সে বছরই শিকাগো থেকে ‘পোয়েট্রি’ ত্রৈমাসিক কবিতা পত্রিকাটি বেরিয়েছে। সম্পাদক হেরিয়েট মনরো।
প্রথম বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা (ডিসেম্বর ১৯১২) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজের হাতে অনূদিত নিজের ছয়টি কবিতা প্রকাশ করেছে। ঠাকুরের প্রথম বৃহত্তম আন্তর্জাতিক প্রকাশ। পোয়েট্রির বিলেত প্রতিনিধি এজরা পাউন্ডের চিঠির সঙ্গে ৩০ ডলার। এই সম্মানী নিয়ে তার কিঞ্চিৎ জবাবদিহি: আমি দুঃখিত তারা তোমাকে গদ্যের রেটে টাকা পাঠিয়েছে; কিন্তু ম্যাগাজিনের টাকা-পয়সার ব্যাপারে আমার করার কিছু নেই।
ম্যাগাজিনের ৮৪-৮৬ পাতায় যে ছয়টি কবিতা ছাপা হয়েছে। সেগুলোর অনূদিত প্রথম পঙিক্ত:
- Thou had made me known to friends
- No more noisy, loud words for me
- On the day when the lolus bloomed
- By all means they try to hold me secure
- I was not aware of the moment
- Thou art thy sky
মূল কবিতা:
১. কত অজানারে জানাইলে তুমি
কত ঘরে দিলে ঠাঁই
দূরকে করলে নিকট, বন্ধু
পরকে করলে ভাই।
(গীতাঞ্জলি ৬৩ নং কবিতা)
২. কোলাহল তো বারণ হলো
এবার কথা কানে কানে
এখন হবে প্রাণের আলাপ
কেবলমাত্র গানে গানে।
(গীতাঞ্জলি ৮৯ নং কবিতা)
৩. যেদিন ফুটল কমল কিছুই জানি নাই
আমি ছিলম অন্যমনে
আমার সাজিয়ে সাজি তারে আনি নাই
সে যে রইল সংগোপনে।
(গীতাঞ্জলি ২০ নং কবিতা)
৪. সংসারেতে আর-যাহারা
আমায় ভালোবাসে
তারা আমায় ধরে রাখে
বেঁধে কঠিন পাশে।
(গীতাঞ্জলি ৩২ নং কবিতা)
৫. জীবনের সিংহদ্বারে পশিনু যে ক্ষণে
এ আশ্চর্য সংসারের মহানিকেতনে
সে ক্ষণ অজ্ঞাত মোর। কোন্ শক্তি মোরে
ফুটাইল এ বিপুল রহস্যের ক্রোড়ে
অর্ধরাত্রে মহারণ্যে মুকুলের মতো।
(গীতাঞ্জলি ৯৫ নং কবিতা)
৬. একাধারে তুমিই আকাশ, তুমি নীড়
হে সুন্দর, নীড়ে তব প্রেম সুনিবিড়
প্রতি ক্ষণে নানা বর্ণে না গন্ধে গীতে
মুগ্ধ প্রাণ বেষ্টন করেছে চারি ভিতে।
(গীতাঞ্জলি ৬৮ নং কবিতা)
হ্যারিয়েট মনরোর ‘টেগর’
‘পোয়েট্রি: আ ম্যাগাজিন অব ভার্স’-এর সৌভাগ্য ইংরেজিতে প্রাচ্যের প্রথম প্রকাশনাটি ঠাকুরের কবিতা। তার গীতাঞ্জলির ছয়টি কবিতা পোয়েট্রির ডিসেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে, লন্ডন ইন্ডিয়া সোসাইটির প্রাইভেট এডিশন বাজারে আসার কয়েক সপ্তাহ আগে। গীতাঞ্জলির প্রকাশকাল ১৯১২ লিখিত হলেও প্রকৃতপক্ষে ১৯১৩-এর আগে এর বিতরণ শুরু হয়নি।
পোয়েট্রি বের হয় শিকাগো থেকে, ভারত থেকে অনেক দূরে এমনকি লন্ডন থেকেও, যেখানে বাঙালি কবি কিছু সময় অবস্থান করছেন। পোয়েট্রির সম্পাদক কখনো তার নামও শোনেননি। কিন্তু পোয়েট্রির বিদেশ প্রতিনিধি এজরা পাউন্ড লন্ডনে তার সঙ্গে দেখা করেন এবং গীতাঞ্জলির কয়েকটি কবিতা কবিদের নতুন ছোট ম্যাগাজিনে প্রকাশের অনুমতি দিতে প্রলুব্ধ করেন।
