ও’শনেসির সবচেয়ে বড় অবদান ছিল গাঁজাকে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করার সম্ভাবনার দাবি করা। তিনি চিকিৎসায় বিশেষত অবেদনিক কাজে গাঁজার ব্যবহারের সম্ভাবনা দেখেছিলেন। গাঁজা নিয়ে করা ও’শনেসির এসব নিরীক্ষা আধুনিক সময়ের ঔষধিবিজ্ঞানে প্রথম। নিজের গবেষণা থেকে রোগীদের দেহে এর প্রয়োগের নতুন কিছু পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। গাঁজা গাছ নিয়ে ও’শনেসির গবেষণা ১৮৩৯ সালে জার্নাল অব এশিয়াটিক সোসাইটিতে প্রকাশিত হয়

১৮৩৩ সাল। ২৪ বছর বয়সী এক এডিনবরা গ্র্যাজুয়েট ঔপনিবেশিক ভারতে পৌঁছলেন, তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সহকারী সার্জন। তিনি লন্ডন কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জন থেকে লাইসেন্স পেতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তবে ততদিনে তিনি চিকিৎসাশাস্ত্রের একজন তরুণ অনুসন্ধিত্সু গবেষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছেন।  ইউরোপে কলেরার প্রকোপ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তিনি উইলিয়াম ব্রুক ও’শনেসি, একজন আইরিশ চিকিৎসক। তিনি জন্মেছিলেন ১৮০৯ সালের অক্টোবরে।

ও’শনেসি ভারতে অবস্থানকালে কয়েক বছর নিবিড়ভাবে গবেষণায় মগ্ন ছিলেন। তার গবেষণার ক্ষেত্র ছিল বিদ্যুৎ, টেলিগ্রাফি এবং অতি অবশ্যই ওষুধ।

ব্রিটিশদের চৌহদ্দিতে বহুবিদ্যাবিশারদের অভাব ছিল না। কিন্তু তার মধ্যে ও’শনেসি ছিলেন একটু ভিন্ন। গবেষণার সময় তিনি যে কেবল স্থানীয় জ্ঞান নেটওয়ার্ক ও কাঠামো ব্যবহার করেছেন তা-ই নয়, বরং সেগুলোকে লিপিবদ্ধও করেছেন যথাযথ স্বীকৃতি দিয়ে।

ও’শনেসির সবচেয়ে বড় অবদান ছিল গাঁজাকে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করার সম্ভাবনার দাবি করা। তিনি লক্ষ করেছিলেন, ভারতে নেশাদ্রব্য হিসেবে গাঁজা বহুল ব্যবহূত। তিনি চিকিৎসায় বিশেষত অবেদনিক কাজে গাঁজার ব্যবহারের সম্ভাবনা দেখেছিলেন। গাঁজা নিয়ে করা ও’শনেসির এসব নিরীক্ষা আধুনিক সময়ের ঔষধিবিজ্ঞানে প্রথম। তিনি গাঁজার ভারতীয় স্থানীয় ব্যবহারকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন এবং তিনি নিজের গবেষণা থেকে রোগীদের দেহে এর প্রয়োগের নতুন কিছু পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন।&dquote;&dquote;

