কলকাতার ১৮৩ ল্যান্স ডাউন (এখন শরৎ বসু রোড) সড়কের বাড়িতে জীবনের শেষ আট বছর কাটিয়েছেন রবীন্দ্রোত্তর যুগের সবচেয়ে মহৎ, জটিল ও ‘বিপজ্জনকভাবে প্রভাববিস্তারী’ কবি জীবনানন্দ দাশ। যদিও এ বাড়িতে একজন উপভাড়াটিয়ার যন্ত্রণা থেকে নিস্তার পাওয়া এবং নিরিবিলি লেখালেখির জন্য মৃত্যুর বছর ১৯৫৪ সালে ল্যান্স ডাউনের অদূরে গড়িয়াহাটা মোড়ের কাছে একটি ঘর ভাড়া নিয়েছিলেন এবং চরম অর্থকষ্টের মধ্যেও মাসের পর মাস সেই ঘরের ভাড়াও দিয়েছেন, কিন্তু শেষমেশ সেখানে যাননি।
১৯১৭ সালে জন্মস্থান বরিশাল শহরে ব্রজমোহন কলেজ থেকে আইএ পাস করার পর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ইংরেজিতে ভর্তি হলে তিনি থাকা শুরু করেন খ্রিস্টান মিশনারি পরিচালিত অক্সফোর্ড মিশন হোস্টেলে। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইংরেজি এবং একই সাথে আইনে ভর্তি হলে চলে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের হার্ডিঞ্জ হোস্টেলে। ১৯২২ সালে কলকাতার সিটি কলেজে শিক্ষকতার চাকরি পাওয়ার পর থাকা শুরু করেন হ্যারিসন রোডের প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং এবং পরে কলেজসংলগ্ন বেচু চ্যাটার্জি স্ট্রিটের একটি বাসায়। এর বাইরে আরো একাধিক জায়গায় তিনি থেকেছেন। জীবনানন্দের আবিষ্কারক বুদ্ধদেব বসুর স্ত্রী প্রতিভা বসু (তিনিও ওই সময়ের বিখ্যাত লেখক) জানাচ্ছেন, রমেশ মিত্র রোডের একটি বোর্ডিংয়েও জীবনানন্দ কিছুদিন ছিলেন এবং বুদ্ধদেব সেখানে বেশ কয়েকবার গিয়েছেন।
জীবনানন্দের ছোট ভাই অশোকানন্দ দাশের লেখা থেকেও জানা যাচ্ছে, সিটি কলেজে অধ্যাপনাকালীন ৬৬ হ্যারিসন রোডের প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং, রাজা দীনেন্দ্র স্ট্রিটের একটি মেস, কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটসংলগ্ন একটি গলির মধ্যে একটি ঘর, বেচু চ্যাটর্জি স্ট্রিট—এভাবে এক বছরের মধ্যে তিনি কয়েকবার ঠিকানা বদল করেন। সেইসব দালানকোঠা এখন কেমন আছে, তার অনুসন্ধানে এই পথচলা।
প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, অক্সফোর্ড মিশন হোস্টেল, সিটি কলেজ, বেচু চ্যাটার্জি স্ট্রিট—সবগুলোই কাছাকাছি। কলেজপাড়া বা কলেজ স্ট্রিটের বিখ্যাত বইয়ের বাজার, কফি হাউজ ইত্যাদিও গড়ে উঠেছে এসব প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করেই। ফলে কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে বই কিনতে গেলে রথ দেখার পাশাপাশি কলা বেচার সুযোগটা নেয়াই যায়।
