আমাদের বন্ধু অম্বুর দাদার সঙ্গে এক জোড়া খড়মের সম্পর্ক আছে, আমাদের কাছে এই সম্পর্ক স্বাভাবিক বলে মনে হয় না, আমরা অনেকবার খেয়াল করেছি, উনি সারাক্ষণ খড়ম নিয়ে পড়ে থাকেন, যে খড়ম অত্যন্ত পুরনো, কালো কিচকিচে, অত্যন্ত পেটা ও মজবুুত।
আমরা জানি, কিছুদিন আগেও ওনার প্রধান কাজ ছিল খড়মের যত্ন করা; ধোয়ামোছা, বুকে জড়িয়ে ধরা, চুমো খাওয়া। কিন্তু ইদানীং প্রিয় খড়মকে গালি দিচ্ছেন, থুথু দিচ্ছেন, মাথার ওপর তুলে আছাড় মারতে যান, শরীরে শক্তি থাকলে হয়তো লাথিও মারতেন। তবে আমাদের কাছে কিছু বিষয় বিভ্রান্ত হওয়ার মতো অথবা ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেয়ার মতো লাগে। এই যেমন গভীর রাতে, বিশেষ করে অমাবস্যার রাতে পশ্চিম দিকে মুখ করে খড়ম পায়ে দিয়ে বিড় বিড় করে মন্ত্রের মতো সূরা কেরাত অথবা কী কী যেন পড়তে থাকেন, অম্বু ও তার বউ এসব কাণ্ড নিজ চোখে দেখেছে, একবার নয়, দুবার নয়, বহুবার, এই বাড়ির কাজের মেয়ে নাকি খড়ম পায়ে উড়তেও দেখেছে। আমাদের কাছে এসব কথা অথবা আচরণ গোলমেলে ঠেকে।
আমরা পাঁচ বন্ধু যেন পঞ্চপাণ্ডব, সেই পঞ্চপাণ্ডবদের একজন অম্বু, যে রাজনীতিবিদ হিসেবে বেশ জনপ্রিয়, আমাদের দৃষ্টিতে যে যুধিষ্ঠিরের মতো স্থির, সত্যবাদী ও গম্ভীর, হয়তো তার এই ব্যক্তিত্বের কারণে তার দাদার খড়ম ও আচরণ সম্পর্কে আগ বাড়িয়ে কিছু জানতে চাই না। তার পরও একদিন সুযোগ বুঝে আমাদের সবচেয়ে চঞ্চল বন্ধু, জনপ্রিয় প্রযুক্তিবিদ অনিল বলে বসে, ‘কি রে অম্বু, তোর দাদার কোনো সমস্যা হইছে নাকি, সবসময় দেখি খড়ম নিয়ে পড়ে থাকে।’ এক কথায়ই কাজ হয়; অম্বু তার দাদা সম্পর্কে পই পই করে বলতে থাকে।
আমরা একেকজন একেক ব্যাখা দিই অথবা সমস্যার কথা তুলে ধরি। আমাদের বন্ধু, স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদ অগ্নি বলে, ‘বয়স হয়ে গেছে তো এমন হতেই পারে।’ বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অম্বর মনে করে, ‘খড়মের সঙ্গে দাদার মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা আছে, সেখানে কোনো অতীত জড়িত।’ অনিল বলে, ‘এই খড়মটাই দাদার নিজের, আর কিছু তো নেই ওনার।’ বন্ধু অম্বু অবশ্য নীরব, আমি প্রস্তাব করলাম, আচ্ছা দাদার সঙ্গে তো কেউ তেমন কথা বলে না, উনি অনেক নিঃসঙ্গ, মাঝে মাঝে ওনার কাছ থেকে গল্প শুনলে খারাপ হয় না, এতে ওনার একাকিত্ব কাটবে আবার আমরাও খড়মের গল্প শুনতে পারব। আমার কথার সঙ্গে অম্বর একমত পোষণ করে, বরাবরের মতো ভাবলেশহীন অগ্নি ও অস্থিরচিত্তের অনিল গুরুত্ব দেয় না। অম্বু আমার কথায় সায় দিলে আমরা খুব সাবধানে দাদার রুমে প্রবেশ করি। গিয়ে দেখি উনি খড়মকে গালিগালাজ করছেন। একেবারে খিস্তিখেউড় যাকে বলে। উনি আমাদের দেখে খুনরঙা চোখে থুথু ছিটিয়ে দেন, সেটা আবার হাত দিয়ে মুছে নেন। অনিল বের হয়ে যেতে চাইলে আমি হাত দিয়ে না করি। আমরা দাদার সঙ্গে এক কথা দুই কথা অনেক কথা বলে শেষ পর্যন্ত খড়মের গল্প শুনতে পাই:
ভাই রে, এই খড়ম নিয়া কী কইতাম। অনেক অনেক আগের কথা ভাই। আয়ুব খান যেবার ক্ষমতা দখল করল, তার পরের বছরের কথা, বুঝছ। ঘটনা কিন্তু আমাদের গেরামের। এই খড়মটা দেখতাছ না, এইডা কিন্তু ভাই আমার না, খড়ম যার সে মইরা খটকিনা লাইগা গেছে। ওই হালা মরার পর আমি এইটা নিয়া আইছি। যে হালার খড়ম আছিল, সে আবার সম্পর্কে আমার মামা হইতো। তার ছিল খুব সুন্দর একটা বউ। এমন বউ আল্লাহর চান্দের নিচে নেই। যেমন তার শরীরের রঙ, যেমন হাত-পায়ের ঢৌল, তেমন তার নাম-মুখ, তেমন উঁচ-লম্বা, এক্কেবারে পাঁচ মিলের। এই রকম বউরে আমরা কইতাম ঠাসা বউ। যা কইতাছিলাম, ওই হালার বেডা ছিল পাতিলের পাছার মতো কালা। সে খালি সন্দেহ করত বউরে। তাও আবার নিজের বড় ভাইরে নিয়া। একদিন হইছে কী, বাতির আজানের সময় নিজের মায়ের পেটের বড় ভাইয়ের সঙ্গে হাসতে হাসতে কথা কইতে দেখে, দুঃখের কথা কী কইতাম, হেই রাতেই কামডা ঘটে।
অম্বু ও তার বউ মৃত্তিকা চুপ করে বসে থাকে। কী বলতে গিয়েও বলে না, আমি নিচু গলায় বলি, ‘দাদা, তারপর কী হয়।’ দাদা একবার ঢোক গিলে আবারো বলা শুরু করেন:
ওইদিন রাতের বেলা বউয়ের লগে এক কথা দুই কথায় লাইগা পড়ে। পরে ধরাধরি, চুলাচুলি, বউও কিন্তু কম না, শরমের কথা কী কইতাম, চুলে বালে লাইগ্যা পড়ে, বউ জামাইয়ের পুরুষাঙ্গে ধইরা এমনভাবে টানাটানি করে যে ছাড়াতে পারে না, জামাইয়ে দিশবিশ না পাইয়া হাতের কাছে পায় খড়ম, হেই খড়ম দিয়া এমন বাড়ি শুরু করে ঘাড়ে গর্দানে যে বউ তড়পাতে তড়পাতে মইরা যায়, হেই খড়ম জোড়াই হইল এইগুলা।
এই পর্যন্ত শোনার পর আমরা বিষম খাই, চোখ চাওয়াচাওয়ি করি, তারপর একবার খড়মের দিকে তাকাই তো আরেকবার দাদার দিকে। অম্বু স্থির হয়ে বসে থাকে। আমাদের খুব জানতে ইচ্ছে করে, এই খড়ম দাদার কাছে কেন বা কীভাবে এল? কিন্তু আমাকে জিজ্ঞেস করতে হয়নি। অগ্নি প্রশ্নটা করে ফেলে। ওনার উত্তর যেন প্রস্তুত ছিল, সঙ্গে সঙ্গে বলা শুরু করেন:
ভাই রে, তোমরা আজকালের পোলাপান, অত জানোও না, অত মানোও না। ধরো, কেউ ফাঁস লইয়া মরল একটা দড়ি দিয়া বা কেউ একটা ডেগার ঢুকায়া দিল পেটের ভিতর। ধরো, কেউ কাইচ্চা দা দিয়া কোপায়া মারল কাউরে। এইসব দড়ি, ডেগার, দা বা খড়ম তুমি যদি নিজের কাছে রাখতে পারো, তাইলে তুমি সাক্ষাৎ বাদশা, তোমার একটা ক্ষ্যামতা থাকব। কেমনে কই কেমনে বোঝাই তোমগরে, এই যে খড়ম দেখতাছ না, এই খড়ম দিয়া একজনরে খুন করা হইছে। আমি এই খড়ম পায়ে দিয়া একটা আমল কইরা যা বলি তা-ই ফলে যায়। বুঝতেই পারতাছ বয়স হইছে, এখন আর আগের মতো আমল করতে পারি না। আমলের একটা দখল আছে, এই দখল সহ্য করার মতো শরীর আমার নেই আর।
এত বৃদ্ধ মানুষ, ওনার মুখে এমন কথা শুনে আমরা বিভ্রান্ত হই। এই খড়ম দিয়ে মানুষ খুন করা হয়েছে, আবার এই খড়ম দিয়ে উনি আমল করছেন, ব্ল্যাক ম্যাজিক টাইপের কিছু করছেন কিনা বুঝতে পারছি না, নাকি ওনার একাকিত্ব ও একঘেয়েমি দূর করার জন্য একমাত্র সম্বল ও স্মৃতিময় খড়ম নিয়ে ইচ্ছে করে এমন করেন? তার পরও ওনার কাছে জানতে চাইলাম এই খড়মের ইতিহাস, উনি এই খড়মের মালিক হলেন কবে। কিন্তু উনি আমাদের কথা শুনে ও বুঝে দৈত্যের মতো হেসে বলেন, ‘কী মিয়ারা, চমকে গেলা নাকি, আরে এই ঘটনা সত্য না, বানায়া কইছি, তবে খড়মের ঘটনা কিন্তু সত্যি সত্যি।’ ওনার ঠোঁটের নাচন, হাসির ধরন ও কথার রকম শুনে মনে হয়, এত বয়স্ক একজন মানুষ, কবে মারা যান তার ঠিক নেই, কিন্তু আমাদের সঙ্গে হেঁয়ালি করে যাচ্ছেন, আমাদের ঘোরের মধ্যে ফেলার চেষ্টা করছেন, তবে আমরাও নাছোড়বান্দা কম না, আজ খড়মের কথা না শুনে ছাড়ছি না। উনিও আমাদের মোটিফ দেখে আরো শক্ত করে বসেন, আসল ঘটনা বলার জন্য গলা খাঁকারি দিয়ে শুরু করেন:
আসল ঘটনা কইতে আমারই বুক কাঁপে আর তোমরা তো হেইদিনের পোলাপান, বুঝছ, অনেক অনেক আগের কথা, আমি নিজ চোখে দেখছি ঘটনাটা, হইছে কী, আমার এক চাচার বউ আছিল কালা কুচকুচা, বিয়া হওয়ার আগে কথা আছিল শ্বশুরবাড়ি থেইকা হালের গরু দিব চাইর জোড়া, কিন্তু গরু আর আসে না, তোমরাই কও, পুরুষ মানুষ কয়দিন আর অপেক্ষা করতে পারে, বিয়ার পানি যাইতে না যাইতে জামাইয়ের জিদ চাপে মাথায়, বউরে হালের গরুর জন্য চাপ দিতে থাকে, লিল্লার