আফ্রিকায়, আরো নির্দিষ্ট করে বললে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ প্রদেশে, বাঙালি (এবং অন্যান্য ভারতীয়) দাসদের অভিবাসন সম্পর্কে খুব কম তথ্যই পাওয়া গিয়েছে এ পর্যন্ত। শুধু এটুকু জানা যায় প্রক্রিয়াাটি সপ্তদশ শতাব্দীতে শুরু হয়ে ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে অব্যাহত ছিল। মূলত ভারতের তিনটি অঞ্চল থেকে দাস সংগ্রহ করা হতো—বাংলা, করোমানডেল উপকূল ও মালাবার।

এখন অবশ্য বাঙালি দাসরা কেপ সমাজের মানুষের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে মিশে গিয়েছে। কিছু দাস হয়ে উঠেছে শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর অংশ। বাকি সংখ্যাগরিষ্ঠ দাসই শারীরিক আকার ও বর্ণের ওপর নির্ভর করে মিশে গিয়েছে কালো বা বাদামি বর্ণের মানুষের সঙ্গে। এদের কাউকে এখন আর আলাদা করে বাঙালি বলে চিহ্নিত করার উপায় নেই।

কিন্তু সে সময়ে এ ভিন দেশে দাসত্ব করতে নিয়ে যাওয়া বাঙালিদের জীবনযাত্রাটা ঠিক কেমন ছিল? অন্যসব জাতির দাসদের মতো বাঙালি দাসদেরও মেনে চলতে হতো তুলবাগ কোড নামে পরিচিত একটি কঠোর শাস্তিমূলক কোড। ১৭৫৩ সালে কেপ কলোনির গভর্নর রিজক তুলবাগের জারি করা এ কোডে দাসদের জীবনকে বিষিয়ে তুলেছিল কঠোর সব বিধিবিধান দিয়ে। সে কোডের উল্লেখযোগ্য কিছু নিয়মের সংক্ষেপ করলে দাঁড়ায়

দাসদের রাতে গান গাইতে, বাঁশি বাজাতে বা কোনো ধরনের শব্দ করতে দেয়া হতো না। তারা কোনো ধরনের পানশালা বা সরাইখানায় প্রবেশ করতে পারত না। কেপ টাউনের রাস্তায় কথোপকথনের জন্য থামার অনুমতিও ছিল না।

দাসদের সরকারি ছুটির দিনে দলে দলে জমায়েত হওয়ার অনুমতি ছিল না।

দাসদের আগ্নেয়াস্ত্র বহন করা বা তার আধিকারী হওয়ার অনুমতি ছিল না।

দাসদের মধ্যে যারা স্বাধীন মানুষের বিরুদ্ধে কোনো মিথ্যা দাবি বা অপমান করেছিল, তাদের প্রকাশ্যে বেত্রাঘাতের মাধ্যমে শাস্তি ও শৃঙ্খলে আটকে রাখা হয়েছিল।

যেসব দাস তাদের প্রভুদের বিরুদ্ধে কোনো রকম সহিংস আচরণ করেছিল তাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হতো।

এ ধরনের কঠোর শাসনে বাঙালি দাসদের জীবন ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নিয়ন্ত্রিত হতো। এর প্রভাব পড়েছিল তাদের জীবনের অন্যান্য অংশেও।

পারিবারিক জীবন

বেশির ভাগ দাসেরই পারিবারিক জীবন বলতে কিছু ছিল না। এর পেছনে মূল কারণ ছিল দাস জনগোষ্ঠীর নারী ও পুরুষের সংখ্যার অসামঞ্জস্য। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে স্টেলেনবশ শহরে প্রাপ্ত বয়স্ক নারী দাসদের তুলনায় প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ দাসের সংখ্যা প্রায় তিন গুণ বেশি ছিল। এ ভারসাম্যহীনতার কারণে নারী দাস ও খোয়সাই নারীদের সুদৃষ্টি আকর্ষণের জন্য পুরুষ দাসদের মধ্যে চরম ঈর্ষা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার সৃষ্টি করেছিল। তাদের মধ্যে এমনকি কখনো সহিংসতার ঘটনাও ঘটত এ নিয়ে। ১৭৯৭ সালে জানুয়ারি ভ্যান বেঙ্গল নামের এক দাস তার প্রতিদ্বন্দ্বী মোসেস ভ্যান ডি কাপকে ছুরিকাঘাত করেন। পরবর্তী সময়ে বিচারের সম্মুখীন হলে তিনি স্বীকার করেন যে ঈর্ষান্বিত হয়েই কাজটি করেছিলেন। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। স্থিতিশীল পারিবারিক জীবনের অনুপস্থিতিতে ধর্ষণ ও অন্যান্য যৌন অপরাধ কেপ প্রদেশের দাসদের জীবনের নিত্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।


