সপ্তম শতাব্দীতে মধ্যপ্রাচ্যে যে ভৌগোলিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সমাজতাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটে তা বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসপাঠে এক অপরিহার্য অধ্যায়। ইতিহাসের এ অধ্যায়কে ঐতিহাসিকরা আরব দখলাভিযান, মুসলিম দখলাভিযান, ইসলামের প্রসার ইত্যাদি বিভিন্ন নামে আখ্যায়িত করেছেন। যে নামেই ডাকা হোক, আলোচিত অঞ্চল ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোয় এবং আরো বড় পরিসরে সমগ্র পৃথিবীর জন্য পরিবর্তনটি ছিল এক বৈশ্বিক ঘটনা। কারণ ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক যুগ-পূর্ববর্তী পৃথিবীতে ব্যবসা-বাণিজ্যের স্থলীয় পথের শাখা-প্রশাখাগুলো বিছানো ছিল অঞ্চলটির বুকজুড়ে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ধারক এ পথগুলো দিয়ে প্রাচীন বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তজুড়ে বেচাকেনা হতো নানা রকমের মসলা, হরেক ধরনের সুগন্ধি ও আসবাব। এর মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান যে জিনিসটি ছিল তা হলো রেশম। প্রাচীন পৃথিবীতে ধনাঢ্যের পরিধেয় ছিল রেশম বস্ত্র। ঐতিহাসিকরা তাই ব্যবসা-বাণিজ্যের এ পথগুলোকে একত্রে বলেন ‘রেশম মার্গ’।
এ রেশম মার্গ দিয়ে কেবল জিনিসপত্রের বেচাকেনা হতো না। আদান-প্রদান হতো তথ্য, খবর, গল্প, ইতিহাস, ধারণা ও বিশ্বাসের। যারাই এ পথকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এ রেশম মার্গ ইতিহাসে তারাই অধিষ্ঠিত হয়েছে পরাশক্তিরূপে আর অবয়ব দান করেছে বিশ্বসভ্যতাকে। সপ্তম শতাব্দীতে আরবদের উত্থান ঘটে মূলত এ রেশম মার্গের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার কারণে। আরবরা নিঃসন্দেহে একটি সভ্যতা স্থাপন করে, কিন্তু তা শূন্য হতে সৃষ্টি করেনি। এ অঞ্চলে সভ্যতা ও সংস্কৃতির উপাদান ছিল। দিগ্বিজয়ী আলেক্সান্ডার এ অঞ্চল দখল করার পর এখানে প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার প্রচার ও প্রসার ঘটে। এ অঞ্চলের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সমাজতত্ত্ব প্রাচীন গ্রিক সভ্যতা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে একটি আকার-আকৃতি ধারণ করে। আরব দখলাভিযানের পর নব্য ক্ষমতাসীনরা এ আকার-আকৃতিতে রুহ ফুঁকে দিয়ে প্রাণ সঞ্চারিত করে এক সুদূরপ্রসারী সভ্যতার।
সভ্যতা-সংস্কৃতির এক উল্লেখযোগ্য উপাদান সংগীত। প্রকৃতির শব্দ-কোলাহলের সঙ্গে মানুষ একাত্মতা বোধ করে আসছে আদিমকাল থেকে। পাখির কূজন, পশুর ডাক কিংবা প্রকৃতির কাকলির মানব অনুকরণ থেকেই সম্ভবত সুর ও সংগীতের উদ্ভব। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকরা সংগীতের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক গুণ সম্পর্কে আলোচনা ও উক্তি করেছেন। সুরের বিভিন্ন ধরনের ওপর নির্দিষ্ট আবেগের বৈশিষ্ট্য আরোপ করেছিলেন প্লাতো ও তার সমসাময়িকরা। গ্রিক ভাষায় এসব ধরনকে বলা হয় হারমোনিয়া। গ্রিক দর্শনে এ হারমোনিয়াগুলো সুরের একেক রকম সারিবদ্ধকরণ ও শ্রেণীবিন্যাস। প্লাতোর মতে, একেক হারমোনিয়া মানব চরিত্রকে একেক রকমভাবে প্রভাবিত করতে সক্ষম।
আরবরা সপ্তম শতাব্দী-পরবর্তী সময়ে সভ্যতা-সংস্কৃতির সঙ্গে এখানকার সংগীতচর্চাও আহরণ করে এবং একে এক স্বতন্ত্র রূপ দেয়। তবে ফরাসি প্রবাদ বাক্যটি এখানে যথার্থভাবেই উল্লেখ করা যেতে পারে—plus ça change, plus c’est la
même chose (প্লুস সা শঁজ, প্লুস সে লা মেম শোজ)—যতই তা বদলায়, ততই তা একই রকম। আরব সংগীতেও সুরের ধারার ধারণাটি রয়েছে। আরবি এ ধারাগুলোকে বলা হয় মাকাম। মাকামগুলো কয়েকটি শ্রেণীতে বিন্যস্ত—আজাম, বয়াত, হিজাজ, কুদর্্, নাহাওয়ান্দ, নওয়া আসার, রাস্ত্, সাবা ও সিকাহ্। গ্রিক হারমোনিয়ার ধারণার সঙ্গে তুলনাযোগ্য বয়াত মাকামের বৈশিষ্ট্য বিরহ, সাবা মাকাম তৈরি করে বেদনার আবহ, কুদর্্ মাকাম জাগিয়ে তোলে বিধুরতা, নাহাওয়ান্দ মাকাম প্রেমকাতরতার ধারক, হিজাজ মাকাম আনন্দের আহ্বায়ক ইত্যাদি।
সুরের সঙ্গে আবেগের এ সম্পর্কের কথা মাথায় রেখে আরব দার্শনিক ও চিন্তাবিদরা সুরের বহু দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন। আল-কিন্দি মানব চিকিৎসায় সুরের ব্যবহার করেছিলেন। আল-ফারাবি তার রচিত কিতাবুল মুসিকাতুল কাবিরে সংগীত ও সুরের তাত্ত্বিক বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। ইবনে সিনা সংগীত ও সুরের ব্যাপারে গ্রিকদের ধারণার ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন তার বেশকিছু গ্রন্থে। ইসলাম ধর্মচর্চায় সুরের প্রধান ব্যবহার দেখা যায় মুয়াজ্জিনের আজানে। ওসামানী খিলাফতকালে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আজান পাঁচ রকমের মাকামে দেয়া হতো। তাই মুয়াজ্জিনের সুর সম্পর্কে ধারণা থাকা ছিল অপরিহার্য।
আবীর হারুনী: লেখক





