প্রাক-ইসলামী ও ইসলাম প্রচারের যুগে সংগীতও প্রচারিত হয়েছিল। তবে আজ আমরা সংগীত বলতে যা বুঝি তেমন ছিল না। আরব ও আরব উপদ্বীপ অঞ্চলের ছিল নিজস্ব সংগীত ধারা। আজ সংগীত নিয়ে যত বিতর্ক, প্রাক-ইসলামী যুগে তা ছিল না। ইসলামী বা আরবের সংগীত বলে যদি কিছু বোঝানো হয়, তার সূচনা হয়েছিল ইসলামের আগেই। এরপর ইসলাম প্রসারের সঙ্গে আরবের সংগীত গিয়েছিল অন্যান্য অঞ্চলে এবং সেসব স্থানের নিজস্ব সংগীতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন নতুন ধারা তৈরি হয়। তবে আরব ও ইসলামী সংগীতের ‘স্টাইল’ আলাদা করা কিছুটা কঠিন। কেননা সংগীতের ধারা এ অঞ্চলে বিধিবদ্ধ করা হয়নি। তবে হুদা, নাশিদ, সামা, মাদি নাবাওয়ি নামে কিছু ধারা পাওয়া যায়। কখনো কখনো হামদ, না’ত, মৌলুদকেও সংগীতের ধারায় যোগ করে উপস্থাপন করা হয়।
ইসলামী সংগীতের সূচনার আগের অবস্থাটি ছিল জাহিলিয়া যুগের কবিতা। সেকালের কবিদের এখনো জাহিলিয়া যুগের কবি বলেই সম্বোধন করা হয়। আরবে সে সময় কবিতার খুব চল ছিল। মরুর বুকে ঘুরে বেড়ানো পুরুষরা কখনো প্রেয়সী, কখনো প্রকৃতি, কখনো বিমূর্ত কোনো সত্তাকে উদ্দেশ করে কবিতা রচনা করত। রচনা পর্যন্তই থেমে থাকত না বিষয়টা। তারা এ কবিতা পাঠ করতেন। তারা এ কবিতাগুলো হাই নোটে আবৃত্তি করতেন। এভাবে আবৃত্তি করার কারণে কবিতার মধ্যেই গানের একটা আবেশ আসে। এরপর আবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত হয় বাদ্যযন্ত্র। ধীরে ধীরে কবিদের নামডাক হতে শুরু করলে তারা নিজেরা কবিতা পড়তেন না। এর জন্য নারীদের নিযুক্ত করা হতো। অর্থাৎ কবিতা থেকে এভাবেই তৈরি হয় গান, গীতিকার ও গায়িকা।
লুট ও রাবাবের বাজনার সঙ্গে গাওয়া এসব আরবের মরুর বুকে মানুষের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল। এ ধারার নির্দিষ্ট কোনো নাম নেই, তবে এখান থেকেই শুরু হয় হুদা, গিনা, নাসব, সনদ ও রুকবানি। এর মধ্যে হুদা জনপ্রিয় হয় খুব বেশি। ইংরেজিতে এ ধারাকে কখনো কখনো ‘সঙ অব ক্যারাভানস’ অর্থাৎ কাফেলার সংগীত বলা হয়। তবে হুদাকে উটের গান বলেও উল্লেখ করা হয়। উটচালকরা এক ধরনের গান গাইতেন বলেই এ ধরনের নামকরণ। তবে হুদার এ ব্যাখ্যা ও নামকরণ থেকে একটা জিনিস নিশ্চিত হওয়া যায় যে আরবের সংগীত মূলত তৈরি হয়েছিল এর প্রাকৃতিক পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাপনের ধারার ওপর নির্ভর করে।
হুদা, রুকবানি ও সনদ গাওয়ার এক ধরনের নিয়ম ছিল। প্রাথমিক অবস্থায় আলাদা করে সুর তৈরি করা হতো না। কবিতায় কবির ব্যবহূত মাত্রা অনুসারে পাঠ করা হতো এগুলো। মাত্রার টান অনুসারে তৈরি হতো সুর। এরপর কবিরা নিজস্ব এক ধরনের স্বকীয়তা তৈরি করেন। তারা নির্দিষ্ট ‘মাকাম’ অনুসারে পাঠ করতেন। গানগুলোর কম্পোজিশন তাই ছিল তুলনামূলক সহজ। কিন্তু দিনে দিনে গান ও গাওয়ার পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে মাকামে পরিবর্তন আসে। মাকাম বলতে মূলত আরবের গানের সুরকে বোঝানো হয়। শাব্দিক অর্থ ‘স্থান’ বা ‘পর্যায়’। কিন্তু গানের যুগ শুরু হলে পরে মাকাম যুক্ত হয় সুরের সঙ্গে এবং ধীরে ধীরে সাত সুরের সঙ্গে মিলে গিয়ে আরবের নিজস্ব ধারার সুর তৈরি হয়ে সংগীতে যুক্ত হতে থাকে।
