এযাবৎ প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত করে বলা যায় দীর্ঘ দুই হাজার বছর ধরে বিহার ভারতবর্ষের জ্ঞানচর্চার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছিল। সেই প্রাচীন মগধ সাম্রাজ্য থেকে শুরু হয়ে গুপ্ত, পাল, সেন, মোগল আমল পর্যন্ত বিহারে একটি সমৃদ্ধ বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ গড়ে উঠেছিল। এ যুগের দুর্দশাগ্রস্ত বিহারের সঙ্গে যার তুলনা করা প্রায় অসম্ভব।

ভারত সভ্যতার উন্মেষকালে

ভারতবর্ষের প্রাচীন সভ্যতাগুলো প্রধানত গড়ে উঠেছিল সিন্ধু ও গঙ্গা অববাহিকাজুড়ে। এর মধ্যে মেহেরগড়, হরপ্পা কিংবা মহেঞ্জোদারোর মতো সিন্ধু সভ্যতাগুলো আট-দশ হাজার বছর প্রাচীন। সে তুলনায় গঙ্গা অববাহিকায় গড়ে ওঠা সভ্যতাগুলো আরো পাঁচ-ছয় হাজার বছর পরের ঘটনা। কিন্তু ২০১৭ সালে বিহারের প্রাচীন নগরী মিথিলায় হরপ্পা যুগের ইটের সন্ধান পাওয়ার পর গাঙ্গেয় সভ্যতার বয়স নিয়ে নতুন চিন্তাভাবনার সূত্রপাত হয়। এরই আগে বিহারকেন্দ্রিক সভ্যতার সঙ্গে সিন্ধু সভ্যতার কোনো যোগসূত্র পাওয়া যায়নি। তবে নতুন গবেষণার ফলাফলের জন্য আরো কিছুকাল অপেক্ষা করতে হবে।

ঐতিহাসিকদের খাতায় মূলত বৈদিক যুগ থেকে বিহারের সভ্যতা বিস্তারের চিত্রটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে মোটামুটি লিখিত ইতিহাস পাওয়া যায়। প্রাচীন ভারতীয় ধর্মগ্রন্থগুলোয় মগধ, মিথিলা, অঙ্গ নামের যেসব নগরের উল্লেখ আছে তার সবই বিহার অঞ্চলের মধ্যে।

৩২৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডার যখন ভারত আক্রমণ করেন তখনো মগধ বেশ শক্তিশালী রাজ্য। সে সময় মগধের শাসক ছিলেন নন্দ বংশের রাজা ধনানন্দ। নন্দ আমলে এ সাম্রাজ্য পূর্বে বাংলা, পশ্চিমে পাঞ্জাব ও দক্ষিণে বিন্ধ্যা পর্বতমালা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তার দুই লাখ পদাতিক সৈন্যের শক্তিশালী বাহিনী ছাড়াও ছিল তিন হাজার হাতি ও চার হাজার সৈন্যের অশ্বারোহী বাহিনী। শোনা যায় আলেকজান্ডার উত্তর ভারতের একাংশ জয় করলেও পূর্ব দিকে এগিয়ে মগধের শক্তি সামর্থ্যের খবর পেয়ে সীমান্ত থেকে ফিরে গিয়েছিলেন।

আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের কয়েক বছর পর ধনানন্দ ক্ষমতাচ্যুত হন তার অধীনস্থ এক সেনাপতির হাতে। ইতিহাসে সে সেনাপতি চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য নামে পরিচিত।

চন্দ্রগুপ্তকে ক্ষমতায় বসানোর মূল কারিগর ছিলেন চানক্য, যিনি সুবিখ্যাত গ্রন্থ অর্থশাস্ত্র লিখেছিলেন। আড়াই হাজার বছর পরও রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতি বিষয়ে প্রাচীন ভারতের একজন দিকপাল হিসেবে তিনি সুপরিচিত।

