যুগে যুগে ভারতবর্ষে দুনিয়ার নানা প্রান্ত থেকে মানুষ এসে আবাস গড়েছে। এদের অনেকে এমনকি প্রবল দাপটে ভারতবর্ষের ভাগ্যবিধাতাও হয়েছেন। আরব সাগর হয়ে ভারতে এসেছেন আফ্রিকার অনেক অধিবাসী। এদের অনেকে ভারতের স্থানীয় হিন্দু ও মুসলিম শাসকদের সৈন্যদলে যোগ দিয়েছেন। অনেকে এসেছেন বণিক হিসেবে। আবার অনেকে স্রেফ দাস হিসেবে এসেছিলেন ভারতে। ভারতে আফ্রিকান অভিবাসীরা মূলত হাবশি নামে পরিচিত ছিলেন। বাংলায় পঞ্চদশ শতাব্দীতে অল্প কয়েক বছরের জন্য হাবশি শাসনও কায়েম হয়েছিল। দিল্লির আলোচিত নারী শাসক রাজিয়া সুলতানার সঙ্গে এক হাবশি দাসের গোপন প্রণয় নিয়ে হয়েছিল নানা কাণ্ড।

আফ্রিকান দাস, বণিকদের দক্ষিণ এশিয়ায় আগমন নিয়ে কম-বেশি ধারণা আছে সবারই। কিন্তু উল্টো ঘটনাও যে ঘটেছিল তা হয়তো খুব কম মানুষেরই জানা আছে। ভারত থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ প্রদেশে দাস নেয়া হতো জোর করে। বাংলাসহ ভারতের কয়েকটি অঞ্চল থেকে কেপে দাস রফতানি করা হতো।

সেই প্রাচীন টেক্সট পেরিপ্লাস অব দি এরিথ্রিয়ান সিতে উল্লেখ পাওয়া যায়, ভারত থেকে এক নারীকে দাসী হিসেবে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল আরব সাগরের সোকোট্রা দ্বীপে। কিন্তু বাংলাসহ ভারতের করোমানডেল ও মালাবার উপকূল থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ প্রদেশে জোরপূর্বক অভিবাসনের ইতিহাস কালের গর্ভে প্রায় হারিয়েই গিয়েছিল। কিন্তু বাঙালি সমাজতত্ত্ববিদ ও আফ্রিকানিস্ট অংশু দত্ত দীর্ঘদিন গবেষণা করে হাজির করেছেন তার জাতির জীবনের বিস্মৃতপ্রায় এ অধ্যায়। সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে শুরু হয়েছিল এ প্রক্রিয়া, অব্যাহত ছিল পরের ২০০ বছর।

এ প্রক্রিয়ায় বাংলা থেকে দাস সংগ্রহ করে জোরপূর্বক তাদের কেপ প্রদেশে পাঠানো হতো। সেখানে তাদের বিক্রি করে দেয়া হতো স্থানীয়দের খামারে কাজ করার জন্য। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী যেমনটা বলেছিলেন যে বাঙালি আত্মবিস্মৃত জাতি—তার সে পর্যবেক্ষণের আদর্শ উদাহরণ বলা যেতে পারে কেপে বাঙালি দাসদের ইতিহাস। দক্ষিণ অফ্রিকায় সফরের আগে খোদ অংশু দত্ত এ বিষয়ে কিছু জানতেন না। এরপর আজকের কেপ টাউনে অবস্থিত ন্যাশনাল আর্কাইভে কাজ করতে গিয়ে তিনি দেখলেন সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে কেপ প্রদেশের অর্থনীতি অনেকটাই নির্ভরশীল ছিল বাঙালি দাসের ওপর। প্রশ্ন উঠতে পারে, সেই বাঙালি দাসদের বংশধরদের কী হলো? এখানে দুনিয়ার অন্যত্র দাসদের ক্ষেত্রে যা হয়েছে তার ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। ইউরোপে আফ্রিকা থেকে যাওয়া কৃষ্ণাঙ্গ দাসেরা স্বতন্ত্র সম্প্রদায় হিসেবেই অবস্থান করছেন। কিন্তু সেদিন কেপে পৌঁছানো বাঙালিরা সেখানকার স্থানীয় সমাজে মিশে গেছেন এবং এই মিথস্ক্রিয়া এমনই শক্তিশালী ছিল যে আজ তাদের বাঙালি শিকড় খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। আর এ কারণে অংশু দত্তের কাজও অনেক গুণ কঠিন হয়েছিল। এক কথায় তাদের সামাজিক মৃত্যু ঘটেছিল। ছোট একটা অংশ মিশে গিয়েছে শ্বেতাঙ্গদের সমাজে আর বড় অংশ তাদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য অনুসারে কৃষ্ণাঙ্গ সমাজে মিশে গিয়েছে। সেই বাঙালি দাসদের কত বংশধর এখন কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর অংশ, তার প্রকৃত হদিস পাওয়া আজ সম্ভব নয়। তবে গবেষকরা মনে করেন, সংখ্যাটা নেহাত কম নয়!