কলকাতা শহরের প্রধান সড়কগুলোর অন্যতম মহাত্মা গান্ধী (সংক্ষেপে এমজি রোড) সড়কের (সাবেক হ্যারিসন রোড) উপরেই কলেজ স্কয়ার। তার দক্ষিণে প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি (জীবনানন্দের সময়ে এটি ছিল কলেজ), তার পাশেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। মাঝখানে ব্যবধান শুধু একটি দেয়াল। আবার মূল রাস্তায় না গিয়ে ভেতর দিয়েই এ দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াত করা যায়। কলেজ স্কয়ারের উত্তর দিকে ঢুকে গেছে বিধান সরণি (পূর্বতন নাম কর্নওয়ালিশ স্ট্রিট)। সেই সড়ক ধরে কিছুটা এগোলে ঠনঠনিয়া কালিমন্দির। মন্দিরের বিপরীতে অর্থাৎ পুবদিকে যে গলিটা ঢুকে গেছে, সেটিই বেচু চ্যাটার্জি স্ট্রিট। এই গলির ১৮/২/এ নম্বর বাড়ির দোতলায় জীবনানন্দ থাকতেন। এই গলিটা শেষ হলেই হাতের বাঁয়ে সিটি কলেজ। আর এর অদূরেই বিবেকানন্দ সড়কে জীবনানন্দের ছাত্রজীবনের স্মৃতিবিজড়িত অক্সফোর্ড মিশন হোস্টেল।
প্রেসিডেন্সি কলেজ
‘প্রেসিডেন্সি কলেজ আমাকে ডাকল
সন্ধ্যার অন্ধকারে
তার উঁচু উঁচু গাছের ইশারা নিয়ে।’
কবিতার যে শব্দচয়ন ও বলার ঢঙ, তাতে এটা পরিষ্কার যে এটি জীবনানন্দের প্রথম দিককার কবিতা। সম্ভবত যখন তিনি প্রেসিডেন্সির ছাত্র, তখনই লিখেছিলেন। প্রশ্ন হলো, এই কলেজ কতটুকু মনে রেখেছে এই কৃতী শিক্ষার্থীকে?
১৯১৯ সালে ২০ বছর বয়সী তরুণ জীবনানন্দ কলকাতার এই অভিজাত কলেজ থেকে ইংরেজিতে বিএ পাস করেন। ক্লিন্টন বি সিলি জানাচ্ছেন, সব ছাত্র যে শ্রেণীর জন্য চেষ্টা করে, সেই প্রথম শ্রেণী তিনি পাননি। পেয়েছিলেন দ্বিতীয় শ্রেণী। তার পরও বরিশালে তখন তার পরিবারের মধ্যে সন্তানদের এমন কৃতিত্বে ধ্যানানুষ্ঠান করার রেওয়াজ ছিল। জীবনানন্দের বেলায়ও তা অব্যাহত থাকে।
প্রেসিডেন্সির ক্যাম্পাস খুব বড় নয়। কিন্তু সুন্দর সাদা ভবন, সবুজ গাছপালা, খোলা মাঠ। মূল ভবনে উঠতে গেলে অনেকগুলো সিঁড়ি পার হতে হয়। বাংলা বিভাগের প্রধান মোসতাক আহমদ জানালেন, তাদের হলরুমটি বছর দুই আগে জীবনানন্দের নামে নামকরণ করা হয়েছে। আর এই কলেজের সাবেক কৃতী শিক্ষার্থীদের নাম যে দেয়ালে খোদাই করা, সেখানেও তাঁর নামটি পাওয়া গেল, ইংরেজিতে লেখা।