আমার মনে আছে, কবিতাগুলো যখন আমাদের হাতে এসে পৌঁছে, আমরা কতটা উত্তেজিত হয়েছিলাম। নিবেদনমূলক কবিতা কদাচিৎ কবিতা হিসেবে স্বীকৃত—কিন্তু এগুলো ছিল চমত্কার নৈবেদ্য আর এতে যে ধর্মীয় অনুভূতির বিস্তার, তা সব জাতি ও ধর্মের বৈশ্বিক ঈশ্বরের জন্য শ্রদ্ধাঞ্জলি।
‘পোয়েট্রি’ ডিসেম্বর সংখ্যা প্রকাশিত হওয়ার কয়েক দিন পর কবিতার আন্তর্জাতিক আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা নিয়ে আমাদের কবিতা থেকে উদ্ধৃত করে দ্য শিকাগো ট্রিবিউন সম্পাদকীয় রচনা করে। আর একজন ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের জুনিয়র টেগর স্বাক্ষরিত একটি চিঠি পেয়ে আমরা বিস্মিত। চিঠিতে লিখেছেন: ‘আমার বাবা এখানে আমার কাছে বেড়াতে এসেছেন। যে সংখ্যায় তার কবিতা ছাপা হয়েছে, তার কয়েকটি কপি পেতে চাচ্ছেন।’
এটা সত্যিই দারুণ খবর। প্রাচ্যদেশের খ্যাতিমান যে কবি যদি লন্ডনে থেকে না থাকেন, তিনি ভারতে নিজ দেশে আছেন বলে ভোবেছিলাম। তিনি কিছু সময়ের জন্য আমারই নিজ অঙ্গরাজ্যে প্রতিবেশী হিসেবে অবস্থান করছেন। আমি তখনই তাকে শিকাগোয় আমার আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি লিখি। কবি ইউলিয়াম ভন মুডির স্ত্রী মিসেস মুডি সব ধরনের আতিথ্যের আশ্বাস দিয়ে আমার আমন্ত্রণকে জোরদার করে তোলে।
নববর্ষের পর পরই টেগর সাহেব তার ছেলে এবং দারুণ সুন্দর ছোটখাটো গড়নের পুত্রবধূকে নিয়ে হাজির হন। শীত মৌসুমে এই আগমনের তিন-চারবার পুনরাবৃত্তি ঘটে। এ ঘটনা নোবেল পুরস্কার পাওয়া এবং এর সঙ্গে অবিভাজ্য প্রচারণার বছর আগেকার। কাজেই পৃথিবীর কৌতূহলী হস্তক্ষেপ ঘটার আগে আমরা কবির সঙ্গে পরিচিত হতে সমর্থ হই।
আমরা মিসেস মুডির বাড়ির ফায়ার প্লেসের পাশে তার কবিতার বাংলা গীত এবং তার ইংরেজি অনুবাদ শুনে সন্ধ্যা কাটিয়ে দিতাম—আমাদের তখন মনে হতো প্রাচ্যের এক প্রাচীন জ্ঞানী যিনি উদারভাবে সুন্দরের প্রকাশ ঘটিয়ে যাচ্ছেন, আমরা তার পদতলে বসে আছি। তিনি তার নিজ দেশের কথা, ‘ভারত’—এই বিশাল শব্দের অর্থ আমাদের শোনাতেন আর প্রত্যাশা করতেন, পৃথিবীর যারা ক্ষমতাসীন শাসক, তারা আরো বন্ধুত্বপূর্ণ সুবিবেচনার সঙ্গে পরিচালনা করবেন।
এভাবেই আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বন্ধু ভাবতে শুরু করি। শেষবার তাকে যখন দেখি, তারপর অনেক বছর পেরিয়ে গেছে আমি এখনো তার সমৃদ্ধ ব্যক্তিত্বের উষ্ণতা ও আন্তরিকতা অনুভব করি—তিনি যেসব দেশে গিয়েছেন, এই ব্যক্তিত্ব দিয়ে বন্ধুদের ধরে রেখেছেন। তার ৭০তম জন্মদিনে, এমনকি বিশিষ্ট কবি হিসেবে শ্রদ্ধা জানানোর আগে প্রথমে বন্ধু হিসেবে তাকে অভিনন্দন জানাই। এই কবি তার দেশবাসীর অন্তরের প্রিয় মানুষ, তাকে সম্মান জানিয়ে পৃথিবী আনন্দিত হচ্ছে—কারণ তার শিল্প ও সুন্দরের বার্তা সারা পৃথিবীর জন্য।