শ্বশুর ছিল একটা খচ্চর, এক্কেবারে চাঁড়াল একটা, একবারও নিজের মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করল না, কাল দিই, পরশু দিই করতে করতে বোরোর মৌসুম আইসা পড়ল, এদিকে চাচার গোয়ালে গরু নাই, গোয়ালে গরু-বাছুর না থাকলে গেরস্তের মাথা ঠিক থাকে না, বুঝছ, পুরুষ মানুষের মাথা ঠিক না থাকলে যা হয় আরকি, চাচা আমার করল কী, এই গরুটরু নিয়া দিনে দুপুরে চাচির সঙ্গে লাইগ্যা পড়ে, চাচিরে ছাইড়া দিবার মতো অবস্থা, একদিন চাচি একটু চেত দেখাইছে কী আর যাস কই, সঙ্গে সঙ্গে আমার চাচা চাচির চুলের মুঠি ধইরা নিয়া গেল ঘরে, ইচ্ছামতো কিল-ঘুষি মারল, ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে হাতের কাছে পাইল এই খড়ম, খড়ম দিয়া মাথায় বাড়ি দিতে লাগল, কয়টা হইব, একশর কম না, আমরা ছাড়াইতে পারলাম না, গিয়া দেখি চাচি ধড়ফড়ায়, ধরতে ধরতে চাচি গেল মইরা, চাচা কী আর করব, মানুষের কাছে বইলা বেড়াইল যে শিকা থেকে গুড় পাড়তে গিয়া পইড়া গেছে, মাথা লাগছে চকির কোনায়, কেউ কিছু বুঝল না, বুঝছ, এই খড়ম হইল সেই খড়ম।
আমরা আবারো প্রশ্ন করি, এই খড়ম কীভাবে ওনার কাছে এল, উনি আবারো এ প্রশ্নের উত্তর দিলেন না, আমাদের চেহারা দেখে বেশ বিরক্ত হয়ে গেলেন, তারপর হঠাৎ করেই সহজ হয়ে বলেন, ‘আরে এ ঘটনাও বানায়া কইছি, তয় খড়মের কথা কিন্তু মিছা না।’ এ কথা বলে খিক খিক করে হাসেন। আমরা বেশ দমে যাই, দ্বিধার মধ্যে পড়ি, আবারো মনে হয়, এমন বৃদ্ধ মানুষ এমন হেঁয়ালি করবেন কেন? এভাবে বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলবেন কেন? তবে আমরা আরো ঘটনা শুনতে চাই, ওনার কথা বলার ধরন, চোখ মুখ ঠোঁটের ভঙ্গি ও হাসি অদ্ভুত লাগে, জাদুকরের মতো কথা বলার টান, ওনার চোখের মায়ার কথার জাদুতে আমরা বসে থাকি। হঠাৎ করে আমাদের চমকে দিয়ে বলেন, ‘তোমরা কি আসল ঘটনাটা শুনতে চাও? শুনলে তো হজম করতে পারবা না।’ আমরা চমকপ্রদ কিছু শোনার জন্য খুব আগ্রহ নিয়ে বলি, ‘দাদা বলেন, আমরা হজম করতে পারব।’ তাইলে শোনো বলে শুরু করেন:
বুঝছ, এ ঘটনা কিন্তু আমার নিজ চোখে দেখা, আমাদের গেরামের কথা, এইডা কিন্তু বানায়া কইতাছি না, সত্যি সত্যি কইতাছি, আমার এক জ্যাঠার মাইয়া ছিল পাঁচটা, ছেলে নেই একটাও, এত সয়ায়-সম্পদ, কেডা খাইব, কেডা দেখব কও, সবচেয়ে বড় কথা, মরার পর লাশ কান্ধে লওয়ার জন্যও তো একটা পোলা দরকার, কবরে খুটা দেয়ার জন্যও একটা পুরুষ দরকার, নাকি, পর পর পাঁচটা মাইয়া হওয়ার পর আবার জেঠির পেটে বাচ্চা এলে জ্যাঠা ঘোষণা দিল যে এবারো মাইয়া হইলে জেঠিকে তালাক দিব, মরার জেঠির কপাল ছিল খারাপ, আবারো হইল মাইয়া, জ্যাঠা কিন্তু তার কথা রাখে নাই, এত্তগুলা মাইয়া, এত্তবড় সংসার, গরু-বাছুর, ক্ষেতে খামারে কামলা— দেখব কেডা, কিন্তু একদিন হইল কী, এই পোলা পোলা কইরাই যুদ্ধ লাগল বাড়িতে, যুদ্ধের একসময় জেঠিরে এমন মাইর মারল যে জেঠি গেল গা মইরা, মারল আবার খড়ম দিয়া পিটায়া, মাথার পেছনে বাড়ি খাইয়া জেঠি লুটায়া পড়ল, রক্ত আর রক্ত, রক্তে জলিতলি হইয়া গেল, উঠান ভিজে গেল, খড়ম ভিজে গেল, বুঝছ, এই হইল সেই খড়ম।
আমি খড়মের দিকে তাকালাম, খড়মে রক্তের দাগ দেখা যায় না, তবে তেল চিটচিটে খড়ম যে বহু বছর আগের তা বোঝা যায়। আবারো প্রশ্ন করলাম ওনার হাতে এই খড়ম এল কীভাবে, এবার তিনি ক্ষেপে গিয়ে বলেন, ‘হেই কথা জানার দরকার নেই তোমগর, জানলে তো সব শেষই, গোমর ফাঁস হইয়া যাইব, সব কইয়া দিলে আমার আমলে কাজ হইব না আর।’
দাদার এসব কথাবার্তা শুনে অনিল খিক করে হেসে ওঠে, ওর এই এক স্বভাব, সবকিছুতে ফান করে, সিরিয়াস বিষয় হলেও। দাদা বোধহয় অপমানিত বোধ করেছেন, প্রথম থেকে অনিলের দিকে লক্ষ রাখছিলেন। এখন বেশ ক্ষিপ্র ও ধারালো মনে হচ্ছে ওনাকে, বিশেষ করে চাহনিতে, কিন্তু পরক্ষণেই খড়ম নিয়ে আরো গল্প ফাঁদার চেষ্টা করেন, কিন্তু আমরা ব্যস্ত মানুষ, উসখুস শুরু করি, আমাদের এত সময় নেই। ঠিক এই সময়ে অনিল আরেকটা অপকর্ম করে বসে, ‘দাদা, আমরা শুনছি আপনি এই খড়ম পায়ে দিয়ে যা বলেন তা নাকি ফলে যায়, আপনি নাকি ভবিষ্যৎ বলতে পারেন, আমাদের ভবিষ্যত্টা যদি বলতেন একটু।’ সঙ্গে সঙ্গে উনি উঠে পড়েন, লাঠিতে ভর দিয়ে নুয়ে নুয়ে বাথরুমের দিকে যেতে থাকেন, আমরা ধরার চেষ্টা করি, কিন্তু উনি হাত দিয়ে সরিয়ে দেন, আর একটা হুঙ্কার দিয়ে বলেন, ‘তোমরা একটু বসো, অজুটা কইরা আসি।’ আমরা একটু ভয় পেয়ে যাই, ওনাকে খুব উত্তেজিত ও রাগান্বিত মনে হচ্ছে, দেখতে দেখতে ফিরে আসেন, খড়ম পায়ে দিয়ে পশ্চিমের দিকে দাঁড়িয়ে ধ্যান করা শুরু করেন, আস্তে আস্তে কাঁপতে থাকেন, হঠাৎ ঢলে পড়ে যান বিছানায়। আমরা অস্থির হয়ে পড়ি, ৯১ বছরের একজন বৃদ্ধকে এভাবে ক্ষ্যাপানোর জন্য অনিলকে বকাঝকা শুরু করি, আমরা চিন্তার মধ্যে পড়ি। কারণ উনি চোখ খুলছেন না, আমাদের নামকরা চিকিৎসাবিদ মৃত্তিকা ভাবি নাড়ি ও চোখ পরীক্ষা করে বললেন যে সব ঠিক আছে, দাদা ঘুমিয়ে গেছেন।
