কবে থেকে বই কেনা শুরু ঠিক মনে নেই। তার আগে বলা উচিত বইয়ের প্রতি প্রীতির সম্পর্ক কবে থেকে, সেটা কিছুটা মনে থাকলেও ব্যাপারটা কিছুতেই ইতিবাচক নয়। যদিও জ্ঞান হওয়া অবধি থেকে বাসায় বসার ঘরে দেখে আসছি তিনটি শেলফে রাখা গাদা গাদা বই। এসব বইয়ের উৎস তিন সহোদর (বাবা ও দুই চাচা) প্রতিষ্ঠিত বইয়ের দোকান ‘নিউজফ্রন্ট’-এর সুবাদে। কী বই, কেমন বই উল্টে দেখার কোনো উৎসাহবোধ ছিল বলেও মনে পড়ে না। শুধু মনে পড়ে, অনেক ছোটবেলায় মনকে সঁপে দিয়েছিলাম সিনেমার কোলে। প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডি পেরোনার আগেই সিনেমার হলে একজন ১০-১১ বছরের ছাত্রের প্রবেশের মানে কি হতে পারে বলা বাহুল্য।
বলতে বাধা নেই, সিনেমা আমায় কখনো ভাসিয়েছে বানের জলে, কখনো হাতে তুলে দিয়েছে ফুলের মালা। মারদাঙ্গা সুড়সুড়ি মার্কা সিনেমার পাল্লায় পড়ে ফুটপাতে বিক্রি করা চটি বই পড়তে শুরু করি। চটি বইয়ের বিষয় কী ও কেমন এবং এর প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া কতটা ভয়াবহ, সেটা বুঝেছিলাম অনেক পরে। মেট্রিক পাসের পর ঘটে গেল একটা অঘটন। কলেজ সীমানায় ঢোকার দুই মাসের মাথায় বন্ধু অনীলের সুবাদে চট্টগ্রাম ভারতীয় হাইকমিশনে প্রদর্শিত ‘পথের পাঁচালী’ অকস্মাৎ ঘটিয়ে দিল মনের মধ্যে এক তুমুল আলোড়ন। চটি বই ছেড়ে কোনো ফাঁকে হাতে উঠে এল একদিন বাসার বুকশেলফে রাখা পথের পাঁচালীর কিশোর সংস্করণ ‘আম আঁটির ভেঁপু’।
শুরু হলো একটু একটু করে পাঠ-পর্ব। চট্টগ্রাম কলেজে পড়ার সময় (১৯৭৭-৭৮) ফিরোজ কবীর নামে এক সহপাঠীর হাত ধরে আমার রুশ সাহিত্যে প্রবেশ। পূর্ব মাদারবাড়ীস্থ তাদের বাসায় একদিন গিয়ে দেখি খাটের নিচে রাখা দুই ট্রাংক বই। ট্রাংকে রাখার কারণ বুকশেলফ রাখার জায়গা ছিল না তাদের বাসায়। দু-চারটি বই ছাড়া সবই ছিল রুশ সাহিত্যের গল্প-উপন্যাস। মনে আছে, ফিরোজ আমার হাতে প্রথম তুলে দিয়েছিল ম্যাক্সিম গোর্কির ‘আমার ছেলেবেলা’। গোর্কির নাম তার মুখেই প্রথম শুনি। আমার ছেলেবেলা জ্বালিয়ে দিল পথের পাঁচালী সিনেমা দেখার মতো আরেক প্রদীপ। সিনেমা ও সাহিত্য দুই বন্ধুর সুবাদে (অনীল ও ফিরোজ) আমার জীবন থেকে বিদায় হলো মারদাঙ্গা সিনেমা আর চটি বইয়ের সুড়সুড়ি।