১. গীতাঞ্জলির ইন্ডিয়া সোসাইটি সংস্করণ সম্ভবত ১ নভেম্বর ১৯১২ প্রকাশিত হয় বলে প্রশান্ত কুমার পাল উল্লেখ করেন। ৭৫০ কপি ছাপা হয়, ৫০০ কপি সোসাইটির সদ্যদের মধ্যে বিতরণ করা হয় এবং ১০ শিলিং ৬ পেন্স দামে ২৫০ কপি বিক্রি করা হয়।
২. এজরা পাউন্ড পোয়েট্রির লন্ডন প্রতিনিধি হিসেবে যথেষ্ট কর্তৃত্বের অধিকারী ছিলেন বলে মনে নয়। তিনি আগেই হ্যারিয়েট মনরোকে লেখেন: আগামী সংখ্যায় টেগরের জন্য জায়গা সংরক্ষিত রাখবেন।
লন্ডনের কবি মহলে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যে উত্তেজনা, এজরা পাউন্ড তা শিকাগোতেও সঞ্চারিত করতে চেয়েছেন। তিনি লিখেছেন রবীন্দ্রনাথের নিজের অনুবাদে প্রকাশিত কবিতাগুলো ইংরেজি কবিতার ইতিহাসে এবং বিশ্ব কবিতার ইতিহাসে একটি ঘটনা।
৩. পোয়েট্রি: আ ম্যাগাজিন অব ভার্স ১৯১২-এর জুলাই প্রথম প্রকাশিত এবং এখন পর্যন্ত প্রকাশনা অব্যাহত আছে। পোয়েট্রির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হেরিয়েট মনরো শিকাগো ট্রিবিউন পত্রিকায় শিল্প-সমালোচক হিসেবে কাজ করছিলেন।
বিশ শতকের আমেরিকান কবিতায় রেনেসাঁ একজন নারীর হাত ধরে এসেছে এবং তিনিই হ্যারিয়েট মনরো।
১২ জন সম্পাদক ১০৭ বছর পোয়েট্রি সম্পাদনা করেছেন। সম্পাদকরা হলেন: হ্যারিয়েট মনরো (১৯১২-৩৬), মর্টন জাবেল (১৯৩৬-৩৭), জর্জ ডিলন (১৯৩৭-৪২), একটি সম্পাদকমণ্ডলী (১৯৪২-৪৯), হেইডেন ক্যারুথ (১৯৪৯-৫০), কার্ল স্যাপিরো (১৯৫০-৫৫), হেনরি র্যাগো (১৯৫৫-৬৯), ডেরিল হাইন (১৯৬৯-৭৭), জন ফ্রেডরিখ নিমস (১৯৭৮-৮৩), জোসেফ প্যারিসি (১৯৮৩-২০০৩), ক্রিশ্চিয়ান উইমান (২০০৩-১৩) ও জন শেয়ার (২০১৩-বর্তমান)। কুড়ির দশকেই এটি পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা ম্যাগাজিন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
৪. রবীন্দ্রনাথের প্রায় সমবয়সী হ্যারিয়েট মনরোর জন্ম ২৩ হিসেম্বর ১৯৬০ শিকাগোয়। তার বাবার বিশাল লাইব্রেরি তাকে লেখালেখির জগতে আটকে রাখে। হ্যারিয়েট তার আত্মজীবনী আ পোয়েটস লাইফ: সেভেন্টি ইয়ার্স ইন আ চেঞ্জিং ওয়ার্ল্ড-এ লিখেছেন, তার জীবনটা শুরুই হয় শেক্সপিয়ার, বায়রন, শেলি, ডিকেন্স ও থ্যাকারেকে নিয়ে। জর্জ টাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক। গদ্য ও পদ্য দুই শাখাতেই তিনি সমাদৃত হয়ে ওঠেন। তিনি তখন শিকাগো ট্রিবিউনের ফ্রিল্যান্স কন্ট্রিবিউটর। শিকাগোর ১০০ ব্যবসায়ীকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করালেন, তারা বছরের ৫০ ডলার করে পাঁচ বছর একটি সাহিত্য পত্রিকাকে স্পন্সর করবেন। সঙ্গে নিজের ৫ হাজার ডলার। বেরিয়ে গেল পোয়েট্রি। প্রবল সমর্থন দিতে থাকলেন তখনকার উদীয়মান ওয়ালেস