গাঁজা গাছ নিয়ে ও’শনেসির গবেষণা ১৮৩৯ সালে জার্নাল অব এশিয়াটিক সোসাইটিতে প্রকাশিত হয়। সে বছর অক্টোবরে এ গবেষণাপত্র মেডিকেল অ্যান্ড ফিজিক্যাল সোসাইটি অব কলকাতার সামনে পড়াও হয়। এ লেখায় আমরা তার পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিশদ এবং তার গবেষণার অভিনব স্টাইল দেখতে পাই। তিনি প্রাণীর শরীরে গাঁজার প্রভাব পরীক্ষা করতে প্রথমে ব্যবহার করেছিলেন একদল প্রাণীকে—মাছ, শকুন, সারস এবং আরো কিছু প্রাণী। তারপর তিনি কয়েকটি মানবশিশুর ওপরও পরীক্ষা চালান, নিশ্চয়ই আজকের দিন হলে এ পরীক্ষা ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিত। প্রাণী থেকে মানবশিশু সবাইকেই বিভিন্ন মাত্রায় গাঁজা (Cannabis indica) সেবন করানো হয়েছিল। তিনি প্রথম পরীক্ষাটি করেছিলেন একটি কুকুরের ওপর। ও’শনেসি তার নোটে এর প্রভাব নিয়ে লিখেছেন: আধা ঘণ্টার মধ্যে সে বোকা হয়ে ঘুমে ঢুলুঢুলু করতে লাগল, একটু পরপর ঝিমোতে লাগল। কিছুক্ষণ পর এমনভাবে লেজ নাড়াতে লাগল যেন কোনো কিছুতে সে খুব সন্তুষ্ট, ক্ষুধার্তের মতো খাবার খেল, তার চেহারা দেখে মনে হলো যে সে মাতাল।’

ও’শনেসি এরপর বিভিন্ন রোগের ক্ষেত্রেও গাঁজার প্রভাব পরীক্ষা করেন। তিনি চার রোগের রোগীর ওপর গাঁজার প্রভাব ব্যাখ্যা করেন—বাতের ব্যথা, হাইড্রোফোবিয়া, কলেরা ও ধনুষ্টংকারে আক্রান্ত রোগী। বাতের রোগীর ওপর গাঁজা প্রয়োগ করার পর সে মুখর হয়ে ওঠে, গান গায়, গল্প বলে এবং রাতে দুজনের খাবার একাই খেয়ে ফেলে। তারপর নিবিড়ভাবে ঘুমিয়ে গিয়ে পরদিন সকালে ওঠে। পরের দিন রোগী নিজেই নতুন ওষুধ (গাঁজা) খেতে চায়। ও’শনেসি আরেক বাতের রোগীর ওপর এক রকম সুররিয়াল অভিজ্ঞতার বিবরণ দিয়েছেন। গাঁজার প্রভাবে এক বাতের রোগী প্রায় অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। মেডিকেল স্টাফরা তার বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেমন ইচ্ছা নাড়াতে পারছিলেন, অঙ্গগুলো স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে ভিন্নভাবে রাখলেও সেগুলো সেভাবেই থাকছিল এবং পুরো সময়টা সেই রোগী প্রায় চেতনাহীন অবস্থায় ছিল। এসব গোলমালপূর্ণ অবস্থার পর এক বা দুদিনের মধ্যে দুই রোগীই তাদের বাতের ব্যথা থেকে বেশ সুস্থ হয়ে ওঠে এবং তিনদিনের মধ্যে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যায়।&dquote;&dquote;

হাইড্রোফোবিয়ার চিকিৎসায় অবশ্য ও’শনেসির পরীক্ষা ব্যর্থ হয়েছিল। তবে এ চিকিৎসার সময়ই তিনি গাঁজার ঔষধি গুণের পক্ষে একটি মৌলিক যুক্তি উল্লেখ করেন, গাঁজা যদি রোগের মূল সারাতে ব্যর্থও হয়, তাহলেও এটা অন্তত একটা উপকার করে—রোগের ভয়াবহতাকে হালকা করে দেয়। আর রোগ যদি শেষ পর্যায়ে থাকে, তাহলে অন্তত চিকিৎসকরা রোগীর শেষ যাত্রাটা সুখকর করে দিতে পারেন। ও’শনেসি অবশ্য গাঁজার নেতিবাচক বিষয়গুলো উল্লেখ করেননি।

