উমাইয়া খেলাফতের অধীনে ইসলামী সংগীতের শাস্ত্রীয় ধারা ব্যাপকভাবে বিকাশ লাভ করে। এই সময় মুসলিম জাহানের রাজধানী মদিনা থেকে সিরিয়ার দামেস্ক নগরে স্থানান্তরিত হয়। দামেস্কের রাজদরবার সর্বদা নারী ও পুরুষ সংগীতজ্ঞ দ্বারা ভরপুর থাকত। তাদের মধ্যে অধিকাংশ জন্মসূত্রে কিংবা সাংস্কৃতিক অভিযোজনের সূত্রে আরবীয় হলেও তাদের মূল ছিল অনারবীয়। উমাইয়া খিলাফতের সময় পারস্য, আফ্রিকা, তুরস্ক ইত্যাদি অঞ্চল থেকে বিপুলসংখ্যক অনারব ইসলাম গ্রহণ করে। এই নওমুসলিমদের কারণে গোত্রীয় আরব সমাজে কিছু সামাজিক জটিলতা সৃষ্টি হয়। এর সমাধান হিসেবে এসব অনারব নওমুসলিমকে কোনো একটি আরব গোত্র কিংবা কোনো একজন আরব ব্যক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় থাকতে হতো। এই নওমুসলিমদের অমুসলিমদের জন্য প্রযোজ্য জিজিয়া নামক কর দিতে হতো এবং তারা সরকার ও সামরিক বাহিনীতে স্থান পেত না। তত্কালীন আরব সমাজে এ শ্রেণীর লোকদের মাওলা, বহুবচনে মাওয়ালি বলা হতো। উমাইয়া শাসনামলে সংগীতের চর্চা ও বিকাশ সাধনে এ মাওলারাই মূল ভূমিকা পালন করে। মাওলাদের মধ্যে একশ্রেণীর নারীদের শিল্প, সাহিত্য ও সংগীতের নানা কলায় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ বিনোদনকর্মী হিসেবে প্রস্তুত করা হতো। আরবীয় পরিভাষায় তাদের বলা হতো ‘ক্বায়েনা’।

এ ক্বায়েনাদেরই অনুসরণে, খুব সম্ভবত, ভারতীয় উপমহাদেশে বাঈজিদের আবির্ভাব ঘটে। এসব অনারব মাওলা ও ক্বায়েনার অবদানে ইসলামী সংগীতে ব্যাপক অনারবীয়, বিশেষত পারস্য সংস্কৃতির সংযোগ ঘটে। উমাইয়া যুগের প্রথম এবং শ্রেষ্ঠ সংগীতজ্ঞ ছিলেন আবু উসমান সাঈদ, যিনি ‘ইবনে মিসজা’ উপনামে পরিচিত ছিলেন। তিনি ছিলেন মক্কার ‘বনু মখযুম’ গোত্রের অধীন মাওলা। তাকে ইসলামী সংগীতের জনক বলা হয়। মক্কার এক পারসি পরিবারে জন্ম নেয়া এ কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি ছিলেন একজন সংগীতবিশারদ, দক্ষ গায়ক ও বীণাবাদক। ইবনে মিসজা সিরিয়া ও পারস্য ভ্রমণ করে বাইজেন্টানীয় ও পারস্য সংগীতের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং আরবীয় গানে তার এ অর্জিত জ্ঞানের প্রয়োগ ঘটান। উমাইয়া যুগের আরেক উল্লেখযোগ্য সংগীতজ্ঞ হলেন আবুল খাত্তাব মুসলিম (মৃত্যু ৭৫৭ খ্রিস্টাব্দ)। ‘ইবনে মুহরিয’ তার উপনাম। তার শিক্ষক ইবনে মিসজার মতো তিনিও মক্কার এক পারসি পরিবারের সন্তান ছিলেন এবং ‘বনু আবদ যর’, মতান্তরে ‘বনু মখযুম’ গোত্রের অধীন মাওলা ছিলেন। তার পিতা পবিত্র কা’বা ঘরের দ্বাররক্ষী ছিলেন। আজজা আল মায়েলা নামক মদিনার এক ক্বায়েনার কাছেও তিনি সংগীতের শিক্ষা গ্রহণ করেন। উমাইয়া রাজদরবারের জনপ্রিয় সংগীতজ্ঞ উবাইদ ইবনে সুরাইজি ‘খোলাফায়ে রাশেদিন’-এর দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ইবনে আল খাত্তাবের (রা.) খেলাফতকালে মক্কার এক তুর্কি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং দশম উমাইয়া খলিফা হিশাম ইবনে আবদুল মালিকের খেলাফত কালে ইন্তেকাল করেন। তিনি ছিলেন মক্কার ‘বনু নওফেল’, মতান্তরে ‘বনু হারিস’ গোত্রের অধীন মাওলা। তিনি শোকগাথা রচনা করে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। এই সময়ে মা’বাদ নামে এক কৃষ্ণাঙ্গ সংগীতবিশারদের পরিচয় পাওয়া যায়, যিনি সপ্তম শতাব্দীর মদিনার এক বিখ্যাত ক্বায়েনা জামিলার শিষ্য ছিলেন।

