আরবদের মধ্যে যখন সচ্ছলতার আবির্ভাব ঘটল, তখন পারস্য ও রোমের সংগীতবিদরা হেজাজে চলে আসলেন। সারাঙ্গী, তানপুরা, বীণা ও বাঁশিসহযোগে গান গাইতে শুরু করলেন। সে সুর আরবরা তুলে নিল নিজেদের কবিতাগুলোয়। মদিনায় নাশিত ফারেসি, তোয়েস ও সায়িবের মতো গুণীরা আভির্ভূত হলেন। আরবদের কবিতায় সুর দিয়ে পেলেন অদ্ভুত সাফল্য। চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল তাদের নাম।

(আল মুকাদ্দিমা, ইবনে খালদুন)

 

 

মুসলিম সংগীতচর্চার ইতিহাসে প্রথম দিকের পরিচিত নাম নাশিত ফারেসি। পারসিক বংশোদ্ভূত এ গায়ক আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর ইবনে আবি তালিবের দাস হিসেবে মদিনায় বেড়ে ওঠেন। পারসিক ধাঁচে গাওয়া তার গান ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় সে যুগে। তার ছাত্র মাবাদ ও ছাত্রী আযযাহ আল মাইলা পরবর্তী সময়ে খ্যাতি অর্জন করেন। অন্যদিকে সায়িব কাসির (মৃত্যু-৬৮৩ খ্রি.) ছিলেন নাশিত থেকে প্রভাবিত। খলিফা মুয়াবিয়ার আমলে তার সামনেই গান পরিবেশন করেন ইয়াজিদের জন্য। সায়িব ছিলেন পারসিক বংশোদ্ভূত মাওয়ালি এবং পেশায় গম ব্যবসায়ী। হেজাজ ও মদিনায় তখন সংগীতের যে পাটাতন প্রস্তুত হচ্ছিল, প্রথম সারিতে থেকে তার নেতৃত্ব দিয়েছেন সায়িব। তার মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হয় সংগীতচর্চার দরবারি ঐতিহ্য। আরবি কবিতার সঙ্গে পারসিক যন্ত্র ও সুরের সমাবেশে তৈরি হয় নতুন সংগীত ধারা।

মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন আফ্রিকান বংশোদ্ভূত ইবনে মিসজাহ। উমাইয়া খলিফা আল ওয়ালিদের (৭০৫-৭১৫) সময় সংগীতে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিনি। আরবি, ফারসি ও বাইজেন্টাইন রীতির সুষম মিশেল ঘটে তার প্রচেষ্টায়। এই যুগেই মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন মা’বাদ বিন ওয়াহহাব (মৃত্যু-৭৪৪)। বস্তুত তিনি নাশিত ফারেসি, সায়িব কাসির ও ইবনে মিসজাহ—সবার কাছেই সংগীতের পাঠ নেন। ফলে আরব সংগীতের মাইলফলক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে বেগ পেতে হয়নি। মক্কা ও মদিনায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল তার নাম।

ইউনুস আল কাতিব আল মুগান্নিকে বলা যায় প্রথম বড় তাত্ত্বিক। হিজরি দ্বিতীয় শতকের প্রথম ভাগে মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন। জুবাইর ইবনে আওয়ামের (রা.) পরিবারে মাওয়ালি ছিলেন তিনি। ছোটবেলা থেকে কবিতায় দক্ষতা থাকলেও সংগীতে পাঠ নেন মা’বাদের কাছে থেকে। উমাইয়া খলিফা হিশামের (৭২৪-৭৪৩ খ্রি.) যুগে লাভ করেন চূড়ান্ত খ্যাতি। সেই খ্যাতি এতটাই উঁচুতে পৌঁছেছিল যে পরবর্তী প্রজন্ম তার সংগীতের ধরনকে অনুসরণ করতে থাকে ‘গিনা জায়ানিবি’ নামে। সংগীত নিয়ে লেখা তার কয়েকটি গ্রন্থ বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে। মদিনা কেন্দ্রিক সংগীত নিয়ে ‘কিতাবুন নাগাম’, বিখ্যাত নারী সংগীতকারদের নিয়ে ‘কিতাবুল কিয়ান’ এবং নিজের লেখা গানের সংকলন ‘কিতাবুল মুজাররাদ ইউনুস’ তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

