ভালোবেসে কত কিছুই তো করে মানুষ। তাই বলে সিংহাসন পরিত্যাগ? মিসেস সিম্পসনকে ভালোবেসে সেই বিরল দৃষ্টান্তই স্থাপন করলেন কিং এডওয়ার্ড। অথচ সেই খবর আগে ইউরোপ কিংবা আমেরিকার কোনো সাংবাদিক প্রকাশ করেননি। প্রকাশ করেছেন দূর মিসরের সম্পাদক গাব্রিয়েল তাকলা। লন্ডন ও নিউইয়র্কের মানুষ জানার আগেই বিষয়টি নিয়ে মুখর হয়ে উঠেছিল কায়রোর অধিকাংশ কফিশপ। সামনে তাদের গাব্রিয়েল তাকলার আরবি পত্রিকা ‘আল-আহরাম’। ব্রিটিশদের কাছে যেমন ‘টাইমস’, আমেরিকানদের কাছে যেমন ‘নিউইয়র্ক টাইমস’, আরবদের কাছে ঠিক তেমনটাই ‘আল-আহরাম’।

১৮৭৫ সালের কথা। ইউরোপ ও আমেরিকায় যে আধুনিকায়নের হাওয়া বইতে শুরু করেছিল, তা ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে মিসরের মাটিতেও। এমন সময় উসমানি দরবারের কড়াকড়ি থেকে সরে আসেন সেলিম তাকলা ও তার ভাই বিশারাহ তাকলা। আলেকজান্দ্রিয়ায় স্থাপন করলেন আল-আহরামের ভিত্তি। প্রথমে সাপ্তাহিক হিসেবে শনিবারে প্রকাশ হলেও ১৮৮১ সাল থেকে দৈনিক পত্রিকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে আল-আহরাম। ক্রমে পরিণত হয়েছে তত্কালীন অভিজাত ও মধ্যবিত্ত মিসরীয় জনগণের মুখপত্র হিসেবে। মুসলিম সংস্কারক মুহম্মদ আবদুহু এ পত্রিকার মধ্য দিয়েই অর্জন করেন পরিচিতি। মোস্তফা কামাল পাশার নেতৃত্ব কিংবা খলিল মুতরানের কবি খ্যাতির পেছনে রয়েছে এর ভূমিকা। এডওয়ার্ড সাঈদ থেকে হামিদ দাবাশী কিংবা নাগিব মাহফুজ থেকে ত্বহা হোসাইন—আধুনিক আরব চিন্তকদের বড় একটা অংশের প্রতিষ্ঠাপর্ব কেটেছে এ পত্রিকার সঙ্গে। আরব বিশ্বের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিবর্তনের সাক্ষী হয়ে শুধু নয়, আরবি ভাষার গতিবিধি নির্ধারণেও নিয়ামক হয়ে থেকেছে আল-আহরাম।

সেলিমের মৃত্যুর পর প্রকাশনার পুরো দায়িত্ব পরে বিশারাহ তাকলার ওপর। মাত্র নয় বছরের ব্যবধানে মারা যান তিনিও। বিশারাহর একমাত্র ছেলে গাব্রিয়েল তখনো ছোট। দৃশ্যমান এ ক্রান্তিলগ্নে সামনে এগিয়ে আসলেন তার মা। তিনিই পেছনে থেকে পারিবারিক বন্ধু দাউদ বারাকাতের তত্ত্বাবধানে চালু রাখলেন আল-আহরামের অগ্রযাত্রা। শৈশব থেকেই গাব্রিয়েলকে প্রস্তুত করলেন আল-আহরামের দায়িত্ব নেয়ার জন্য। হতাশ হতে হয়নি। ১৯০৮ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে আল-আহরামের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হাতে পেয়েই আনলেন ব্যাপক পরিবর্তন। দেশে-বিদেশে নিজস্ব প্রতিনিধি রাখা হলো। ইউরোপের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলল সংস্কার। পাঠকের কথা মাথায় রেখে খবরের সঙ্গে ছবি যুক্ত হলো। পরিবর্তন এল আরবি টাইপিং রীতিতে। পত্রিকার কলেবরও চার থেকে বেড়ে দাঁড়াল ১৬-২০ পৃষ্ঠায়। নিয়মিত পশ্চিমা প্রেস অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন গাব্রিয়েল। জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার পণ্ডিতদের পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত করতে ছিলেন তত্পর। ফলে পত্রিকার গ্রাহক সংখ্যা রাতারাতি ১২ হাজার থেকে ১ লাখে পরিণত হলো।

