অনুবাদ: শওকত হোসেন

ইরানে পোষা প্রাণী হিসেবে নিষিদ্ধ কুকুরই জাফর পানাহির ক্লোজড কার্টেইন ছবির সূচনার ধারণা জুগিয়েছিল। জনৈক চিত্রনাট্যকারের (কাম্বোজিয়া প্যাত্রোভি, সহপ্রযোজকও বটে) সাগরতীরের বাড়িতে বন্ধুদের চালান করা একটা কুকুর রয়েছে। ওটা ভেতরে নেয়ামাত্রই তিনতলা বাড়ির সবগুলো জানালায় পর্দা টেনে দিচ্ছেন তিনি। জাফর পানাহির ক্লোজড কার্টেইনের সূচনা ছবিটির প্রযোজনার প্রয়োজনীয় পরিবেশকে গল্পে পরিণত করছে: গোপনীয়তা বজায় রেখে কাজ করতে গিয়ে পরিচালক শুটিংয়ের জন্য পর্দা টেনে দিতে বাধ্য হচ্ছেন, যেন যতদূর সম্ভব ভেতরের ঘটনা কেউ না দেখে। ৎসাই মিঙ-লিয়াংয়ের ফেস ও উরসুলা মেইয়ারের হোমের সাম্প্রতিক দৃশ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়—দুটো ছবির পাত্রপাত্রীরা অনুমানযোগ্যভাবে হুমকি দানকারী পৃথিবীকে রুদ্ধ করে দিতেই জানালা অন্ধকার করতে পদ্ধতিগতভাবে টেপ ব্যবহার করেছে। এখানে স্বআরোপিত বিচ্ছিন্নতার ভিন্ন ধরনের উদ্দেশ্য আছে: ইনডোর থিয়েটারের বিকাশের স্বার্থেই বাইরের দুনিয়াকে বাইরে রাখতেই অনীহার সাথে পর্দা টানতে হয় এবং দর্শকরা (ক্যামেরাসহ, পোর্চের চেয়ে বেশি দূরে যেতে পারে না এটা) কুশীলবদের সঙ্গে থিয়েটারে বন্দি হয়ে যায়।

পানাহির প্রযোজনার সঙ্গে অশুদ্ধ সমান্তরাল হিসেবে পুলিশের নজর থেকে কুকুরের উপস্থিতি আড়াল করার চেষ্টা চালাচ্ছেন চিত্রনাট্যকার। জানোয়ারটা (ওটার নাম ‘বয়’) বসে টিভি দেখছে। পুলিশি হামলায় মরতে বসা রক্তাক্ত কুকুরের ছবি দেখিয়ে যাচ্ছে ওটা। কী দেখছে তা কি ‘বয়’ বুঝতে পারছে কিংবা নিজের অস্তিত্বের প্রতি আরো বড় হুমকি টের পাচ্ছে? মানুষ তার ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপিত হওয়ার ব্যাপারটা বুঝতে পারে, কিন্তু কুকুর নিরীহভাবে নিস্পৃহ থাকে: এই প্রেক্ষাপটে সচেতনতা এক ধরনের অভিশাপ। পুলিশের হাত থেকে আশ্রয়সন্ধানী ভাইবোন মেলিকা (মারায়াম মোকাদাম) ও রেজার (হাদি সায়িদি) অপ্রত্যাশিত আগমনে এরই মধ্যে টানটান হয়ে ওঠা চিত্রনাট্যকারের মানসিক ভারসাম্য আরো টলে ওঠে। রেজা বিদায় নিলেও চিত্রনাট্যকারের বিরক্তি সৃষ্টি করে বোনটি থেকে যায়। ‘কোনো ধরনের ঝামেলা’ না চাওয়ার কথাই বলেন তিনি। মেলিকা আবার ভিন্ন ধরনের বন্দির জোরালো স্মারকমাত্র: ইরানি নারী, যাদের কর্মকাণ্ড, আচরণ এবং প্রকাশ্য ও ব্যক্তিগত উপস্থিতি ভীষণভাবে সরকার নিয়ন্ত্রিত। পানাহির দ্য সার্কল ও অফসাইডের বিষয়বস্তু এটাই। (চিত্রনাট্যকার ছবির শেষ নাগাদ বিদায় নিতে উদ্যত হন, কিন্তু মেয়েটি ভেতরে তালাবদ্ধই থাকে; যথেষ্ট বলা হয়েছে।)&dquote;&dquote;