ইবরাহিম আল মাউসিলি (৭৪২-৮০৪ খ্রিস্টাব্দ) সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সংগীতবিশারদদের একজন। কুফাতে জন্মগ্রহণ করলেও পিতার মৃত্যুর পর মসুল চলে যান সংগীতচর্চার জন্য। সেখান থেকেই নামের সঙ্গে মাউসিলি যুক্ত হয়। আব্বাসীয় খলিফা আবু জাফর আল মানসুরকে (৭৫৪-৭৭৫ খ্রিস্টাব্দ) গান শুনিয়ে দরবারে বিশেষ মর্যাদা অর্জন করেন। পরবর্তী খলিফা আল মাহদি (৭৭৫-৭৮৫ খ্রিস্টাব্দ) এবং হাদির (৭৮৫-৭৮৬ খ্রিস্টাব্দ) দরবারেও ছিলেন সমাদৃত। দরবারকে কেন্দ্র করে সংগীতের প্রশিক্ষণ চালু হয় তার তত্ত্বাবধানে। খলিফা হারুন-অর-রশিদ (৭৮৬-৮০৯ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন শিল্পের পৃষ্ঠপোষক। তিনি ইবরাহিম আল মাউসিলি এবং ইবনে জামিকে নির্বাচিত ১০০ গানের সংকলন তৈরির দায়িত্ব দেন; এ সংকলনই পরবর্তী সময়ে ‘কিতাবুল আগানি’ তৈরির অনুপ্রেরণা দিয়েছে আবুল ফারাজ ইসফাহানিকে। ইবরাহিম ছিলেন ধ্রুপদী হেজাজি ঘরানার; অন্যদিকে ইবনে জামি আধুনিকতাবাদী। ইবনে জামির প্রকৃত নাম আবুল কাসিম ইসমাইল। কুরাইশ বংশের শাহম গোত্রে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে বাগদাদে দরবারে পৃষ্ঠপোষকতা পান।

ইসহাক আল মাউসিলি (মৃত্যু-৮৫০) ছিলেন ইবরাহিম আল মাউসিলির পুত্র। সংগীতের ওপর ৪০টির মতো গ্রন্থ এবং প্রায় ৪০০ গান রচনা করেন তিনি। বিশিষ্ট আরব সংগীতজ্ঞ জিরিয়াব তার ছাত্র। জিরিয়াবের পূর্ণ নাম আবুল হাসান আলি ইবনে নাফি। শুধু মুসলিম সংগীতকার হিসেবে না; খোদ সংগীতের ইতিহাসে তার মতো প্রতিভা বিরল। ৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে ইরাকে জন্মগ্রহণ করেন। আন্দালুসিয়ায় তখন উমাইয়া শাসক আল হাকিমের আমন্ত্রণে কর্ডোবাতে গিয়ে থিতু হন। কেবল সংগীতে না, ভূমিকা রেখেছেন আন্দালুসিয়ার সাংস্কৃতিক অভিমুখ নির্ধারণেও। সংগীতে পাশ্চাত্য সঙ্গে প্রাচ্য ঘরানার মধ্যে তৈরি হয় নতুন সম্পর্ক। তার পরিচয় করিয়ে দেয়া নতুন বাদ্যযন্ত্র, পুনর্গঠন করা সংগীতের পরিমাপ পদ্ধতি এবং সংগীতবিষয়ক তাত্ত্বিক আলোচনা কয়েক শতক ধরে চর্চিত হয়েছে পরবর্তী ইউরোপে। ইতিহাসে তিনিই প্রথম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সংগীতচর্চাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান করেন।