এক আফ্রিকান ক্রীতদাসের সন্তান এই মা’বাদ ইসলামী সংগীতে এক স্বতন্ত্র ধারার উদ্ভব ঘটান, যা পরবর্তী সময়ে বহু বছর সংগীতের এক শক্তিশালী ঘরানা হিসেবে টিকে থাকে। এদের মধ্যে অনেকেই সংগীতবিদ্যার পাশাপাশি অন্যান্য জ্ঞান, যেমন ইলমে কোরআন, ইলমে হাদিস, ইলমে ফিক্বহ ইত্যাদিতেও পারদর্শী ছিলেন। তাদের ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই জ্ঞানের এসব শাখায় খ্যাতি অর্জন করেন। উমাইয়া শাসনামলে ক্বায়েনারা নিয়মিত সংগীতের আসর বসাতেন। এসব আসরে নারী-পুরুষ সবাই সমবেত হতেন। নিছক বিনোদনের ঊর্ধ্বে উঠে তত্কালীন সামাজিক যোগাযোগের এক অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছিল এসব সংগীত আসর। ক্বায়েনাদের অর্থনৈতিক স্বার্থও এর সঙ্গে জড়িত ছিল। এ আসরগুলো থেকে ক্বায়েনারা তাদের সম্ভাব্য পৃষ্ঠপোষক এবং একই সঙ্গে তাদের শিষ্যদের খুঁজে নিতেন। উমাইয়াদের রাজত্বকালে মদিনা শহরে নিয়মিত সংগীতের মজলিস করতেন, এমন দুজন বিখ্যাত ক্বায়েনার নাম পাওয়া যায়। তারা হলেন জামিলা এবং আজজা আল মায়েলা। সপ্তম শতাব্দীতে এ দুজনের নিয়মিত সংগীত পরিবেশনায় মদিনার পরিবেশ থাকত সতত প্রাণবন্ত। জামিলা (মৃত্যু ৭২০ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন মদিনার বনু সুলাইম গোত্রের অধীন একজন মাওলা। তিনি অনেক বিখ্যাত সংগীতজ্ঞের শিক্ষক ছিলেন। তার এক শিষ্য সংগীতবিশারদ মা’বাদ (মৃত্যু ৭৪৩ খ্রিস্টাব্দ) তার সম্পর্কে বলেন, ‘সংগীত কলায় জামিলা হলেন মহীরুহ, আর আমরা হলাম তার শাখা।’

জামিলা যখন মদিনা থেকে মক্কায় তীর্থযাত্রা করেন, তখন তার কাফেলায় পঞ্চাশ জন গায়িকাসহ সেই কালের মুখ্য সংগীতজ্ঞরা ছিলেন। এ তীর্থযাত্রা করার সময় বিভিন্ন স্থানে তিনি সংগীত সন্ধ্যার আয়োজন করেন, যা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। পবিত্র মক্কায় হজব্রত পালন করে মদিনায় ফিরে এসে তিনি তিনদিনব্যাপী এক সংগীত মেলার আসর করেন। আজজা আল মায়েলা (মৃত্যু ৭০৫ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন মদিনার আনসারদের অধীন একজন মাওলা। 

তাঁর সৌন্দর্য, নমনীয় কটিদেশ এবং আকর্ষণীয় চলাফেরার কারণে তিনি 'আল মায়েলা' তথা 'ছন্দময় রমণী' উপনামে খ্যাত হন৷ তাঁর ছিল সহজাত সঙ্গীত প্রতিভা, চমৎকার কণ্ঠ এবং বাদ্যযন্ত্র বাজানোর মনোমুগ্ধকর ক্ষমতার সংযোগে যা আরো বৃদ্ধি পেয়েছিল৷ রা'ইক্বা, শিরিন এবং জায়নাব নামক তিন গায়িকার কাছ থেকে তিনি আরবী গানের শিক্ষা গ্রহণ করেন। আর পারস্য সঙ্গীতের তালিম নেন শিয়াব খিতির এবং নাশিত নামক দুই সঙ্গীতজ্ঞের নিকট, যাঁরা পারস্য সঙ্গীতের পরিবেশক হিসাবে বিখ্যাত ছিলেন৷ সঙ্গীতে তিনি পুরাতন এবং নতুন ধারার সফল সংযোগ ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন, যে কারণে তাঁকে 'গায়িকাদের রাণী' খেতাবে ভূষিত করা হয়৷

