মোগলদের বাজার সাধারণত ‘চক’ নামেই পরিচিত ছিল। দিল্লি, আগ্রা, লাহোর, পাটনার মতো শহরের প্রধান বাজারগুলোর নামকরণে তা-ই দেখা যায়, যেমন দিল্লিতে চাঁদনি চক বা শাদুল্লা খাঁ চক। দিল্লির বাজারগুলো পরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠলেও আগ্রার প্রধান বাজারে সে রকম ছাপ ছিল না। দিল্লি ও লাহোরের বাজারের চত্বর ইট বা পাথর দিয়ে বাঁধাই করা থাকত।
লাহোর,
দিল্লি, আগ্রার বাজারে পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে পণ্যদ্রব্য আসত। যমুনা নদী বেয়ে আসা পণ্য জমা হতো আগ্রার সেকেন্দ্রা বাজারে। পাটনার সিল্ক, তাঁতের পণ্য জমা হতো পাটনা বাজারে। ভাগলপুরে শাহজাদা সুজার নামে গড়ে ওঠা একটি শস্যবাজার গত শতকের নব্বইয়ের দশকেও টিকে ছিল, হয়তো এখনো আছে। ভারতের দক্ষিণে পূর্ব উপকূলে গঞ্জাম, ভিজাগাপতম, মাদ্রাজে ছিল সমৃদ্ধ বাজার। ক্যাম্বে, সুরাট ও আহমেদাবাদে জড়ো হতো গুজরাটের যত পণ্য। সপ্তদশ শতাব্দীর পর্যটক ডেলা ভ্যালে (১৬২৩) আহমেদাবাদের দৃষ্টিনন্দন ও প্রশস্ত রাজপথের দুই পাশে বিভিন্ন পণ্যের দোকানের বর্ণনা দিয়ে গেছেন। ফ্রায়ারের বর্ণনায় পাওয়া যায় সুরাটের ক্রেতার ভিড়ে ঠাসা কাপড়ের দোকান এবং ফেরিওয়ালাদের ছোট ছোট দোকানের কথা।
সিন্ধ
আঞ্চলের প্রধান বাজার ছিল সেওয়ান ও থাট্টা। এই থাট্টা থেকে ‘স্মোকড ফিশ’ বিভিন্ন বন্দর ও অন্য বাজারে যেত।
এসবই
শহরগুলোর বাজারের ধরন কিংবা বিবরণী। গ্রামীণ বাজার বলতে ছিল মূলত সাপ্তাহিক বা নির্দিষ্ট সময়ে পরপর ধারাবাহিকভাবে বসা হাট। এসব হাটে আশপাশের কৃষকরা নিয়ে আসতেন তাদের শস্য, সবজি আর হস্তশিল্প ও ব্যবসায়ীরা নিয়ে আসতেন তাদের হরেক পণ্য। হস্তশিল্প কারিগর ও ব্যবসায়ীদের সাধারণত দোকান ছিল। বিদেশী পর্যটকদের বিবরণীতে মোগল আমলে এমন গ্রামীণ হাট-বাজারের বিবরণ পাওয়া যায়। তাভের্নিয়ের জানিয়েছেন গ্রামের বাজারগুলোতে চাল, আটা, দুধ, মাখন, সবজি, চিনি, বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি পাওয়া যেত। আর একটু বড় বাজারে ভেড়া, কবুতর, মুরগি বিক্রি হতো।
গ্রামের
বাজার বেশ সুসংগঠিত ছিল। শহরের বাজারে ছিল সরকারের নিয়ন্ত্রণ। কর্মকর্তারা পণ্যের দাম ও ওজন তদারক করতেন। মেট্রোপলিটন নগর যেমন—দিল্লি, আগ্রা, লাহোরের বাজারে সারা ভারত থেকে পণ্য আসত। আগ্রার বাজার সম্পর্কে জোর্ডায়েনের মন্তব্য ছিল এমন: ‘আপনার
কল্পনায় যা কিছু আসে, তার সবই এ শহরে পেয়ে যাবেন।’ আরেক বিদেশী পর্যটক টেরি লিখেছেন, ‘ভারতের
সব বড় শহরে দিনে দুবার বাজার বসে। শীতকালে সূর্যোদয়ের পর আর সূর্যাস্তের আগে। সুরাটের বাজারে বানিয়া ও অন্য ব্যবসায়ীরা হাতে পণ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত আর ক্রেতাদের আকর্ষণ করতে চেষ্টা করত।
বাজার
ব্যবস্থার এই বিস্তৃতি, সহজ ব্যবস্থাপনা একদিক থেকে মোগল কারিগরদের পিছিয়ে দিয়েছিল। তারা যা তৈরি করত সেগুলো স্থানীয় বাজারে সহজেই বিক্রি হয়ে যেত। পণ্যের মানের উন্নতি, মান নিয়ন্ত্রণের কোনো তাগিদ তাদের ছিল না। একই সময়ে ইউরোপে প্রযুক্তির বিকাশ হতে শুরু করেছে। সেখানে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে পণ্যের মান ও উৎপাদনক্ষমতা ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছিল। কিন্তু মোগল ভারতের কোনো কিছুর তাড়া ছিল না। তারা শতবর্ষ ধরে যা উৎপাদন করেছে তা-ই অব্যাহত ছিল। উৎপাদনের যন্ত্রপাতিও সেই পুরনো আমলের।