প্রেসিডেন্সির বড় মাঠের পাশ দিয়ে হাঁটি, পুরনো ভবনগুলোর দেয়ালে কান পাতি—জীবনানন্দের কণ্ঠস্বর ভেসে আসে কিনা। এই মাঠ, এসব ভবনের বারান্দায় কতদিন হেঁটেছেন তিনি। শৈশব থেকেই কিছুটা লাজুক, নিজের মধ্যে থাকা, ভিড় ও কোলাহল এড়িয়ে দেবদারু-ঘাস আর শালিখের রঙে নিজেকে আবিষ্কার করতেন। কোনোদিন সহপাঠীদের সঙ্গে মাঠে খেলাধুলা করেছেন বলে জানা যায় না। কারণ ওই বয়সে তিনি প্রকৃতির পাঠ নিয়েছেন। চিনেছেন বাংলার সমস্ত বৃক্ষ-লতা-গুল্ম; হেঁটে হেঁটে জেনেছেন কলকাতা শহরের অলিগলি আর তার মানুষের ভাষা। হাইড্র্যান্ট খুলে কুষ্ঠরোগীর জল পান অথবা চেটে নেয়া কিংবা ভিখিরিদের তত্পরতাও তার চোখ ফাঁকি দিতে পারেনি।
প্রসঙ্গত, শেষ দিকে যখন চাকরি নিয়ে টানাটানি, বেকারত্বের ঘানি টানছেন এবং কোথাও মনমতো (তার ভাষায় বিশুদ্ধ চাকরি) একটা চাকরি পাচ্ছিলেন না, তখন মনে মনে খুব চাচ্ছিলেন কৈশোরের স্মৃতিবিজড়িত এই প্রেসিডেন্সি কলেজে যেন তার চাকরি হয়। এজন্য তত্কালীন শিক্ষা সচিব কবি ও সম্পাদক হুমায়ুন কবিরকে এ বিষয়ে অনুরোধও করেছিলেন। কিন্তু ওই সময়ে প্রেসিডেন্সির ইংরেজি বিভাগে কোনো অধ্যাপকের পদ খালি ছিল না।
অক্সফোর্ড মিশন হোস্টেল
জীবনানন্দ অন্তঃপ্রাণ গবেষক প্রভাতকুমার দাস আগেই মনে করিয়ে দিয়েছিলেন যে অক্সফোর্ড মিশন হোস্টেল বললে এখন আর কেউ নাও চিনতে পারে। ফলে তার বাতলে দেয়া পথনকশা অনুসারে ভবনটি খুঁজে না পেলে বিবেকানন্দ সড়কে গিয়ে দোকানদার বা স্থানীয় কাউকে যেন জিজ্ঞেস করি ওয়াইএমসিএটা কোথায়। সেইমতো হাঁটতে হাঁটতে দেয়ালঘেরা একটি জরাজীর্ণ বাড়ির সামনে গিয়ে একজন বয়স্ক মানুষকে জিজ্ঞেস করি ওয়াইএমসিএর ঠিকানা। তিনি দেখিয়ে বললেন, এটিই ওয়াইএমসিএ। গেটের কাছে গিয়ে দেখা গেল, রঙ ওঠা ছোট্ট নামফলকে ইংরেজিতে YMCA লেখা রয়েছে। কোনো বাধা ছাড়াই গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকি। টানা দু-তিনদিন সরকারি ছুটি। ফলে হোস্টেলে এখনো যে সামান্য শিক্ষার্থী থাকেন, তাদের কারো দেখা মিলল না।
মূলত খ্রিস্টান শিক্ষার্থীরা এখানে থাকেন। জীবনানন্দের বাবা সত্যানন্দের সঙ্গে বরিশালের অক্সফোর্ড মিশনের সুসম্পর্কের সুবাদে তিনি এখানে থাকার সুযোগ পান। পরবর্তীকালে অক্সফোর্ড মিশনের নাম পরিবর্তন হয়ে YMCA (Young Men’s Christian Association) হয়ে যায়। মূল ভবনটি এখন জরাজীর্ণ। তবুও ভাঙাচোরা আর রঙজ্বলা কাঠ ও লোহার শরীর ঠিকরে বেরিয়ে আসে ঐতিহ্য আর সৌন্দর্য। এই জরাজীর্ণ ভবনে এখনো অল্প কয়েকজন খ্রিস্টান শিক্ষার্থী থাকেন। তবে পাশেই একটি নতুন ভবন করা হয়েছে।
সেই ভবনের দরজায় একজন নিরাপত্তা প্রহরী। দুপুরের আলস্য তার শরীরে। পরিচয় পেয়ে বললেন, অন্য কোনোদিন এলে হয়তো কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে ভেতরটা ভালো করে ঘুরে দেখা সম্ভব হতো। তার পরও বাইরে থেকে যেটুকু দেখা যায়, তাও মন্দ কী?