১৯৯৯ সালে কেপ প্রদেশে দাস ব্যবহারের ইতিহাস পুনরুদ্ধারে চালু হয় একটি প্রকল্প—টুয়ার্ডস আ নিউ এজ অব পার্টনারশিপ। তারা বিভিন্ন দলিল, বই ও সাহিত্য জড়ো করেন, যেগুলোয় বাঙালি দাসের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে বাঙালি এমনকি দক্ষিণ আফ্রিকায় সেই বাঙালি দাসদের বংশধরদের মধ্যেও এ বিষয় নিয়ে তেমন জানাশোনা ছিল না।

বাংলা থেকে কেপ প্রদেশে দাস নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি ছিল মূলত ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্য। তবে এটা ছিল তাদের মোট ব্যবসার মাত্র দশমিক ৫ শতাংশ। তাই কোম্পানির ইতিহাস নিয়ে যারা কাজ করেছেন তারাও দাস ব্যবসার দিকে সেভাবে নজর দেননি।

২০১৩ সালে প্রকাশিত হয় অংশু দত্তের ফ্রম বেঙ্গল টু দ্য কেপ: বেঙ্গলি স্লেভস ইন সাউথ আফ্রিকা। বইটি দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ প্রদেশে ২০০ বছর ধরে বাঙালি দাসদের অবস্থানের ইতিহাসে আলো ফেলেছে। এর আগে ভারতে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইতিহাস নিয়ে অনেক বই লেখা হলেও সেগুলোয় দাস ব্যবসা নিয়ে উল্লেখ ছিল কম। এর মধ্যে ঐতিহাসিক তপন রায় চৌধুরী অবশ্য বাংলায় ডাচ কোম্পানির দাস ব্যবসার উল্লেখ করেছেন। তার হিসাবমতে, ১৬৪৪ সালে কোম্পানি বাংলা থেকে ৫৮ জন দাস সংগ্রহ করেছিল। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে তখনো কেপ প্রদেশে ডাচ গ্যারিসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

বাংলায় ডাচদের মূল অবস্থান ছিল হুগলিতে। ১৬০৭ সাল থেকে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের উপস্থিতি ছিল। তবে ১৬৩৫ সালে মোগলদের অনুমতি নিয়ে হুগলিতে কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে তারা বাংলায় ঘাঁটি গাড়ে। বাংলা তাদের অন্য বাণিজ্য পোস্টগুলো ছিল কাশিমবাজার, পাটনা, রাজমহল, বালাসোর ও ঢাকায়। বাংলায় ডাচদের মূল ব্যবসা ছিল সিল্ক, আফিম, সল্টপিটারের। এ সময় তাদের দলিলে দাস ব্যবসার উল্লেখ রয়েছে সামান্যই। বিকল্প বিভিন্ন উৎস সন্ধান করে মার্কাস ভিঙ্ক জানিয়েছেন, ১৬২৬-৬২ সালের মধ্যে প্রতি বছর ডাচরা গড়ে ১৫০-৪০০ দাস সংগ্রহ করেছে আরাকান-বাংলা উপকূল থেকে। কেপ প্রদেশে প্রথম যে বিদেশী দাসদের পা পড়েছিল তারা মূলত বাংলা থেকেই গিয়েছিলেন। তবে বাংলায় মোগল শাসন শক্তিশালী হওয়ার পর এ দাস ব্যবসা কমে এসেছিল। অন্যদিকে কেপ প্রদেশে ডাচদের ঔপনিবেশিক শাসন ও কেপ টাউনের গড়ে ওঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল এশিয়া থেকে নিয়ে যাওয়া দাসদের।

সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে বাংলার সঙ্গে কেপ টাউনের উল্লেখযোগ্য বাণিজ্য সম্পর্কের রেকর্ড পাওয়া যায় না। তবে বাংলা ও কেপ টাউনের মধ্যে যে জাহাজ চলাচল করত সে বিষয়ে প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। বাংলা থেকে জাহাজে কেপ টাউনে মূলত যেত চাল। এ জাহাজগুলোয় বাঙালি দাস পরিবহনের কথা তেমন জানা যায় না। এখানে যে ঘটনাটি ঘটত তা এমন—ইন্দোনেশিয়ার বাটাভিয়ায় ছিল ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শক্তিশালী কলোনি। প্রথমে তার বাংলা থেকে দাস নিয়ে যেত বাটাভিয়ায় এবং সেখান থেকে তাদের নেয়া হতো কেপ টাউনে। বাটাভিয়া ও কেপ টাউন—দুটো শহরের বিকাশ হয়েছে এই ডাচ কোম্পানির হাতে।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, ডাচরা এশিয়ার তিনটি কেন্দ্র থেকে দাস বা শ্রমদাস সংগ্রহ করত। এদের ব্যবহার করা হতো তাদের এশীয় উপনিবেশের কেন্দ্র বাটাভিয়ায় কাজ করতে। ভিঙ্ক দেখিয়েছেন, ১৬৪৬-৪৯ সালের মধ্যে বাটাভিয়ায় মুক্তি পাওয়া ২১১ জন দাসের মধ্যে ১২৬ জনই ছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার, যার মধ্যে ৮৬ জন বাংলার।

অনেক গবেষক জানিয়েছেন, অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে কেপ টাউনে নেয়া বাঙালি দাসদের অনেককে নিয়ে গিয়েছিল ব্রিটিশ বণিকরা। অবশ্য এ তথ্য নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

অংশু দত্ত সিদ্ধান্ত টেনেছেন, বাংলা থেকে যে দাসদের কেপে নেয়া হয়েছিল তাদের কিছু অংশ সরাসরি বাংলা থেকে গিয়েছিল এবং বড় অংশ গিয়েছিল বাটাভিয়া হয়ে। বাংলা ও কেপের মধ্যে সরাসরি জাহাজ চলাচলের রেকর্ড থেকে বোঝা যায়, বাংলা থেকে সরাসরি দাস যাওয়ার পরিমাণ কম ছিল।

মহাফেজখানার দলিল জানাচ্ছে, ১৭৭১ সালের ১৬ এপ্রিল কেপ টাউনে ডাচ কোম্পানির মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছিল বাংলায় তাদের অফিসকে কিছু দাস প্রেরণের অনুরোধ করার। সম্ভবত বাংলায় সে সময়ের ভয়াল মন্বন্তরের সুযোগ নিয়েছিল ডাচরা। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় এ অনুরোধ গৃহীত হয়েছিল। পরের বছর ল্যান্ড ওলভারেন ও সেলমদ নামের দুটো জাহাজ কিছু দাস বাংলা থেকে কেপ টাউনে নিয়ে গিয়েছিল। জাহাজগুলো একেকটা ছিল ৮৮০ টনের, তাই অনেক দাস যে তারা নিতে পারেনি সেটা নিশ্চিত।