কর্ডোবার উমাইয়া শাসক তৃতীয় মুহম্মদের (১০২৪-২৫ খ্রিস্টাব্দ) কন্যা ছিলেন ওয়াল্লাদা বিনতে আল-মুসতাকফি। কাব্য ও সংগীতে ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তার সঙ্গে ইবনে জায়দুনের রোমান্টিক সম্পর্কের খবর ঐতিহাসিক মহলে বেশ সুপরিচিত। ইবনে জায়দুন নিজেও ছিলেন আন্দালুসের আধুনিক ধারার কবি। দুর্ভাগ্যক্রমে দুজনেই বেড়ে উঠেছেন কর্ডোবার পতনের যুগে।

প্রাথমিক যুগে আরব তাত্ত্বিকরা সংগীতের উপরে লেখা পিথাগোরাস ও অ্যারিস্টটলসহ বিভিন্ন গ্রিক এবং লাতিন লেখকের পুস্তক অনুবাদ করেন। উন্নতি সাধন করেন সংগীতবিষয়ক সেই সব তত্ত্বে। অবসাদ, দুশ্চিন্তা, রাগসহ নানা রকম মানসিক চিকিৎসার ওষুধ হিসেবেই কদর পেয়েছে নানা ঘরানার সংগীত। গড়ে উঠেছে বিন্যাস ও পদ্ধতিগত আলোচনা। সংগীতের পদ্ধতিগত আলোচনায় এখন পর্যন্ত ইউনুস আল কাতিবকেই সামনে রাখেন ঐতিহাসিকরা। তারপর আসে আরবি ছন্দশাস্ত্রের জনক আল-খলিলের নাম। আল-খলিল ইবনে আহমদ আল ফরহাদি ৭১৮ সালে বর্তমান ওমানে জন্মগ্রহণ করেন। কিতাবুল আইন, কিতাবুল ফিহরিস্ত ও কিতাবুল মুয়াম্মা তার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। তিনিই প্রথম প্রণয়ন করেন আরবি ভাষার অভিধান। সংগীতবিষয়ক তার তত্ত্ব পরবর্তী সময়ে আব্বাস ইবনে ফিরনাস (৮১০-৮৮৭ খ্রিস্টাব্দ) আন্দালুসিয়ায় প্রসার ঘটান। অন্যদিকে ইবনে আল মুনাজ্জিম (মৃত্যু-৯১২) ‘রিসালাহ ফিল মুসিকা’ গ্রন্থে সংগীতের তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করেন। যদিও তত্ত্বগুলো ইসহাক আল মাউসিলি থেকে প্রভাবিত।

বাগদাদ তখন জ্ঞানচর্চার তীর্থস্থান। অষ্টম থেকে দশম শতাব্দীতে সংগীত ও স্বরবিজ্ঞানের ওপর লেখা অনেক গ্রিক ও সিরিয়াক রচনা অনূদিত হয় আরবিতে। সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন আসিরীয় পণ্ডিত ইউহান্না ইবনে আল বাতরিক (মৃত্যু-৮১৫), হুনাইন ইবনে ইসহাক (মৃত্যু-৮৭৩) ও সাবিত ইবনে কুররা (মৃত্যু-৯০১)। আরব চিন্তায় প্রবেশ করে পিথাগোরাস, অ্যারিস্টটল, প্লেটো, অ্যারিস্টোজেনাস, গ্যালেন ও সিমপ্লিসিয়াসের সংগীতবিষয়ক বিভিন্ন মতবাদ। কেবল সাবিত ইবনে কুরার সংগীতবিষয়ক গ্রন্থের সংখ্যাই আট।

