ইতিহাসে কালাপাহাড় এক বিতর্কিত চরিত্র। তার প্রকৃত পরিচয় নিয়ে যেমন ধোঁয়াশা আছে, তেমনি তার বিভিন্ন যুদ্ধাভিযান নিয়েও নানা গল্প প্রচলিত। এসব গল্পে অতিরঞ্জন আছে। তাকে বলা হয় ‘আইকনোক্লাস্ট’, প্রতিমা ধ্বংসকারী। কালাপাহাড় মানেই ধ্বংসাত্মক কিছু। বলা হয়, সমগ্র উড়িষ্যায় অবস্থিত অসংখ্য মন্দির তিনি আক্রমণ করেছেন। বিগ্রহগুলো ধ্বংস করেছেন। মন্দিরগুলোয় সংরক্ষিত সম্পদ হরণ করেছেন। এসব গল্পে সত্য কতটুকু, তা বিতর্কযোগ্য। কিন্তু তা সত্ত্বেও কালাপাহাড়ের নেতিবাচক ইমেজ তৈরি হতে কোনো সমস্যা হয়নি। বিশেষ করে পুরির জগন্নাথ মন্দির আক্রমণ ও সেখানকার বিগ্রহ ধ্বংসের প্রচেষ্টার জন্য ইতিহাসে কালাপাহাড় কুখ্যাত হয়ে আছেন। ‘মাদল পঞ্জি’ নামক জগন্নাথ মন্দিরের ঘটনাপঞ্জিতে এর উল্লেখ আছে। তখন জগন্নাথ মন্দিরের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন দিব্য সিংহ। কালাপাহাড়ের অভিযানের খবর পেয়ে তিনি মন্দির থেকে জগন্নাথের প্রতিমাটি অন্যত্র লুকিয়ে ফেলেছিলেন। জগন্নাথ মন্দিরের নিকটবর্তী খুরদা গ্রাম থেকে পাওয়া একটি পাণ্ডুলিপির তথ্যানুসারে, কালাপাহাড় জগন্নাথ মন্দির আক্রমণ করার পর সেখানে জগন্নাথের বিগ্রহ দেখতে না পেয়ে চারপাশে খোঁজ লাগান। তখন ঘরের শত্রু বিভীষণ হয়ে এগিয়ে আসেন কোকলো (খুরদার নিকটবর্তী একটি গ্রাম) গ্রামের হেডম্যান দানপাহান্ত সিং। তিনি কালাপাহাড়ের সঙ্গে দেখা করে জগন্নাথের প্রতিমা কোথায় লুকানো আছে তা জানিয়ে দেন। তার নির্দেশনা অনুসারে কালাপাহাড় প্রতিমাটি খুঁজে পান। ‘মাদল পঞ্জি’-তে উল্লেখ আছে, ‘কালাপাহাড় হাতির পিঠে করে বিগ্রহটি ফিরিয়ে আনেন। তিনি জগন্নাথ মন্দিরের সম্পদ লুট করেন। মন্দিরের প্রতিটি প্রতিমা তিনি ধ্বংস করেন। পবিত্র কল্পতরু খুঁড়ে বের করেন এবং পুড়িয়ে ফেলেন।’ সম্রাট আকবরের অন্যতম সভাসদ আবুল ফজল তার ‘আইন-ই-আকবরি’ গ্রন্থে লেখেন, ‘সোলায়মান কররানির সেনাপতি কালাপাহাড় উড়িষ্যা বিজয় করে বিগ্রহটি আগুনে নিক্ষেপ করে পুড়িয়ে ফেলেন। তারপর সেটি সাগরে ছুড়ে ফেলেন।’ মোগল আমলের ঐতিহাসিক আবদুল কাদির বাদায়ুনির ‘মুনতাখাব-উত-তাওয়ারিখ’ গ্রন্থের তথ্যানুসারে, সোলায়মান কররানির সেনাপতি কালাপাহাড় কটক ও বেনারস জয় করেন। এগুলো হিন্দুদের অন্যতম পবিত্র ভূমি। তিনি সেখানে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। 