চন্দ্রগুপ্তের ক্ষমতারোহণে তার ভূমিকা নিয়ে একাধিক কিংবদন্তি চালু আছে। তার একটি রাজা ধনানন্দ চানক্যকে একবার প্রকাশ্যে চরম অপমান ও অপদস্থ করেছিলেন। তিনি সে অপমানের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য চন্দ্রগুপ্তকে ব্যবহার করে ধনানন্দকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। চানক্যের বিচক্ষণ যুদ্ধ পরিকল্পনার কারণে চন্দ্রগুপ্ত বিজয়ী হয়েছিলেন। চানক্য ছিলেন মৌর্য সাম্রাজ্যে চন্দ্রগুপ্তের প্রধান উপদেষ্টা। সে হিসেবে চানক্যকেও মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বলা চলে।

মৌর্য বংশের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন বৃহত্তর ঐক্যবদ্ধ ভারতের প্রথম শাসক। মৌর্য শাসনামলে ভারতবর্ষ দক্ষিণ এশিয়ার একটি বৃহত্তম শক্তিশালী সাম্রাজ্য হিসেবে গড়ে উঠেছিল। পূর্বে বাংলা থেকে পশ্চিমে আফগানিস্তান ও বেলুচিস্তান, উত্তরে কাশ্মীর থেকে দক্ষিণে দাক্ষিণাত্য মালভূমি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। ভারতের ইতিহাসে তার আগে এর চেয়ে বৃহৎ সাম্রাজ্য নির্মিত হয়নি। তিনি ভারতের সবচেয়ে বড় অংশকে একত্রিত করে প্রথমবারের মতো শাসনকার্য জারি করেন, যেটা পরিপূর্ণতা পেয়েছিল সম্রাট অশোকের আমলে। চন্দ্রগুপ্ত বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি খুব অনুরক্ত ছিলেন। তিনিই প্রথম ভারতবর্ষে বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার ঘটিয়েছিলেন। তার পৌত্র অশোকের আমলেও সেটা অব্যাহত থাকে।

আলেকজান্ডার ভারত আক্রমণ করে পুরো সফল না হলেও উত্তর ভারতের কিছু অংশে গ্রিক শাসন জারি হয়েছিল। সেসব অঞ্চল থেকে অনেক ভারতীয় পণ্ডিত পালিয়ে বিহারে চলে আসেন। তাদের সম্মিলিত চেষ্টায় পাটালিপুত্রে (বর্তমান পাটনা) গড়ে উঠেছিল বৌদ্ধদের উন্নততর এক বিদ্যাশিক্ষা কেন্দ্র। তখন পাটালিপুত্র ছিল মগধের রাজধানী।

কৌটিল্য যুগের সমৃদ্ধি

চন্দ্রগুপ্তের আনুকূল্যে মগধে যে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল তার অন্যতম গুরু ছিলেন চানক্য বা কৌটিল্য। সে সময়েই তিনি রচনা করেছিলেন বিশ্বখ্যাত গ্রন্থ ‘অর্থশাস্ত্র’। সে সময়ের আরেকজন প্রাজ্ঞ বিদ্যাগুরু ছিলেন ভদ্রবাহু। তিনিও একাধিক মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করে বিহারের বৌদ্ধিক সমাজকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। রাজনীতি ও জ্ঞানচর্চা উভয় ক্ষেত্রেই মগধ তখন ভারতবর্ষের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ছিল।

চন্দ্রগুপ্তের সময়ে বিহারে জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার যে ভিত গড়ে উঠেছিল, সম্রাট অশোকের সময়কালে সেটাই উন্নতির সর্বোচ্চ শিখর স্পর্শ করেছিল। ভারতে বৌদ্ধ ধর্ম প্রসারও শুরু হয়েছিল চন্দ্রগুপ্তের আমলে। তার পৌত্র সম্রাট অশোকও একই নীতি অনুসরণ করেছিলেন। তিনি চাইতেন সাধারণের মধ্যেও বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার ও প্রসার ঘটুক। তিনি ধর্মীয় বাণীগুলোকে সাধারণের কাছে পৌঁছানোর জন্য আমজনতার ভাষায় অনুবাদের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। প্রাকৃত ভাষার সেসব বাণী পাথরের স্তম্ভে খোদাই করে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন। তার আমলে ভারতে প্রস্তর শিল্প একটা অনন্য উচ্চতায় উঠে গিয়েছিল। পাথরে খোদাই করা সে বাণীগুলো দুই হাজার বছর পরও অবিকল রয়েছে। সেটা ছিল এমন একটা সময় যখন রাজা ও প্রজার ভাষা একীভূত হয়ে গিয়েছিল। সম্ভবত ওটা ছিল সমগ্র সাম্রাজ্যের মধ্যে একটা সাধারণ ভাষা চালু হওযার প্রথম পদক্ষেপ। সম্রাট অশোকের মৃত্যুর পর মৌর্য সম্রাজ্যের প্রভাব কমতে শুরু করলেও বিহার জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রভূমি হিসেবে আরো বহুকাল সক্রিয় ছিল।