পরিবারসহ কেপ টাউনে আসার সৌভাগ্য হয়েছিল ১ শতাংশেরও কম দাসদের। পরিসংখ্যানটি যদিও কেপের সব দাসের জন্য, তবে এটি সহজেই অনুমেয় যে অনুপাতটি বাঙালি দাসদের ক্ষেত্রেও একই ছিল। তাছাড়া মোজাম্বিক ও মাদাগাস্কারসহ বেশকিছু অঞ্চল থেকে দাসদের দল বেঁধে নিয়ে আসা হয়েছিল। কিন্তু বাঙালি দাসদের আনা হয়েছিল এককভাবে তাদের আত্মীয়-স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন করে। দাসদের এভাবে স্বতন্ত্রভাবে কেনাবেচার পেছনে মূল কারণ ছিল বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের দাস হিসেবে ব্যবহার করা যেত না। এ কারণেই প্রায়ই দাস পরিবারগুলোকে স্থানান্তরের সময়েই বিভক্ত করে ফেলা হতো। অন্যদিকে কিছু প্রভু আবার তাদের দাস পরিবারের ঐক্য রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন তাদের সামগ্রিকভাবে হস্তান্তর বা তাদের নিজের ইচ্ছায় একজনের কাছে দান করে। তবে এ ধরনের ঘটনা দুর্লভ ছিল, বরং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যেত মালিকরা দাসদের স্থিতিশীল পরিবারের ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না।

১৮২৩ সালে প্রণীত একটি আইন দাসদের মাঝে বৈধ বিবাহের অনুমোদন দেয় এবং আদেশ করে যে খ্রিস্টীয় রীতি অনুসারে বিবাহিত দাসদের আলাদাভাবে বিক্রি করা যাবে না। তবে দুর্ভাগ্যবশত খ্রিস্টধর্ম ব্যতীত অন্য ধর্মের রীতি অনুযায়ী বিবাহ এ আইন দ্বারা স্বীকৃত ছিল না। তাছাড়া সেখানকার আইন অনুযায়ী দাসদের বিয়ে করতে হলে তাদের মালিকদের অনুমতি নিতে হতো। আর মালিকরা যে এ ব্যাপারে খুব একটা উৎসাহী ছিলেন না সেটা বোঝা যায়। এজন্যই হয়তো ১৮৩১ সাল পর্যন্ত কেপের দাস সংখ্যা ছিল ৩৫ হাজার আর সেখানে তখন মাত্র তিনটি বৈধ (খ্রিস্টান) বিবাহ নিবন্ধিত হয়েছিল।

যথাযথ বিবাহ আইনের অভাবে অনেক পুরুষ দাসই অন্যান্য নারী দাসী বা গ্রামাঞ্চলের খোয়সাই মহিলাদের সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক স্থাপন করতেন। অন্যান্য জাতিগত সম্প্রদায়ের দাসদের সঙ্গে বাঙালি দাসদের (প্রধানত পুরুষ), যেমন করোমানডেল ও মালাবারের দাস, সিলোনিজ দাস, মালয় ও ইন্দোনেশিয়ান দ্বীপপুঞ্জের বিভিন্ন দ্বীপের দাস এবং মাদাগাস্কার ও মোজাম্বিকের কালো দাসের সম্পর্ক স্থাপনের অনেক উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে এসব সম্পর্কের স্থায়িত্বের কোনো নিশ্চয়তা ছিল না, কেননা যেকোনো সময়েই দাস বা দাসীরা অন্য কোনো মালিকের কাছে বিক্রি হয়ে যেতে পারত।

