ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এবং বিভিন্ন ভাষায় এক শতাধিক সংবাদপত্র রয়েছে, যেগুলো ১০০ বছর বা তার চেয়ে অধিক সময়ের পুরনো এবং বর্তমানে সচল আছে, অর্থাৎ নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। এসব শতবর্ষী পত্রিকা থেকে স্বনামধন্য ও উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সংবাদপত্রের পরিচিতি তুলে ধরা হলো এবং বাকিগুলো থেকে নির্বাচিত পত্রিকা সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে।

ইউরোপে সংবাদপত্রের আবির্ভাব

প্রথম ইংরেজি পত্রিকা (অক্সফোর্ড গেজেট) প্রকাশিত হয় ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড শহরে, ১৬৬৫ সালে। পত্রিকাটি ১৬৬৬ সালে লন্ডনে স্থানান্তরিত হয় এবং নামকরণ করা হয় ‘লন্ডন গেজেট’, যা আজও প্রকাশিত হচ্ছে।

ইউরোপে আজও ছাপা হওয়া কয়েকটি শতবর্ষী সংবাদপত্র

ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এবং বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত চলমান শতবর্ষী পত্রিকা থেকে স্বনামধন্য এবং উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সংবাদপত্রের পরিচিতি তুলে ধরা হলো।

দ্য হেরাল্ড

দ্য হেরাল্ড বিশ্বের দীর্ঘতম চলমান জাতীয় সংবাদপত্র এবং এটি বিশ্বের অষ্টম প্রাচীনতম দৈনিক পত্রিকা। এটি একটি স্কটিশ ব্রডশিট সংবাদপত্র, যা ১৭৮৩ সালের জানুয়ারিতে গ্লাসগো অ্যাডভার্টাইজার নামে একটি সাপ্তাহিক প্রকাশনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে পত্রিকার নাম পরিবর্তন করে গ্লাসগো হেরাল্ড রাখা হয়। তবে ১৯৯২ সালে ‘দ্য গ্লাসগো হেরাল্ড’ থেকে গ্লাসগো শব্দটি বাদ দিয়ে শুধু ‘দ্য হেরাল্ড’ রাখা হয়। যদিও শিরোনাম থেকে গ্লাসগো শব্দটি বাদ দেয়া হয়, তবে পত্রিকার ‘মাস্টহেড’ পরিবর্তন করা হয়নি। জানা যায়, একসময় হেরাল্ড পত্রিকার মালিকানা নিয়ে একাধিক বিত্তবান ব্যবসায়ীর মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল।

হেরাল্ড পত্রিকার সহযোগী সংবাদপত্র দ্য সানডে হেরাল্ড বন্ধ হওয়ার পর রোববারের হেরাল্ড পত্রিকা ২০১৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর রোববার সংস্করণ হিসেবে চালু করা হয়। হেরাল্ড সংবাদপত্রের প্রতিটি সংস্করণে ঘোষণা থাকে, পত্রিকাটি কোনো রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করে না। তবে সংবাদপত্রটি ২০১৪ সালে স্কটিশ স্বাধীনতার ওপর গণভোটে ‘না’ ভোটকে সমর্থন করেছিল। সংবাদের শিরোনাম ছিল: ‘হেরাল্ডের দৃষ্টিভঙ্গি: আমরা যুক্তরাজ্যের মধ্যে থাকার জন্য ফিরে এসেছি, তবে কেবল যদি সুদূরপ্রসারী আরো বিবর্তন হয়।’

দ্য গার্ডিয়ান

দ্য গার্ডিয়ান একটি ব্রিটিশ দৈনিক পত্রিকা এবং ১৮২১ সালে সাপ্তাহিক দ্য ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে ১৮৫৫ সালে ব্রিটিশ সরকার সংবাদপত্রের ওপর স্টাম্প কর (ট্যাক্স) তুলে নেয়ার পরে সাপ্তাহিকের পরিবর্তে দৈনিক সংবাদপত্রে রূপান্তরিত হয়। ইতিবাচক আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জনের লক্ষ্যে এবং জাতীয় দৈনিক হিসেবে সংবাদপত্রের অবস্থানকে প্রতিফলিত করার জন্য ১৯৫৯ সালে ম্যানচেস্টার নামটি বাদ দেয়া হয়। পত্রিকার সম্পাদক এবং সম্পাদকীয় কর্মীরা ১৯৬৪ সালে লন্ডনে স্থানান্তরিত হন।