জ্ঞানচর্চায় পাটনার উন্নতি আরো একবার শিখর স্পর্শ করেছিল চতুর্থ শতকে এসে। উদারপন্থী গুপ্ত শাসকরা জ্ঞানচর্চাকে উৎসাহিত করার জন্য দূর দেশের শাসককেও পাটনায় ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলার অনুমোদন দিয়েছিলেন। শ্রীলংকার শাসক মেঘবর্মা বুদ্ধগয়ায় একটা মন্দির স্থাপন করেছিলেন, যেখানে বৌদ্ধ ধর্মের দীক্ষা প্রচার করা হতো।

গুপ্ত শাসকদের আনুকূল্যে শিল্প সাহিত্যের যে প্রসার হয়েছিল তার একটি নজির বিখ্যাত সংস্কৃত কবি কালিদাসের সাহিত্যকর্ম। কালিদাস গুপ্ত রাজ্যের সভাকবি থাকা অবস্থায়ই বিখ্যাত মেঘদূত কাব্য রচনা করেছিলেন। শুধু শিল্প সাহিত্য নয়, জ্ঞানবিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায়ও তখন উত্কর্ষ অর্জন করতে শুরু করেছিল। আর্যভট্ট ছিলেন বিশ্বমানের একজন গণিতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিদ। প্রাচীন ভারতীয় গণিতের ইতিহাসে আর্যভট্টের হাত ধরেই ক্ল্যাসিক্যাল যুগ (কিংবা স্বর্ণযুগ) শুরু হয়। গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যাসংক্রান্ত আর্যভট্টের বিভিন্ন কাজ মূলত দুটি গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে বলে জানা গেছে। এর মাঝে ‘আর্যভট্টীয়’ একটি গ্রন্থ যেটি উদ্ধার করা গেছে। অন্য যে কাজটি সম্পর্কে জানা যায় সেটি হলো ‘আর্য-সিদ্ধান্ত’। আর্য-সিদ্ধান্তের কোনো পাণ্ডুলিপি খুঁজে পাওয়া যায়নি, তবে বরাহমিহির, ব্রহ্মগুপ্ত ও প্রথম ভাস্করের কাজে এটির উল্লেখ মেলে। আর্যভট্ট গ্রন্থ রচনা করেছিলেন পদবাচ্যের আকারে। মাত্র ২৩ বছর বয়সে আর্যভট্ট গ্রন্থটি সংকলন করেন।

নালন্দার স্বর্ণযুগ

মৌর্য সাম্রাজ্যের আরেকটি খ্যাতিমান কীর্তি ছিল নালন্দা বিদ্যাপীঠ। নালন্দা ছিল প্রাচীন ভারতের মগধ রাজ্যে অবস্থিত একটি খ্যাতনামা মহাবিহার। এটি বিহারের রাজধানী পাটনা শহরের ৯৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত। খ্রিস্টীয় সপ্তম থেকে আনুমানিক দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত নালন্দা মহাবিহার ছিল ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

প্রাচীন ভারতে বৈদিক শিক্ষার উত্কর্ষ তক্ষশীলা, নালন্দা, বিক্রমশিলা প্রভৃতি বৃহদায়তন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর স্থাপনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইতিহাসবিদরা ভারতের প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবেও চিহ্নিত করেন। খ্যাতির মধ্যগগনে থাকাকালীন নালন্দায় ভারত ছাড়াও তিব্বত, চীন, কোরিয়া ও মধ্য এশিয়ার পণ্ডিত ও ছাত্ররা অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা করতে আসতেন। ইন্দোনেশিয়ার শৈলেন্দ্র রাজবংশও যে এ মহাবিহারের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিল, তাও পুরাতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে স্পষ্ট।