ও’শনেসির ছাত্রদের মধ্যেও গাঁজার ব্যবহার নিয়ে আগ্রহ বেড়ে গিয়েছিল। তাদের অনেকেই মানবশরীরের গাঁজার প্রভাব বুঝতে নিজেরাই গাঁজা সেবন শুরু করে। এ রকম এক ছাত্রের অভিজ্ঞতাকে ও’শনেসি নিজেই লিপিবদ্ধ করে রেখে গেছেন। গাজা সেবনের ২০ মিনিট পর ‘সে নিজেকে রাজা ভাবতে শুরু করে এবং আশপাশের মানুষকে তার সভাসদ ভেবে বিভিন্ন নির্দেশ দিতে থাকে। সে তার সহপাঠী এবং পরিচিত কাউকেই চিনতে পারছিল না। তার অবস্থার মতো তার মনও তখন পাল্টে গেছে। সে এমনভাবে কথা বলছিল যেন মনে হচ্ছে বহু বহু বছর ধরে এখানে পড়াশোনা করছে। সে এমন তীব্র আবেগ নিয়ে তার শিক্ষক ও সহপাঠীদের কথা বর্ণনা করতে লাগল যে কোনো দক্ষ নাট্যকারও তাতে লজ্জা পেয়ে যাবেন। সে তার জীবনের কাল্পনিক অনেক বছরের বিবরণ দিতে লাগল, আরো বলল তার কাল্পনিক ভ্রমণ, ধন-সম্পদ অর্জনের গল্প। সে এরপর প্রবেশ করল ধর্মীয়, বৈজ্ঞানিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে—বিস্ময়কর পাণ্ডিত্যে সে অনর্গল বলে যেতে লাগল। প্রকাশিত হলো তার জ্ঞান ও পাঠের পরিধি, উপস্থিত রসবোধ। তাকে অনেক বছর ধরেই যারা চেনে, তারাও এসবের জন্য প্রস্তুত ছিল না। এভাবে ৩ ঘণ্টা সে অন্য একটি চরিত্রে পরিণত হয়েছিল। এটা কল্পনার চেয়েও অদ্ভুত এক পরিস্থিতি। যেমন যত দ্রুত তার এ পরিবর্তন দেখা দিয়েছিল তত দ্রুতই আবার সেটা চলে যায় এবং কোনো ধরনের মাথাব্যথা, অসুস্থতা কিংবা অন্য কোনো অস্বস্তিকর লক্ষণ দেখা যায়নি।’&dquote;&dquote;

ইতিহাসবিদ শ্রীময় রায় চৌধুরী মনে করেন, অস্ত্রোপচারে ব্যথা হ্রাস করাই ভারতে ব্রিটিশ ওষুধকে গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছিল এবং এক্ষেত্রে গাঁজার একটি বড় ভূমিকা ছিল। ভেটেরিনারি বিজ্ঞানেও গাঁজার ব্যবহার করা হয়েছিল। এক্ষেত্রে বিখ্যাত একটি পরীক্ষা করেছিলেন হিউজেস ও টেম্পলার। তারা দাবি করেন, ধনুষ্টংকারে আক্রান্ত প্রতি পাঁচটি ঘোড়ার তিনটি গাঁজার রেজিন ব্যবহারে সুস্থ হয়ে উঠেছিল। 

ও’শনেসি তার Extract from a Memoir on the Preparations of the Indian Hemp, or Gunjah, (Cannabis Indica) their effects on the Animal system in Health, and their utility in the Treatment of Tetanus and other Convulsive Diseases প্রবন্ধে পরীক্ষার বিশদ বর্ণনা করার আগে গাঁজার বোটানিক্যাল বৈশিষ্ট্য, জনপ্রিয় ব্যবহার, ঐতিহাসিক বিবরণ এবং ঔষধি উপাদান সম্পর্কে ধারণা দিয়েছেন। এ প্রবন্ধে ও’শনেসি বিচিত্র ও বিস্তৃত উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছেন।

ঐতিহাসিক বিবরণী ও পরিসংখ্যানের তথ্যের জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন সৈয়দ কেরামত আলী, হুগলি ইমামবাড়ার মোতোয়ালি, তেহরানের হাকিম মির্জা আবদুল রেজা, পণ্ডিত মধুসূদন গুপ্ত বিদ্যালংকার এবং মি. ডা কস্তার কাছে।

