The King is a Moor, a warrior, he has great renown among the Moors.
The people who govern the kingdom are Abissinians. These are looked upon as
knights; these are greatly esteemed. They wait on the kings on their
apartments. The chief among them are enunchs and these come to be kings and
great lords in the kingdom. Those who are not enunch are fightingmen. After the
king it is to this people that the Kingdom is obedient from fear.
বাংলা সালতানাতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে মাল্লাকার পর্তুগিজ ফ্যাক্টরির কর্মকর্তা তোমে পিরেস উপরোক্ত মন্তব্য লিখেছিলেন ষোড়শ শতকের শুরুর দিকে। বিষয়বস্তু ও বর্ণনার ভঙ্গিতে বাংলার ইতিহাসের আগ্রহী পাঠকের ভাবনায় ঢেউ খেলে যায় যে, তোমে পিরেসের সংবাদগুলো এক দশক আগে ঘটে যাওয়া হাবশি শাসনের প্রতিই ইঙ্গিত করেছে। ইতিহাসবিদ মমতাজুর রহমান তরফদার সর্বপ্রথম পর্তুগিজ ফ্যাক্টরি প্রধানের লিখিত গ্রন্থ সুমা ওরিয়েন্টাল (Suma Oriental) এর তথ্যাদি ব্যবহার করেছিলেন পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকের বাংলার রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসের আকর সূত্র হিসেবে। বাংলার হাবশি শাসন সম্পর্কে সমসাময়িক দিল্লির দরবারি ইতিহাস গ্রন্থগুলোর নীরবতা কিংবা সময়ের দূরত্বের মাপকাঠিতে অষ্টাদশ শতকে লেখা রিয়াজ-উস-সালাতিনের দুর্বলতাকে বিবেচনায় নিলে তোমে পিরেসের উপরোক্ত ভাবনা বাংলা সালতানাতের ক্ষমতা দখল ও হাবশিদের রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে নতুন মাত্রা সংযোজন করেছে। এ পাণ্ডুলিপি দীর্ঘদিন দৃষ্টির অগোচরে প্যারিসের বিবলিওথিকে দ্য লা শাঁব্র দ্য দ্যপুতে সংরক্ষিত ছিল। পর্তুগিজ ভাষায় লিখিত পাণ্ডুলিপিটি আবিষ্কার করেন আর্মান্দো কোর্তেসার। লন্ডনের হ্যাকলুত সোসাইটি ১৯৪৪ সালে এটির টীকা সমেত ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করে। ষোড়শ শতকের এশীয় দুনিয়ার ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম, অর্থনীতি ইত্যাদি নানা বিষয়ের তথ্যের ফর্দনামা উপস্থাপিত হয়েছে কোর্তেসার ইংরেজি ভাষ্যটিতে। এশীয় সমুদ্র বলয়ের অংশীদার হিসেবে বাংলা সালতানাতের তথ্যাদিও তোমে পিরেসের সংকলনে উঠে এসেছে। বিদ্যমান উৎসাদির পাশাপাশি তোমে পিরেসের বর্ণনার আলোকে বাংলায় হাবশি শাসনের উত্থান, সমকালীন ক্ষমতার রাজনীতি, আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক পাটাতনের সংক্ষিপ্ত চিত্র পাঠকের সামনে তুলে ধরাই এ লেখার উদ্দেশ্য। এক্ষেত্রে মান্যবর প্রয়াত মুদ্রাতত্ত্ববিদ (যিনি শিল্পী হিসেবেই বহুল সমাদৃত) ও গবেষক মুর্তজা বশীরের মুদ্রা ও শিলালিপির আলোকে বাংলার হাবশি সুলতান ও তৎকালীন সমাজ গ্রন্থটি বর্তমান লেখার প্রধান অবলম্বন। শিল্পীর কল্পনা ও আবেগী ভাবনার সীমানা অতিক্রম করে প্রয়াত গবেষক মুর্তজা বশীর মুদ্রার আলোকে বাংলার হাবশি সুলতানদের উত্থান, কালপর্ব, রাজ্যসীমা এবং সমাজ-সংস্কৃতির ইতিহাসকে দেখেছেন বিশ্লেষণী ও নৈর্ব্যক্তিকতার চশমায়। চিত্রাঙ্কনে পটু শিল্পী মুর্তজা বশীর ইতিহাস রচনায় সফল—এটি কোনো অতিশয়োক্তি নয়।
বাংলায় হাবশি রাজাদের শাসনপর্ব হলো ১৪৮৭ থেকে ১৪৯৩ সাল। মুদ্রা প্রমাণে জানা যায়, চারজন সুলতান এ সময় শাসন করেছেন। তারা হলেন: গিয়াসুদ্দিন বারবক, সাইফুদ্দিন ফিরুজ, কুতুবুদ্দিন মাহমুদ এবং শামসুদ্দিন মুজাফফর শাহ। দাস, দেহরক্ষী কিংবা সেনাবাহিনীর স্ট্রাইকিং ফোর্স থেকে ক্ষমতার শীর্ষে যাওয়ার এ ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক কোনো বিষয় নয়। চতুর্দশ শতক থেকেই বাংলার ‘সামরিক-সিভিল’ প্রশাসনে হাবশিদের উপস্থিতির সংবাদ নানা ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায়। ইলিয়াস শাহি বংশের শেষ দিকে রাজা গণেশের উত্থান, তদ্বীয় পুত্র জালালুদ্দিনের দুই দফায় ক্ষমতা দখল, মুদ্রায় রাজা দনুজ্জমর্দনদেব ও রাজা মহেন্দ্রদেবের অস্তিত্ব ছিল পঞ্চদশ শতাব্দীতে বাংলা সালতানাতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট, ক্ষমতার বলয়ের পরিবর্তন এবং আমির-উমরাহদের পারস্পরিক বিশ্বাস-অবিশ্বাসেরই ফসল। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী ইলিয়াস শাহি বা মাহমুদ শাহি বংশের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। বারবার ক্ষমতা পরিবর্তনের পটভূমিতে বাংলার তুর্কি আমিরদের আধিপত্য কিংবা স্থানীয় অমাত্যদের প্রভাব বলয় থেকে বের হওয়ার জন্যই হয়তো রুকনুদ্দিন বারবক শাহ হাবশিদের আমদানি করেছিলেন। মধ্যযুগে বিশ্বস্ত প্রাসাদ রক্ষী অথবা ঝানু দক্ষ যোদ্ধা হিসেবে হাবশিদের সুখ্যাতি ছিল। হাবশি আমদানির তত্ত্বের সমর্থন মিলে সমসাময়িক বিখ্যাত দরবারি ইতিহাস গ্রন্থ তারিখ-ই-ফিরিশতা গ্রন্থে। এ সূত্রমতে, বারবক শাহের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে আট হাজার হাবশি ক্রীতদাস সেনাবাহিনী ও প্রাসাদ রক্ষার কাজে নিযুক্ত হয়েছিলেন। ফিরিশতার বর্ণনার সূত্র ধরে আবদুল করিম তার বাংলার ইতিহাস (সুলতানী আমল) গ্রন্থে উপসংহার টেনেছিলেন যে:
...হয়তো
দুর্ধর্ষ হাবশীদের
সাহায্যে তাঁহার
(বারবক শাহের)
সৈন্যবাহিনী পুনর্গঠন
করিয়া রাজ্যের
স্থায়িত্ব বিধান
করাই তাঁহার
উদ্দেশ্য ছিল।
... (পৃ. ২৭০)
শুরুতেই আমরা তোমে পিরেসের বর্ণনায় দেখেছি যে হাবশিরা কেবল ছায়া সুলতানই নয় বরং অনেক ক্ষেত্রেই প্রভাবশালী। স্থানীয় জনগণ রাজার পরপরই তাদের সমীহ করে। সামন্ত প্রথা ও মধ্যযুগের ধর্মযুদ্ধ বা ক্রুসেডের কারণে নাইটহুড ছিল গৌরব ও শৌর্যের পরিচায়ক। পর্তুগিজ প্রশাসক তোমে পিরেস হাবশিদের ইউরোপীয় নাইটদের সঙ্গে তুলনা করেছেন। বাংলার মুসলিম রাজ্যে সুলতানের প্রাসাদের রক্ষার দায়িত্ব, সশস্ত্র যোদ্ধা কিংবা প্রভাবশালী ভূস্বামী—ত্রিবিধ ভূমিকায় হাবশিদের অবস্থান স্পষ্ট। কিন্তু আমদানীকৃত বেতনভোগী যোদ্ধা-খোজা-দেহরক্ষীদের সিংহাসন দখল কি কেবলই হাবশিদের উচ্চাভিলাষী ভাবনার ফসল? সমসাময়িক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণপূর্বক মুর্তজা বশীর এ প্রশ্নের উত্তরে পঞ্চদশ শতকের বাংলার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের বাঁকগুলোকে সমসাময়িক আকর সূত্রাদির নিরিখে বিশ্লেষণ করেছেন। তার মতে, রাজপরিবারের অন্তর্দ্বন্দ্ব, দরবার রাজনীতিতে অমাত্যদের চরম মাত্রার গোষ্ঠীভিত্তিক কোন্দল, সুপ্ত মন্ত্রণা এবং ক্ষমতা দখলের তীব্র প্রতিযোগিতাই এই শতকের রাজনীতির জগতের বৈশিষ্ট্য। তোমে পিরেসের বর্ণনার ভিত্তিতে বিষয়টির বিশদ ও যৌক্তিক উপস্থাপনের প্রতিফলন দেখা যায় মমতাজুর রহমান তরফদারের নিম্নোক্ত উক্তিতে:
... পনের
শতকের প্রথমার্ধে
সংঘটিত রাষ্ট্র-বিপ্লবের
সঙ্গে হাবশী
উত্থান সম্পর্কিত
বলে মনে
করার সংগত
কারণ আছে।
এই শতকের
অন্তত প্রথম
দশক থেকেই
ইলিয়াস শাহি
রাজশক্তি ও
তার ঘনিষ্ঠ
সমর্থক তুর্কি
সামন্ত শক্তির
সঙ্গে বাঙালি
হিন্দু সামন্ত
শক্তির দ্বন্দ্ব-সংঘাত
হচ্ছিল।
... বারবক
শাহ (১৪৫৯-১৪৭৪
খ্রি.) বুঝতে
পেরেছিলেন যে,
সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত
ও প্রাণশক্তিহীন
তুর্কি সামন্তশক্তির
উপর নির্ভর
করা সম্ভব
নয়। অথচ
তখন হিন্দু
সামন্তশক্তি দেশে
অত্যন্ত প্রবল।
... এই ভূস্বামীদের
প্রভাব বেড়ে
গিয়েছিল। এই
সামন্তগণ শুধু
দেশের রাজনৈতিক
ও সামাজিক
শক্তিই নিয়ন্ত্রণ
করতেন না,
তাঁদের সম্পূর্ণ
নিয়ন্ত্রণে ছিল
রাজ্যের প্রধানতম
উৎস ভূমি-ব্যবস্থা।...প্রবল
আর্থসামাজিক শক্তির
অধিকারী হিন্দু
জমিদারদের পক্ষ
থেকে যেকোনো
সময়ে প্রতিবিপ্লব
ঘটতে পারত।
মনে হয়
এই সামন্ত-শ্রেণীর