তারপর আমরা নিচে ড্রয়িংরুমে ফিরে আসি, দাদার কথা মন থেকে মুছে ফেলি, আমরা অনেক দিন পর অনেকটা সময় হইহুল্লোড় করে কাটিয়ে দিই। আড্ডা শেষ করতে করতে রাত হয়ে যায়, যাওয়ার আগে মনে হলো দাদাকে একবার দেখে যাই, ওদের বলি, ‘চল, একবার দাদাকে দেখে যাই।’ ওরা কেউ রাজি হয় না, আমাকে নিয়ে মজা করে বলে, ‘আমাদের বন্ধু অংশুসোনা, ও সোনাবাবু, তুমি তো কবি-সাহিত্যিক মানুষ, বুদ্ধিবীজী মানুষ, তোমার আবার মানবিকতা একটু বেশি, শালা, যা ব্যাটা, তুই যা, আমরা আছি।’ বুঝতে পারলাম, ওদের বলে লাভ নেই, আমি নিঃশব্দে এগিয়ে যাই, আমার ভেতরটা কেমন করছে, খুব সাবধানে ঘরের দরজা খুলে দেখি এখনো ঘুমাচ্ছেন দাদা, আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখলাম ওনাকে, খড়মজোড়া পাশেই পড়ে আছে। রুম থেকে বের হওয়ার জন্য ইউটার্ন করার সঙ্গে সঙ্গে একটা আওয়াজ পেলাম, আমি চমকে উঠি, মোবাইলের আলোয় দেখি উনি হাত দিয়ে ইশারা করছেন, আমি দুরুদুরু মন নিয়ে কাছে যাই, ওনার চোখ দিয়ে যেন রক্ত বের হয়ে আসবে, চোখ-মুখ উল্টিয়ে কেমন করে বললেন, ‘আগের দিন বাঘে খাইছে, পরের দিন টাকে খাইবে।’ ওনার বলার ভঙ্গি দেখে আমার গা হিম হয়ে আসে। অম্বুর মুখে শুনেছি, উনি যা বলেন সব ফলে যায়, এ কারণে শত জ্বালা-যন্ত্রণা সহ্য করেও অম্বু নিজের কাছে রেখেছে ওনাকে, বলা তো যায় না, কখন মুখ দিয়ে কী বেরিয়ে আসে।
রুম থেকে বেরিয়ে এলে বন্ধুরা আবারো টিপ্পনী কাটে, শুধু অম্বু আমার চোখের ভাষা পড়তে পারে। নিজের প্রতি রাগ হচ্ছে, কী দরকার ছিল আগ বাড়িয়ে গিয়ে অভিশাপ বা ঘটনাসূত্র শুনতে, কিন্তু দাদার সংকেত বা শ্লোক আমার মাথা থেকে যাচ্ছে না।
নিশুতি রাতে অগ্নি গাড়ি করে নামিয়ে দিয়ে যায়, ঘরে ঢুকে কেমন শান্তি শান্তি লাগে, ভাগ্যিস মানবাধিকার সংগঠনের নেত্রী, আমার বউ বসুন্ধরা আজ বাসায় নেই। তারপর জেলফেরত আসামির মতো লম্বা গোসল দিয়ে ঘুমাতে যাই; কিন্তু আমার ঘুম আসে না। সারাক্ষণ দাদার গল্প বা অভিশাপ কিংবা ভবিষ্যতের কথা মনে পড়ছে। এখানে একটা বিষয় খেয়াল করা যেতে পারে, দাদার গল্পে তিনজন নিরাপরাধ নারীকে খুন করা হয়েছে, প্রত্যেককে আবার পুরুষের পায়ের খড়ম দিয়ে পিটিয়ে মারা হয়েছে। আমার মনে প্রশ্ন