কাজের ধরন

কেপ টাউনে স্লেভ লজের বাইরে, নারী দাসদের কাজকর্ম মূলত ছিল গৃহস্থালি প্রকৃতির। সাধারণত তারা ঘর পরিষ্কার, কাপড় ধোয়া, রান্না ও শিশুদের দেখাশোনা ইত্যাদি ঘরোয়া কাজেই নিযুক্ত থাকতেন। প্রায়ই তারা তাদের মালিকদের বাড়িতেই বা তার আশপাশে থাকতেন। খামারে কাজ করা দাসদের তুলনায় তাদের জীবনযাত্রা সহজ ছিল বলে মনে করা হয়।

কিছু দাস বিশেষ করে পুরুষ দাসকে কারিগর হিসেবে ব্যবহার করার কথাও জানা যায়। গ্রামাঞ্চলে দাসরা কৃষিকাজে নিয়োজিত ছিল বা খামারের কাজে সাহায্য করত। কিন্তু কিছু দাসকে গরু বা ভেড়া পালনের কাজ দেয়া হয়েছিল। সাধারণত এগুলো ছিল পুরুষদের কাজ এবং সাধারণত মোজাম্বিক ও মাদাগাস্কারের দাসদের এ ধরনের কাজের জন্য পছন্দ করা হতো। এর বাইরেও কাঠমিস্ত্রি, দর্জি, বাজনাদার ইত্যাদি পেশায় বাঙালি দাসদের কাজ করার উল্লেখ পাওয়া গিয়েছে।


কাজের পরিবেশ

দাসদের প্রতি কঠোর আচরণের কথা বিভিন্ন বিবরণে রিপোর্ট করা হয়েছে। দাসদের শারীরিক নির্যাতন ও শ্লীলতাহানি করা ছাড়াও তাদের মালিকরা প্রায়ই তাদের পুনরায় বিক্রির মাধ্যমে পরিত্রাণ পেতেন। যেসব দাস কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত ছিল তাদের শিকল দিয়ে বেঁধে পুনরায় বিক্রি করা হতো। অষ্টাদশ শতাব্দীতে আলেকজান্ডার অব বেঙ্গল নামে পরিচিত এক ১৬ বছর বয়সী বাঙালি দাসকে এমনিভাবে বিক্রি করা হয়েছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।


আবাসস্থল ও জীবন যাপনের অবস্থা

কেপ টাউনের কোম্পানি ক্যাসেলের স্লেভ লজ ও সাধারণ জনগণের বাসা বা গ্রামীণ খামারবাড়িগুলোর আবাসনের মান যথেষ্ট আলাদা আলাদা ধরনের ছিল। জনাকীর্ণ স্লেভ লজে, দাসদের যে অবস্থায় রাখা হয়েছিল সেগুলো মোটেই স্বাস্থ্যসম্মত ছিল না। অন্যদিকে ব্যক্তিমালিকানাধীন সামান্য কিছু দাসকেই নিজস্ব থাকার জায়গাও দেয়া হয়েছিল; আর বাদবাকি সবাই তাদের প্রভুদের বাসভবনের ছাউনি, রান্নাঘর ও বাহির বাড়ির মতো অদ্ভুত সব জায়গায় ঘুমাতেন। সাধারণত দাস নারীরা তাদের সন্তানদের নিয়ে পুরুষদের থেকে আলাদা ঘুমাতেন। এ রকম গোপনীয়তার অনুপস্থিতি দাস জনগোষ্ঠীর মাঝে সুস্থ পারিবারিক জীবন না গড়ে ওঠার আরেকটি প্রধান কারণ ছিল। গ্রামীণ এলাকায় কিছু বড় খামারে দাসদের জন্য আলাদা শোয়ার বাড়ি থাকত। তবে নিলামের সময় দাস ঘরের বর্ণনা থেকে যতদূর জানা গিয়েছে তার থেকে ধারণা করা হয় এসব বাড়িতে নামমাত্র পরিমাণে আসবাবপত্র থাকত। আর সাধারণত খামারের দাসরা খামারের বিভিন্ন জায়গায়, শেড বা বাহির বাড়িতে ঘুমাতেন। মেষপালক ও পশুপালকদের বেলায় গ্রীষ্মের সময় বাইরে খোলা জায়গায় ঘুমানোও অস্বাভাবিক কিছু ছিল না।

 

অনন্যা দাশ: লেখক ও অনুবাদক