৭৫০ খ্রিস্টাব্দে আব্বাসীয় খেলাফতের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে বাগদাদ সংগীতচর্চার প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ইসলামী সংগীতের স্বর্ণযুগ হলো আব্বাসীয় খেলাফত। নীতিশাস্ত্র, অধ্যাত্মবাদ, গণিত শাস্ত্রের সঙ্গে সঙ্গে এ সময়ে সংগীত শিক্ষার ওপর ব্যাপক গুরুত্বারোপ করা হয়। তখন একজন শিল্পীর একই সঙ্গে কারিগরি দক্ষতা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং তাত্ত্বিক জ্ঞান থাকতে হতো। অষ্টম শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে সংগীত তত্ত্ববিষয়ক ইসলামী সাহিত্যের উত্কর্ষ সাধন শুরু হয়। এই সময় গ্রিক গ্রন্থগুলো আরবি ভাষায় অনুবাদের কাজ শুরু হয়। গ্রিক লেখনীর সঙ্গে পরিচিত পণ্ডিতরা সংগীত শাস্ত্রে অবদান রাখতে শুরু করেন। তাদের রচনায় তারা গ্রিক সংগীত শাস্ত্রের নানাবিধ পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন সাধন করেন। সংগীতের ধারায় তারা নব নব দিক উন্মোচন করেন। বিখ্যাত আরব মুসলিম দার্শনিক আবু ইউসুফ ইয়া’কুব আল কিন্দী (৮০১-৮৭৩ খ্রিস্টাব্দ), যাকে আরবীয় দর্শনের জনক বলা হয়, যিনি কুফায় জন্মগ্রহণ করেন এবং বাগদাদে শিক্ষা লাভ করেন, তিনি সংগীতের ওপর তেরোটিরও অধিক গ্রন্থ রচনা করেন। আরবীয় সংগীত তত্ত্বের ওপর এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত প্রথম গ্রন্থটি তার লেখা। দার্শনিক আবু নসর আল ফারাবি (৮৭০-৯৫০ খ্রিস্টাব্দ) সংগীতশাস্ত্রের বিশালাকার কিতাব ‘কিতাব আল মুসিক্বী আল কবির’ রচনা করেন। এছাড়া আবু আলী ইবনে সিনা, আল সারাখসী, সাবিত ইবনে কুররাহ, ইবনে জায়লা প্রমুখ দার্শনিক সুর, তাল, লয়, শব্দ, বিরাম, বাদ্যযন্ত্র ইত্যাদি নিয়ে এ সময়ে ব্যাপক গবেষণা করেন। 

আব্বাসীয় যুগের সর্বশেষ গুরুত্বপূণ তাত্ত্বিক হলেন সফি আল দীন (১২১৬-১২৯৬ খ্রিষ্টাব্দ)। তিনি 'কিতাব আল আদভার ফি আল মুসিক্বা' নামক একটি গ্রন্থ রচনা করেন। এক পারসি পরিবারে জন্মগ্রহণকারী নবম শতকের ইসহাক ইবনে ইবরাহিম আল মাওসিলি (মৃত্যু- ৮৫০ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন আব্বাসীয় শাসনামলের বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ। ছয় জন আব্বাসীয় খলিফার খেলাফত কালে তিনি রাজ দরবারে নিয়মিত সঙ্গীত পরিবেশনা করেন। তাঁরা হলেন- খলিফা হারুন আল রশিদ, আল আমিন, আল মা'মুন, আল মু'তাসিম, আল ওয়াসিক এবং আল মুতাওয়াক্কিল। তাঁর পিতা এবং ওস্তাদ আবু ইসহাক ইবরাহিম আল মাওসিলিও একই রকম বিখ্যাত ছিলেন। তিনি ইরানের তেহরানের তৎকালীন 'রায়' নামক শহরে আরবীয় এবং পারস্য সঙ্গীতের প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর তাঁকে বাগদাদে ডেকে পাঠানো হয়, যেখানে তিনি তিন জন আব্বাসীয় খলিফা-আল মাহদী, আল হাদী এবং হারুন অর রশীদের অধীনে গীতিকার হিসাবে কাজ করেন।