কলেজ পেরিয়ে ভর্তি হলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে। যত না আঁকিয়ে হওয়ার ইচ্ছা, তার চেয়ে বেশি ছিল আঁকাজোকার নন্দনতত্ত্ব ও তার ইতিহাসের তত্ত্ব-তালাশের প্রতি। সেই সঙ্গে মেতে উঠেছিলাম সিনেমা নিয়েও। প্রায় ৩৮ বছর আগে অর্থাৎ ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশে চিত্রকলা ও চলচ্চিত্রবিষয়ক বই ছিল বড়ই অপ্রতুল। প্রকাশকদের ওই দুই বিষয়ে বই প্রকাশের কোনো উৎসাহবোধ ছিল না বললেই চলে। চলচ্চিত্রবিষয়ক বই বা পত্রপত্রিকা বলতে ছিল বাংলাদেশ ফ্লিম সোসাইটির মুখপত্র ‘ধ্রুপদী’, ‘চলচ্চিত্রপত্র’ আর অন্য দু-চারটি ফ্লিম সোসাইটির কিছু পত্রপত্রিকা। সুতরাং একমাত্র ভরসা কলকাতা থেকে প্রকাশিত ওই বিষয়ের বই। তার ওপর বই বা পত্রপত্রিকা যা আসত ঢাকা ছাড়া অন্য কোনো শহরে নয়। সড়ক বা রেলপথে চট্টগ্রাম থেকে সে সময় ঢাকা পৌঁছানো ছিল অনেক ঝক্কি-ঝামেলার ব্যাপার। যত কষ্টই হোক তার পরও ঢাকা যাওয়া হতো একমাত্র সেসব বইপত্রের আকর্ষণে। মনে পড়ে, ট্রেন কিংবা বাস থেকে নেমেই ছুটে যেতাম বায়তুল মোকাররমস্থ স্টেডিয়ামের দ্বিতীয় তলায় ‘ম্যারিয়েটা’ নামের একটি ছোট্ট পরিসরের দোকানে। সবেধননীলমণি সেই দোকানেই আসত শিল্পকলাবিষয়ক লিটল ম্যাগাজিন ও বইপত্র। যত না বই রাখা হতো শেলফে, তার চেয়ে বেশি রাখা হতো ফ্লোরে। হাঁটু গেঁড়ে বসে বই খোঁজার সেসব মুহূর্তের স্মৃতি জীবনেও ভোলার নয়। সেদিনের ষাটোর্ধ্বে বয়সী চেইনস্মোকার দোকানদারও ছিলেন পোশাক-আশাকে সাধারণ গোছের একজন মানুষ। কথা প্রসঙ্গে একবার চট্টগ্রামের নিউজফ্রন্টের নাম শুনে নিমিষেই বলে দিলেন, আমার বাবা ও দুই চাচার নাম। এরপর যতবারই যেতাম খাতির-যত্ন করে চা খাওয়াতেন। তাকে শেষবার দেখিছি শাহবাগের ম্যারিয়েটা বইয়ের দোকানে। এরই মধ্যে শাহবাগ হয়ে উঠেছে বই বিক্রির মূল কেন্দ্র। তিনিও স্টেডিয়ামের দোকান ছেড়ে চলে এলেন এখানে। কিন্তু বেশিদিন সচল রাখতে পারেননি দোকান। পুঁজির অভাবে এবং ‘পাঠক সমাবেশ’-এর দাপটে একদিন দোকান গুটিয়ে হারিয়ে গেল সেই মানুষটি।
শাহবাগ এলাকায় পাঠক সমাবেশ প্রতিষ্ঠার পর নানা বিষয়ের বই আসতে শুরু করে ঢাকায়। চট্টগ্রামে নিউজফ্রন্টের অবস্থা তখন প্রায় নিভু নিভু। অথচ বইপড়ুয়া চট্টগ্রামের নানা প্রবীণজনদের মুখে শুনেছি ষাটের দশকের নিউজফ্রন্টের জৌলুসপর্বের কথা। শুনেছি বিচিত্র বিষয়ের বই ও পত্রপত্রিকার মেলা ছিল যেন নিউজফ্রন্ট। এর প্রায় পড়তির মুখেই জন্ম ‘কারেন্ট বুক সেন্টার’-এর। এর সুখ্যাতি ছিল আবার আরেক দিকে। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলের লিটল ম্যাগাজিনের আখড়া ছিল কারেন্ট বুক সেন্টার। অবশ্য কলকাতা থেকে প্রকাশিত নতুন বইপত্রের আনাগোনা তেমন ছিল না বললেই চলে। সুতরাং তখনো প্রায় মুখিয়ে থাকতে হতো ঢাকার দিকে, বিশেষ করে চলচ্চিত্রবিষয়ক বই কিংবা কলকাতাস্থ বিভিন্ন ফিল্ম সোসাইটির ‘চিত্রবীক্ষণ’, ‘চিত্রভাসা’, ‘চিত্রকল্প’সহ আরো কিছু মুখপত্রের জন্য। মনে এলে হাসি পায় আবার গর্ববোধও জাগে এ ভেবে, বইয়ের সংস্পর্শে এসেছিলাম বলেই বুঝি একদিন অনেকের মতো লেখালেখির সাধ জেগেছিল মনে। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-পরিজন কেউ কলকাতা যাচ্ছে শুনলেই নির্লজ্জের মতো তাদের হাতে ধরিয়ে দিতাম পছন্দের বইয়ের তালিকা। আমৃত্যু মনে থাকবে এমন একটি ঘটনার কথা। ঘটনার নায়ক শ্রদ্ধেয় অনুপম স্যার (অনুপম সেন)। ঘটনার কাল নব্বইয়ের দশক। তিনি তখন থাকতেন তার উত্তর নালাপাড়ার বাসায়। আমি তখন ‘সত্যজিতের রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থের ডামি নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছি টাকা-পয়সার সন্ধানে। শুনেছি, অনুপম স্যার এসব কাজে অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করেন। শোনামাত্রই ঢুঁ মেরেছিলাম স্যারের বাসায়। অথচ এর আগে কোনো পরিচয় ছিল না তার সঙ্গে। মনে আছে, তার বাসার ডোরবেল টিপতে হাত কাঁপছিল। লজ্জায় নয়, ভয়ে। এত বড় একজন প্রাজ্ঞ মানুষের বাসায় না বলে আসাটা কতটা অশোভন হতে পারে, সে কথা ভেবে। কিন্তু ফল হলো পুরো উল্টো। কেন এলাম, নাম কী আমার, কোথায় বাসা কিছুই জানতে চাইলেন না। আমার হাতে ধরা ডামিটা দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বইটা কিসের?’ সাহস করে তুলে দিলাম স্যারের হাতে। স্যার পাতা উল্টে উল্টে দেখলেন অনেকক্ষণ ধরে। তারপর নিরুত্তরে চলে গেলেন ভেতরে। একটু পর ছোট একটা খাম হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এটা রাখুন’। ছোট-বড় নির্বিশেষে সবার প্রতি সেই ‘আপনি’ সম্বোধন স্যার ছাড়তে পারেননি বুঝি এখনো। কথা প্রসঙ্গে জানলাম, দুদিন পর কলকাতা যাবেন একটা বিশেষ কাজে স্যার। মনে এলে এখন লজ্জাবোধে মরি। প্রথম দিনের দেখা বা সাক্ষাতে স্যারকে তত্ক্ষণাৎ বলে বসলাম দুটি বই আনার কথা। একটি ছিল রবীন্দ্রনাথের তিন কন্যাকে নিয়ে এক লেখকের লেখা ‘তিন কন্যা’ নামের একটি বই, আরেকটি ছিল নির্মাল্য আচার্য্য সম্পাদিত শারদীয় ‘এক্ষণ’।
সপ্তাহ দুই পর স্যার আমার বাসার ল্যান্ডফোনে জানালেন, ‘পিন্টু, আপনার বই দুটি এনেছি’ শুনে যত না অবাক হয়েছিলাম, তার চেয়ে বেশি মাথা নত হয়ে এসেছিল আমার স্যারের বদান্যতা দেখে! পরদিন বই দুটি আনতে গিয়ে উপহারস্বরূপ স্যারের জন্য নিয়ে গিয়েছিলাম ‘রবীন্দ্রসাহিত্যে ব্রাত্যসমাজ’ নামের দুই বছর আগে ঢাকা থেকে কেনা একটি বই।