কালাপাহাড়ের আক্রমণের ফলে জগন্নাথ বিগ্রহের কী গতি হয়েছিল, তার আরেকটি বর্ণনা ‘মাদল পঞ্জি’-তে উল্লেখ আছে। সে বর্ণনা অনুসারে, কালাপাহাড় জগন্নাথের মূর্তিকে বহন করে গঙ্গার ঘাটে নিয়ে যান। সেখানে তিনি মূর্তিটি পোড়ানোর চেষ্টা করেন। তখন একটি অলৌকিক ঘটনা ঘটে। তার শরীর অত্যন্ত দুর্বল হয়ে যায়। হাঁটুর কাছে ভাঁজ হয়ে মাটিতে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। এ অবস্থা দেখে কালাপাহাড় আতঙ্কিত হয়ে যান। তিনি তৎক্ষণাৎ অর্ধদগ্ধ মূর্তিটি গঙ্গায় ছুড়ে ফেলেন। (‘মাদল পঞ্জি’র তথ্যানুসারে, জগন্নাথের অভিশাপে তখনই গঙ্গার তীরে কালাপাহাড়ের মৃত্যু ঘটে। কিন্তু এ তথ্য ঠিক নয়। ‘আকবরনামা’য় উল্লেখিত ঐতিহাসিক বিবরণী অনুসারে, মোগল সম্রাট আকবরের সেনাপতি খান-ই-আজমের বিরুদ্ধে এক যুদ্ধে কালাপাহাড় নিহত হন। তখন ১৫৮৩ সাল।) এক মুসলিম আমির এটি নদী থেকে উদ্ধার করে ঘরে রাখেন। বিসারা মোহন্তি নামে উড়িষ্যার এক সন্ন্যাসী ওই আমিরের কাছ থেকে পোড়া মূর্তিটি উদ্ধার করেন। তিনি মূর্তির ভেতরে থাকা পবিত্র বস্তু সন্তর্পণে বের করে তা কুজাং নামের একটি গ্রামে সংরক্ষণ করেন। ‘মাদল পঞ্জি’ অনুসারে, রাজা রামচন্দ্র দেব সে পবিত্র বস্তু সংগ্রহ করেন। রামচন্দ্র পুরির দক্ষিণ দিকের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত ছোট একটি রাজ্যের রাজা ছিলেন। খুরদা ছিল তার রাজধানী। ১৫৭৫ সালের ১৭ জুলাই তিনি আড়ম্বর ও জাকজমকের সঙ্গে জগন্নাথ মন্দিরে পুনরায় বিগ্রহ স্থাপন করেন। আফগান সুলতান দাউদ কররানির রাজত্বকাল পর্যন্ত উড়িষ্যায় মুসলিমদের প্রভাব ছিল। কিন্তু মোগল সেনাপতি খান-ই-খানান মুনিম খানের হাতে দাউদ কররানি পরাজিত হওয়ার পর রামচন্দ্র জগন্নাথ মন্দিরে পুনরায় প্রতিমা স্থাপনের সুযোগ পেয়েছিলেন। তবে এসবই জগন্নাথ মন্দিরের ঘটনাক্রম ‘মাদল পঞ্জি’র বিবরণী। এগুলো নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক আছে। এটিও বলা হয়, জগন্নাথ মন্দিরে পুনরায় বিগ্রহ স্থাপনের কৃতিত্ব আসলে রাজা টোডরমলের। তিনি মুনিম খানের সেনাবাহিনীর ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ ছিলেন। দাউদ কররানির সঙ্গে মুনিম খানের সন্ধি হয়েছিল। সন্ধির একটি শর্ত হিসেবে রাজা টোডরমল জগন্নাথের বিগ্রহ পুনরায় স্থাপনের কথা বলেন। কিন্তু এটি বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ সমসাময়িক ইতিহাস গ্রন্থগুলোয় এমন কিছুর উল্লেখ নেই। জগন্নাথ মন্দিরে পুনরায় বিগ্রহ স্থাপনের ব্যাপারে আরেকটি ধারণাও প্রচলিত। ১৫৯১ সালে সেনাপতি মানসিংহের নেতৃত্বে উড়িষ্যা যখন সম্পূর্ণরূপে মোগলদের দখলে, তখনই জগন্নাথ মন্দিরে পুনরায় বিগ্রহ স্থাপন করা সম্ভব হয়েছিল। তারপর থেকেই সেখানে পুনরায় পূজা শুরু হয়। জগন্নাথ মন্দির ফিরে পায় তার হারানো ঐতিহ্য।

মোহাম্মদ রবিউল হোসাইন: লেখক