তেরতম আব্বাসীয় খলিফা আল মু'তায বিল্লাহ-র পুত্র আবদুল্লাহ ইবনে আল মু'তায (মৃত্যু- ৩০৯ খ্রিস্টাব্দ) সঙ্গীতের তাত্ত্বিক এবং প্রায়োগিক উভয় ক্ষেত্রেই অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন৷ তিনি পারস্যের সামারা নগরে জন্মগ্রহণ করেন এবং বাগদাদে এন্তেকাল করেন। আব্বাসীয় আমলের একজন ক্বায়েনা ছিলেন আরিব আল মা'মুনিয়া (মৃত্যু- ৮৯১ খ্রিস্টাব্দ)। বাগদাদের রাজ সভায় সবচাইতে বিখ্যাত ক্বায়েনা ছিলেন তিনি। তিনি ছিলেন খলিফা আল মা'মুনের প্রিয় গায়িকা।বাগদাদে জন্ম নেয়া এই ক্বায়েনা প্রাথমিক জীবনে একজন ক্রীতদাসী ছিলেন৷ পরবর্তীতে খলিফা আল মু'তাসিম বিল্লাহ তাঁকে আজাদ করে দেন। আব্বাসীয় যুগের আরেক বিখ্যাত ক্বায়েনা হলেন শারীয়া (৮১৫ - ৮৭০ খ্রিস্টাব্দ)।তিনি নবম আব্বাসীয় খলিফা আল ওয়াসিক বিল্লাহর দরবারে প্রাধান্য লাভ করেন৷ প্রাথমিক জীবনে তিনি তৃতীয় আব্বাসীয় খলিফা আল মাহদীর পুত্র এবং পঞ্চম খলিফা হারুন আল রশিদের বৈমাত্রেয় ভাই ইবরাহিম ইবনে আল মাহদীর ক্রীতদাসী ছিলেন। খলিফা আল মু'তাসিম কিংবা আল ওয়াসিকের সময়ে তিনি মুক্তি লাভ করেন৷ খলিফা আল মুতাওয়াক্কিলের সময়ে (রাজত্বকাল- ৮৪৭ - ৮৬১) সামারা নগরে আরিব আল মা'মুনিয়া এবং শারিয়া-র গানের দলের মধ্যে এক সঙ্গীত প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এই প্রতিযোগিতায় শারিয়া-র দল আরিব-এর দলের কাছে পরাজিত হলেও নিজ প্রতিভা গুণে শারিয়া তৎকালীন অভিজাতদের হৃদয় হরণ করতে সক্ষম হন।

খলিফা আল মাহদীর কন্যা এবং খলিফা হারুন আল রশিদের বৈমাত্রেয় বোন উলাইয়া বিনতে মাহদীও (৭৭৭-৮২৫) একজন সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন৷ খলিফা হারুন আল রশিদের স্ত্রী জোবায়দার সম্মানে তিনি প্রেমগীতি রচনা করেন, যা প্রায় দুই হাজার গায়িকা দ্বারা রাজ দরবারে পরিবেশিত হয়। তিনি তাঁর বৈমাত্রেয় ভাই শাহজাদা ইবরাহিম ইবনে আল মাহদীর সাথে দ্বৈত ভাবে সঙ্গীত পরিবেশনা করেন। খলিফা আল মাহদী পুত্র ইবরাহিমও সঙ্গীতজ্ঞ হিসাবে নাম করেছিলেন৷ ইবরাহিমের মা শাকলা ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ, যিনি খলিফা আল মাহদীর উপপত্নী মুহাইয়াত- এর তত্ত্বাবধানে বেড়ে উঠেন৷ মুহাইয়াত শাকলার মধ্যে সঙ্গীত প্রতিভা আবিষ্কার করে তাঁকে তায়েফের বিখ্যাত সঙ্গীত নিকেতনে সঙ্গীত শেখার জন্য পাঠান৷ এর কিছু বছর পর আল মাহদী তাঁকে উপপত্নী হিসাবে গ্রহণ করেন এবং তাঁর গর্ভেই কৃষ্ণকায় ইবরাহিমের জন্ম হয়৷ ইবরাহিমকে তাঁর সময়ের সবচাইতে প্রতিভাধর সঙ্গীতজ্ঞ বলে বিবেচনা করা হয়। তিনি নিয়মিত রাজ দরবারে সঙ্গীত পরিবেশন করতেন এবং সঙ্গীতের তালিম দিতেন৷ সঙ্গীতের ক্ষেত্রে তিনি নিয়ম নীতির তেমন ধার ধারতেন না, বরং এ ক্ষেত্রে তিনি ভাবের স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশকেই প্রাধান্য দিতেন৷ এ নিয়ে তাঁর সাথে তৎকালীন প্রভাবশালী সঙ্গীতজ্ঞ ইসহাক আল মাওসিলির বিরোধ লেগেই থাকত, যিনি সঙ্গীতের শাস্ত্রীয় সকল রীতি নীতি যথাযথ মেনে চলতেন৷ সঙ্গীতে তিনি যে সহজিয়া পথ উদ্ভাবন করেছিলেন, ইসহাক আল মাওসিলি এবং অন্যান্য সঙ্গীতজ্ঞগণ তার কঠোর সমালোচনা করেন। তবে ইবরাহিম এবং ইসহাকের মধ্যে সঙ্গীত বিষয়ক এই বিরোধ সত্ত্বেও তাঁরা দু'জনে ভাল বন্ধু ছিলেন এবং নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে সুস্থ মত বিনিময়ের সংস্কৃতি তাঁদের মধ্যে ছিল৷ এটি আব্বাসীয় আমলে বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের প্রাণবন্ততাকে ইঙ্গিত করে। আবু আহমদ ওবায়দুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে তাহির (মৃত্যু- ৯১৩ খ্রিস্টাব্দ) ছিলেন একজন সামরিক কর্মকর্তা এবং পরবর্তীতে বাগদাদের প্রশাসক৷ ৮৬৭-৮৯১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে তিনি বাগদাদের প্রশাসক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে তাঁর এই সামরিক ও রাজনীতির পরিচয়ের বাইরে একজন সঙ্গীতজ্ঞ হিসাবেই তিনি জনপ্রিয় হয়ে উঠেন৷ তিনি তাঁর সময়ের বিখ্যাত গায়কদের বহু গানে সুরারোপ করেন।