প্রতিষ্ঠানের প্রতি গ্যাব্রিয়েলের দায়বদ্ধতার একটা উদাহরণ হতে পারে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন মন্দাবস্থা। পত্রিকার কলেবর নেমে চার পৃষ্ঠাতে ঠেকলেও তিনি কর্মীদের কাউকেই ছাঁটাই করেননি। মিথ্যা সংবাদ এমনকি পণ্যের মিথ্যা বিজ্ঞাপনও ছাপা হতো না। ফলে জনমনে পত্রিকাটির প্রতি আস্থা ও ভালোবাসা ছিল অন্য মাত্রার। দ্রুতই দেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিষয়ে প্রবীণ পরামর্শকের ভূমিকা পালন করতে থাকে আল-আহরাম। শক্তিশালী সম্পাদকীয়ের জন্য সবসময় আলাদা অবস্থান তৈরি করেছে পাঠকমহলে। কেবল বাক্স্বাধীনতার জন্য না, ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে স্বাধীনতার পক্ষেও নিয়মিত প্রকাশিত হতো লেখা। ১৯২৪ সালে দাউদ বারাকাতির লেখা পরবর্তী সময়ে বছরের পর বছর মিসরীয় গণমানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। সমালোচনা সত্ত্বেও পত্রিকার জনপ্রিয়তা ও মর্যাদার জন্য শাসকরা আল-আহরাম বন্ধ করে দিতে সাহস করেনি। মাত্র ১৪ বছরের এক পুত্র ও দুই কন্যা রেখে গাব্রিয়েল মৃত্যুবরণ করেন ১৯৪৩ সালে। প্রকাশনার দায়িত্ব পড়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু আন্তুন গুমাইল পাশার কাঁধে। পূর্বজীবনে মিসরের অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলে আসা গুমাইল বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতেন। ফলে তার সময়ে আল-আহরাম কার্যালয় হয়ে উঠত রাজনীতিবিদ, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী ও ব্যবসায়ীদের তীর্থস্থান।

আল-আহরামের দীর্ঘ পথচলায় কিছু প্রতিযোগীও দেখতে হয়েছে। ১৮৮৮ সালে যাত্রা করে ‘আল-মুকাত্তাম’। ১৯৩৬ সালে বিখ্যাত প্রতিবেদক মাহমুদ আবুল ফাতহ আল-আহরাম থেকে বের হয়ে করিম সাবিতের সঙ্গে শুরু করেন ‘আল-মিসরি’। মিসরীয় সংস্কৃতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলার পরও উভয় পত্রিকা ১৯৫৪ সালের দিকে বন্ধ হয়ে যায়। তবে আল-আহরামের আধিপত্য ভাটা পড়েনি। ১৯৫৭ সালে সম্পাদকের দায়িত্ব পান মোহাম্মদ হাসনাইন হায়কল। হায়কল ছিলেন রাষ্ট্রপতি গামাল আবদেল নাসেরের বন্ধু। ফলে সরকারি অংশগ্রহণ বৃদ্ধির পাশাপাশি পত্রিকাটি বিস্তার লাভ করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। ১৯৭৬ সালে গ্রাহক সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ২০ হাজার এবং ২০০০ সালের জরিপে তা দাঁড়ায় ১২ লাখে। বর্তমানে মিসরের তথ্য মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে কায়রো থেকে প্রকাশ হয় পত্রিকাটি। প্রকাশিত ও প্রচারিত হয় বাহরাইন, সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকেও। অনলাইনে যাত্রা করার পর আল-আহরাম বর্তমানে আরব বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ওয়েবসাইটের একটি।