সমসাময়িক ছিলেন আল কিন্দী (মৃত্যু-৮৭৩)। আরব দর্শনের জনক হিসেবে পরিচিত এ পণ্ডিত কেবল সংগীত নিয়েই সাতটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। অন্তত তিনটি এখনো সংরক্ষিত। ‘দি এসেনশিয়ালস অব নলেজ ইন মিউজিক’, ‘অন দ্য মেলোডিজ’ এবং ‘দ্য নেসেসারি বুক ইন দ্য কম্পোজিশন অব মেলোডিজ’। সংগীতকে তিনি গণিত শাস্ত্রের চমত্কার শাখা হিসেবে প্রশংসা করেছেন। শরীর ও মনের চিকিৎসার জন্য ডাক্তারদের এ ব্যাপারে পরমর্শও দিয়েছেন। তার ছাত্রদের মধ্যে আল সারাকশি (মৃত্যু-৮৯৯), মানসুর ইবনে তালহা (মৃত্যু-৯১০) ও ইবনে তাহিরের (মৃত্যু-৯১৩) নাম বেশ সমাদৃত। জ্ঞানচর্চার গুপ্ত সংগঠন ‘ইখওয়ানুস সাফা’ তাকে অনুসরণ করেই সংগীতের আলোচনা লিপিবদ্ধ করেন ‘রাসায়েলে ইখওয়ানুস সাফা’ বিশ্বকোষে। এই দিক থেকে পিছিয়ে থাকনেনি সেই সময়ের জনপ্রিয় দার্শনিক আবু বকর আল রাজি (মৃত্যু-৯২৫)। সংগীতের ওপর তিনি লেখেন ‘কিতাব ফি জুমাল আল মুসিকা’।

আবু নসর আল ফারাবি (মৃত্যু-৯৫০)—পরিচিত ছিলেন ‘আল মুয়াল্লিমুস সানি’ বা দ্বিতীয় শিক্ষক হিসেবে। ফারব অঞ্চলে জন্মের কারণে নামের সঙ্গে ফারাবি যুক্ত। দর্শন, মনোবিজ্ঞান, যুক্তিবিদ্যা ও আলকেমির পাশাপাশি সংগীত নিয়েও তার জ্ঞান ছিল প্রগাঢ়; তার প্রমাণ ‘কিতাবুল মুসিকা আল কাবির’। ইতিহাসে মুসলমানদের উত্থান থেকে তার সময়কাল পর্যন্ত তাত্ত্বিকভাবে সংগীতে সবচেয়ে বড় অবদান এ গ্রন্থ। গ্রিক লেখকরা কিংবা পূর্ববর্তী দার্শনিক আল-কিন্দির প্রভাবকে ছাপিয়ে গিয়ে দাঁড় করান মৌলিক মতবাদ। ‘স্টাইলস ইন মিউজিক’ এবং ‘অন দ্য ক্ল্যাসিফিকেশন অব রিদম’ গ্রন্থগুলোয় তার মৌলিকতার ছাপ স্পষ্ট। এছাড়া ‘ক্ল্যাসিফিকেশন অব দ্য সায়েন্সেস’ এবং ‘দ্য অরিজিন অব দ্য সায়েন্সেস’ গ্রন্থ দুটিতেও আলোচনা করেন সংগীত নিয়ে। কেবল তাত্ত্বিক ছিলেন না ফারাবি, নিজেও চর্চা করতেন।

মুহম্মদ ইবনে আহমদ আল খাওয়ারিজমি (মৃত্যু-৯৮০) সামানীয় শাসনামলে উজিরের পদে আসীন ছিলেন। তার রচিত ‘মাফাতিহুল উলুম’ গ্রন্থে এসেছে সংগীত প্রসঙ্গ। কাছাকাছি সময়েই ছিলেন আবুল ওয়াফা আল বুজজানি (মৃত্যু-৯৯৮)। ত্রিকোণমিতিতে সেক্যান্ট এবং কোসেক্যান্ট ধারণা প্রবর্তনের জন্য তিনি খ্যাতি লাভ করলেও সংগীত নিয়ে নীরব থাকেননি। ‘মুখতাসারু ফিল ফান আল ইকা’ গ্রন্থে তিনি আলোচনা করেন সুর ও সংগীতের তত্ত্ব নিয়ে।