মনসুর জালজাল আল দারিব (মৃত্যু ৮৪২ খ্রিস্টাব্দ) নামে আব্বাসীয় আমলে একজন বিখ্যাত বীণাবাদক ছিলেন। তার ভাতিজা এবং শিষ্য ইসহাক আল মাওসিলি তাকে সর্বোত্তম বীণাবাদক হিসেবে অভিহিত করেন। এছাড়া হুনাইন ইবনে ইসহাক (মৃত্যু ৮৭৩ খ্রিস্টাব্দ), বনু মুসা ভাইয়েরা (৮০০-৮৬০ খ্রিস্টাব্দ), আবু আল হাসান আলী বিন নাফি ওরফে জিরিয়াব (৭৮৯-৮৫৭ খ্রিস্টাব্দ) আব্বাসীয় আমলে সংগীতজ্ঞ হিসেবে গুরুত্ব অর্জন করেন। এদের মধ্যে শেষোক্তজন তথা জিরিয়াব ছিলেন আন্দালুসিয়ার অধিবাসী। সেখান থেকে বাগদাদে এসে তিনি ইসহাক আল মাওসিলির কাছে সংগীতের তালিম নেন এবং কালক্রমে বাগদাদের রাজদরবারে সংগীতশিল্পী হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

খলিফা হারুন আল রশিদের সঙ্গে তার প্রথম সাক্ষাতে খলিফা বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র, বিশেষ করে বীণা এবং বাঁশি বাজানোতে তার ওস্তাদি দেখে অভিভূত হন। তবে তিনি বাগদাদে টিকে থাকতে পারেননি। এর কারণ হিসেবে তার প্রতি তার গুরু ইসহাক আল মাওসিলির ঈর্ষা কিংবা বিরাগকে দায়ী করা হয়। যিরাবের কণ্ঠ তার গুরুর চেয়ে বহু গুণে আকর্ষণীয় ছিল। শিষ্যের কাছে নিজের জনপ্রিয়তা হারানোর আশঙ্কা থেকে একপর্যায়ে ইসহাক আল মাওসিলি তাকে বাগদাদ থেকে হাওয়া করে দেয়ার হুমকি দেন। জিরিয়াব তখন তিউনিসিয়ায় চলে যান। সেখান থেকে তিনি তত্কালীন স্পেনের মুসলিম নগর কর্ডোভার আমির দ্বিতীয় আবদুর রহমানের (৭৯২-৮৫২) আমন্ত্রণে কর্ডোভায় গিয়ে সেখানকার রাজসভা অলংকৃত করেন। অতঃপর যিরাবের তত্ত্বাবধানে সমগ্র আন্দালুসিয়া অঞ্চলে ইসলামী সংগীত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আব্বাসীয় খলিফারা এতটাই সংগীতপ্রেমী ছিলেন যে তারা তাদের দরবারসংলগ্ন একটি কক্ষকেই জলসা ঘর হিসেবে ব্যবহার করতেন, যা কেবল একটি পর্দা দ্বারা আলাদা করা থাকত। এই জলসা ঘরের তত্ত্বাবধানে থাকত রাজকীয় সংগীতজ্ঞদের একটি দল, যাদের ‘সিতারা’ বলা হতো।

সংগীতের এ জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতায় একসময় এটি আর নিছক বিনোদনের মাধ্যম থাকে না, বরং ধর্মীয় বাহন হিসেবেও এটি মুসলিমদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে শুরু করে। নবীজি মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রশংসাকীর্তনের সঙ্গে সংগীত যোজনার চল শুরু হয়। এছাড়া শিশু জন্মগ্রহণের সময়, গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে, যুদ্ধযাত্রায় সৈনিকদের ক্লান্তি দূর করতে সংগীতায়োজন করা হতো। মানসিক অবস্থার উন্নতি সাধনে মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা হিসেবেও সংগীতের ব্যবহার ছিল। এই সময়ে বিখ্যাত দার্শনিক এবং সুফি হযরত আবু হামিদ আল গাজালি (১০৫৮-১১১১) আধ্যাত্মিকতা ও সংগীতের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক দেখিয়ে সংগীতের নতুন তত্ত্ব দেন। তার মতে, স্রষ্টার সঙ্গে একাত্ম হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো সংগীত। তবে তিনি স্রেফ ইন্দ্রিয়সর্বস্ব সংগীত এবং আধ্যাত্মিক সংগীতের মধ্যে একটি বিভাজন তৈরি করেন এবং এই মত প্রদান করেন যে মানুষের আত্মার ওপর গান, সুর, ছন্দ—এসবের উপকারী একটা প্রভাব রয়েছে। তার বিখ্যাত দুটি গ্রন্থ ‘ইহইয়া উলুম আল দীন’ এবং ‘কিতাব আদাব আল সামা ওয়া আল ওয়ায়েয’-এ তিনি সংগীতের আধ্যাত্মিক ধারণা নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেন। নবম-দশম শতকে ‘ইখওয়ান আল সাফা’ নামক বসরার একটি মরমি গোষ্ঠীও ঈশ্বরের সঙ্গে সংযোগ সাধনের একটি মাধ্যম হিসেবে সংগীতকে গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করে।