১৬৫২ থেকে ১৮৩৪ সালের মধ্যে কেপে যাওয়া বাঙালি দাসের প্রকৃত সংখ্যা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। উল্লেখ্য, ১৮৩৪ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যজুড়ে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হয়েছিল। বোয়েসির গবেষণা জানাচ্ছে ১৬৫৮-১৭০০ সালের মধ্যে বাঙালি দাস কেনাবেচা বিষয়ের ১৭৫টি দলিলের কথা। ১৭৫৫ সালের ২৬ মে লিখিত একটি ফার্মের দলিলে ৩০ জন পুরুষ ও তিনজন নারী দাসের হিসাব পাওয়া গিয়েছে। এদের মধ্যে ১২ জন পুরুষ ও একজন নারী বাঙালি। অষ্টাদশ শতাব্দীতে কেপের স্টেলেনবশ জেলায় দাসদের হিসাব নিয়ে দলিল উদ্ধার করেছেন গবেষক নাইজেল ওয়ার্ডেন। তাতে দেখা যায় ১৭২২-৯৯ সালের মধ্যে সেখানে মোট বাঙালি দাসের অনুপাত। এর মধ্যে ১৭৬০-৬৯ সালে তা ছিল সর্বনিম্ন ৫ দশমিক ৫ ভাগ আর ১৭৯০-৯৯ সময়ে তা বেড়ে হয়েছিল ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ। অংশু দত্ত কেপ টাউনে গিয়ে Vergelegen museum জাদুঘর সফর করেন। সেখানে তখন Vergelegen এস্টেটের অনেক দলিল, নিদর্শন প্রদর্শিত হচ্ছিল। এতে দেখা যায়, ১৬৯৯ থেকে ১৭০৭ সময়ে ভেলহেম অড্রিয়ে য়ান ডার স্টেল তার লজে ১৫০ জন দাস রাখতেন। এই ভেলহেম ছিলেন একজন ডাচ কমান্ডারের পুত্র। দলিলে দেখা যায়, এদের মধ্যে ১৩ জন ছিলেন বাংলার।

১৭২৬ সালে কেপে মোট দাসের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৭০০ এবং ১৮২৫ সালে ৩২ হাজার ৮৩০। কেপে প্রথম বাঙালি দাসের কথা পাওয়া যায় ১৬৫৬ সালে। তার নাম ক্যাথরিনা অ্যান্থোনিজ। তিনি মুক্তি পেয়েছিলেন এবং তার বিয়ে হয়েছিল এক ডাচ সেনার সঙ্গে। একই বছর আরেক বাঙালি নারী ডোমিঙ্গো এলভিগের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল ডাচ জুনিয়র অফিসার অ্যান্থানি মুলারের। বাঙালিদের এ নামকরণ থেকে ধারণা করা যায়, তারা খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন। কেপে ডাচ উপনিবেশ তৈরির অন্যতম কারিগর ছিলেন নাবিক য়ান ভ্যান রিবেক। ১৬৫৮ সালের ৬ জুলাই তিনি তার জার্নালে উল্লেখ করেছেন ডাচ য়ান সাচারিয়াসের সঙ্গে মারিয়া ভান বেঙ্গালের বিয়ের কথা। এই মারিয়া ছিলেন বাংলা থেকে আসা দাস এবং বিয়ের জন্য সাচারিয়াস তাকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করেছিলেন। মারিয়া ডাচ ভাষায় কথা বলতে পারতেন এবং খ্রিস্টধর্ম সম্পর্কে তার ভালো ধারণা ছিল।

এর পর থেকে বিভিন্ন রেফারেন্সে বাঙালি দাসের উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৭৭১ সালে শেল লিখেছেন, বাংলা থেকে আসা ১০০ নতুন দাস তাদের নতুন ভাষা ও চেহারা দিয়ে স্থানীয় দাসদের মধ্যে চাঞ্চল্য তৈরি করেছিল।

কেপের ডাচ প্রশাসন শুরুর দিকে দাসদের তালিকা ও বিস্তারিত সংরক্ষণে যত্নশীল ছিল না। এ কারণে সেখানে দাসদের পরিচয় উদ্ধারে ইতিহাসবিদেরা বিপাকে পড়েছেন। আর বাঙালি দাসদের বেশির ভাগ যেহেতু বাটাভিয়া থেকে নেয়া হতো তাই উৎসের হদিস পাওয়াটা ছিল আরো জটিল। আর এদের বড় দলে আনা হয়নি। অন্যদিকে জাভা, বালি, বাংলা, করোমানডেল, মালাবার, শ্রীলংকা থেকে যাওয়া দাসদের শারীরিক বৈশিষ্ট্যে খুব বেশি পার্থক্য ছিল না বলে ডাচরা তাদের জাতিগত বিভাগ অনুসারে তালিকা সংরক্ষণে আগ্রহ পায়নি।