বর্তমানে আমরা নালন্দা মহাবিহার সম্পর্কে যেসব তথ্য পেয়েছি, তা এসেছে মূলত হিউয়েন সাং ও কয়েকজন পূর্ব এশীয় তীর্থযাত্রী ভিক্ষুর ভ্রমণ বিবরণী থেকে। এরা খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে নালন্দায় এসেছিলেন। ভিনসেন্ট আর্থার স্মিথ মনে করেন, নালন্দার ইতিহাস মহাযান বৌদ্ধ ধর্মেরই ইতিহাস। হিউয়েন সাং তার ভ্রমণ বিবরণীতে নালন্দার অবদান হিসেবে যেসব পণ্ডিতের নাম করেছেন, তাদের অনেকেই মহাযান দর্শনের বিকাশের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতি এতদূর ছড়িয়ে পড়েছিল যে অষ্টম শতাব্দীতে এ বিদ্যাপীঠের আচার্য শান্তরক্ষিতকে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের জন্য তিব্বতে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তিনি তার সঙ্গে আরো সাতজন বৌদ্ধ পণ্ডিতকে নিয়ে তিব্বত গিয়েছিলেন। একাদশ শতাব্দীতে বিক্রমশীলা বিহার থেকে তিব্বত গিয়েছিলেন অতীশ দীপঙ্কর। তিনি তিব্বতিদের বড় একটা অংশকে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা দিয়েছিলেন।

গুপ্ত শাসনের পর পাল বংশের শাসনামলে বাংলায় শাসনকেন্দ্র স্থাপিত হলেও নালন্দার খ্যাতি আগের মতোই ছিল। পাল শাসকরাও নালন্দাকে পৃষ্ঠপোষকতা করতে থাকেন। পাল বংশের পর সেন বংশের কাছ থেকেও একই রকম সহযোগিতা পেয়ে গেছে নালন্দা।

কিন্তু দ্বাদশ শতাব্দীতে এসে বড় ধরনের হোঁচট খায় নালন্দার সে অগ্রগতি। দ্বাদশ শতাব্দীর শেষভাগে মধ্য এশিয়া থেকে মুসলিম বাহিনী উত্তর ভারত আক্রমণ করে। এর আগে গজনির সুলতান মাহমুদের সময় থেকে সিন্ধু ও পাঞ্জাব অঞ্চল মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। দ্বাদশ শতাব্দীতে এসে সেটা ক্রমেই পূর্ব দিকে সরে আসে। বখতিয়ার খলজির বাহিনীর হাতে বিহার আক্রান্ত হলে নালন্দা তাতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে শিক্ষক ও বিদ্যার্থী সবাই পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। নালন্দার বিখ্যাত গ্রন্থাগার ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

১২৩৪ সালে ধর্মস্বামী নামের এক তিব্বতি শিক্ষক নালন্দায় এসেছিলেন। তিনি দেখেছেন পুরো নালন্দায় মাত্র একজন শিক্ষক টিকে আছেন। তার বয়স ৯০। মাত্র অল্প কয়েকজন ছাত্র নিয়ে তিনি টিকে আছেন কোনোমতে। তিনি জানিয়েছেন, নালন্দায় অবশিষ্ট যেসব বইপত্র ছিল, সেগুলো পড়ার মতো লোক ছিল না। সবাই মৃত্যুভয়ে কাতর হয়ে ছিল। অনুমান করা হয় যে সময়কাল থেকে নালন্দার পতন শুরু হয়, সে সময় থেকে পুরো ভারতবর্ষ থেকে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব কমতে শুরু করে। এতে পরবর্তী কয়েকশ বছরে বৌদ্ধ ধর্মের আদি ভাষা বলে পরিচিত পালি ভাষা বিলুপ্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল।