আব্বাসীয় আমলেই রচিত হয় সংগীতের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কিতাব আল আগানি’ (গানের বই)। ইমাম আবুল ফারায আল ইসফাহানি রচিত ও সংকলিত ২৪ খণ্ডে এই কিতাব ইসলামী সংগীত, সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক অমূল্য খনি হিসেবে স্বীকৃত। দশম শতকে রচিত এ মহাকাব্যিক প্রয়াস এর রচনাকাল থেকে শুরু করে অদ্যাবধি সমানভাবে জনপ্রিয় এবং গবেষকদের প্রধান তথ্যসূত্র হিসেবে বিবেচিত। আল ইসফাহানি ৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সর্বশেষ উমাইয়া খলিফা মারওয়ান ইবনে মুহাম্মদের বংশধর ছিলেন। উমাইয়া খেলাফতের পতনের পর মারওয়ানের কয়েকজন উত্তরসূরি পালিয়ে ইসফাহান চলে যান। সেখান থেকে আল ইসফাহানির পরিবার ইরাকে গিয়ে সেখানকার প্রশাসনে জায়গা করে নেয়। তার বাবার চাচা আবদুল আজিজ ইবনে আহমদ সামারা নগরে খলিফা আল মুতাওয়াক্কিলের অধীনে একজন নেতৃস্থানীয় কর্মকর্তা ছিলেন। তার চাচা আল হাসান ইবনে মুহাম্মদও সামারায় একজন ‘কাতিব’ তথা লেখক হিসেবে প্রসিদ্ধি অর্জন করেছিলেন। তিনিও খলিফা আল মুতাওয়াক্কিলের সময়ে জন্মগ্রহণ করেন। কিতাব আল আগানির অন্যতম উৎস ছিলেন এই আল হাসান ইবনে মুহাম্মদ। এছাড়া আল ইসফাহানি তার পরিবারের অন্যান্য সদস্য, যেমন তার বাবা আল হোসাইন ইবনে মুহাম্মদ, বাবার চাচা আবদুল আজিজ, দাদা মুহাম্মদ ইবনে আহমদ এবং চাচাতো ভাই আবু আবদুল্লাহ আহমদ ইবনে আল হোসাইন থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন। তার নানা আবু আলী ইয়াহইয়া ইবনে মুহাম্মদ ইবনে তাওয়াবা তার জন্য একটি দিনলিপি রেখে যান, যেখান থেকে তিনি উমাইয়া এবং আব্বাসীয় কবিদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন।

আল ইসফাহানি তত্কালীন জ্ঞানচর্চার দুই প্রধান কেন্দ্র কুফা এবং বাগদাদে অধ্যয়ন করেন। এই সময়ে যেসব মানুষের সংস্পর্শে তিনি আসেন, তাদের থেকেও তিনি ‘কিতাব আল আগানি’ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন। কুফায় অধ্যয়নকালে তিনি সেখানকার স্থানীয় গায়কদের সম্পর্কে অবগত হন, যাদের খ্যাতি তখনো নিজ শহরকে অতিক্রম করেনি। ‘কিতাব আল আগানি’ তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত। প্রথম অংশে (প্রথম-নবম খণ্ড) তিনি একশটি গান অন্তর্ভুক্ত করে সেগুলোর ওপর আলোচনা করেন, যেই গানগুলো বিখ্যাত সংগীতজ্ঞ ইসহাক আল মাওসিলি খলিফা আল ওয়াসিকের জন্য সেরা একশ গান হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন। পাশাপাশি এই অংশে তিনি মা’বাদ এবং ইবনে সুরাইজির গানও অন্তর্ভুক্ত করেন। দ্বিতীয় অংশে (নবম-দশম খণ্ড) তিনি খলিফা এবং তাদের পরিবারের মধ্যে যারা গান রচনা করেছেন, তাদের নিয়ে আলোচনা করেন। এই অংশে তিনি উমাইয়া খেলাফতের অষ্টম খলিফা উমর ইবনে আবদুল আযীয (৬৮০-৭২০ খ্রিস্টাব্দ), যিনি দ্বিতীয় উমর নামে পরিচিত ছিলেন, থেকে শুরু করে আব্বাসীয় খলিফা আল মু’তাদিদ বিল্লাহ (৮৫৭-৯০২ খ্রিস্টাব্দ) পর্যন্ত খলিফাদের পর্যায়ক্রমিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করেন। তৃতীয় অংশে (দশম-২৪তম খণ্ড) তিনি নিজের বাছাই করা গান এবং সংগীতজ্ঞদের নিয়ে আলোচনা করেন। মোট কথা, প্রাক-ইসলামী যুগ থেকে শুরু করে নবম শতক পর্যন্ত সংগীতের সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়ার জন্য এখনো পর্যন্ত টিকে থাকা মূল আকর মহাত্মা আল ইসফাহানি রচিত এই ‘কিতাব আল আগানি’ আব্বাসীয় খেলাফতকালের এক অনন্য কীর্তি।