নিরাপত্তা প্রহরী জানালেন, তিনি এখানে ১০ বছর ধরে কাজ করছেন। তবে দুই বছর ধরে এই হোস্টেলে নতুন কাউকে দেয়া হচ্ছে না। আগে থেকে যারা আছেন, কেবল তারাই থাকছেন। তবে তাদেরও ধীরে ধীরে বিদায় করা হচ্ছে। হয়তো ভবনটি নিয়ে কর্তৃপক্ষের নতুন কোনো পরিকল্পনা আছে। মূলত কলকাতার বাইরে থেকে আসা বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্রিস্টান ছাত্ররাই এখানে থাকেন।
হার্ডিঞ্জ হোস্টেল
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকেই ১৯২১ সালে ইংরেজিতে এমএ পাস করেন জীবনানন্দ। তবে ইংরেজির পাশাপাশি তখন তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগেও ভর্তি হয়েছিলেন। উদ্দেশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের হার্ডিঞ্জ হোস্টেলে থাকা। কারণ তখন আইনের শিক্ষার্থীরা হার্ডিঞ্জ হোস্টেলে থাকার সুযোগ পেতেন। কিন্তু জীবনানন্দ আইন পড়া শেষ করেননি (আইন পড়া লোকও তিনি ছিলেন না)। প্রভাতকুমার দাস বলছেন, সম্ভবত তার মতো লাজুক প্রকৃতির ছাত্র আইন পড়তে চেয়েছিলেন কেবল এই ছাত্রাবাসে থাকার সুযোগ পাওয়ার ভরসায়। ৯ অক্সফোর্ড মিশনের ছাত্রাবাস থেকে কেন তাকে হার্ডিঞ্জ হোস্টেলে আসতে হলো, তার সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায় না। এই হোস্টেলে তার বাল্যসহপাঠী হরিজীবন থাকতেন। ফলে অক্সফোর্ড মিশন ছেড়ে এখানে আসতে চাওয়ার পেছনে এই কারণটি ছিল কিনা তা পরিষ্কার নয়। তবে হতে পারে এই যে, যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন, সে ক্যাম্পাসেই থাকতে চেয়েছিলেন পথের দূরত্ব কমাতে।
এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও লেখক চিন্ময় গুহ জানালেন, আলাদা করে এখানে জীবনানন্দের কোনো স্মৃতি বা তার স্মৃতিতে কোনো আবক্ষ মূর্তি, ছবি কিংবা কোনো ফলক নেই। কারণ এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং পরবর্তীকালে পৃথিবীবিখ্যাত হয়েছেন, এ রকম মানুষের সংখ্যা অগণিত। ফলে আলাদা করে জীবনানন্দকে এখানে খুঁজে পাওয়া কঠিন। তবে পুরনো ভবনের কয়েকটি বিশাল ক্লাসরুম ঘুরিয়ে তিনি বললেন, হয়তো এসব কক্ষেই জীবনানন্দ ক্লাস করেছেন। আর যে হার্ডিঞ্জ হোস্টেলে তিনি থাকতেন, সেটির নাম এখনো হার্ডিঞ্জ থাকলেও এটি এখন আর আবাসিক ভবন নয়, বরং এখানে এখন ক্লাস হয়।
হার্ডিঞ্জ হোস্টেলে বসে মা কুসুমকুমারী দাশকে লেখা জীবনানন্দের দুটি চিঠির সন্ধান পাওয়া যায়। এর মধ্যে একটি চিঠিতে বই কেনার জন্য ৫০ টাকা পাঠানোর তাগিদ আছে। বরিশালের বাল্যবন্ধু হরিজীবনও যে এই হোস্টেলে তার সঙ্গে আছেন, সেই তথ্যও রয়েছে এই চিঠিতে। হার্ডিঞ্জ হোস্টেলে বসে মাকে লেখা আরেকটি চিঠিতে তিনি জানাচ্ছেন, কাকার বাসায় থেকে পড়াশোনা করতে চান না। সেজন্যই এই হোস্টেলে ওঠা। তবে বাবা সত্যানন্দ দাশ কলকাতায় এসে একটি বাড়ি ভাড়া করতে পারেন কিনা, সেই ইচ্ছের কথা জানানোর পর আবার স্বগতোক্তির মতোই লিখছেন, সেসব স্বপ্ন সুদূরপরাহত। ছোট ভাই অশোকানন্দের (ডাক নাম ভেবলু) চেহারা কলকাতায় এলে কেন দাঁড়কাকের মতো হয়ে যায়, সেই তির্যক প্রশ্নও রয়েছে এই চিঠিতে।