গার্ডিয়ান পত্রিকার সহযোগী খবরের কাগজ দ্য অবজারভার এবং দ্য গার্ডিয়ান উইকলির পাশাপাশি গার্ডিয়ান স্কট ট্রাস্টের মালিকানাধীন গার্ডিয়ান মিডিয়া গ্রুপের অংশ। এ ট্রাস্ট তৈরি করা হয়েছে ১৯৩৬ সালে। গার্ডিয়ান লন্ডন থেকে প্রকাশিত প্রভাবশালী দৈনিক সংবাদপত্র, যা সাধারণত যুক্তরাজ্যের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রের মধ্যে অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হয়।

গার্ডিয়ানের গড় পাঠকের বয়স ২৪-৩৪ বছর, যেখানে নারীদের তুলনায় পুরুষদের অনুপাত বেশি, অর্থাৎ বেশিসংখ্যক পুরুষ গার্ডিয়ান পড়েন। লন্ডনে এ সংবাদপত্রের পাঠকসংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

গার্ডিয়ান অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, বিভিন্ন বিষয়ের ওপর মুক্ত আলোচনা, সাহিত্য ও শিল্প নিয়ে লেখা প্রকাশ এবং সমালোচনা ও বিদেশী চিঠিপত্রের জন্য প্রশংসিত হয়ে আসছে। গার্ডিয়ানের সম্পাদকীয় অবস্থানকে লন্ডন থেকে প্রকাশিত অন্যান্য স্বনামধন্য সংবাদপত্রের (যেমন দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ এবং দ্য টাইমস) চেয়ে কম রক্ষণশীল বলে মনে করা হয়। তবে গার্ডিয়ানে প্রকাশিত প্রতিবেদন মুক্ত সাংবাদিকতার সাক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পত্রিকাটিকে একসময় ‘ব্রিটেনের নন-কনফরমিস্ট বিবেক’ বলা হতো।

ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস

ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস একটি ব্রিটিশ দৈনিক সংবাদপত্র, যা ব্রডশিটে মুদ্রিত হয় এবং ডিজিটালভাবে প্রকাশিত হয়। এ পত্রিকায় চলমান ব্যবসা ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলোর ওপর খবর, নিবন্ধ-প্রবন্ধ এবং আলোচনা প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটি ১৮৮৮ সালের জানুয়ারিতে লন্ডন ফাইন্যান্সিয়াল গাইড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে এক মাস পরে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে। শুরুতে পত্রিকাটি মেট্রোপলিটান লন্ডনের চারপাশে সরবরাহ করা হতো। তখন পত্রিকার পাঠকসংখ্যা ছিল লন্ডন শহরের আর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তিরা। জানা যায়, সেই সময় পত্রিকাটি ব্রিটিশ সরকারের আর্থিক নীতির ওপর শক্তিশালী প্রভাব ফেলেছিল।

প্রায় একই নামযুক্ত ফাইন্যান্সিয়াল নিউজ (যা ১৮৮৪ সালে আত্মপ্রকাশ করেছিল) থেকে আলাদা করার জন্য ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস ১৮৯৩ সালের জানুয়ারি তেহালকা গোলাপি কাগজে মুদ্রণ শুরু করে। তবে ৫৭ বছরের প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর ১৯৪৫ সালে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস এবং ফাইন্যান্সিয়াল নিউজ একীভূত হয়ে ছয় পৃষ্ঠার পত্রিকায় রূপান্তরিত হয়।

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস সংবাদপত্রের প্রচলন উল্লেখযোগ্যভাবে প্রসারিত হয় এবং খবরের কাগজের পরিধি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। ফলে পত্রিকার মুদ্রণ ইউরোপ, এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার বেশ কয়েকটি শহরে প্রসারিত হয় এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্করণ চালু হয়। পত্রিকাটি ১৯৯৪ সালে লাইফস্টাইল ম্যাগাজিন হাউ টু স্পেন্ড ইট প্রকাশ করা শুরু করে, যা পাঠকের কাছে সমাদৃত হয়। ২০১৫ সালে জাপানি মিডিয়া কোম্পানি ‘নিক্কেই’ ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস গ্রুপ কিনে নেয়, যার মধ্যে সংবাদপত্রও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

স্বাধীন সম্পাদকীয় দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখে ব্যবসা ও আর্থিক সংবাদ প্রতিবেদন করার ক্ষেত্রে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস বিশেষভাবে পরিচিত। একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের গোড়ার দিকে পত্রিকার ছাপা কাগজ এবং ইলেকট্রনিক সংস্করণ মিলিয়ে দৈনিক পাঠকসংখ্যা দুই মিলিয়নেরও বেশি।

