেডও তৈরি করেছে, তাদের আরেকটি ব্যবসা— ব্যাংক নোট ছাপা।

যেহেতু বাংলাদেশ সদ্যস্বাধীন, ব্যাংক নোট ছাপাতেই হবে। কাজেই কাজটা তাদেরই চাই। ব্যবসায়ী জানেন, কেমন করে কাজ আদায় করতে হয়, এ ব্যবসায়ীও কার্যাদেশ আদায় করেছেন। ফারুক চৌধুরীর ‘শেষ হাসি’ নামের একটি স্কেচে বিষয়টি জেনেছি।

প্রথম অতিথি হিসেবে কোকা-কোলার প্রতিনিধিকে দেখলেও এটা অবাক হওয়ার মতো কিছু হতো না। সাম্রাজ্য বিস্তারের এটাই তো কৌশল।

পাকিস্তান আমলেই তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে কোকা-কোলা প্লান্ট বসে যাওয়ায় সে সময় তাদের নতুন উদ্যোগ নিতে হয়নি।

উইলকসনস প্রতিনিধি যুদ্ধের পরিণতি টের পেয়ে কলকাতায় চলে এসেছিলেন, সেখানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন ব্রিগেডিয়ারের সঙ্গে পরিচিত হন এবং দ্রুত বন্ধুত্ব স্থাপন করেন। তিনি তাকে ভারতীয় বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টারে ঢাকায় পাঠান।

নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ডেসমন্ড টুটুর একটি বর্ণনা খুবই লাগসই— পশ্চিমের সাদা মানুষ যখন আফ্রিকায় এল, তাদের হাতে বাইবেল। তারা কালো মানুষদের বলল, তোমরা চোখ বন্ধ করো এবং প্রার্থনা করো।

কালো মানুষ প্রার্থনা শেষে যখন চোখ খুলল, দেখল তাদের হাতে বাইবেল, আর তাদের সব জমি চলে গেছে সাদা মানুষের কাছে।

কোকো-কোলায়নেও তা-ই ঘটেছে।

একটি ব্যক্তিগত পাদটীকা

১৯৬৯। হাই স্কুলের দ্বিতীয় বর্ষ চলছে। মানে ক্লাস সেভেন, দেশের বাড়ি থেকে আঠারো-উনিশ বছর বয়সী আমার এক আত্মীয় এসেছে। বিকালের দিকে আমার বাবা আমাকে ১ টাকা দিয়ে বললেন, এ আত্মীয়কে নিয়ে যেন একটু ঘুরে আসি, টাকাটা টুকটাক খাওয়ার জন্য। আমি  পরিকল্পনা করে ফেললাম। হেঁটে শেরেবাংলা নগরে নির্মাণাধীন সেকেন্ড ক্যাপিটাল (আসলে সংসদ ভবন) দেখিয়ে ফার্মগেট হয়ে ফেরার পথে কাশ্মীর কনফেকশনারিতে (বহু  বছর আগে বিলুপ্ত, এখন বহুতল ভবন সেখানে) ফ্রিজের ঠাণ্ডা কোকা-কোলা (সে সময় ফ্রিজের দেখা খুব কম দোকানেই মিলত) খেয়ে বাড়ি ফিরে আসব। দুই বোতলের দাম ছয় দু’গুণে বারো আনা, বাকি চার আনা ধরে নিচ্ছি ট্যুরিস্ট গাইড হিসেবে আমার মজুরি।

বেশ ঠাণ্ডা কোক পেলাম। বোটল-ওপেনার দিয়ে খোলার সময় চমত্কার একটি শব্দ হলো। আমি মনের সুখে বোতলের মুখ নিজের মুখে ঢুকিয়ে দিলাম।

এক ঢোক মুখে নিয়ে ওদিকে আমার আত্মীয় তা ওগরে ফেললেন এবং চোখ লাল করে আমার দিকে তাকালেন। তিনি দ্বিতীয় চুমুক দিলেন না। ফেরার পথে আমার সঙ্গে তেমন কথাও বললেন না।

একাত্তরে যখন ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে যাই, দেখি কয়েকজন বয়স্ক মুরব্বিজন সন্দিগ্ধ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে; একজন বললেন, বাচ্চা বয়সেই মদ খাওয়া ধরলে।

অন্যজন বললেন, নিজে খেলেও একটা কথা ছিল, জোর করে অন্যদেরও খাওয়ায়।

বোঝার বাকি নেই আমার আত্মীয় কোককে নিশ্চয়ই মদই মনে করেছেন। আমার আপ্যায়নকে সেভাবেই নিয়েছেন।

স্বাধীনতার ১০ বছরের মধ্যেই অতিথিকে লেবু কিংবা বেলের শরবত দেয়ার সংস্কৃতি উঠে গেল। আমার সেই আত্মীয়ের বাড়িতে যখন গেলাম, জিজ্ঞেস করলেন— কোক কি গ্লাসে ঢেলে দেবে না সরাসরি বোতল থেকে খাব।