মিসরে মুহম্মদ আলি পাশার সময়ে ১৮২৮ সালে যাত্রা করেছিল ‘আল-ওয়াকায়ি আল-মিসরিয়াহ’। এক কলামে তুর্কি আর পাশের কলামে আরবি ভাষায় অনুবাদ দেয়া থাকত। তুর্কি অংশের সম্পাদক ছিলেন মুস্তফা সামি এফেন্দি এবং আরবি অংশের শিহাব উদ্দিন মুহম্মদ ইসমাইল। ১৮৪২ সাল থেকে পত্রিকাটি আরব সংস্কৃতির ওপর জোর দেয়। যুক্ত হয় রাজনৈতিক লেখালেখি ও সম্পাদকীয়। সেই সময়ের সম্পাদক ছিলেন রিফা আত-তাহতাভি। তবে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে ১৮৮০ সালে সম্পাদক নিযুক্ত হওয়া মুহম্মদ আবদুহুর সময়। শিক্ষা ও সামাজিক সংস্কারের ওপর জোর তিনি দিয়েছেন বেশি। ১৮৮২ সালে অ্যাংলো-ইজিপ্ট যুদ্ধের সময় পত্রিকাটি স্বাধীন হয়ে পড়লেও ১৯১১ সালে ফিরে আসে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়। অন্যান্য পত্রিকার সঙ্গে তাল মিলিয়ে গ্রহণ করে ব্যাপক পরিবর্তন। রাষ্ট্রপতি গামাল আবদেল নাসেরের সময়ে আরবি সংস্করণে দৈনিক ও ফরাসি সংস্করণে সাপ্তাহিক হিসেবে প্রতি বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হতো আমিরি প্রেস থেকে। বর্তমানে এটি মিসরের সরকারি সাময়িক পত্রিকার পরিশিষ্ট আকারে প্রকাশিত হয়।

১৮৯২ সালে জুরজি জায়দানের তত্ত্বাবধানে যাত্রা করে মাসিক ম্যাগাজিন ‘আল-হিলাল’। লেবানিজ এ সাংবাদিক ও ঔপন্যাসিক আশির দশকে কায়রোয় পা রাখেন আরবি ভাষায় সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশের ইচ্ছা নিয়ে। সে পরিকল্পনা সফলও হয়। দ্রুতই রাজনীতি, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধ প্রকাশের কারণে বুদ্ধিজীবী মহলে দারুণ জনপ্রিয়তা লাভ করে আল-হিলাল। জায়দানের মৃত্যুর পর দায়িত্ব অর্পিত হয় তার দুই পুত্র এমিল ও শুকির জায়দানের ওপর। তাদের প্রচেষ্টা আর রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠিত হয় দার-আল হিলাল পাবলিশিং হাউজ। বর্তমানে মুহাম্মদ আল শাফেয়ির সম্পাদনায় ম্যাগাজিনটি দার-আল হিলাল থেকেই বের হচ্ছে নিয়মিত। ফিলিস্তিনি নারীবাদী লেখিকা মে জিয়াদেহ, অধ্যাপক আয়িশা আবেল রহমান, রাজনৈতিক তাত্ত্বিক সালামা মুসা এবং ঐতিহাসিক আহমাদ আমিনের লেখা নিয়মিত প্রকাশ করত ‘আল-হিলাল’।