ঐতিহাসিকরা ইবনে সিনাকে (৯৮০-১০৩৭ খ্রিস্টাব্দ) চিকিৎসাবিজ্ঞানী আর দার্শনিকদের তালিকায় দেখে অভ্যস্ত। বাস্তবিক অর্থেই আধুনিক যুগের আগ অব্দি ইবনে সিনার মতো প্রভাবশালী দার্শনিক প্রাচ্য বা পাশ্চাত্যে খুব অল্প ছিলেন। তার লেখা ৪৫০টি গ্রন্থের মধ্যে ২৪০টি এখনো সুরক্ষিত। সেখানে সংগীতশাস্ত্র নিয়ে আলোচনা নেহাত কম না। ‘কিতাবুশ শিফা’ গ্রন্থের ‘ফান’ অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে সংগীত। প্রসঙ্গ এসেছে ‘কিতাবুন নাজাত’-তেও। সংগীতকে তিনি অনেক রোগের ওষুধ হিসেবে গণ্য করতেন। ইবনে সিনার ছাত্র ছিলেন আবু মানসুর ইবনে জাইলাহ (মৃত্যু-১০৪৮)। তিনি লেখেন ‘কিতাব আল কাফি ফিল মুসিকা’। শুধু সংগীতকে উপজীব্য করে সমৃদ্ধ ও সম্পূর্ণ গ্রন্থ।

হাসান ইবনে আল হাইসাম (৯৬৫-১০৪০ খ্রিস্টাব্দ) গণিত ও আলোকবিজ্ঞানে বিশেষ অবদানের জন্য পরিচিত। তিনি ইউক্লিডের রচনায় টীকা যুক্ত করেন। সংগীত নিয়ে তার রচনা ‘মাকালাহ ফি শরহি আল আরমুনিকি’ ও ‘রিসালাহ ফি তাসিরাতুল লুহুন আল মুসিকিয়াহ ফিল নাফুসু আল হায়ওয়ানিয়্যাহ’। দ্বিতীয় গ্রন্থ এ কারণে গুরুত্বপূর্ণ, তাতে প্রাণীর মনে ও আত্মায় সংগীতের প্রভাব নিয়ে আলোচিত হয়েছে।

মানুষের আকাশে উড়ার চেষ্টার ইতিহাসে বেশ উজ্জ্বল নাম আব্বাস ইবনে ফিরনাস (৮১০-৮৮৭ খ্রিস্টাব্দ)। জ্যোতির্বিদ্যা আর চিকিৎসাবিদ্যায়ও তার দখল ছিল অসামান্য। সংগীতসংক্রান্ত যে তত্ত্ব তিনি আন্দালুসিয়ায় আলোচনা করেন, তা বাগদাদের পণ্ডিত আল খলিলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অন্যদিকে বাগদাদে ‘ইখওয়ানুস সাফা’-এর মতবাদগুলো সেখানে প্রচার করেন মাসলামাহ আল মাজরিতি (৯৫০-১০০৭) এবং আবুল হাকাম আল কিরমানি (মৃত্যু-১০৬৬ খ্রিস্টাব্দ)। আল মাজরিতি আন্দালুসিয়ার উমাইয়া শাসক দ্বিতীয় হাকিমের (৯৬১-৭৬) পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। আল কিরমানি ছিলেন তার ছাত্র।

ইবনে সিদাহ আল আন্দালুসি (১০০৭-১০৬৬ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন আরবি ভাষাবিদ। ‘কিতাব আল মুখাসসাস’ গ্রন্থের কয়েকটি অধ্যায়জুড়ে সংগীত ও সংগীত সম্পর্কিত যন্ত্রপাতি নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি। পরবর্তী প্রজন্মে আবু সালত উমাইয়া আল আন্দালুসির (মৃত্যু-১১৩৪ খ্রিস্টাব্দ) নাম উত্তর আফ্রিকায় ছিল প্রসিদ্ধ। তার রচিত গ্রন্থ ‘রিসালাহ ফিল মুসিকা’ পরবর্তী সময়ে হিব্রু ভাষায় অনূদিত হয়। আফ্রিকার মাটিতে ‘রিসালাহ আল মুসিকা’ নামে আরো একটি বই প্রচলিত ছিল; যার লেখক ইবনে বাজা (১০৮৫-১১৩৮ খ্রিস্টাব্দ)। মুসলিম স্পেনের সারাগোসায় জন্মগ্রহণ করা এ পণ্ডিত স্পেনীয় জ্ঞানচর্চায় প্রথম সারির ব্যক্তিত্ব।