গ্রেট গেম চলাকালে কান্দাহারে আর্থার কনোলির অধীন ‘নিউজরাইটার’ হিসেবে কাজ করা সৈয়দ কেরামত আলী ও’শনেসিকে ফার্সি রেফারেন্স ও কিছু পাণ্ডুলিপি দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। ডা কস্তা ছিলেন সম্ভবত লুইস ডা কস্তা। তিনি ১৮৪০-এর দশকে ভারত সরকারের নিয়োগকৃত ফার্সি অনুবাদক ছিলেন।&dquote;&dquote;

পণ্ডিত মধুসূদন গুপ্ত বিদ্যালংকারের সঙ্গে ওষুধের কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি ও’শনেসিকে গাঁজার ব্যবহার সম্পর্কিত কিছু দুর্লভ সংস্কৃত পাণ্ডুলিপির সন্ধান দেন। এর মধ্যে ছিল মনুস্মৃতিতে ব্রাহ্মণদের জন্য গাঁজার ব্যবহার নিষেধ করার আদেশ। গাঁজা সেবন সম্পর্কে ধারণা পেতে ও’শনেসি পুলিশের ডেপুটি সুপারিনডেন্ট মি. ম্যাকক্যানেরও সহায়তা নেন।

ও’শনেসি তার প্রবন্ধের উদ্দেশ্য সম্পর্কে লিখেছেন, ‘এ প্রবন্ধে আমি এই শক্তিশালী ও মূল্যবান উপাদান বিষয়ে (গাঁজা) প্রাচীন ইতিহাসে থাকা মূল্যায়ন, এর জনপ্রিয় ব্যবহার এবং ওষুধশাস্ত্রে ব্যবহার উপস্থাপন করেছি। বিভিন্ন পশুর ওপর পরীক্ষা করে আমি শরীরের ওপর এর প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছি। এরপর আমি হাইড্রোফোবিয়া, ধনুষ্টংকার ও খিঁচুনির সমস্যায় আক্রান্তদের ওপর গাঁজার বিভিন্ন মিশ্রণ/ওষুধ ব্যবহার করে ফল পেয়েছি এবং সেগুলোর ক্লিনিক্যাল বিবরণ উল্লেখ করেছি।’

ও’শনেসি বাংলায় গাঁজার ব্যবহারের বেশ গভীর ও তথ্যবহুল বিবরণী দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, বাংলায় গাঁজা মূলত ধূমপানের মাধ্যমেই সেবন করা হতো।&dquote;&dquote;

পুলিশের ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট মি. ম্যাকক্যানের দেয়া তথ্যমতে, সে আমলে বাংলায় ব্যবহূত গাঁজার বেশির ভাগ আসত মির্জাপুর ও গাজীপুর থেকে। ও’শনেসি লিখেছেন, ‘আমার জানামতে, যশোরে খুব ভালো মানের গাঁজা উৎপাদন হয় এবং ব্যাপকভাবে এর চাষ হয়।’ তিনি দেখেছেন, তরলের সঙ্গে মিশিয়ে বাংলায় গাঁজা সিদ্ধি, ভাং নামে ব্যবহার হয়। মাজুন নামে একটি পানীয় ভারতের সব শ্রেণীর মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় ছিল। এটি ছিল চিনি, মাখন, ময়দা, দুধ ও সিদ্ধি বা ভাংয়ের মিশ্রণ। নীচু শ্রেণীর পর্তুগিজ বা কালা ফিরিঙ্গি, বিশেষত নারীরা এ পানীয় পান করতেন।