স্বয়ং পানাহি আরো পরে আবির্ভূত হচ্ছেন, যদিও চিত্রনাট্যকারের সঙ্গে তার সম্পর্ক স্পষ্ট নয়: শেষজন কি প্রথমজনের কল্পনার সৃষ্টি কিছু? কে ছায়া আর কে কায়া? ক্লোজড কার্টেইন ক্রমাগত এসব সম্পর্ক ও দ্ব্যর্থবোধকতাকে উদ্বিগ্ন করে নতুন করে সাজাচ্ছে।

সমস্ত হতাশা সত্ত্বেও ক্লোজড কার্টেইন এখনো গৃহবন্দি এবং ছবি নির্মাণের নিষেধাজ্ঞার অধীনে থাকা বিশ্বের অন্যতম মহান চিত্রপরিচালকের একটি নতুন ছবি। দ্য সার্কল ও ক্রিমসন গোল্ডের মতো সামান্য পরিবর্তনসহ একই দৃশ্য দিয়ে শুরু ও শেষ হওয়া এ ছবির সামগ্রিক কাঠামো ধরতে গেলে প্যালিন্ড্রমের মতো জটিল। একসময় পানাহি নগরমুখী ছিলেন, ডার্টি হ্যারিতে সান ফ্রান্সিসকোর জন্য ডন সেগাল যা করেছেন, তিনিও তেহরানের পথঘাটের জন্য তা-ই করেছেন: কাছ বা দূর থেকে শুটিং, মেট্রোপলিটন ব্যস্ততায় মিশে যাওয়া, অপ্রীতিকর বিষয়বস্তুর পাল্টা ভারসাম্য আনতে সজীব ও আকর্ষণীয় ইমেজ তৈরি। এখন ভেতরে আটকা পড়ে গেছেন তিনি এবং ছবিতে দম বন্ধ পরিবেশ ও সুযোগের অভাব ক্রমবর্ধমান স্নায়ুচাপ স্পষ্ট বোঝা যায়। তার একটি পুরনো ছবিসহ সিনেমার পোস্টারের একটা গ্যালারি পর্দার নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছে: ওগুলো টেনে নামানোর সময় বড় বড় ইরানি হরফ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দেশে এটাই প্রথমবারের মতো পানাহির ছবি নিষিদ্ধ হয়নি; বিদেশে যা দেখা সহজতর।&dquote;&dquote;

অহিংস থেকে শিল্পকর্মের দিকে মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করেছি আমি, যাতে ঘিরে রাখা পরিস্থিতি থেকে একে বিচ্ছিন্ন করা যায়, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি। পানাহি তার চলমান ডিজিটাল অনুশীলন পছন্দ করেন কিনা সে সম্পর্কিত প্রশ্ন জীবন সম্পর্কে তার বোধগম্য হতাশার দিকেই ঠেলে দিয়েছে। গৃহবন্দি থাকা অবস্থায় পানাহির একটি অবৈধ ছবির পক্ষে প্রচলিত কেতায় প্রচারের কাজই এক ধরনের অসম্ভব ঘটনা। পানাহি কেমন আছেন, সে সম্পর্কে দীর্ঘ হালনাগাদ তথ্যের অংশ হিসেবে তার সাক্ষাত্কারগুলো পড়া দরকার।

প্রশ্ন: আপনার নতুন ছবি নিয়ে কথা বলার আগে দিস ইজ নট আ ফিল্মে দেখা ডিভিডি সংগ্রহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে চাই। ওগুলোর ভেতর অনেকগুলো নতুন হলিউডি ছবিও আছে। আপনি এসব ছবি খুঁজে নেবেন বলে আমি আশা করিনি। ওগুলো কি আপনার কাছে পাঠানো হয়েছে?