দ্য ডেইলি মেইল

ডেইলি মেইল ১৮৯৬ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। তখন ব্যাপক প্রচার বাড়ানোর জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে পত্রিকার মূল্য কম রাখা হয়েছিল। তবে বিজ্ঞাপন থেকে বেশির ভাগ রাজস্ব উপার্জনের পরিকল্পনা করা হয়। ডেইলি মেইল ব্রিটেনের প্রথম ট্যাবলয়েড, যার আকৃতি স্ট্যান্ডার্ড পেপারের আকারের প্রায় অর্ধেক।

১৯০২ সালে পত্রিকার প্রচারসংখ্যা এক মিলিয়ন ছাড়িয়ে যায় এবং শীর্ষস্থানীয় অন্যান্য মার্কিন সংবাদপত্রের (যেমন নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ড ও নিউইয়র্ক জার্নাল) সঙ্গে পাল্লা দেয়। যদিও ১৯৭০-এর দশকে প্রচারসংখ্যা অনেক কমে যায়, তবে বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে পত্রিকাটি ব্রিটেনের সর্বাধিক বিক্রীত সংবাদপত্রের মধ্যে একটি হয়ে ওঠে। ডেইলি মেইল স্বাধীন সম্পাদকীয় অবস্থান এবং বিদেশী সংবাদ কাভারেজের জন্য পরিচিতি লাভ করে, যেমন ফ্রান্সে ড্রেফাস বিষয়ক (১৮৯৪-১৯০৬) এবং দক্ষিণ আফ্রিকান যুদ্ধ (১৮৯৯-১৯০২)।

দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ

দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ, যা অনলাইন এবং অন্য সব জায়গায় দ্য টেলিগ্রাফ নামে পরিচিত, একটি জাতীয় ব্রিটিশ দৈনিক ব্রডশিট সংবাদপত্র, যা লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয় এবং যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে বিতরণ করা হয়। পত্রিকাটি ১৮৫৫ সালে দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ অ্যান্ড কুরিয়ার নামে প্রকাশিত হয় এবং উচ্চমানের সাংবাদিকতার জন্য খ্যাতি অর্জন করে। পত্রিকাটির নীতিবাক্য (ছিল, আছে এবং থাকবে) সম্পাদকীয় পৃষ্ঠায় প্রদর্শিত হয় এবং ১৮৫৮ সালের ১৯ এপ্রিল থেকে সংবাদপত্রের প্রতিটি সংস্করণে যুক্ত হয়েছে।

ডেইলি টেলিগ্রাফের সহযোগী পত্রিকা দ্য সানডে টেলিগ্রাফের আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯৬১ সালে। এই দুটি সংবাদপত্র পৃথকভাবে পরিচালিত হয় এবং সম্পাদকীয় কর্মী আলাদা। তবে পত্রিকা দুটিতে অনেক খবরই প্রকাশিত হয়, যা হুবহু এক ও অভিন্ন। ডেইলি টেলিগ্রাফ ২০০৯, ১৯৯৬ ও ১৯৯৩ সালে বছরের সেরা জাতীয় সংবাদপত্র নির্বাচিত হয়েছে। অন্যদিকে সানডে টেলিগ্রাফ ১৯৯৯ সালে একই পুরস্কার জিতেছে। 

ডেইলি টেলিগ্রাফ রাজনৈতিকভাবে রক্ষণশীল এবং ১৯৪৫ সাল থেকে যুক্তরাজ্যের প্রতিটি সাধারণ নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টিকে সমর্থন করে আসছে। তবে কনজারভেটিভদের পক্ষে ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়ে হাজার হাজার গ্রাহককে একটি অযাচিত ই-মেইল পাঠানোর জন্য ২০১৫ সালে পত্রিকাকে ৩০ হাজার পাউন্ড স্টার্লিং জরিমানা করা হয়েছিল।