মিসরের তাকিম উদ্দিন মাকরিজির লেখায় পাওয়া যায়, সবচেয়ে পুরনো যে রচনায় গাঁজার উল্লেখ পাওয়া যায়, তার রচয়িতা হাসান। ৬৫৮ হিজরিতে শেখ জাফর শিরাজি তার ওস্তাদের কাছে প্রথম গাঁজা আবিষ্কারের কাহিনী শুনেছিলেন। জাফর শিরাজি ছিলেন সাধু-ফকির মানুষ, তিনি ছিলেন হায়দার নামে একটি তরিকার সদস্য। এ তরিকার প্রধান ছিলেন হায়দার। তিনিও ছিলেন সাধু প্রকৃতির। তিনি নিশাবোর ও রামাহ পর্বতের মাঝে একাকী বসবাস করতেন এবং সেখানে ফকিরদের একটি আস্তানা গড়ে তোলেন। ১০ বছর তিনি এভাবে বসবাস করেন। এক মুহূর্তের জন্যও তিনি এ স্থান ত্যাগ করেননি। তারপর এক প্রচণ্ড গ্রীষ্মের দিনে তিনি একা একা এক মাঠে বেরিয়ে পড়লেন। তিনি যখন ফিরে আসেন, তখন তার মুখে প্রশান্তি আর আনন্দের ছাপ। তার অনুসারীরা তাকে ঘিরে আলোচনা শুরু করেন। তাদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একটি গাছ দেখে তিনি অবাক হয়েছেন, তার মনে হয়েছে গরমের মধ্যে গাছটি এমনভাবে নাচছে যেন সে খুব আনন্দিত। অথচ আশপাশের অন্য সব গাছ তখন নিরানন্দ, চুপচাপ। তিনি তখন সেই নৃত্যরত গাছের পাতা চিবিয়ে খান। হায়দার এবার তার অনুসারীদের সেখানে নিয়ে যান এবং তারা সবাই সেই গাছের পাতা খান। এবার তারাও তাদের ওস্তাদের মতো খুশি, উত্তেজিত। মনে হয় শেখ হায়দারের প্রিয় ছিল তরলে গাঁজার পাতার সামান্য অংশ মিশিয়ে পান করা। একজন আরব কবি হায়দারের পান্না রঙের কাপের প্রশস্তিমূলক গান গেয়েছেন। এ থেকে বোঝা যায় গাঁজার পাতার সেই পানীয় সবুজ রঙের হতো। গাঁজা আবিষ্কারের পর শেখ হায়দার আরো ১০ বছর বেঁচে ছিলেন। এ সময় তিনি প্রচুর পরিমাণে গাঁজার পাতা খেতেন। মৃত্যুর পর অনুসারীরা তাদের ওস্তাদের ইচ্ছা অনুসারে তার কবরের পাশে গাঁজা গাছ রোপণ করেন।

শেখ হায়দারের মৃত্যুর পর তার কবরে গাঁজা গাছ রোপণের ঘটনা এবং নিশ্চিতভাবে তার অনুসারীদের মাধ্যমে গাঁজার জ্ঞান খোরাসান অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। ও’শনেসির মতে, ইরাকে গাঁজার ব্যবহার ৭২৮ হিজরি পর্যন্ত অজানা ছিল। বাহরাইনের খলিফা মোস্তানজির বিল্লাহর শাসনামলে গাঁজার ব্যবহার ইরাক, সিরিয়া, মিসর ও তুরস্কে ছড়িয়ে পড়ে। ‘তবে মনে হয় খোরাসানে গাঁজার ব্যবহার প্রচলিত ছিল হায়দারের আমলের আগেই। বিরাসলান নামে এক ভারতীয় তীর্থযাত্রী পঞ্চম শতকে খোরাসান ও ইয়েমেনে গাঁজার ব্যবহারের পরিচিতি ঘটিয়েছিলেন। &dquote;&dquote;

৭৮০ হিজরিতে মিসরে গাঁজার ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। গাঁজার ক্ষেত ধ্বংস করা হয় এবং সেবনকারীদের শাস্তির ব্যবস্থা হয়। ৭৯৯ হিজরিতে এর ব্যবহার আবার শুরু হয়।