পরবর্তী যুগে সংগীতসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক আল হাসান ইবনে আহমদ ইবনে আলি আল কাতিব (মৃত্যু-১২২৮)। তিনি ছিলেন একাধারে সুফি ও সংগীতবিশারদ। সংগীদের দর্শন নিয়ে তার লেখা ‘কামাল আল-আদাব আল গিনা’। মোট ৪০টি অধ্যায়ে সংগীতসংক্রান্ত সব বিষয় আলোচনা করা হয়েছে এখানে। এরপর আসেন সফিউদ্দিন আবদুল মুমুন আল উরমাওয়ি আল বাগদাদী (মৃত্যু-১২৯৪)। সংগীত নিয়ে তার লেখা ‘কিতাবুল আদওয়ার’ ও ‘রিসালাহ আল শারাফিয়্যাহ ফি নাসাব আল তালিফিয়্যাহ’। বাগদাদ থেকে শাম হয়ে মাগরিব অঞ্চলে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল গ্রন্থগুলোর মাধ্যমে। তৈরি করেছে নতুন স্রোত। সেই স্রোতের উত্তরসূরি হিসেবে আছেন ইসা ইবনে কারা (মৃত্যু-১৩৫৮), আমর ইবনে খিজির আল কুর্দি (মৃত্যু-১৩৯৭) ও আবদুল কাদির ইবনে গায়িবি (মৃত্যু-১৪৩৫)।

মূলধারার বাইরে থেকেও সংগীত নিয়ে আলোচনা করেছেন কেউ কেউ। তুলে এনেছেন সংগীতের পরিচিতি, ইতিহাস, ধরন ও সংগীতসংশ্লিষ্ট নানা যন্ত্রপাতির বর্ণনা। আবুল হাসান আলি আল ইসফাহানির (মৃত্যু-৯৬৭) লেখা ‘কিতবুল আগানি’ তার উদাহরণ। ঐতিহাসিক আল মাসুদি (মৃত্যু-৯৫৬) ‘মুরুজুজ জাহাব ওয়া মায়দানুল জাওয়াহির’ এবং ইবনে খালদুন (মৃত্যু-১৪০৬) ‘মুকাদ্দিমা’ গ্রন্থে আলোচনা করেছেন সংগীত নিয়ে।

সভ্যতার অনিবার্য উপাদান সংগীত। সেই সংগীতের ইতিহাসে মুসলিম সভ্যতার নায়কদের গল্প কম দীর্ঘ না। হেজাজ ও বাগদাদ থেকে যে আলো জ্বলে উঠেছিল, শিগগিরই তা আলোকিত করে তুলে খোরাসান থেকে আন্দালুসিয়া পর্যন্ত। পূর্ব দিক থেকে বলকান অঞ্চল এবং পশ্চিম দিক থেকে স্পেন দিয়ে প্রবেশ করে ছড়িয়ে পড়ে গোটা ইউরোপে। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। একদিকে ইউরোপ ক্রমে উজ্জ্বল হয়ে উঠল; আর ক্রমে স্তিমিত হয়ে পড়ল বাগদাদ ও কায়রো। এ ব্যাপারে ইবনে খালদুনের একটা কথা প্রণিধানযোগ্য— “কোন সভ্যতার প্রয়োজনীয় সকল উপাদানের শেষে আবির্ভূত হয় সংগীতশিল্প। কারণ এটা পরিপূর্ণতা বিধায়ক অভ্যাস এবং আনন্দ সৃষ্টির উপকরণ। একে পেশা হিসাবে গ্রহণ করা সম্ভব না। এই জন্যই সভ্যতার অবক্ষয় এবং বিলুপ্তির সম্ভাবনা দেখা দিলে এই সংগীত শিল্পই সবার আগে বিলুপ্ত হয়।”

 

আহমেদ দীন রুমি: লেখক