সিটি কলেজ
কলকাতার সিটি কলেজে পড়েছেন জীবনানন্দের বাবা সত্যানন্দ দাশ। সেখানেই নিজের ক্যারিয়ার শুরু করেন জীবনানন্দ। এমএ পাস করার পরের বছরই অর্থাৎ ১৯২২ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে কলকাতার সিটি কলেজে ইংরেজি বিভাগের টিউটর হিসেবে যোগ দেন। ব্রাহ্মসমাজ পরিচালিত এই কলেজে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে জীবনানন্দের ব্রাহ্ম পরিচয় এবং তার বাবার একটা প্রভাব ছিল বলে মনে করা হয়। তবে ১৯২৮ সালে কলেজের রামমোহন ছাত্রাবাসের ছাত্ররা কলেজ কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সরস্বতী পূজার আয়োজন করলে এ নিয়ে হিন্দু ও ব্রাহ্মসমাজ বিবাদে জড়িয়ে পড়ে এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে জীবনানন্দের চাকরিটা চলে যায়।
ক্লিন্টন জানাচ্ছেন, ব্রাহ্মসমাজ পরিচালিত সিটি কলেজে সব ধর্মের ছাত্রদের জন্য একটি ছাত্রাবাস ছিল—রামমোহন হোস্টেল। অধ্যক্ষ হেরম্বচন্দ্র মৈত্রের রবিবাসরীয় প্রাত্যুষিক বক্তৃতা ছাড়া হোস্টেল সীমানায় কোনো ধরনের ধর্মীয় অনুষ্ঠান অনুমোদিত ছিল না। বিশেষ করে ব্রাহ্মসমাজ মূর্তিপূজার বিরোধী ছিল বলে হোস্টেল চত্বরে এ ধরনের কাজ নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু ১৯২৮ সালের ২৭ জানুয়ারি হোস্টেলের হিন্দু শিক্ষার্থীরা সরস্বতী পূজার আয়োজন করেন এবং কর্তৃপক্ষের অগোচরে হোস্টেলে সরস্বতীর একটি মূর্তি নিয়ে আসেন। এ নিয়ে তুমুল হট্টরোল শুরু হয়। পূজা আয়োজনকারী শিক্ষার্থীদের ক্ষমা চাইতে বললেও তারা তাতে রাজি হননি। কলেজ কর্তৃপক্ষ কিছু ছাত্রের জরিমানার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু অবস্থার অবনতি হলে গ্রীষ্মের আগাম ছুটি দিয়ে কলেজ বন্ধ করে দেয়া হয়। দলে দলে শিক্ষার্থীরা কলেজ ত্যাগ করেন, বিশেষত হিন্দু ছাত্ররা। ফলে চরম আর্থিক সংকটে পড়ে কলেজ। তখন ব্যয় কমাতে গিয়ে ১১ জন শিক্ষককে অব্যাহতি দেয়া হয়। সর্বকনিষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে জীবনানন্দের চাকরিটাও চলে যায়। ক্যারিয়ার শুরুর ছয় বছরের মাথায়, অর্থাৎ প্রথম চাকরিতেই বরখাস্ত হওয়ার যে সূচনা হলো, পরবর্তীকালে এ ধারাটি অব্যাহত থাকে। তিনি বারবারই বরখাস্ত হয়েছেন।
সিটি কলেজ থেকে তার এ চাকরিচ্যুতির পেছনে কবিতায় অশ্লীলতাকে কারণ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বলা হলেও জীবনানন্দের জীবনীকার ও গবেষকরা, বিশেষ করে ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকার সম্পাদক এবং জীবনানন্দের প্রথম জীবনীকার গোপালচন্দ্র রায় যথেষ্ট যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন যে কবিতায় অশ্লীলতা কোনো কারণ ছিল না। বরং হিন্দু-ব্রাহ্ম বিবাদের ফলে কলেজ যথেষ্ট আর্থিক সংকটে পড়লে তার বলি হন কনিষ্ঠতম শিক্ষক জীবনানন্দ দাশ।