 মোঙ্গলদের প্রাদুর্ভাবের ফলে আব্বাসীয় খেলাফতের অবসানের পূর্ব পর্যন্ত ইসলামী স্বর্ণযুগের এই ধারা চলমান থাকে৷ ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে মোঙ্গল সর্দার হালাকু খানের হাতে আব্বাসীয় খলিফা আল মুসতা'সিম বিল্লাহর পরাজয়ের মাধ্যমে বাগদাদের পতন হয়। মোঙ্গলরা বাগদাদ শহরে ব্যাপক ধ্বংস লীলা চালিয়ে একে একটি বিরান ভূমিতে পরিণত করে। অন্যান্য আরো অনেক স্থাপনার সাথে বিলীন হয়ে যায় আব্বাসীয় খলিফাদের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান 'বায়ত আল হিকমা' (জ্ঞানগৃহ) নামক বাগদাদের প্রধান গ্রন্থাগার, আর সেই সাথে হারিয়ে যায় সেখানে সংরক্ষিত মূল্যবান গ্রন্থ সমূহ, যেসবের মধ্যে ছিল সঙ্গীত বিষয়ক বহু মূল্যবান রত্ন সম্ভার।

 

বাগদাদ ছাড়াও মুসলিম জাহানের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোও মোঙ্গলদের ধ্বংসলীলার শিকার হয়৷ বাগদাদ ধ্বংসের মাধ্যমে আব্বাসীয় খেলাফতের অবসানের প্রায় অর্ধ শতক পূর্বে মামলুক সুলতানদের মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম নেতৃত্বাধীন সুলতানি আমলের যাত্রা শুরু হয়। এই সময় দিল্লি মুসলিম জাহানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি কেন্দ্রে পরিণত হয়, একই সাথে পারসি, তুর্কি, হাবসি, আরব ইত্যাদি বহু জাতি গোষ্ঠীর মানুষের আগমনে বাগদাদ এবং দামেস্কের মত দিল্লিও একটি বহুজাতিক নগরের রূপ লাভ করে। বাগদাদের খলিফা এবং দিল্লির সুলতানদের মধ্যে একটি যোগাযোগ শুরু থেকেই ছিল। দিল্লির সুলতানগণ স্বাধীন ছিলেন, তথাপি মুসলিম জাহানের অভিভাবক হিসাবে আব্বাসীয় খলিফাদের প্রতি তাঁরা আনুগত্য এবং সম্মান প্রদর্শন করতেন৷ আব্বাসীয় খলিফাগণও এই সুলতানদেরকে এক প্রকার স্বীকৃতিপত্র দিতেন, যা তাঁদের জন্য সম্মানসূচক বলে বিবেচিত হত৷ সেই সুবাদে বাগদাদ এবং দিল্লির মধ্যে শুরু থেকেই একটি সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ছিল৷ বাগদাদ সহ সমগ্র মুসলিম জাহান থেকে সেই সময়ে গুণী সঙ্গীতজ্ঞগণ সাংস্কৃতিক সফরে দিল্লিতে আসতে শুরু করেন। তাঁদের তালিম এবং দিল্লির সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায় দিল্লি দরবারকে কেন্দ্র করে ভারতবর্ষে ইসলামী সঙ্গীতের যাত্রা শুরু হয়৷ আরবীয় এবং পারস্য ধারার মিশেলে দামেস্ক এবং বাগদাদে সঙ্গীতের যে উৎকর্ষ সাধন হয়, ভারতবর্ষের স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে মিশে তা এক নবতর রূপ পরিগ্রহ করে। অতঃপর মোঙ্গলদের হাতে বাগদাদ সহ মুসলিম জাহানের অন্যান্য কেন্দ্র সমূহের পতন ঘটলে ইসলামী সঙ্গীতের এই ধারা দিল্লির দরবারেই তাঁর আশ্রয় খুঁজে নেয়, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল শুরুর আগ পর্যন্ত যা নিরবচ্ছিন্নভাবে জারি ছিল৷