পানাহি: ওগুলোর বেশির ভাগই এসব বেআইনি ডিভিডি বিলি করা যাদের কাজ, তাদের মারফত এ দেশে চোরা পথে এনে বিভিন্নজনের বাড়িতে জোগান দেয়া হয়েছে। অনেক সময় ওরা আমারই ছবি নিয়ে আসে, যেন আমি ওদের কাছ থেকে কপি কিনি। আমার এও বলা দরকার যে হলিউডের প্রতিটি প্রধান ছবিই লোকজন ডাউনলোড করে।

প্রশ্ন: কীভাবে জটিল কাঠামোর ধারণা পেলেন?&dquote;&dquote;

পানাহি: আমার ছবিতে আপনি যা দেখেন, সেসব আমি যেমন পরিস্থিতিতে বাস করি তারই সৃষ্টি। আমার মানসিক অবস্থা কতখানি টলমল তাও তুলে ধরে। চিত্রনাট্য রচনার সময় মোটেই ভালো বোধ করছিলাম না। রীতিমতো বিষণ্ন ছিলাম, আর সে কারণেই উপকূলের ভিলায় চলে গেছি। ওখানে থাকতে কিছুটা ভালো লাগছিল, কিন্তু তখনো আমার মনের পটভূমিতেই ছিল সেটা। অনেক সময়ই কোনটা বাস্তব আর কোনটা তা নয়, আলাদা করার বেলায় সমস্যা ছিল এবং সেটাই ছবিতে এসেছে। অনেক সময় আমার মনে হয়, এখনো একই পরিস্থিতিতেই আছি। আপনার ভবিষ্যৎ কেমন হতে চলেছে, তার কোনো ধারণা না থাকাটা বেশ কঠিন।

কারাগারে আমার খানিকটা মানসিক শান্তি ছিল, কারণ কিছুই করতে পারছিলাম না। কারাগারের গণ্ডিতে রুদ্ধ ছিলাম। কিন্তু আপনি যখন বাইরে থাকেন, কিন্তু কাজ করার অনুমতি থাকে না, তখন তা আরো বিরাট কোনো কারাগারের মতো হয়ে দাঁড়ায়। অবস্থা আর পরিস্থিতি ভিন্ন, কিন্তু কাজের অক্ষমতার কারণে আপনার ভেতর সেই বন্দিত্বের অনুভূতিই কাজ করে। দীর্ঘদিন সমাজের অংশ ছিলাম আমি, অথচ সামাজিক অঙ্গীকারবদ্ধ ও বাস্তবধর্মী ছবি নির্মাণ করতে পারিনি, কিন্তু এখন নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে হয় এবং যেভাবে কাজ করে অভ্যস্ত, সেভাবে কাজ করতে পারছি না। তাই কল্পনার অশ্রয় নিয়েছি; এখন যা কিছু ঘটছে, সবই ঘটছে আমার কল্পনায়। ছবি নির্মাণের অনুমতি না থাকায় কোনো কিছুরই ছবি নির্মাণ কঠিন ঠেকে আমার কাছে।&dquote;&dquote;

আমার জন্য ওরা এ জগতই নির্মাণ করেছে। অনেক সময় মনে হয়, আমি বুঝি আমার আপন ভাবনারই কারাগার। এই বৃহৎ কারাগারে বাস করা কঠিন। একে নরকের মতো ঠেকে, যেখানে সবকিছুই অন্তঃস্থকরণ করা হয়েছে। আমাকে সবকিছু অন্তঃস্থকরণে বাধ্য করা হয়েছে, অভ্যস্ত উপায়ে আর কিছুই আসলে প্রকাশিত হতে পারবে না।

প্রশ্ন: আপনার প্রথম দিকের কাজে দূর থেকে চিত্রায়িত প্রচুর গভীরতা আর শহুরে শোরগোল নিয়ে রাস্তাঘাটের বহু দৃশ্য রয়েছে। ওসব বিকল্পের উপস্থিতি ছাড়া কোনো একটা বাড়ির অভ্যন্তরে শুটিংয়ে খাপ খাওয়াতে কীভাবে পরিকল্পনা করেছেন?