বিরুদ্ধেই বারবক
হাবশীদের এক
প্রবল শক্তি
হিসেবে গড়ে
তুলতে চেয়েছিলেন।
(পৃষ্ঠা ১৮৮-১৮৯)
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বারবক শাহের রাজত্বের প্রায় সাত দশক আগেই সুলতান গিয়াসুদ্দিন আজম শাহের সময় হাবশিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে দেখা যায়। আরব ইতিহাসবিদ ইবনে হাজর আসকালানি এবং আল সাখাওয়ারির লেখনিতে জানা যায়, গিয়াসুদ্দিন আজম শাহের পক্ষ থেকে হাবশি ইয়াকুত আল গিয়াসি ৮১৩ হিজরিতে বাংলা থেকে মক্কা-মদিনায় উপঢৌকন নিয়ে যান। সেখানে আল মাদ্রাসাহ-আল-বাঙ্গালিয়াহ (বাঙালি মাদ্রাসা) প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ইয়াকুতের মাধ্যমে সুলতান আজম শাহ আরাফাতের ময়দানে থাকা ঝরনার সংস্কার করার জন্য টাকা পাঠিয়েছিলেন। (মুর্তজা বশীর: বাংলায় হাবশী সুলতান, পৃষ্ঠা ৩৫)। ফলে হঠাৎ করেই সুলতান রুকনুদ্দিনের সময় হাবশিরা ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠেনি। দীর্ঘ সময় ও জটিল রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় বাংলায় সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য হাবশি সুলতানরা ক্ষমতা লাভ করেন। সম্ভবত ফতেহ শাহ ক্ষমতা দখলের পর হাবশিদের প্রতি কঠোর আচরণ করেছিলেন। তিনি কতিপয় উদ্ধত ও উচ্চাভিলাষী হাবশিকে কঠোর শাস্তি দিয়েছিলেন। এটি অন্যান্য হাবশির মনে ক্রোধের সৃষ্টি করেছিল।
ক্ষমতাসম্পন্ন হাবশিদের
বেপরোয়া যথেচ্ছাচার
শক্ত হাতে
দমন ও
তাদের প্রভাব
নিয়ন্ত্রণ করায়
দেশের রাজনৈতিক
সংকট তীব্র
আকার ধারণ
করে। হাবশিদের
বিরুদ্ধে দমননীতি
প্রয়োগ হওয়াতে
তারা ক্রুদ্ধ
হয় এবং
বিদ্রোহ করে।...
প্রতিশোধের স্পৃহায়
হাবশি খোজা
বারবক...ফতেহ
শাহকে হত্যার
মাধ্যমে উচ্ছেদ
করে গৌড়ের
সিংহাসন দখল
করেন। (মুর্তজা
বশীর, বাংলায় হাবশী
শাসন,
পৃষ্ঠা ৩৬)।
এর পর থেকে বাংলার রাজধানী গৌড়ে হাবশিদের ক্ষমতাবলয় এবং আধিপত্য সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। গোলাম হোসেন সলিমের রিয়াজুস সালাতিনের ভাষায় ফতেহ শাহের হত্যা-পরবর্তী বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল নিম্নরূপ:
কৃতঘ্ন বারবক
স্বীয় প্রভুর
প্রাণনাশ করিয়া
সুলতান শাহজাদা
উপাধি ধারণ
পূর্ব্বক রাজ
সিংহাসন অধিকার
করিল। কথিত
আছে যে,
শূন্য বনে
শৃগাল সিংহের
আকার ধারণ
করে। বারবক
সিংহাসনে আরোহণ
করিলে স্বজাতীয়
আত্মীয় অন্তরঙ্গেরা
আসিয়া মিলিত
হইল। বারবক
রাজ্যের হীনমতি
লোকদিককে অর্থ
দ্বারা বশীভূত
করিয়া দল