লে ফিগারো

ফরাসি ভাষায় প্রকাশিত দৈনিক সকালের সংবাদপত্র, যা ১৮২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর সদর দপ্তর প্যারিসে অবস্থিত। শুরুতে পত্রিকাটি ব্যঙ্গাত্মক সাপ্তাহিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। তবে ১৮৬৬ সালে লে ফিগারো একটি দৈনিক পত্রিকায় রূপান্তরিত হয়। পত্রিকাটি ফিগারোর নাম ও নীতিবাক্যের ওপর ভিত্তি করে নামকরণ করা হয়। ফিগারোর ছিল পিয়েরে বিউমার্চাইজ (১৭৩২-১৭৯৯)-এর একটি নাটকের চরিত্র এবং সেই নাটকে নীতিবাক্য ছিল: সমালোচনা করার স্বাধীনতা ছাড়া, কোনো চাটুকারিতার প্রশংসা নেই।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে লে ফিগারো পত্রিকা ফ্রান্সের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রে পরিণত হয়েছিল। তবে যুদ্ধের পর পত্রিকাটি উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে এবং রক্ষণশীল অবস্থান বজায় রাখে। উল্লেখ্য, ইসলামকে অপমান করার অভিযোগে ২০০৬ সালে মিসর ও তিউনিশিয়ায় পত্রিকাটি নিষিদ্ধ করা হয়।

লে ফিগারো পত্রিকা বার্লিনার ফরম্যাটে প্রকাশিত হয় (বার্লিনার বা ‘মিডি’ হচ্ছে সংবাদপত্রের একধরনের বিন্যাস, যেখানে পৃষ্ঠার আকৃতি সাধারণত ১২.৪–১৮.৫ ইঞ্চি মাপের হয়, যা ট্যাবলয়েড বা কম্প্যাক্ট বিন্যাসের চেয়ে সামান্য লম্বা এবং সামান্য প্রশস্ত হয় এবং ব্রডশিট বিন্যাসের চেয়ে ছোট)।

লা ভ্যানগার্ডিয়া

স্প্যানিশ ভাষায় মুদ্রিত দৈনিক সংবাদপত্র, যা ১৮৮১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি প্রথম প্রকাশিত হয়। পত্রিকার সদর দপ্তর বার্সেলোনায়। জানা যায়, শুরুতে পত্রিকাটি ‘ঘোষণা এবং সংবাদ রাজনৈতিক সংবাদপত্র’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল। কেননা পত্রিকাটি লিবারেল পার্টির একটি গোষ্ঠীর জন্য, যারা বার্সেলোনা সিটি কাউন্সিলের ওপর নিয়ন্ত্রণ অর্জন করতে চেয়েছিল, যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।

উল্লেখ্য, লা ভ্যানগার্ডিয়া স্পেনের প্রাচীনতম সংবাদপত্রগুলোর মধ্যে একটি এবং এটিই একমাত্র কাতালান সংবাদপত্র, যা দ্বাদশ আলফনসোর পুনরুদ্ধার থেকে একবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত সব স্প্যানিশ শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন থেকে বেঁচে গেছে। পত্রিকাটি ২০১১ সালের ৩ মে থেকে কাতালান ভাষায়ও মুদ্রিত হয় এবং কাতালোনিয়ার শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।

এবিসি

স্পেনের মাদ্রিদ থেকে স্পেনীয় ভাষায় প্রকাশিত প্রাচীনতম জাতীয় দৈনিক পত্রিকা, যা এখনো সচল রয়েছে। বলা হয়, পত্রিকাটি স্পেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনসাধারণের পছন্দনীয় সংবাদপত্র এবং মাদ্রিদের এক নম্বর। এবিসি আঁটসাঁট বুনট আকারের স্টেইপলার দিয়ে বাঁধানো পত্রিকা, যা El Mundo এবং El Pais সহ বেশির ভাগ স্প্যানিশ দৈনিক সংবাদ পত্রিকার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে ছোট। El Mundo এবং El Pais পত্রিকার পাশাপাশি এবিসি স্পেনের রেকর্ড সৃষ্টিকারী তিনটি সংবাদপত্রের মধ্যে একটি। উল্লেখ্য, পত্রিকার প্রচ্ছদে পূর্ণ আকারের ছবি পত্রিকার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

এবিসি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯০৩ সালের ১ জানুয়ারি। যদিও পত্রিকাটি সাপ্তাহিক সংবাদপত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল, তবে ১৯০৫ সালের জুন মাসে দৈনিক পত্রিকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯২৮ সালে এবিসির দুটি সংস্করণ ছিল—একটি মাদ্রিদের জন্য এবং অন্যটি সেভিলের জন্য। উল্লেখ্য, সেভিল সংস্করণের নাম রাখা হয়েছিল ‘এবিসি ডি সেভিলা’।