পানাহি: বাইরে কাজ করেই অভ্যস্ত ছিলাম আমি। আপনি যখন বাইরে যান, নিজেকে বড্ড সীমিত মনে হয় আপনার। আমাদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার কারণে আমরা এমনকি জানালা দিয়ে বাইরে পর্যন্ত তাকাতে পারিনি। ভেতরে আমরা কী করছি, কেউ যাতে দেখতে না পায়, তাই জানালায় পর্দা টেনে দিতে হয়েছে। এটা আমার আগের ছবিগুলোয় কাজে লাগানো জায়গাগুলোর বিপরীতে গভীরতাহীন, তাই স্থানের চেয়ে বরং মানুষের ওপর বেশি গুরুত্বারোপ। বয়ানে মানুষেরই সিংহভাগ অংশ রয়েছে বলে মনে হয়। অপেক্ষাকৃত সংক্ষিপ্ত ফোকাস ও ডায়াফ্রাম বন্ধ করে দেয়ায় অন্দরমহলে কাজ করায় কোনো কোনো দৃশ্য সম্পাত করা আলোকেও প্রভাবিত করে, এটাও আমি যেভাবে কাজ করে অভ্যস্ত ছিলাম, তার চেয়ে একেবারেই ভিন্ন। আপনি যদি খেয়াল করে থাকেন, আমার আগের ছবিগুলোয় এমনকি কারো কল্পনাকে তুলে ধরা কোনো দৃশ্য ছিল না। বাস্তবতার চেয়ে ভিন্ন কিছুই না। আপনি যখন আমার বিগত দুটো ছবির মতো পরিস্থিতিতে পড়তে বাধ্য হন, তখন আপনাকে ভিন্ন নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। আমার হাতে বিকল্প থাকলে আমি বাইরে, এমনকি দেশের &dquote;&dquote;বাইরেই কাজ করতে ভালোবাসতাম। আমাকে গ্রেফতারের সময় আলোচনা চলছিল। খালেদ হোসাইনির আ থাউজ্যান্ড স্প্লেন্ডিড সানস অবলম্বনে ছবি নির্মাণের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল আমাকে।

প্রশ্ন: আপনি কীভাবে ‘অপবিত্র কুকুরকে’ আশ্রয় দেয়া চিত্রনাট্যকারের চরিত্রের কথা ভাবলেন? আপনার পরিস্থিতির সঙ্গে মিল আছে এর, তবে হুবহু নয়।

পানাহি: ইরানে পোষা পশু হিসেবে কুকুর রাখা নিষিদ্ধ, বিশেষ করে ওগুলোকে রাস্তায় হাঁটানো বা গাড়িতে বহন করা। এ ধরনের কিছু করার দায়ে পুলিশ আপনাকে গ্রেফতার করতে পারে। একে যারা অন্যায় ভাবেন, তারা এ আইনের প্রতিরোধ করছেন। অনেকেই বাড়িতে কুকুর রাখছেন। তেহরানে এমন জায়গাও অছে, যেখানে লোকে একসঙ্গে মিলে কুকুর কেনাবেচা করে। এটা রীতিমতো বেআইনি হলেও লোকে এখনো করছে। অনেক নজির আছে যেখানে পুলিশ কুকুর ধরার ক্ষেত্রে সহিংসতা দেখায়, এমনকি মালিকের চোখের সামনেই ওদের হত্যা করছে।

প্রশ্ন: আপনি আপনার পুরনো কাজের কথা যখন ভাবেন, দেয়ালের পোস্টারগুলো কী তাত্পর্য তুলে ধরে?

পানাহি: এ পোস্টারগুলোর বেশির ভাগই আমার নিজের ছবির জন্য। তবে এগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ছাত্রাবস্থায় দেখেছি আমি। অবশ্যই ওগুলো আমাকে প্রভাবিত করে, কিন্তু আমাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে যে একটি ছবি, সেটি হলো ভিত্তিরিও দে সিকার দ্য বাইসাইকল থিভস।

প্রশ্ন: আবার বৈধভাবে ছবি নির্মাণের অনুমতি পাওয়ার ব্যাপারে সরকারের সঙ্গে নতুন করে কোনো যোগযোগ হয়েছে?&dquote;&dquote;

পানাহি: না, দুর্ভাগ্যজনবকভাবে নতুন কিছু নেই। অবশ্যই আমি কখনই সরকারের লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করিনি। তবে আমার বন্ধুবান্ধব এ ব্যাপারটার কোনো একটা সুরাহা করা যায় কিনা দেখতে ওদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে। সেটা আমার অজান্তে। ওদের মধ্যস্থতা করতে বলিনি আমি। নিজেদের ইচ্ছাতেই করেছে ওরা। পরে ওরা আমাকে বলেছে, কোনো অগ্রগতি হয়নি। দুর্ভাগ্যক্রমে অফিস-আদালতে কিছু নতুন লোকজন এসেছে হয়তো, কিন্তু কেতাকানুন রয়ে গেছে আগের মতোই। কেবল আমার প্রতিই নয়, সম্প্রতি একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণকারী মাহনাজ মোহাম্মদিসহ ওদের অপছন্দ হতে পারে, এমন আরো অনেক চিত্র নির্মাতাদের প্রতিই প্রতিরোধ তুলে ধরছে ওরা।