জাগে, এত কিছু থাকতে খড়ম কেন? আবার এই খড়ম এখনো দাদা রেখে দিয়েছেন, আগে খড়মকে আদর-যত্ন করলেও ইদানীং যাচ্ছেতাই ব্যবহার করছেন; সেই সঙ্গে আরেকটা চিন্তা উঁকি মারে, দাদার মতো বৃদ্ধ মানুষ এত এত গল্প বলতে পারেন, নিশ্চয় এখানে কোনো ইঙ্গিত আছে, ভার্সিটিতে থাকাকালে অম্বুদের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে জেনেছিলাম, ওদের বাড়িকে ‘ডাকাতবাড়ি’ বলে লোকে। কারণ অনেক অনেক আগের কথা, তিন মাসের ব্যবধানে ওদের বাড়িতে নাকি তিনজন বউকে মেরে ফেলা হয়, তার পর থেকেই নাকি ওদের বাড়ির নাম হয় ‘ডাকাতবাড়ি’। এই চিন্তার সঙ্গে দাদার বলে দেয়া শেষ বাক্যটা মিলেমিশে আমাকে হত্যা করবে যেন। বাক্যটাতে ‘টাক’ বলে কিছু একটা আছে, সেই ছোট্টবেলা থেকে দাদা-দাদুর কিস্সায় টাকের কথা শুনে আসছি, টাক হলো বাঘের উপরে চড়ে বসা অদৃশ্য কিছু একটা। কিন্তু টাক বলে বাস্তব পৃথিবীতে কিছু আছে বলে শুনিনি। তবে বারবার মনে হচ্ছে, এখানে কিছু একটা আছে, বারবার কানে আসছে, ‘আগের দিন বাঘে খাইছে, পরের দিন টাকে খাইবে।’
আমরা কাজেকর্মে ফিরে আসি, কিন্তু দাদার কথা ও খড়মের ব্যাপার আমার মাথা থেকে যায় না। আমি যেন কিছু একটার জন্য অপেক্ষা করছি, খুব দ্রুত আমার অপেক্ষার অবসান হচ্ছে যেন, কিন্তু এ অপেক্ষা সারা জীবন বয়ে বেড়ালে আমার চেয়ে সুখী হতো না কেউ। দিনে দিনে আমার বেঁচে থাকা দুরূহ হয়ে যাচ্ছে, সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, কোনটা কল্পনা, কোনটা স্বপ্ন, কোনটা বাস্তব বুঝতে পারছি না। আমার মনে হচ্ছে, আমার বন্ধু অনিল স্ত্রীর হাতে খুন হয়েছে, নেশার টাকা না পেয়ে অগ্নির দশম শ্রেণীতে পড়া মেয়েটা ঘুুমের ওষুধ খাইয়ে শ্বাসরোধ করেছে ওকে, অম্বরের বউ পাঁচ বছরের ছেলেকে ছাদ থেকে ফেলে দিয়েছে শুধু পরকীয়ার সাক্ষী নিশ্চিহ্ন করে দিতে, অম্বুকে তার বউ ডিভোর্স দিয়েছে।
আমি এসব দেখি, শুনি নাকি ভাবি? আমি কোথায়, আমি স্বপ্নে নাকি বাস্তবে? নিজেকে ঠিক রাখতে পারছি না, মুহূর্তে মুহূর্তে দাদার শ্লোক, খড়মের কীর্তি, অভিশাপ বা ভবিষ্যতের কথা মনে পড়ছে। ভীষণ ভয় আমাকে গ্রাস করছে, আমি দেখি, আমার স্ত্রীর হাতে চকচক করছে চাকু, ওর দাঁত ঝিলিক দিয়ে ওঠে, আমি চোখ বন্ধ করে ফেলি, চোখে মৃত্যুর মতো ঘুম নেচে যায়, সারাক্ষণ মগজে ঘুরেফিরে আসে, ‘আগের দিন বাঘে খাইছে, পরের দিন টাকে খাইবে।’