আবদুল আজিজ বিন আবদুর রহমান আস-সৌদ মক্কায় প্রবেশ করেন হিজরি ক্যালেন্ডারের ১৩৪৩ সালে। সেই বছরেই যাত্রা করে ‘উম্মুল কুরা’। সে হিসাবে ২০২২ খ্রিস্টাব্দে অর্থাৎ হিজরি ক্যালেন্ডারে ১৪৪৩ সালে মুহম্মদ বিন সালমানের পৃষ্ঠপোষকতায় শতবর্ষ উদযাপন করে পত্রিকাটি। প্রতিষ্ঠাকালীন সম্পাদক ছিলেন ইউসুফ ইয়াসিন। সাপ্তাহিক হিসেবে যাত্রা করলেও পরবর্তী সময়ে পরিণত হয় দৈনিকে। রাজনীতি, অর্থনীতি ও ইতিহাসবিষয়ক লেখা প্রাধান্য পেত। ওই অঞ্চলের প্রথম মিডিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও শুরুর দিকে তেমন সফল ছিল না। মূলত তৃতীয় সম্পাদক মুহাম্মদ সাইদ খোজার সময়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখায়। এতদিন এ অঞ্চলের ইতিহাস ও চিন্তার প্রবাহ ছিল মৌখিক, ‘উম্মুল কুরা’-এর আত্মপ্রকাশ সেখানে লিখিত ঐতিহ্যের ভিত্তি স্থাপন করে। ১৯২৬ সালের হেজাজ ও নজদের একত্রিত হওয়া, সৌদি রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা, তেল আবিষ্কার, আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ কিংবা বিভিন্ন সময়ে নেয়া সৌদি সরকারের সংস্কার আলোচিত হয়েছে বিশেষ গুরুত্ব নিয়ে। উঠে এসেছে রাজকীয় ফরমান ও ওয়াহাবি মতবাদের সমর্থন। বিবৃত হয়েছে সৌদি রাজতন্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে দেশ ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা। ব্রিটিশ পরামর্শক জ্যাক ফিলবি ছিলেন পত্রিকাটির অন্যতম লেখক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অর্থনৈতিক মন্দা চলাকালে অল্প সময়ের জন্য বিরতি থাকলেও দ্রুত ফিরে আসে আগের অবস্থানে। বর্তমানে সৌদি আরবের ওয়াজারাতুল ই’লাম বা দ্য মিনিস্ট্রি অব মিডিয়ার তত্ত্বাবধানে নিয়মিত প্রকাশ হয়। তাদের ওয়েবসাইট যেন ওই অঞ্চলের শত বছরের ঘটনার সংগ্রহশালা।

আফ্রিকার অন্যান্য অঞ্চলের মতো জিম্বাবুয়েতেও পত্রিকার সূত্রপাত ঘটেছে ঔপনিবেশিক সময়ে। জিম্বাবুয়ের সম্পূর্ণ রাষ্ট্রায়ত্ত পত্রিকার নাম ‘দ্য হেরাল্ড’। ব্রিটিশ অধিকৃত রোডেশিয়ায় থাকতেন সাংবাদিক ও প্রকাশক উইলিয়াম আরনেস্ট ফেয়ারব্রিজ। দক্ষিণ আফ্রিকার আর্গুস গ্রুপের পক্ষে রোডেশিয়ার হারারে থেকে ১৮৯১ সালে প্রকাশ শুরু করেন পত্রিকার। সেই সময় নাম ছিল ‘ম্যাশনাল্যান্ড হ্যারল্ড অ্যান্ড জাম্বেশিয়ান টাইমস’। হাতে লেখা কাগজে সাপ্তাহিক হিসেবে বের হতো। ঠিক পরের বছরই প্রিন্টের জগতে প্রবেশ করে পত্রিকাটি। নাম গ্রহণ করে ‘দ্য রোডেশিয়া হেরাল্ড’। ক্রমে প্রতিষ্ঠিত হয় রোডেশিয়ান প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিং কোম্পানি। ১৯৮০ সালে স্বাধীনতা লাভ করে জিম্বাবুয়ে। স্বাধীনতার পর আর্গুস গ্রুপকে কিনে নেয় জিম্বাবুয়ে মাস মিডিয়া কোম্পানি। হ্যারল্ড এবং আর কয়েকটি পত্রিকা প্রবেশ করে নতুন নেতৃত্বে। তখন থেকেই প্রকাশিত হয় ‘দ্য জিম্বাবুয়ে নিউজপেপার লিমিটেড’ বা জিমপেপারের তত্ত্বাবধানে। বর্তমানে জিমপেপারের অধীনে অন্তত ১৩টি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। পুরো দক্ষিণ আফ্রিকা অঞ্চলেই সর্বাধিক পঠিত পত্রিকা দ্য হেরাল্ড। কেপ টাউন থেকে সলিসবেরি, দ্য হেরাল্ডের আধিপত্য একচেটিয়া। যদিও নানা সময়ে শাসকগোষ্ঠীর প্রচারযন্ত্র হিসেবে ব্যবহূত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তার পরও ১০০ বছর ধরে স্থানীয় কৃষ্টি ও সংস্কৃতির দিক অনেকাংশেই প্রভাবিত হয়েছে দ্য হেরাল্ডের মাধ্যমে। ২০১৩ সাল থেকে পত্রিকাটির প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সিজার ভায়ি।