আজ ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। পেরিয়ে গেছে প্রায় ২১ বছর। এই ২১ বছরে কেনা আমার সংখ্যাধিক বই চলচ্চিত্রের, দ্বিতীয় স্থানে বিভিন্ন গল্পকারের গল্পসংকলন কি গল্পসমগ্র। ছাত্র ছিলাম চিত্রকলার। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি ছেড়ে আসতে না আসতেই ছোটগল্প হয়ে উঠল আমার প্রধান পঠন-পাঠন ও ভালো-লাগার বিষয়। কেনা শুরু হলো গল্পের বই। অবশ্য এ গল্পপ্রীতির পেছনে লুকিয়ে আছে চলচ্চিত্রের ইন্ধন। চট্টগ্রাম কলেজে পড়ার সময় পাঠ্যবইয়ের তালিকায় ছিল শরত্চন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের প্রথম পর্ব। উপন্যাসের ঘটনার মধ্যে আমার মূল আকর্ষণ ছিল ‘ইন্দ্রনাথ’। স্বপ্ন দেখা শুরু হলো ইন্দ্রনাথকে উপজীব্য করে ছবি নির্মাণের। শুরু হলো চিত্রনাট্য রচনা। মনে এলে হাসি পায়, সম্ভাব্য পোস্টারের লেখায় ‘ইন্দ্রনাথ’ শব্দটির ক্যালিগ্রাফিও করে রেখেছিলাম। গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল মাখা হলো বটে কিন্তু চিত্রনাট্য লেখা শেষ হলো না আজ অবধি।
প্রায় বছর ১৫ আগে এক শীতের মধ্য লগ্নে কলকাতা বেড়াতে গেলাম। কলকাতা মানে আমার কাছে কলেজস্ট্রিটস্থ বইপাড়া ও সত্যজিতের বাড়ি। এখনো তাই। নানা দোকান ঘুরে বই কেনা আর বই প্রেমিকদের লাইন ধরে বই কেনা দেখা। এর মধ্যে আমার ব্যাগ ভর্তি হয়ে গেছে। পরে বুদ্ধি করে কিনলাম একটা ঢাউস চটের থলি। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে সেটাও ভর্তি হয়ে গেল। সিংহভাগই গল্পের বই আর লিটল ম্যাগাজিন। শরীরও এল পড়ে। ভাবলাম এবার ফিরে যাওয়া যাক হোটেলে। কিন্তু কিছুতেই জোটাতে পারছি না ট্যাক্সি। দাঁড়িয়ে আছি ফুটপাতে অনেকটা সময়। এদিকে অফিস ছুটি হয়েছে। ট্রাম বা বাসে যে উঠব, সেটারও সুযোগ নেই। সিগারেট কিনতে গিয়ে দেখি ফুটপাতে একের পর এক লাগানো পুরনো বইয়ের দোকান। এসব দোকান নিয়ে বিশিষ্ট কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, শিল্পী ও চলচ্চিত্রকার পূর্ণেন্দু পত্রীর একটা লেখা পড়েছিলাম ‘আরেক বইমেলা’ নামে। মনে পড়ে গেল লেখাটির কথা। এখানে নাকি পাওয়া যায় অনেক মূল্যবান ও দুষ্প্রাপ্য বই অনেক কম দামে। ব্যস, বেড়ে গেল আমার ব্যস্ততা। নিমিষে হারিয়ে গেল শরীরের ক্লান্তি। ব্যাগ আর চটের থলি একটি দোকানে রেখে শুরু হলো দুষ্প্রাপ্য বইয়ের অনুসন্ধান। সত্যি, পূর্ণেন্দু বাবু মিথ্যে বলেননি। পর পর হাতে উঠে এল কত নামিদামি বই, কোনটা ছেড়ে কোনটা নেব, তার ওপর বইভর্তি একটি ব্যাগ ও চটের থলে। তার পরও নিতে হলো দুটি বই, না নিয়ে উপায় ছিল না। তার একটি হলো ছবিসহ ‘বুলবুলি পাখির লড়াই’, আরেকটি হলো ‘শরত্চন্দ্রের ইন্দ্রনাথ’। এদ্দিন জানতাম ‘মোরগে-মোরগে লড়াই’য়ের কথা, কিন্তু একদা বাঙালি