চারতলা ভবনে তিনটি কলেজের কার্যক্রম চলে। সিটি কলেজ, আন্দন মোহন কলেজ ও রামমোহন কলেজ। এর মধ্যে সিটি কলেজের প্রতিষ্ঠা ১৮৮১ সালে। এ কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ শীতল প্রসাদ চট্টোপাধ্যায় জানালেন, এখানে জীবনানন্দের কোনো স্মৃতি বা তার স্মরণে কোনো ফলক কিংবা ভাস্কর্য নেই। তবে কলেজের ১২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০০৬ সালে যে স্মরণিকা প্রকাশিত হয়েছিল, তার একটি কপি আমাকে খুঁজে দেন বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তপস্যা ঘোষ, যেখানে তার ‘আত্মগত জীবনানন্দ’ নামে একটি প্রবন্ধ রয়েছে। তাছাড়া ১৯২৮ সালে যে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জীবনানন্দের চাকরিটা চলে গিয়েছিল, সেই ঘটনাবলি নিয়ে তত্কালীন পত্রপত্রিকার কিছু সংবাদও রয়েছে এ স্মরণিকায়।
১৮/২/এ বেচু চ্যাটার্জি স্ট্রিট
সিটি কলেজে অধ্যাপনা শুরুর পর জীবনানন্দ কলেজের অদূরেই হ্যারিসন সড়কে প্রেসিডেন্সি বোর্ডিংয়ে (এটি মূলত বাণিজ্যিক আবাসিক হোটেল, প্রেসিডেন্সি কলেজের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই) থাকা শুরু করেন। তবে বরিশাল থেকে ছোট ভাই অশোকানন্দ দাশ গণিতে এমএসসি পড়ার জন্য কলকাতায় এলে দুই ভাই একত্রে থাকার জন্য সিটি কলেজের পাশের গলি বেচু চ্যাটার্জি স্ট্রিটের ১৮/২/এ নম্বর বাড়ির দোতলা ভাড়া নেন। একটি থাকার ঘর, একটি রান্নাঘর। দুজন মিলেই রান্না করতেন। অশোকানন্দের পরীক্ষার বছর বরিশাল থেকে একজন কাজের লোক এসেছিলেন।
কবির ছোট বোন সুচরিতা দাশ এই বাড়ি সম্পর্কে লিখেছেন, ‘বেচু চ্যাটার্জি স্ট্রিটের একখানা ঘরে দুই ভাইয়ের দিন কাটে। একজন অধ্যাপক, আরেকজন বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএসসি ক্লাসের ছাত্র। দাদা অধ্যাপনা করে টাকা রোজগার করেই খালাস, বাকি সময় লেখায় কাটে, আর সব দায়দায়িত্ব মেজদার। মেজদার কাটে স্টোভে রান্না করায়, ছোট্ট সংসারের নানান টুকিটাকি কাজে, তার ফাঁকে ফাঁকে পড়াশুনোয়। দুই ভাইয়ের নিবিড় অন্তরঙ্গতায় দিনগুলো মধুর হয়ে ওঠে। কখনো বরিশাল থেকে মা এসে উপস্থিত হন। মার স্নেহে, সহস্থিতিতে দিনগুলো রূপক হয়ে ওঠে; ভাঙা হাটে চাঁদের আলো ঝলমল করে। কিন্তু হঠাৎ সিটি কলেজের কাজ গেল। আকস্মিক, অপ্রত্যাশিত বিপর্যয়।’
বেচু চ্যাটার্জি স্ট্রিটের দোতলা বাড়িটা এখনো আছে। নিচতলায় এনএল দাস ও রণধির কুমারের নাম লেখা দুটি দোকানের সাইনবোর্ড। দেয়ালে বাড়ির মালিকের নাম লেখা সুব্রত দাস, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। লেখাটা ঝাপসা। বাড়ির দোতলাটা বন্ধ। কেউ থাকে বলে মনে হয় না। স্থানীয়রাও এ বিষয়ে কিছু বলতে পারেননি।
বেচু চ্যাটার্জি স্ট্রিটে বসে ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯২৬ তারিখে লেখা একটি চিঠির সন্ধান পাওয়া যায়, জীবনানন্দ যে চিঠিটি লিখেছিলেন সুহূদ অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তকে। এই চিঠিতে এটা পরিষ্কার যে ১৯২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতেও জীবনানন্দ বেচু চ্যাটার্জি স্ট্রিটের এই বাড়িতে ছিলেন। কিন্তু এই বাড়িতে ঠিক কত সালে উঠেছিলেন, তা সুস্পষ্টভাবে জানা যায় না। কারণ সিটি কলেজে অধ্যাপনা শুরুর পর বিভিন্ন এলাকায় থেকেছেন।