মুসলমান যুগের বিজ্ঞানচর্চা

দ্বাদশ শতাব্দী থেকে বিহারে মুসলমান শাসন শুরু হওয়ার পর সুফিদের আগমন ঘটে। প্রাথমিক যুগে আবু নজিব আবদুল কাদের সরওয়ার্দী (১১৬৮ খ্রিস্টাব্দ) ও তার অনুসারীরাই প্রাধান্য বিস্তার করতে শুরু করে। গ্রাম ও শহরাঞ্চলে ধর্মান্তরিত হয় অনেক মানুষ। মুসলমানরা শাসনকাজ এবং ধর্মীয় প্রচার প্রসারের জন্য ফার্সি ও আরবি ভাষা প্রচলন করে। শাসকরা ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করাকেই প্রাধান্য দেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে ফার্সি ভাষা জনপ্রিয়তা লাভ করে। তবে আশ্চর্যের বিষয় কথ্য ভাষা হিসেবে ফার্সি যতটুকু চালু হয়েছিল, লিখিত ভাষা হিসেবে তেমন একটা জনপ্রিয়তা পায়নি। মুসলিম শাসন শুরু হওয়ার অন্তত প্রথম ৩০০ বছরে সেটা দেখা যায়নি।

মুসলমানরা চিকিৎসাবিদ্যায় ইউনানি পদ্ধতি আমদানি করেছিল। সে সময় ভারতে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা খুব জনপ্রিয় ছিল। ইউনানি আসার পরও আয়ুর্বেদিক পদ্ধতির জনপ্রিয়তা কমেনি। দুই পদ্ধতির চিকিৎসাই পাশাপাশি চলেছিল। এখানে লক্ষণীয় ধর্মে বিপুল বিভেদ থাকলেও বিজ্ঞানে তার প্রভাব পড়েনি।

১৫২৬ সালে পানিপথের যুদ্ধে মোহাম্মদ লোদিকে হারিয়ে সম্রাট বাবর যখন মোগল শাসনের গোড়াপত্তন করেন, তখনো বিহার মোগল শাসনের বাইরে ছিল। বাবরের মৃত্যুর পর তার পুত্র হুমায়ুন পূর্ব দিকে সীমান্ত বিস্তার করতে গিয়ে বিহার থেকে বাংলা পর্যন্ত অধিকার করেন। কিন্তু সে অধিকার তিনি বেশিদিন রাখতে পারেননি। কারণ বিহারের এক দুর্ধর্ষ সৈনিক শের শাহ মাথা উঁচু করে হুমায়ুনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। শের শাহের কাছে ধাওয়া খেয়ে হুমায়ুন ভারতবর্ষ ত্যাগ করে পারস্যে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন দীর্ঘ সময়ের জন্য। শের শাহ বিহার ও বাংলাকে মোগল অধিকার থেকে মুক্ত করে থেমে থাকেননি। দিল্লির সিংহাসন পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল তার হাত। তিনি খুব বেশিদিন শাসন করেননি, তবু স্বল্পমেয়াদে তিনি যেসব শাসনব্যবস্থা প্রচলন করেছিলেন, তা পরবর্তী মোগল সম্রাটদের জন্য আদর্শ হয়ে ছিল। ভারতে মুদ্রা হিসেবে রুপির যে প্রচলন সেটা শের শাহের হাতেই। বিখ্যাত গ্র্যান্ড ট্রাংক রোড ভারতের ইতিহাসের দীর্ঘতম মহাসড়ক তার আমলেই তৈরি। শের শাহের ঘোড়ার ডাক ব্যবস্থা তো প্রবাদতুল্য ব্যাপার হয়ে আছে। বিহারই ছিল এসব শাসনতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের পটভূমি।

সম্রাট আকবরের সময়কালে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসলে শিল্প সাহিত্যের প্রসার ঘটতে শুরু করেছিল ভারতবর্ষজুড়ে। বিহারেও তার প্রভাব পড়েছিল। এ সময়ে পারস্যের শিক্ষকদের সঙ্গে মিলে মিথিলার শিক্ষকরা বেশকিছু গ্রন্থ রচনার কাজ করেন। মহেশ ঠাকুর এ পথ দেখিয়েছিলেন তাদের। সম্রাট আকবর মহেশ ঠাকুরের শিক্ষাদীক্ষায় মুগ্ধ হয়ে বিহারের দেওয়ান হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন। শাহজাহানের আমলেও হেমাঙ্গ ঠাকুর নামে মহেশ ঠাকুরের এক বংশধর জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে একটা গ্রন্থ রচনা করেছিলেন এবং সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণ নিয়ে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছিলেন।

 

হারুন রশীদ: সভ্যতা ও ইতিহাস অনুসন্ধানী লেখক