সমাজ যে বুলবুলি পাখির লড়াই আনন্দেও যে মেতেছিল, তা জানা ছিল না। কিন্তু বিস্ময়ে দ্বিগুণ হতবাক হলাম শরত্চন্দ্রের ইন্দ্রনাথ হাতে নিয়ে। খুব বেশি বড় না হলেও মলাটশূন্য বইটির প্রথম পাতা পড়ে এই প্রথম জানলাম ‘ইন্দ্রনাথ’ শরত্বাবুর কোনো কাল্পনিক চরিত্র নয়, যাকে নিয়ে শরত্চন্দ্র ইন্দ্রনাথ রচনা করেছেন তিনি এবং তার মা-বাবা, ভাইবোনসহ পুরো পরিচয় ছবিসহ তুলে ধরেছেন বইটির লেখক। অনেক পরে বুলবুলি পাখির লড়াই বইটি উপহার দিয়েছিলাম বাংলাদেশের বিশিষ্ট পক্ষী বিশারদ ইনাম (ইনাম আল হক) ভাইকে। আর শরত্চন্দ্রের ইন্দ্রনাথ বইটি যক্ষের ধনের মতো আগলে রেখেছি নিজের কাছে। দুঃখের বিষয় এমন একটি প্রয়োজনীয় বই কে লিখেছেন, মলাট ছিল না বলে তার নামটি জানা হলো না আজও।
বই প্রসঙ্গে ম্যাক্সিম গোর্কির একটি কথা এ মুহূর্তে বারবার মনে পড়ছে। কথাটি অনেকটা এ রকম: জীবন নিতান্তই একঘেয়ে, দুঃখ-কষ্টে ভরা, কিন্তু মানুষ বই পড়তে বসলেই সেসব ভুলে যায়। কথাটা যে মিথ্যে নয়, চরম সত্য, জীবনে বহুবার প্রমাণ পেয়েছি সে কথার। খুব যে বেশি পড়েছি, তাও নয়। আবার যতটা পড়েছি, সেই স্বল্প পঠন-পাঠন থেকে আমার যা অর্জন ঘটেছে, জীবনে সেটাও বা কম কি?
আজ বয়স ষাটের ঘরে। যার অর্ধেক কেটে গেছে পত্রিকার অফিসে চাকরিসূত্রে। সেই ৩০ বছরে সিংহভাগ কেনা বইয়ের চেহারাই শুধু দেখে গেছি, দেখা হয়নি এর শরীর। কিনেছি আর পড়ার ঘরকে করে তুলেছি বইয়ের গোডাউন। পত্রিকার চাকরি এমনই এক চাকরি, পুরো ২৪ ঘণ্টা যার উদ্বেগে ভরা। আবার এই উদ্বেগের ভেতরে থেকেও অনেকে পড়েছেন, লিখেছেন প্রতি মাসে বইয়ের পর বই। সেই এলেম আমার নেই। অগত্যা চাকরি ছাড়লাম দুই মাস আগে—আর কিছুর জন্য নয়, শুধু ৩০ বছর ধরে কেনা অপঠিত সেসব বই পড়ব বলে।
বইয়ের জন্য একসময় হা-পিত্যেশ ছিল। পছন্দের বই পাওয়া ছিল অনেক কষ্টের। সেই কষ্ট এখন নেই, কারণ হাতের কাছেই গড়ে উঠেছে এক আরশী নগর। তথা ‘বাতিঘর’ নামের একটি বড় গ্রন্থালয়। কিনি বা না কিনি প্রায় প্রতিদিনই যাওয়া হয় সেই বাতিঘরে।
ছাত্রজীবনে যখন পকেটে টাকা ছিল না তার পরও কেনা হতো বই। এখন টাকা হয়েছে কিন্তু মাঝে মাঝে ভাবি, পড়ার ঘর যে বইয়ে ঠাসা, ঢুকতে গেলে সাবধানে ঢুকতে হয়, কখন না ভেঙে পড়ে যায় আবার ফ্লোরে রাখা বইয়ের পিলার! অনেকবার পণ করেছি আর নয় বই কেনা, মন বলে, ‘যা আছে পারবে কি পড়ে শেষ করতে এত বই বেঁচে থাকতে?’ সত্যি পারব না। পারা সম্ভব নয়। তবুও কিনি, তবুও ফিরে যাই বারে বারে বইয়ের কাছে। বই যেন আমায় ডেকে বলে ‘আয় আয় পিন্টু, কিনিস বা না কিনিস, অন্তত দেখে যা একটিবার আমায়’।