হারারেতে যে বছর দ্য হেরাল্ড প্রতিষ্ঠিত হলো, তার তিন বছরের মাথায় ১৮৯৪ সালে বুলাওয়ায়ো থেকে প্রকাশিত হতে থাকে ‘দ্য বুলাওয়ায়ো ক্রনিকল’। পরবর্তী সময়ে যা শুধু ‘দ্য ক্রনিকল’ নাম গ্রহণ করে। পত্রিকার অধিকাংশ প্রতিবেদন থাকত জিম্বাবুয়ের দক্ষিণ অঞ্চল মাতাবেলেল্যান্ডের পরিস্থিতি নিয়ে। দ্য হ্যারল্ডের মতো এ পত্রিকা প্রতিষ্ঠার পেছনেও জড়িত দক্ষিণ আফ্রিকার আর্গুস কোম্পানির নাম। সেই সময়ে রোডেশিয়ার পত্রিকা ছিল শ্বেতাঙ্গদের মুখপত্র। স্থানীয়দের খবরাখবর উপেক্ষা করা ছিল স্বাভাবিক। রাজনীতি, খেলা ও সমকালীন ইস্যু নিয়ে আলোচিত হলেও আফ্রিকার খবর ঠাঁই পেত কালেভদ্রে। সেই খবরেও আবার থাকত আফ্রিকান মানুষকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন। স্বাধীনতার পর পুরো আশির দশক নিয়ে বেশ বড়সড় বিবর্তন আসে প্রকাশনায়। পরিবর্তন আসে দ্য ক্রনিকলের নীতিতেও। ১৯৮৩ সালে টমি সিথোল প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে দ্য ক্রনিকলের সম্পাদক মনোনীত হন। ১৯৮৮ সালে সম্পাদক জিওফ্রে নিয়ারোটার সময়ে সরকারের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতির খতিয়ান প্রকাশ করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন লাভ করে পত্রিকাটি। জিম্বাবুয়ের ইতিহাসে তা উইলোগেট নামে পরিচিত। স্বাধীনতার পর জিমপেপার গঠিত হলে দ্য হেরাল্ডের পাশাপাশি দ্য ক্রনিকলও তাতে যুক্ত হয়। বর্তমানে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ক্রনিকলের তিনটা পৃথক প্রকাশনা তৈরি হয়েছে। দৈনিক দ্য ক্রনিকল, সাপ্তাহিক স্যাটারডে ক্রনিকল ও ক্রনিকল অনলাইন। পত্রিকাটির বর্তমান সম্পাদক এমদুদুজি মাথুথু। জিম্বাবুয়ের একটি শতবর্ষী প্রাদেশিক পত্রিকা এ প্রসঙ্গে উল্লেখের দাবি রাখে। ডিসেম্বর ১৮৯৩ সালে সাপ্তাহিক হিসেবে যাত্রা করে ‘দ্য মানিকা পোস্ট’। স্বাধীনতার পর যুক্ত হয় জিমপেপারের সঙ্গে। পত্রিকার মূল লক্ষ্য জিম্বাবুয়ের অন্যান্য প্রদেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মানিকাল্যান্ডের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা। মানিকাল্যান্ডের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিয়মিত তুলে ধরা হয় এতে। অবশ্য এর বাইরে জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংবাদও ঠাঁই পায়।