উপমহাদেশে ইসলামী সঙ্গীতের একজন প্রধান পুরুষ ছিলেন বিখ্যাত সুফি ও কবি হযরত আমির খুসরো৷ সঙ্গীত কলায় পরিপূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি উপমহাদেশীয় ধ্রুপদ সঙ্গীতে তিনি 'তারানা' সহ বেশ কিছু নতুন ধারার সৃষ্টি করেন, যা অদ্যাবধি জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে৷ এ ছাড়াও তবলা এবং সেতার আবিষ্কারের কৃতিত্বও তাঁকে দেয়া হয়ে থাকে। হযরত আমির খুসরো ছিলেন চিশতিয়া তরিকার অন্যতম প্রধান শায়খ হযরত খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়ার প্রিয়তম মুরিদ৷ চিশতিয়া সুফিবাদের প্রাচীন গ্রন্থগুলো থেকে এ তথ্য জানা যায় যে, চিশতিয়া সুফিগণ ছিলেন কাব্য রসিক এবং সঙ্গীতের উঁচু দরের সমঝদার৷ তাঁদের দরবারে নিয়মিত সামা'র (আধ্যাত্মিক কবিতা ও গান) আসর বসত, যাঁকে তাঁরা স্রষ্টার সাথে মিলনের অন্যতম অনুষঙ্গ হিসাবে নিজেদের তরিকায় ধারণ করেছিলেন। ভারতীয় উপমহাদেশে চিশতিয়া তরিকার দ্বিতীয় প্রধান সুফি হযরত খাজা কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকী, যিনি হযরত খাজা মুঈনউদ্দিন চিশতির আধ্যাত্মিক উত্তরসুরী ছিলেন, তিনি একটি সেমা'র মজলিশে আধ্যাত্মিক ভাবের চূড়ান্ত মত্ততায় পৌঁছে মূর্চ্ছা যান এবং সেই অবস্থাতেই তিনি এই দুনিয়াবী সফর শেষ করে পরম স্রষ্টার সাথে মিলিত হন৷

 

তাঁর আধ্যাত্মিক উত্তরসুরী, চিশতিয়া তরিকার আরেক মহান স্তম্ভ, হযরত বাবা ফরিদউদ্দিন মাসউদ গঞ্জে শকর পাঞ্জাবি এবং ফার্সি ভাষার বিখ্যাত একজন কবি ছিলেন৷ বাবা ফরিদের প্রধান খলিফা, আমির খুসরোর পীর খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়াও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না৷ তিনি ছিলেন কবিতার সমঝদার এবং সঙ্গীত বিশারদ। আমির খুসরো প্রায় সময় তাঁর নিকট থেকে সঙ্গীত এবং কবিতা রচনার ক্ষেত্রে পরামর্শ গ্রহণ করতেন৷ তিনি আমির খুসরোকে পরামর্শ দেন গান ও কবিতার ক্ষেত্রে জটিল ও দুর্বোধ্য পরিভাষা পরিত্যাগ করে সাধারণের উপযোগী সহজ সরল ভাষা ব্যবহার করতে। পীরের এই উপদেশ যথাযথ অনুসরণ করে আমির খুসরো জনপ্রিয়তার তুঙ্গে পৌঁছান৷ হযরত নিজামউদ্দিন আউলিয়ার দরবারে সেমা'র নিয়মিত আসর বসত, যেখানে তাঁর শিষ্যগণের মধ্যে যাঁরা কবি ও সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন, যেমন খাজা আমির খুসরো, খাজা আমির হাসান সিজঝি, খাজা সৈয়দ আহমদ প্রমুখ, তাঁরা সঙ্গীত পরিবেশন করতেন। একেকবার সেমা' শুরু হলে, এমনও হয়েছে যে, তা তিন চার দিন ধরে চলত৷ মাঝে কেবল নামাজ এবং খাবারের বিরতি দেয়া হত৷ সেই ধারাবাহিকতায় চিশতিয়া তরিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসাবে আধ্যাত্মিক সঙ্গীতের এই ধারা অদ্যাবধি বহমান৷ সৌভাগ্যের বিষয় হল মোঙ্গলরা কয়েক বার প্রচেষ্টা চালিয়েও দিল্লি দখল করতে পারেনি৷ ফলতঃ ইসলামী সঙ্গীত ও সংস্কৃতির প্রধান কেন্দ্র হিসাবে দিল্লি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং নেতৃত্বের আসনে সমাসীন হয়। বাংলাতেও যার ঢেউ এসে লাগে এবং কালক্রমে লখনৌতি, কোলকাতা, ঢাকা প্রভৃতি শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে পশ্চিম ও পূর্ব বাংলার ইসলামী সঙ্গীত ও সংস্কৃতির এক সুপরিসর পরিমণ্ডল৷

নিজাম আশ শামস: লেখক ও অনুবাদক