স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই (১৯৩৬ সালের ২০ জুলাই) রিপাবলিকান সরকার মাদ্রিদ থেকে প্রকাশিত এবিসি দখল করে এবং তাদের সমর্থন করার জন্য কাগজের রাজনীতি পরিবর্তন করেছিল। অন্যদিকে সেভিল থেকে মুদ্রিত এবিসি পত্রিকা জাতীয়তাবাদীদের সমর্থন করেছিল। তবে ১৯৩৯ সালে মাদ্রিদের এবিসি তার মূল মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছিল। সেই সময়ের মধ্যে কাগজটি La Vanguardia -এর সঙ্গে দেশের দুটি প্রধান দৈনিকের মধ্যে একটি ছিল। যা হোক, ১৯৭০ এবং ১৯৮০-এর দশকের শেষের দিকে এবিসি প্রথমে ‘পপুলার অ্যালায়েন্স’ এবং পরে ‘পপুলার পার্টি’র সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করে।

জুরিখের নতুন জার্নাল

The Neue Zürcher Zeitung (বাংলায় জুরিখের নতুন জার্নাল) সুইস ও জার্মান ভাষায় প্রকাশিত দৈনিক সংবাদপত্র। পত্রিকাটি সুইজারল্যান্ডের জুরিখ শহর থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৭৮০ সালের ১২ জানুয়ারি। পরবর্তী সময়ে সুইস-জার্মান সংবাদপত্র তথ্য থেকে জানা যায়, আন্তর্জাতিক বিষয়ে উদ্দেশ্যমূলক এবং বিস্তারিত প্রতিবেদনের জন্য একটি উচ্চ মানের সংবাদপত্র হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। The Neue Zürcher Zeitung এখনো ইউরোপের প্রকাশিত প্রাচীনতম সংবাদপত্রের মধ্যে অন্যতম। সুইস চিত্রশিল্পী এবং কবি সালোমন গেসনার ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।

ইউরোপের চলমান অন্যান্য শতবর্ষী সংবাদপত্র

ইউরোপের চলমান অন্যান্য শতবর্ষী সংবাদপত্রের মধ্যে স্বনামধন্য কিছু সংখ্যক সংবাদপত্র, বিশেষ করে পত্রিকার নাম, কোন দেশে, কোন শহরে এবং কখন প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল, উল্লেখ করা হলো।

যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্রের মধ্যে রয়েছে Yorkshire Post (শহর: লিডস, প্রথম প্রকাশ: ১৭৫৪), The Economist (লন্ডন, ১৮৪৩), Surrey Comet (লন্ডন, ১৮৫৪), Manchester Evening News (ম্যানচেস্টার, ১৮৬৮), Birmingham Mail (বার্মিংহাম, ১৮৭০), Edinburgh Evening News (এডিনবার্গ, ১৮৭৩), The Liverpool Echo (লিভারপুল, ১৮৭৯) এবং Lancashire Evening Post (প্রেস্টন, ১৮৮৬)।

ইতালি থেকে ইতালিয়ান ভাষায় প্রকাশিত চলমান শতবর্ষী পাঁচটি পত্রিকা রয়েছে: La Nuova Sardegna (সাসারি, ১৮৬৪), Il Sole 24 Ore (মিলান, ১৮৬৫), La Stampa (তুরিন, ১৮৬৬), Il Corriere della sera (মিলান, ১৮৭৬) এবং L’Eco di Bergamo (বার্গামো, ১৮৮০)।

ফিনল্যান্ড থেকে ফিনিশ এবং সুইডিশ ভাষায় সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। ফিনিশ ভাষায় প্রকাশিত চলমান শতবর্ষী পত্রিকার মধ্যে Keskisuomalainen (১৮৭১), Satakunnan Kansa (১৮৭৩), Aamulehti (১৮৮১), Helsingin Sanomat (১৮৮৯) এবং Kaleva (১৮৯৯)। নেদারল্যান্ডস থেকে ডাচ ভাষায় প্রকাশিত চলমান শতবর্ষী দুটি পত্রিকা রয়েছে Nieuwe Rotterdamsche Courant (রটারডাম, ১৮৪৪) ও De Telegraaf (আমস্টারডাম, ১৮৯৩)। অন্যদিকে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা থেকে জার্মান ভাষায় প্রকাশিত শতবর্ষী সংবাদপত্রের মধ্যে Wiener Zeitung (১৭০৩) এবং Die Presse (১৮৪৮) উল্লেখযোগ্য।

 

ফজল হাসান: লেখক ও অনুবাদক