অনেক ঐতিহাসিকের মতে, কালাপাহাড় বর্তমান বাংলাদেশের নওগাঁ জেলায় জন্ম নিয়েছিলেন। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, তাকে ঘিরে জাতীয় পর্যায়ে কোনো আলোচনা নেই। এমনকি স্থানীয়রাও তাকে নিয়ে বিশেষ কিছুই জানেন না। নওগাঁ জেলাসহ বাংলাদেশের কোথাও তার কোনো উল্লেখযোগ্য স্মৃতি-নিদর্শন নেই। তাকে নিয়ে এক অদ্ভুত নীরবতা। কালাপাহাড়ের বিতর্কিত চরিত্র এ নীরবতার অন্যতম কারণ হতে পারে। তবে কারণ যা-ই হোক না কেন, কালাপাহাড়ের মতো এত বড় ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের ব্যাপারে এমন নীরবতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। কালাপাহাড়ের উপর থেকে অস্পষ্টতার আবরণ সরানো জন্য তাকে নিয়ে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে গবেষণা হওয়া উচিত। একই সঙ্গে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে নওগাঁ জেলায় কালাপাহাড়ের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো খুঁজে বের করা সম্ভব হলে সেগুলোর সংরক্ষণ জরুরি।

নওগাঁ জেলার নিয়ামতপুর থানাধীন বীরজোয়ান গ্রামের সম্ভ্রান্ত পরিবারের যোদ্ধা ও বলিষ্ঠ জোয়ান কালাপাহাড় ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। (করিম ১৯৯৩ ও আফজল ১৯৭৪)। এ কালাপাহাড় সোলাইমান কররানির প্রধান সেনাপতি ছিলেন। কালাপাহাড়ের নেতৃত্বে উড়িষ্যা যুদ্ধে মুসলমানরা জয়লাভ করে। এ সময় কালাপাহাড় বিখ্যাত জগন্নাথ মন্দির ধ্বংস করেন। (নওগাঁ জেলার ইতিহাস, খোসবর আলী) কালাপাহাড় সুলাইমান কররানি এবং তার ছেলে দাউদ কররানির সেনাপতি ছিলেন।

দাউদ কররানি সম্রাট আকবরের বশ্যতা অস্বীকার করলে ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে রাজমহলে মোগলদের সঙ্গে তার যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে তিনি পরাজিত ও বন্দি হন এবং তার সেনাপতি কালাপাহাড় আহত হন। পরবর্তীকালে ১৫৮৩ খ্রিস্টাব্দের বাংলা ও বিহারে সম্রাট আকবরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হয়। এ বিদ্রোহে কালাপাহাড় অংশগ্রহণ করেন এবং মোগলদের সঙ্গে যুদ্ধে নিহত হন (কালান্তরে নওগাঁ)।

মুসলমান ঐতিহাসিকরা তাকে রাজু নামে অভিহিত করেন। এর প্রকৃত নাম রাজচন্দ্র বা রাজকৃষ্ণ বা রাজ নারায়ণ। কেউ কেউ বলেন কালাপাহাড় ব্রাহ্মণ ছিলেন। কোনো নবাব কন্যার প্রেমে পড়ে মুসলমান ধর্ম পরিগ্রহণ করেন। কালাপাহাড়ের মৃত্যু সম্পর্কে আকবর নামায় এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, ‘যখন মুঘল সেনাপতি মুনিম খান দাউদকে ধরবার জন্য কটকে উপস্থিত হন তখন কালাপাহাড় ও অপর কয়েকজন আফগান সেনা নায়ক কাকশাল অধিকার করেন। কিন্তু অল্পকাল পরেই কালাপাহাড় কালী গঙ্গার তীরে মুঘল বাহিনীর তোপে ভূতল শাহী হন।’ (১৫৮০ খ্রিস্টাব্দ) (সরল বাংলা অভিধান সুবলচন্দ্র মিত্র)

ইতিহাসবিদরা কালা পাহাড়কে একটি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছেন। তাকে চিহ্নিত করা হয়েছে হিন্দু মন্দির, দেবালয় ধ্বংসকারী রূপে। তার নেতৃত্বে সামরিক বাহিনীর সদস্য দ্বারা উড়িষ্যার পুরীর মন্দির, জগন্নাথ মন্দির এবং গুয়াহাটি কামাখ্যা মন্দিরের ক্ষতি হয়েছিল। এ তথ্যগুলো ইতিহাসনির্ভর।

উড়িষ্যার মন্দির ও কামাখ্যা মন্দির ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার চিত্রগুলো যদি দেখি তবে দেখব এ মন্দিরগুলোর মূল কাঠামোগত কোনো ক্ষতিসাধন কালাপাহাড়ের আক্রমণে হয়নি। এ দেবগুলোয় রক্ষিত কয়েকটি মূর্তির ক্ষতি সাধন করে সেখানে রক্ষিত ধনরত্ন ইত্যাদি কালাপাহাড়ের বাহিনী লুণ্ঠন করেছিল।

কালাপাহাড়ের ক্ষেত্রে ইতিহাসবিদরা এ যোদ্ধার সাহস বীরত্বকে যতটা না চিত্রিত করেছেন তার চেয়ে বেশি করে তাকে একজন সাম্প্রদায়িক মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কালাপাহাড়কে মন্দির ধ্বংসকারী বলা হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত ইতিহাস হচ্ছে তিনি মন্দির ধ্বংস করেননি। বরং দেবালয়ে রক্ষিত মূল্যবান ধনরত্ন লুণ্ঠন করেছেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, কামরূপের কামাখ্যা মন্দির, উড়িষ্যার জগন্নাথ মন্দিরসহ পুরীর মন্দিরগুলোর মূল কাঠামো কালাপাহাড়ের অভিযানের পরও অক্ষত ছিল। মূর্তিগুলোর মধ্যে রক্ষিত স্বর্ণসহ মূল্যবান সম্পদ আহরণের জন্যই মূর্তিগুলো ধ্বংস করা হয়।

কালাপাহাড়ের প্রকৃত পরিচয় হচ্ছে তিনি একজন দেশপ্রেমিক বাঙালি। জাতীয় কবি এ বীরের পরিচয় জানতেন বলেই তার বিখ্যাত মানুষ কবিতায় বললেন, ‘কোথা চেঙ্গিস, গজনি মামুদ, কোথায় কালাপাহাড়, ভেঙে ফেল ওই ভজনালয়ের যত তালা দেয়া দ্বার।’ 

কবি এখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারী হিসেবে কালাপাহাড়কে সামনে এনেছেন। কালাপাহাড় আমাদের গর্ব, বরেন্দ্রের গর্ব, তার নাম হোক অক্ষয় অম্লান। (বরেন্দ্র, কৈবর্ত বিদ্রোহ ও রামাবতী নগরী মাহবুব সিদ্দিকী)


শরিফুল ইসলাম খান: সাবেক অধ্যক্ষ

নওগাঁ সরকারি কলেজ, নওগাঁ