স্টিভেনস, এজরা পাউন্ড, টিএস এলিয়ট, হিল্ডা ডুলিটল, উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামস, কার্ল সান্ডবার্গ প্রমুখ কবিদের। কবি হিসেবে স্বীকৃতির প্রধান প্লাটফর্ম হয়ে দাঁড়াল পোয়েট্রি ম্যাগাজিন। প্রকাশিত লেখার জন্য সম্মানী নির্ধারিত হলো। হ্যারিয়েট কবিতার প্রশ্নে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের অধিকারী ছিলেন। ১৯৩৬ সালে ৭৫ বছর বয়সে পেরুর আরেকুইপায় মাচু পিচু পর্বতে ওঠার সময় সেরিব্রাল হ্যামারেজে মৃত্যুবরণ করেন।
রবীন্দ্রনাথের ছেলে রথীন্দ্রনাথ যখন বাবার জন্য কয়েক কপি পোয়েট্রি (ডিসেম্বর ১৯১২) চাইলেন, হেরিয়েট মনরো পাঁচ কপি পাঠিয়ে চিঠিতে লিখলেন: আপনার ছেলের নোটটি পেয়ে আমি বিস্মিত হয়েছি যে আপনি ইলিনয়ে আছেন। আপনাকে শিগগির যাতে শিকাগোয় দেখতে পারি, সে প্রত্যাশা করার অনুমতি আমাকে দিন। সেখানে আপনাকে স্বাগত জানাতে পেরে আনন্দিত হব এবং আপনার লেখা প্রকাশ করতে পেরে যে সম্মানিত হয়েছি, সেজন্য ধন্যবাদ জানাব।... আপনি কখন আসবেন তা যদি জানতে পারি, আপনার স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা করতে পারব। আমার বেশ ক’জন বন্ধু বলেছেন, শিকাগোয় এসে আপনি যদি তাদের বাড়িতে থাকেন তারাও খুশি হবেন।
৫. মিসেস হ্যারিয়েট মুডির প্রাথমিক পরিচিতি কবি উইলিয়াম ডন মুডির স্ত্রী হিসেবে হলেও তিনি জন মেসফিল্ড, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জেমস স্টেফেনস প্রমুখের বন্ধু এবং আমেরিকার বহুসংখ্যক তরুণ লেখকের প্যাট্রন হিসেবে অধিক সমাদৃত। তিনি ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক, লেখক ও ব্যবসায়ী। ১৮৭৬ সালে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক, ১৮৮৯ প্রথম বিয়ে ভেঙে যায়। বাবার মৃত্যু হয়। তিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক কবি উইলিয়াম মুডির প্রেমে পড়েন। ১৯০৯ সালে কানাডার কুইবেকে তারা বিয়ে করেন। হানিমুন সফরেই জাহাজে দক্ষিণ আটলান্টিকে কবি ভয়ংকর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং জাহাজ আসার পর জানা যায়, তিনি অপারেশনের অযোগ্য ব্রেইন টিউমারে ভুগছেন। পরের বছরই তিনি মারা যান।
হ্যারিয়েট মুডি লেখা চালিয়ে যান, চলচ্চিত্রের পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন। তিনি শিকাগোয় ম্যানসন, নিউইয়র্কে অ্যাপার্টমেন্ট এবং নিউ ইংল্যান্ডে বড় ফার্মের মালিকানা ক্রয় করেন। কিন্তু ১৯২৯ সালের স্টক মার্কেট বিপর্যয় ও মহামন্দা তার আর্থিক সামর্থ্য সংকুচিত করে ফেলে। ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৩২-এ তিনি ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমায় মারা যান।