পরিপুষ্ট করিল
এবং তারপর
আপন পদমর্যাদা
ও ক্ষমতা
বৃদ্ধি করিতে
সচেষ্ট হইল।
ঘটনার প্রায় ৩০০ বছর পরে লেখা রিয়াজুস সালাতিনের লেখক বারবক শাহের সিংহাসনে বসার পরই স্বজাতীয়দের আগমনের সংবাদ প্রদান করে ‘ক্ষমতার প্রতি আকর্ষণ ও আনুগত্য’—এই চিরন্তন সত্যই আরেকবার মনে করিয়ে দেন। সিক্কাহ ও খুতবা ছিল মধ্যযুগের মুসলিম শাসনের আইনি বৈধতার প্রমাণ। এই মানদণ্ডে তিনটি টাঁকশাল থেকে সিক্কাহ (মুদ্রা) ইস্যু করে সুলতান হিসেবে বারবক নিজের আইনি বৈধতা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মুদ্রায় উপস্থাপিত পরিচয়সূচক শব্দগুচ্ছ হলো: গিয়াস আল-দুনিয়া ওয়াল-দিন আবু আল-মুজাফফর বারবক শাহ আল-সুলতান খাল্লাদা মুলকুহু।
২০১৯ সালে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর কর্তৃক প্রকাশিত Coins of the Bengal Sultans গ্রন্থে ফতেহাবাদ টাঁকশাল থেকে ইস্যুকৃত একটি মুদ্রার ছবি সংযোজন করা হয়েছে। মুর্তজা বশীরের গবেষণায় দেখা যায় বাংলার প্রথম হাবশি সুলতানের একটি মাত্র স্বর্ণমুদ্রার উল্লেখ পাওয়া গেছে। এছাড়া তিনি এই শাসকের তিনটি টাঁকশালের উল্লেখ করেছেন। মুদ্রায় প্রাপ্ত টাঁকশাল ও তারিখগুলো হলো: (ক) খাজানাহ, ৮৯২ হিজরি (খ) ফতেহাবাদ, ৮৯৩ হিজরি (গ) দারু নূর, ৮৯৩ হিজরি।
রিয়াজুস সালাতিনের বর্ণনানুসারে মালিক আনদিল নামক জনৈক অনুগত সেনাপতির নেতৃত্বে সংঘটিত বিদ্রোহে গিয়াসুদ্দিন বারবকের মৃত্যু হয়। মুদ্রায় এই শাসকের পরিচয় উত্কীর্ণ হয়েছে নিম্নোক্ত শব্দগুচ্ছের মাধ্যমে:
সাইফ আল দুনিয়া ওয়াল দিন আবু আল-মুজাফফর ফিরুজশাহ আল-সুলতান খাল্লাদাল্লাহ মুলকুহু ওয়া সুলতানুহু।
তিনি মোট পাঁচটি টাঁকশাল থেকে মুদ্রা জারি করেছিলেন। মুর্তজা বশীরের মতে, বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা টাঁকশালগুলো হলো: ফতেহাবাদ, মাহমুদাবাদ, ফিরুজাবাদ, বারবকাবাদ এবং মুয়াজ্জামাবাদ। (পৃষ্ঠা: ১৬৬)
লিপি ও মুদ্রা প্রমাণের আলোকে বলা যায়, তিনি প্রায় তিন বছর বাংলা সালতানাতের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। হাবশি পর্বে সম্ভবত তার সময়ই সবচেয়ে দীর্ঘ, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধিশালী ছিল। রিয়াজের লেখক বেশ উচ্ছ্বসিত ভাষায় এটিকে চিত্রিত করেছেন:
হাবশি মালেক
আন্দিলের অদৃষ্ট
প্রসন্ন হওয়ায়
বাঙ্গালার রাজলক্ষ্মী
তাহার অঙ্কশায়িনী
হইলেন। মালেক
ফিরোজ শাহ
উপাধিতে ভূষিত
হইয়া রাজধানী
গৌড় নগরে
গমন পূর্ব্বক
তথায় অবস্থিতি
করিতে আরম্ভ
করিলেন। ফিরোজ
শাহ পরোপকার