ব্রিটিশ ভারত থেকে আফ্রিকায় অভিবাসী হওয়া সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একজন আলি ভাই মোল্লা জীবনজি। আফ্রিকায় তখন রেললাইনের কাজ চলছে। জীবনজি ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ শ্রমিক সরবরাহের দায়িত্ব পালন করেন। তার নেতৃত্বেই ১৯০২ সালে সাপ্তাহিক হিসেবে কেনিয়া থেকে যাত্রা করে ‘দ্য আফ্রিকান স্ট্যান্ডার্ড’। কিন্তু তিন বছরের মধ্যে জীবনজি পত্রিকাটি বিক্রি করে দেন মায়া এন্ডারসন ও রুডলফ ফ্রাঞ্জ মেয়ারের কাছে। এই হাত বদলের ফলে নামটাও বদলে হয় ‘দ্য ইস্ট আফ্রিকান স্ট্যান্ডার্ড’। রূপ নেয় দৈনিক পত্রিকায়, মোম্বাসা থেকে নাইরোবিতে সরিয়ে নেয়া হয় সদর দপ্তর। ছড়িয়ে পড়ে বর্তমান উগান্ডা ও তানজানিয়া অঞ্চল অব্দি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রশক্তি আফ্রিকায় নিজেদের সমর্থনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে। তারা কাজে লাগায় এ পত্রিকাকে। স্থানীয় মানুষের সামনে সরকারের মুখপত্র হিসেবে এর সঙ্গে প্রকাশ হতে থাকে সাপ্তাহিক বারাজা। মূলত সরকারের প্রচারযন্ত্রের ভূমিকা পালন করত বারাজা। তবে পঞ্চাশের দশক থেকে ক্রমেই মত প্রকাশে স্বাধীনতা আসতে থাকে। ব্রিটিশ মালিকানাধীন লোনরো গ্রুপ পত্রিকাটি ১৯৬৭ সালে কিনে নেয়। ১৯৭৭ সালে নাম চেঞ্জ করে ‘দ্য স্ট্যান্ডার্ড’-এ পরিণত হয়। ১৯৯৫ সালে আরো এক দফা পরিবর্তন আসে মালিকানায়। ঔপনিবেশিক রূপ থেকে ক্রমে হয়ে উঠেছে আফ্রিকার মানুষদের কণ্ঠস্বর। আফ্রিকান জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি। বস্তুত দুই দশক ধরেই কেনিয়ায় সাংবাদিকতার পথিকৃতের ভূমিকা পালন করে চলছে ‘দ্য স্ট্যান্ডার্ড’। বর্তমানে বিশেষ পরিচালনা পরিষদের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয় দ্য স্ট্যান্ডার্ড মিডিয়ার সব নীতি। প্রযুক্তির উন্নয়নের যুগে ২০১০ সালে তাদের তত্ত্বাবধানেই প্রতিষ্ঠিত হয় রেডিও মাইশা। রাজনীতি ও ইতিহাস নিয়ে আলোচনার জন্য থাকে ‘দ্য নাইরোবিয়ান’। ভারত থেকে কেনিয়ায় গিয়ে জীবনজি যে আলো জ্বেলেছিলেন, তা শতবর্ষ ধরে কথা বলছে আফ্রিকার মাটি ও মানুষের।

 

আহমেদ দীন রুমি: লেখক