আরবে ইসলামের প্রথম যুগে দফ বাজিয়ে গান গাওয়ার প্রচলন ছিল। বিয়ে প্রভৃতি উৎসব আয়োজনে গান গাওয়া হতো। এছাড়া ‘ইসলামী সংগীত’ বললে সেখানে যুক্ত হয় স্রষ্টার আরাধনায় গাওয়া গান। সামষ্টিকভাবে এ ধারাটিকে বলা হয় ‘নাশিদ’। হামদ, না’ত এ ধরনের সংগীতের অংশ। হামদে আল্লাহর গুণগান করা হয় এবং না’তে রাসুলের। হামদ ও না’তে বাদ্য ব্যবহার করা হয় না, তবে এতে সুরের ব্যবহার সেই প্রথম যুগ থেকেই আছে। এর বাইরে ইসলামের ইতিহাস, নানা ঘটনার বর্ণনা করা গানগুলোও নাশিদের অন্তর্গত হিসেবে ধরা হয়।
ইসলামী সংগীত ইসলামের প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে ভ্রমণ করে। আরব উপদ্বীপের রেশ নিয়ে যায় মিসর, সিরিয়া থেকে শুরু করে আন্দালুসিয়ায়। এর মধ্যে মিসরে এ অঞ্চলের নিজস্ব সংগীত ছিল। মিসরের উচ্চ অঞ্চল ও নিম্ন অঞ্চলে নানা ধরনের ফোক সংগীত ছিল, যার সুরের ধারাটি আরবের মরুর সুরের সঙ্গে মেলে। ইসলাম প্রসারিত হওয়ার পর মিসরের এ ধরনের গানের সঙ্গে হুদার সংমিশ্রণ হয়। একই ধরনের সংমিশ্রণ হয় ইরানে। তৃতীয় আরব খলিফার সময়কার এবরাহিম মা’সেলি একজন বিখ্যাত গায়ক। তার পুত্র ইসহাক ও ইসহাকের এক ছাত্র জিরিয়াব (জারিয়াব) ছিলেন আন্দালুসিয়ার সংগীত-প্রভাবিত। তিনি ইরানের সংগীতের সঙ্গে আন্দালুসিয়ার সংগীতের মিশ্রণ ঘটান।
আন্দালুসিয়ার সংগীতের ক্ষেত্রে ইসলাম ও ইসলামী সংগীতের প্রভাব ছিল প্রবল। বিশেষত ধারাটিতে জিরিয়াবের অবদান সবচেয়ে বেশি। ইরাক থেকে পালিয়ে গিয়ে তিনি কর্ডোভার আবদ আল-রহমানের দরবারে সংগীতকার হিসেবে কাজ করেছেন। এর বাইরে মরক্কোর মালহুন ছিল এক ধরনের কবিতা, যার অন্ত্যমিল ও ছন্দের কারণে তা গানের মর্যাদা পায়। এ ধরনের গান ইসলামী আমলে জনপ্রিয় হতে থাকে। আব্দুল আজিজ আল-মাগরাওয়ি, আবদের রহমান আল-মাজদুব এ ধারার গায়ক। মরক্কো ও তিউনিসিয়ার ‘নুবা’র উত্কর্ষ সাধিত হয়েছিল আন্দালুসিয়ায়। কোরাসে গাওয়া হতো এ ধারার গান। নানা ধরনের সুর ব্যবহারে সমৃদ্ধ হয় নুবা। এর সঙ্গে ব্যবহার হতো উদ রবাব, নেইয়ের মতো বাদ্যযন্ত্র।
ইসলামী সংগীতে টার্কিশ প্রভাবও অনস্বীকার্য। তুরস্কে এক সময় খ্রিস্টান আধিপত্য ছিল। কিন্তু ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার পর এখানে সংগীতে ইসলামী সংগীতের পুরনো ধারার নানা বিষয় যুক্ত হয়। তুরস্কে ইসলাম আসার আগেও ইসলামী সংগীতে তুর্ক প্রভাব ছিল। যেমন নেইয়ের ব্যবহার এর প্রমাণ দেয়। অন্যদিকে তুরস্কের ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিকে মাকামের ব্যবহার তুরস্কের সংগীতে ইসলামী ধারার প্রভাবের প্রমাণ রাখে।
সংগীতের যে ধারাগুলোতে ইসলাম ও ইসলামী বিষয়ের সরাসরি সংযোগ পাওয়া যায়, তার একটি হলো ‘মাদি নাবাওয়ি’। সপ্তম শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এর সূচনা হয়। মাদি নাবাওয়িতে রাসুল (স.) ও তার পরিবারের গুণকীর্তন করা হয়। সাধারণত এ ধরনের গানে একজন মূল গায়ক থাকেন ও তার সঙ্গে কোরাসে কয়েকজন নির্দিষ্ট কিছু লাইন পুনরাবৃত্তি করে থাকেন। এ ধরনের গান ইসলামী বিভিন্ন সাম্রাজ্য ও অঞ্চলে জনপ্রিয় ও প্রচলিত। নুবার সঙ্গে এ ধারার সংগীতের মিল রয়েছে। মিসরে বলা হয় দুর, সিরিয়ায় মুয়াসসা ও ইরাকে মাকাম আল ইরাকি।