ও ন্যায়
বিচারের জন্য
যত্ন করিতেন।
ফিরোজ শাহের
শাসনে প্রজাগণ
সুখ স্বাচ্ছন্দ্য
ও শান্তি
লাভ করিয়াছিল।...তিনি
দানশীলতা ও
পরোপকারে অদ্বিতীয়
ব্যক্তি ছিলেন।
হাবশি সুলতানদের মধ্যে একমাত্র কুতুবুদ্দিন মাহমুদ শাহ উত্তরাধিকার সূত্রে সিংহাসনে বসেন। পিতা ফিরুজ শাহের মৃত্যুর পর তিনি সুলতান হয়েছিলেন। ফারসি ভাষায় লিখিত গ্রন্থাদিতে কুতুবুদ্দিনের পরিচয় নিয়ে নানা রকম বক্তব্য রয়েছে। কিন্তু মুদ্রায় তার পরিচয় দেয়া হয়েছে:
কুতুব আল দুনিয়া ওয়াল দিন আবু আল মুজাহিদ মাহমুদ শাহ আল-সুলতান ইবন ফিরুজ শাহ আল-সুলতান।
তিনটি টাঁকশাল—ফতেহাবাদ, খাজানাহ এবং দার-উল-যরব—থেকে কুতুবুদ্দিনের মুদ্রা ইস্যু হয়েছিল। ক্ষমতার পালাবদল বা হত্যা-ষড়যন্ত্রের প্রক্রিয়ায় রাজ-তখত দখলের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে কুতুবুদ্দিনের সময়। তিনি সিদি বদর নামক হাবশি সামরিক কর্মকর্তার হাতে মৃত্যুবরণ করেন।
সিদি বদর শামসুদ্দিন মুজাফফর শাহ উপাধি নিয়ে বাংলা সালতানাতের শীর্ষপদে সমাসীন হয়েছিলেন। প্রাপ্ত শিলালিপি ও মুদ্রার মাধ্যমে বলা যায় তিনি দুই বছর রাজত্ব করেছিলেন। মোট পাঁচটি শিলালিপিতে এই সুলতানের নাম পাওয়া যায়। এই লিপিগুলো বর্তমান বিহারের ভাগলপুর এবং পশ্চিম বাংলার মালদা, বর্ধমান এবং দিনাজপুর জেলায় পাওয়া গেছে। মুহাম্মদাবাদ, ফতেহাবাদ, বারবকাবাদ, খাজানা, দার-উল-যরব এবং খয়রাবাদ টাঁকশাল থেকে তিনি মুদ্রা জারি করেছিলেন। বাংলায় হাবশি শাসনের অবসান ঘটে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের উত্থানের মাধ্যমে।
তবকাত-ই-আকবরি গ্রন্থে বলা হয়েছে, রাজপ্রাসাদের নিরাপত্তারক্ষীদের হাতে মুজাফফর শাহের মৃত্যু হয়েছিল। তারিখ-ই-ফিরিশতা ও রিয়াজ-উস-সালাতিন-এর মতে, এ হতভাগ্য সুলতান যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুবরণ করেন।
পর্তুগিজ পর্যটক জোয়াও-দ্য-ব্যারোসের প্রদত্ত তথ্য অনেকাংশেই তবকাত-ই-আকবরি-এর সঙ্গে মিলে যায়। ইতিহাসের পাতায় সমাপ্তি ঘটে আবিসিনীয় হাবশি যোদ্ধাদের ছয় বছরের শাসনের।
পঞ্চদশ শতককে বাংলার ইতিহাসে ক্ষমতা দখলের ম্যারাথন হিসেবে তুলনা করা যায়। সামরিক-সামাজিক প্রভাব বলয়ে ক্ষমতাবান গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, অবিশ্বাস, গুপ্তহত্যা এবং ষড়যন্ত্র ছিল এ শতকের নিত্যদিনের ঘটনা। হাবশি শাসনের অবসানের মাধ্যমে খতম হয় এ ধরনের রাজনৈতিক পালাবদলের ধারা। মুজাফফর শাহের মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠিত হয় হোসেন শাহি বংশের শাসন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, একাধিক লিখিত সূত্রে এ অস্থির রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের একটি গণতান্ত্রিক সমাধানের দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা হয়েছে। মুজাফফর শাহের মৃত্যুর পর গৌড়ের অভিজাত-অমাত্য-আমির-উমরাহ সবাই একটি সভায় সিদ্ধান্ত নেন আলাউদ্দিন হোসেন শাহকে সুলতান হিসেবে গ্রহণ করার। বর্তমান আধুনিক গণতন্ত্রের রসম অনুযায়ী এটিকে সম্পূর্ণভাবে গণতান্ত্রিক নির্বাচন মানা কষ্টসাধ্য। কিন্তু পঞ্চদশ শতকের বাস্তবতায় সবার মতামতে ‘সুলতান’ নির্বাচনটি বিশেষ উল্লেখের দাবিদার। এলোমেলো ভাবনার আড়ালে-আবডালে লুকিয়ে থাকা নানা প্রশ্ন পাঠকের মনোজগতে থাকতেই পারে। কিন্তু ইতিহাসের আধুনিক পঠনে তা উৎসনির্ভরতার দাবিদার। হাবশি আধিপত্যের যবনিকাপাতের চূড়ান্ত বিদায়ঘণ্টা বাজে নবনির্বাচিত সুলতান হোসেন শাহের হাতে। যিনি অসংখ্য হাবশিদের বাংলা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। আপাতদৃষ্টিতে এটিকে দমনমূলক মনে হলেও ক্ষমতাকাঠামোর নিরিখে রাষ্ট্র তার জন্য কোনো হুমকিকেই ক্রিয়াশীল রাখতে চায় না। এটাই রাষ্ট্রের-ক্ষমতার-আধিপত্যবাদের ফিতরত।
সহায়ক গ্রন্থাবলি
১.
মুর্তজা বশীর,
মুদ্রা
ও শিলালিপির আলোকে বাংলার
হাবশী সুলতান
ও তৎকালীন সমাজ,
ঢাকা: অ্যাডর্ন
পাবলিকেশন, পরিমার্জিত
ও পরিবর্ধিত
সংস্করণ, ফেব্রুয়ারি
২০০৯ (প্রথম
প্রকাশ ফেব্রুয়ারি
২০০৯)।
২.
এ কে
এম খাদেমুল
হক, ‘হাবশি
শাসন’, আবদুল
মমিন চৌধুরী
সম্পাদিত, বাংলাদেশের ইতিহাস
সুলতানি ও
মোগল যুগ
(আনু.
১২০০-১৮০০
সা. অব্দ),
ঢাকা: বাংলাদেশ
এশিয়াটিক সোসাইটি,
২০২০: ১৮৯-১৯৪।
৩.
মমতাজুর রহমান
তরফদার, ‘তোমে
পিরেসের বর্ণনায়
বাংলাদেশ’, সালাহউদ্দিন
আহমেদ সম্পাদিত,
আবু মহাম্মেদ
হবিবুল্লাহ স্মারক
গ্রন্থ, ঢাকা:
বাংলাদেশ ইতিহাস
পরিষৎ, ১৯৯১:
১৮৪-২১৩।
৪.
মমতাজুর রহমান
তরফদার, হোসেন শাহী
আমলে বাংলা
(১৪৯৪-১৫৩৮)
একটি সামাজিক রাজনৈতিক পর্যেষণা, মোকাদ্দেসুর
রহমান অনূদিত,
ঢাকা: বাংলা
একাডেমি, ২০০১।
৫.
আবদুল করিম,
বাংলার
ইতিহাস সুলতানি আমল,
ঢাকা: বাংলা
একাডেমি, ১৯৮৭।
৬.
গোলাম হোসেন
সলীম, রিয়াজ-উস-সালাতিন,
শ্রী রামপ্রাণগুপ্ত
সম্পাদিত, ঢাকা,
প্রথম দিব্য
প্রকাশ সংস্করণ
২০০৫।
৭.
সুখময় মুখোপাধ্যায়,
বাংলার
ইতিহাস ১২০৪-১৫৭৬, ঢাকা: খান
ব্রাদার্স অ্যান্ড
কোম্পানি, ২০০০।
শহিদুল হাসান: সহযোগী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়