ও’শনেসি তার প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ফার্সি, আরবি রচনা ও আধুনিক ইউরোপীয় লেখকদের লেখায় গাঁজার ঔষধি গুণের কথা জানা যায়। ও’শনেসি মাকজান-উল-উদেয়িহতে গাঁজার বিভিন্ন ধরনের ঔষধি গুণের বিবরণীর প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এ পাণ্ডুলিপিতে আছে যে গাঁজার পাতার রস দিয়ে মাথা ধৌত করলে উকুনসহ অন্য যেকোনো ধরেনের পোকার সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। আবার এ পাতা থেকে তৈরি গুঁড়োর বাহ্যিক ব্যবহার আছে, যেমন ঘা বা ক্ষততে গুঁড়ো ব্যবহার করলে সুফল পাওয়া যায়। মির্জা আবদুল রেজা গাঁজার ঔষধি গুণ সম্পর্কে কৌতূহলোদ্দীপক বিবরণী দিয়েছেন—এটা ক্ষুধা বাড়িয়ে দেয় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য তৈরি করে। বুনো কল্পনাকে উসকে দেয়। গাঁজার প্রভাব যতক্ষণ থাকে, সে সময়ের স্মৃতি মানুষ ভুলে যায়। জার্মান উদ্ভিদবিদ রামফিয়াস ১৬৯৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত তার Herbarium Amboinense গ্রন্থে গাঁজার ঔষধি ব্যবহার সম্পর্কে বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। তিনি পুরুষ ও স্ত্রী গাঁজা গাছের বোটানিক্যাল বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন এবং সেগুলোর জন্য দুটি চমত্কার অলংকরণও এঁকেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, ভারতের উত্তরাংশে গাঁজার জন্মস্থান। এছাড়া জাভা ও ইন্দোনেশিয়ায় গাঁজার চাষ হয়।

দ্য জার্নাল অব দি এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল ও’শনেসির আরো দুটি পরীক্ষার বিবরণ প্রকাশ করে। ১৮৩৯ সালে তিনি তার গ্যালভানিক ব্যাটারির ব্যবহার নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। তার পরের কাজটি ছিল ট্রেলিগ্রাফ নিয়ে। খেয়াল করার বিষয়, যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে টেলিগ্রাফের উপযোগিতা সামনে আসে ১৮৪৭ সালের পর, গভর্নর জেনারেল হিসেবে লর্ড ডালহৌসির নিয়োগের পর। অর্থাৎ ক্ষমতা কাঠামোর জন্য ব্যবহার হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে ও’শনেসি তার গবেষণা চালাননি।

শিবপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেনে ও’শনেসি প্রথম টেলিগ্রাফ সার্কিট নিয়ে পরীক্ষা চালান। এ ঘটনা ইংল্যান্ডে গিয়ে তার মোর্স শেখার আগেকার। তিনি টেলিগ্রাফে বার্তা পাঠাতে সমর্থ হন। প্রতিটি সিগনাল যেতে সময় লাগত ৩ মিনিট। ভারতে ইংরেজ শক্তির জন্য টেলিগ্রাফটা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আর ও’শনেসি সচেতন কিংবা অবচেতনভাবে সে প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে উঠেছিলেন। ১৮৫৬ সালে টেলিগ্রাফ নিয়ে তার অবদানের জন্য তাকে নাইটহুড প্রদান করা হয়।

ঔপনিবেশিক সময়ের জ্ঞানচর্চায় ঔপনিবেশিক শক্তি ও স্থানীয়দের মধ্যে আদান-প্রদানের বাইনারি মডেলকে যদি উপেক্ষা করতে পারি, তাহলে দেখা যাবে জ্ঞান উৎপাদনের নেটওয়ার্কটি অনেক বেশি জটিল। ও’শনেসি তার প্রবন্ধের সব উৎস বিশদভাবে উল্লেখ করেছেন। সেখানে মনোযোগ দিয়ে দেখলে আমরা দেখি অনেকগুলো জটিল ঢেউ ক্রিয়াশীল। তাই শুধু ও’শনেসির কাজ নয়, বরং তার কাজ করার পদ্ধতিও সমাজতাত্ত্বিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৮৮৯ সালের ৮ জানুয়ারি ইংল্যান্ডে ও’শনেসি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।