শুনিছ না—ওই দিকে দিকে কাঁদে রক্ত-পিশাচ প্রেতের দল! 

শবভুক্ যত নিশাচর করে জগৎ জুড়িয়া কী কোলাহল!

দুর-মশালের তপ্ত-নিশাসে ঘামিয়া উঠিছে গগন-শিলা!

ধরণীর বুক থরথরি’ কাঁপে—একি তাণ্ডব নৃত্য-লীলা!

এতদিন পরে উদিল কি আজ সুরাসুরজয়ী যুগাবতার?—

মানুষের পাপ করিতে মোচন, দেবতারে ‘হানি’ ভীম প্রহার, 

—কালাপাহাড়!


বংশ যাহার বলি যোগাইল যূপে, যুগে-যুগে, ভয়-বিভল—

জাগিয়াছে তারি বীর-সন্তান হুঙ্কারে ভরি’ জলস্থল!

পথে পথে ওই গিরি নুয়ে যায়, কটাক্ষে রবি অস্তমান! 

খড়্গ তাহার থির-বিদ্যুৎ!—ধূলি-ধ্বজা তার মেঘ-সমান! 

সেই আসে ওই!—বাজে দুন্দুভি, তামার দামামা, কাড়া-নাকাড়!

এতদিন পরে উদিল কি আজ সুরাসুরজয়ী যুগাবতার! 

—কালাপাহাড়।

পাষাণ-পুরীর খিল খুলে যায়, দূর হ’তে শুনি’ হুহুঙ্কার। 

পূজাবেদী-মূলে হেম-তৈজস ঝঙ্কার করে আশঙ্কার!

বেগে বাহিরায় লৌহ-কীলক বিরাট দেউল-কপাট-পাটে! 

আঁধার-গহ্বরে জাগে হাহাকার, বিগ্রহ-শিলা আপনি ফাটে।

পূজারী-পাণ্ডা ঝাণ্ডা নামায়ে প্রাঙ্গণ-তলে খায় আছাড়! 

ওই আসে—ওই, বাজায়ে দামামা, ভীম-নির্ঘোষ কাড়া-নাকাড়, 

—কালাপাহাড়!


অকাল-জলদ-উদয় যেন সে উদিয়াছে কাল।—কালাপাহাড়! 

ডাকিনীরা ওই দলে দলে চলে, গলে দোলে নর-কপাল-হাড়! 

রক্ত-শোষণ পাপ-বিভীষিকা, প্রাণ-শিহরণ মন্ত্র-গান,

আঁখি মুদি’ ভয়ে জপ অনিবার, অন্ধ-আরতি, প্রদীপ-দান—

ঘুচাইতে আসে মহাভয়হারী দেবারি-মানব যুগাবতার—

ঘুচাবে কায়ার ছায়া-শৃঙ্খল, চূর্ণ করিবে পাষাণ-ভার! 

—কালাপাহাড়!


কতকাল পরে আজ নর-দেহে শোণিতে ধ্বনিছে আগুন-গান!

এতদিন শুধু লাল হ’ল বেদী—আজ তার শিখা ধূমায়মান!

আদি হ’তে যত বেদনা জমেছে—বঞ্চনাহত ব্যর্থশ্বাস—

ওই উঠে তারি প্রলয়-ঝটিকা, ঘোর-গৰ্জ্জন মহোচ্ছ্বাস!

ভয় পায় ভয়! ভগবান ভাগে!—প্রেতপুরী বুঝি হয় সাবাড়!

ওই আসে—তার বাজে দুন্দুভি, তামার দামামা, কাড়া-নাকাড়! 

—কালাপাহাড়!

কোটী-আখি-ঝরা অশ্রু-নিঝর ঝরিল চরণ-পাষাণ-মূলে, 

ক্ষয় হ’ল শুধু শিলা-চত্বর—অন্ধের আঁখি গেল না খুলে! 

জীবের চেতনা জড়ে বিলাইয়া আধারিল কত শুক্ল নিশা!

রক্ত-লোলুপ লোল-রসনায় দানিল নিজেরি অমৃত-তৃষা!

আজ তারি শেষ! মোহ অবসান!—দেবতা-দমন যুগাবতার 

আসে ওই! তার বাজে দুন্দুভি—বাজায় দামামা, কাড়া-নাকাড়!

—কালাপাহাড়!


বাজে দুন্দুভি, তামার দামামা—বাজে কি ভীষণ কাড়া-নাকাড়!