মিসেস মুডির কাছে রবীন্দ্রনাথের ইংরেজি অনুবাদের পাণ্ডুলিপি সুরক্ষিত ছিল, যা পরে রবীন্দ্রভবনে আনা হয়।
প্রথম সাক্ষাতের পর থেকে তার মৃত্যু পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ মিসেস মুডির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন।
মিসেস হ্যারিয়েট মুডি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ:
গত্ং. গড়ফফু-কে আমার বড় ভালো লাগছে।... এর আতিথ্যের মধ্যে একটি স্বাভাবিক দাক্ষিণ্য আছে। একটি অপর্যাপ্ত মাতৃভাব এর হূদয় থেকে উৎসারিত হয়ে নানা ধারা প্রবাহিত হচ্ছে, শুধু বিশেষভাবে আমরা নয়, যে কেউ এর কাছে আসবে। সবাই সেই স্নিগ্ধতায় অভিষিক্ত হয়ে যাচ্ছে। এখানে এসে অবধি পরের বাড়িতে আছি বলে একদিনের জন্যও অনুভব করিনি।... গত্ং. গড়ফফু-র মধ্যে থেকে এখনকার মেয়েদের আর একটি পরিচয় আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমি দেখলুম এদের মধ্যে পতিব্রত্যের পরিধি কোনোদিকে সংকীর্ণ নয়।... ইনি এর স্বামীর কাজ তার রচনা তার সমস্ত জীবনের সাধনাকে কোলের ছেলের মতো লালন করেছেন—তার জীবনের কোনো অংশের সঙ্গে এর হূদয়ের কিছুমাত্র বিচ্ছেদ নেই, এইটে দেখতে আমার অত্যন্ত আনন্দ বোধ হয়।... ইনি বিদুষী-লাতিন জার্মান ফরাসি প্রভৃতি ভাষায় অভিজ্ঞ, সাহিত্যচর্চায় জীবনযাপন করছেন; এক সময়ে ইনি শিক্ষয়িত্রী ছিলেন এবং এর ছাত্রদের অনেকের চিত্তকে ইনি কবিত্বে উদ্বেলিত করে তুলেছেন বলে তার একটা খ্যাতি আছে। স্বামীর মৃত্যুর পর ইনি খুব দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছিলেন—কেবল নিজের চেষ্টায় ইনি তার থেকে নিজেকে উদ্ধার করেছেন। এমনকি এখন একে ধনী বলা যেতে পারে। এই কর্মকুশলতার মধ্যে সহূদয়তার সম্মিলন এইটেই আমার বোধ হয় নারীত্বের আদর্শ।... নারীর এই সর্বোচ্চ প্রকাশটি আমার কাছে অত্যন্ত আনন্দময়। এই প্রকাশকেই আমি গোরায় আনন্দময়ীর মধ্যে ব্যক্ত করতে চেষ্টা করেছি।
(অজিত কুমারকে লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠি, রবিজীবনী ষষ্ঠ খণ্ড)
হ্যারিয়েট মুডিও রবীন্দ্রনাথকে লিখেছেন: আপনি যে আমার জন্য কী করেছেন, আপনি নিজেও জানেন না।
পাদটীকা
রবীন্দ্রনাথ যখন ইংল্যান্ড-আমেরিকা বাজিমাত করছেন, তখন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘আনন্দ বিদায়’-এর কথোপকথন:
২য় ভক্ত: এই একবার বিলেত ঘুরে এলেই ইনি চউ হয়ে আসবেন।
৩য় ভক্ত: চউ কী
২য় ভক্ত: Doctor of Poetry
৩য় ভক্ত: ইংরেজরা কি বাঙলা বোঝে যে এর কবিতা বুঝবে?
৪র্থ ভক্ত: এ কবিতা বোঝার দরকার নেই। এ শুধু গন্ধ। গন্ধটা ইংরেজিতে অনুবাদ করে নিলেই হলো।
২য় ভক্ত: এরপর রয়টার দিয়ে সেই খবরটা এখানে পাঠালেই আর Andrew-এর একটা Certificate জোগাড় করলেই PL.
৩য় ভক্ত: চখ কী?
২য় ভক্ত: Poet laureate.