ইসলামী সংগীতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবদান রয়েছে সুফিবাদের। আজও ইসলামী অধ্যাত্মবাদের সঙ্গে যুক্ত সংগীতের আলাপ হলে সামা নৃত্যের কথা আসে। সামা কেবল নৃত্য নয়, এর সঙ্গে যুক্ত থাকে সংগীত। স্রষ্টার গুণকীর্তন ও অন্যান্য কথার পাশাপাশি এখানে জিকির করা হয়। জিকিরকে সংগীতের ধারায় ধরা হবে কিনা তা নিয়ে তর্ক হতেই পারে, তবে বৃহত্তর পরিসরে জিকিরের তাল, লয়, সুর মিলে তা সংগীতই তৈরি করে। তাছাড়া জিকির কেবল আল্লাহর নাম করে তসবি জপাই নয়, নানা ধরনের কথা সুর দিয়ে গাওয়াও জিকিরের অংশ। এছাড়া সামায় ঘূর্ণায়মান নৃত্যে যে সুরটি রয়েছে, তাও ইসলামী সংগীতের অংশ।
ইসলামের নানা ঘটনা-দুর্ঘটনাকে জড়িয়েও তৈরি হয়েছে সংগীত। কারবালার ঘটনা স্মরণে যে ধরনের গান গাওয়া হয় তাকে বলে মার্সিয়া। মূলত শিয়া মতাবলম্বীদের মধ্যে এ সংগীত বেশি জনপ্রিয়। তবে বাংলাদেশেও মার্সিয়ার সুরে তৈরি হয়েছে নানা গান এবং তাকে ইসলামী সংগীতের মধ্যেই হিসাব করতে হবে। তাজিয়া মিছিলের সময় মার্সিয়া গাওয়া হয়। অন্যদিকে রুমির হাত ধরে যে জিকির ও সামার উত্পত্তি তা সময়ের স্রোতে এসে পৌঁছেছে ভারতীয় উপমহাদেশেও। আর তৈরি হয়েছে মুর্শিদি, কাফি ও কাওয়ালির মতো সংগীতের নানা ধারা। এর মধ্যে গুরু-শিষ্যের কথোপকথনের কাফি আফগানিস্তানে জনপ্রিয়।
কাওয়ালি পুরোপুরিই ইসলামী সংগীতের অংশ। যদিও আরব থেকে এর সূচনা নয়। তবে আল্লাহ ও রাসুলের (সা.) গুণকীর্তনের পাশাপাশি কাফির ধারাটি যুক্ত করে তৈরি কাওয়ালি ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমদের মধ্যে তুমুল জনপ্রিয়। সুফিবাদ এ ধারাটিকে প্রভাবিত করেছে তাতে সন্দেহ নেই। কাফিতে সুফিবাদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি আর সেটিই পড়েছে কাওয়ালিতে। ওরস ও অন্যান্য ধর্মীয় দিবসে কাওয়ালির আয়োজন করা হয়। কাওয়ালির একটি অংশ বলা যায় কাসিদাকে। কাসিদা মূলত প্রশংসাসূচক কবিতা। আল্লাহ ও নবীদের প্রশংসা করে কাসিদা গীত হয়। কাসিদাকে বলা চলে ইসলামী সংগীতের প্রাথমিক পর্যায়ের একটি উদাহরণ। তবে কাসিদাকে সে সময় আলাদা করে চিহ্নিত করা হয়নি।
বাংলাদেশে সাহরির সময় কাসিদা গাওয়ার সংস্কৃতি লুপ্তপ্রায় হলেও দুই দশক আগেও তা দেখা যেত। আশ্চর্যজনক একটি বিষয় হলো রমজানকেন্দ্রিক এক ধরনের গানও প্রচলিত ছিল, যার উৎস তুরস্ক। ফাসিল নামে পরিচিত এ সংগীত প্রাথমিকভাবে চার হাজার বছর আগে থেকে প্রচলিত বলে ধারণা করা হয়। ফাসিলের প্রচলন ছিল মধ্য এশিয়ার। তুরস্কের নানা গোত্র কবিতার মতো করে ফাসিল লিখত। ফাসিলের শুরুতে থাকত তাকসিম (বাদ্য দিয়ে শুরু), এরপর চার পর্বে চার ধরনের সুর ও লয়ে পাসরেভের পর ‘কার’ নামে একটি অংশ গাওয়া হতো। ফাসিলে আরব সংগীতের সেই পুরনো নিয়মটি পাওয়া যায়। পুরো গানটি একটি নির্দিষ্ট মাকামে গাওয়া হয়। আরব থেকে মধ্য এশিয়া, এ নিয়মের ব্যতিক্রম খুব কমই হয়েছে।
মাহমুদুর রহমান: লেখক