অগ্নি-পতাকা উড়িছে ঈশানে দুলিছে তাহাতে উল্কা-হার!

অসির ফলকে অশনি ঝলকে—গলে’ যায় যত ত্রিশূল-চূড়া!

ভৈরব রবে মূর্চ্ছিত ধরা, আকাশের ছাদ হয় বা গুঁড়া! 

পূজারী অথির, দেবতা বধির—ঘণ্টার রোলে জাগে না আর! 

অরাতির দাপে আরতি ফুরায়—নাম শুনে হয় বুক অসাড়!

—কালাপাহাড়!


নিজ হাতে পরি’ শিকলি দু’পায় দুর্ব্বল করে যাহারে নতি,

হাত জোড় করি’ যাচনা যাহারে, আজ হের’ তার কি দুর্গতি?

কোথায় পিনাক? ডমরু কোথায়? কোথায় চক্র সুদর্শন?

মানুষের কাছে বরাভয় মাগে মন্দির-বাসী অমরগণ!

ছাড়ি’ লোকালয় দেবতা পলায় সাত-সাগরের সীমানা-পার! 

ভয়ঙ্করের ভুল ভেঙে যায়! বাজায় দামামা, কাড়া-নাকাড়

—কালাপাহাড়!


কল্প-কালের কল্পনা যত, শিশু-মানবের নরক-ভয়—

নিবারণ করি’ উদিল আজিকে দৈত্য-দানব-পুরঞ্জয়!

দেহের দেউলে দেবতা নিবসে—তার অপমান দুৰ্ব্বিষহ! 

অন্তরে হ’ল বাহিরের দাস মানুষের পিতা প্রপিতামহ! 

স্তম্ভিত হৃদ্‌পিণ্ডের’ পরে তুলেছে অচল পাষাণ-ভার— 

সহিবে কি সেই নিদারুণ গ্লানি মানবসিংহ যুগাবতার 

—কালাপাহাড়!


ভেঙে ফেল’ মঠ-মন্দির-চূড়া, দারু-শিলা কর নিমজ্জন!

বলি-উপচার ধূপ-দীপারতি রসাতলে দাও বিসর্জ্জন!

নাই ব্রাহ্মণ, ম্লেচ্ছ-যবন, নাই ভগবান—ভক্ত নাই, 

যুগে যুগে শুধু মানুষ আছে রে! মানুষের বুকে রক্ত চাই!

ছাড়ি’ লোকালয় দেবতা পলায় সাত-সাগরের সীমানা-পার!

ভয়ঙ্করের ভয় ভেঙে যায়,—বাজায় দামামা, কাড়া-নাকাড়,

—কালাপাহাড়!


ব্রাহ্মণ-যুবা যবনে মিলেছে, পবন মিলেছে বহ্নিসাথে!

এ কোন্ বিধাত! বজ্র ধরেছে নবসৃষ্টির প্রলয়-রাতে! 

মরুর মর্ম্ম বিদারি’ বহিছে সুধার উৎস পিপাসাহরা!

কল্লোলে তার বন্যার রোল!—কুল ভেঙে বুঝি ভাসায় ধরা!

ওরে ভয় নাই!—মুকুটে তাহার নবারুণ-ছটা, ময়ুখ-হার!

কাল-নিশীথিনী লুকায় বসনে!—সবে দিল তাই নাম তাহার 

—কালাপাহাড়!


শুনিছ না ওই—দিকে দিকে কাঁদে রক্ত-পিশাচ প্রেতের পাল!

দূর-মশালের তপ্ত-নিশাসে ঘামিয়া উঠিছে গগন-ভাল!

কার পথে-পথে গিরি নুয়ে যায়! কটাক্ষে রবি অস্তমান!

খড়্গ কাহার থির-বিদ্যুৎ! ধূলি-ধ্বজা কার মেঘ-সমান!

ভয় পায় ভয়! ভগবান ভাগে! প্রেতপুরী বুঝি হয় সাবাড়!

ওই আসে! ওই বাজে দুন্দুভি—বাজায় দামামা, কাড়া-নাকাড়

—কালাপাহাড়!


[সূত্র: মোহিতলাল কাব্যসম্ভার, মিত্র ও ঘোষ, ১৩৬৭ ব.। পৃ. ১৩৬-১৩৯)


গৌড়ের সোনামসজিদ। ছবি: গৌড়: ইটস রুইনস অ্যান্ড ইন্সক্রিপশন,

জন হেনরি র‍্যাভেনশ, ১৮৭৮