ডাচ কর্তৃপক্ষ সাধারণত ভ্যান বেঙ্গল বা ভ্যান বেঙ্গালেন শব্দগুলো যোগ করত বাঙালি দাসদের নামের সঙ্গে। অংশু দত্ত কেপ পুলিশের দলিলে বাঙালি পরিচয়সূচক ডাচদের শব্দের বানান পেয়েছেন অনেকগুলো—Bengaalel, Bengaalen, Bengaals, Bengaalsch, Bengaalsche, Bengaalse, Bengaalsen, Bengaalsse, Bengaels, Bengaelse, Bengale, Bengalen, Bengalle, Bengals, and Bengelan.

বাংলার ইমাম আচমত সম্ভবত স্বেচ্ছায় কেপে গিয়েছিলেন শ্রমিক হিসেবে। কিন্তু তার মৃত্যুর রেকর্ডে উল্লেখ করা হয়েছে যে তিনি একজন মালয়ি। এশীয়দের নাম, জাতি নিয়ে যথেষ্ট ধারণার অভাবই কারণ বলে ধারণা করা যায়। আচমত এক বিবরণীতে নিজেই উল্লেখ করে গিয়েছিলেন যে তার জন্ম বাংলার চিনসুরায়।

ডাচ দাস ব্যবসায়ীদের কাছে দাসদের জাতিগত পরিচয়ের চেয়ে কোত্থেকে তাদের সংগ্রহ করা হয়েছে সেটাই বেশি জরুরি তথ্য ছিল।

বাঙালি দাসদের বংশধরদের শনাক্ত করা একটি কারণে কঠিন হয়ে গিয়েছিল। কারণ দাসদের নামের শেষে ‘বাংলা’ পরিচয়টি যুক্ত থাকলেও তাদের সন্তানদের ক্ষেত্রে তেমনটা হয়নি। তারা কেপে যে স্থানে জন্ম নিয়েছেন সেখানকার নামেই পরিচিত হতেন। যেমন অমুক ভ্যান ডি কাপ। কাগজপত্রে লেখা হতো এমন—

‘the slave Sophie of Bengal and her two children, Louis and Rebecca, both of the Cape’ কিংবা ‘Samieta of Bengal and her child Regina of the Cape.’

কাগজপত্রে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের পর দাসদের নাম বদলে যেত। কোনো দাস মুক্ত হলেও একই ঘটনা ঘটত। এসবের ফলে দাসদের নাম থেকে তাদের পরিচয় উদ্ধারের কাজটি কঠিন হয়ে যায়। আবার একটি নিয়ম ছিল যে নতুন দাসদের মৃত দাসের নামে তালিকভুক্ত করা হতো। অংশু দত্ত কেপের ৭০০-এর বেশি বাঙালি দাস ও ৫০-এর বেশি বাঙালি দাস মালিকের নাম উদ্ধার করেছেন। এরা ১৬৫২ থেকে ১৮৩৪ সালের মধ্যে কেপে গিয়েছিলেন।

অনেক সময় ডাচ মালিকরা দাসদের বাইবেল থেকে নাম দিতেন। অনেকে দিতেন গ্রিক কিংবা রোমান পুরাণ থেকে। হারকিউলিস, কিউপিডের মতো নামও পাওয়া যায় বাঙালি দাসদের ক্ষেত্রে। অনেক সময় দাসদের সংগ্রহের মাস কিংবা দিনের নামও তাদের দেয়া হতো। অংশু দত্ত কিছু অবিকৃত বাঙালি নামও উদ্ধার করতে পেরেছেন—মালতি, কানাই, রবি, মিনা, মনিকা।

 

এসএম রশিদ: লেখক