মোগল
আমলের বাজার নিয়ে সবচেয়ে জীবন্ত বিবরণ পাওয়া যায় সম্রাট আকবরের দূত আসাদ বেগের কাছ থেকে। আসাদ বেগ বিজাপুরে একটি বাজার দেখেছিলেন, যা সাড়ে ২৭ মিটার প্রশস্থ এবং প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ। আসাদ এই বাজার নিয়ে লিখেছেন, ‘প্রত্যেক
দোকানের সামনে একটা করে সুন্দর সবুজ গাছ আছে। পুরো বাজারটি খুবই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। এ বাজারে নানা রকম দুর্লভ পণ্য পাওয়া যায়, যা অন্য শহরে দেখা এমনকি সেগুলোর নামও শোনা যায় না। এ বাজারে কাপড়, অলংকার, অস্ত্রশস্ত্র, মাছ, মদসহ আরো অনেক পণ্যের দোকান আছে।’
আসাদ
বেগের বিবরণী থেকে আরো জানা যায় যে অলংকারের দোকানে সব ধরনের রত্ন কিংবা অলংকার পাওয়া যায়। রত্নখচিত ছুরি, ভেজালি, আয়না, নেকলেস এমনকি রত্নখচিত পাখির ভাস্কর্য। দোকানের তাকে এগুলো থরে থরে সাজানো থাকত। পাশাপাশি ছিল খাদ্যদ্রব্যের দোকান। সেখানে নানা রকমের খাবার পাওয়া যেত। তারপর থাকত কাপড়ের দোকান। সেখানে থাকত সব ধরনের কাপড়। এরপর ছিল দর্জির দোকান। সেখান থেকে এগোলেই মদের দোকান। এই মদের দোকানে আবার বাহারি পানপাত্র, পেয়ালা পাওয়া যেত। চীনের পাত্র পাওয়া যেত আবার থাকত ক্রিস্টালের দামি বোতল। এরপর পাওয়া যেত ফলের দোকান। সেখানে ফলের সঙ্গে সঙ্গে মিষ্টিও বিক্রি হতো। বাজারে গায়ক ও সুন্দরী নর্তকীরাও থাকত। টাকার বিনিময়ে এরা নাচ-গান পরিবেশন করত। এক কথায় পুরো বাজার মদ, সৌন্দর্য, নর্তকী, সুগন্ধি, রত্নপাথর, আর খাবার দিয়ে পূর্ণ ছিল।
বিজাপুর
থেকে এবার ফেরা যাক মোগলদের প্রাণ দিল্লিতে। সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ভারতের বিবরণী পাওয়া যায় ফরাসি পর্যটক ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়েরের ভ্রমণবৃত্তান্ত থেকে। দিল্লির বাজারে গণৎকারদের সরব উপস্থিতির কথা জানা যায় বার্নিয়েরের বিবরণীতি: ‘কাছেই
একটি বাজার আছে যেখানে এমন কোনো জিনিস নেই যা পাওয়া যায় না। বিচিত্র সব পণ্যদ্রব্য নানা দেশ থেকে আমদানি হয় সেখানে। জিনিসের মতো নানা রকমের সব লোকজনেরও সমাবেশ হয় সেখানে। যত রকম ভণ্ড, হাতুড়ে বৈদ্য, জাদুকর ইত্যাদি বিভিন্ন রাজ্যে আছে সব এসে জমা হয় বাজারে। গণৎকার ও জ্যোতিষীদেরও বেশ ভিড় হয় এবং তাদের মধ্যে হিন্দুও আছে মুসলমানও আছে।’ বার্নিয়েরের বিবরণ থেকে জানা যায় তখন ওড়নায় মুখ ঢেকে নারীরাও বাজারে আসতেন। আপাদমস্তক সাদা ওড়নায় ঢেকে স্ত্রীলোকেরা বাজারে এসে গণৎকারের সামনে হাত বের করে বসে এবং নিজেদের ব্যক্তিগত জীবন সম্বন্ধে এমন কোনো গোপন কথা নেই যা তারা ঈশ্বরের মূর্তিমান প্রতিনিধি এই গণৎকারদের কাছে বলে না। স্পষ্টতই এ অবৈজ্ঞানিক চর্চাকে বার্নিয়ের কঠোর সমালোচনার দৃষ্টিতে দেখেছেন। তবে একই সঙ্গে তারা এ সমালোচনা থেকেও সে আমলে দিল্লির বাজারের প্রাণবন্ত ছবি পাওয়া যায়।
দিল্লির
বাজারে-দোকানে হরেক পণ্য পাওয়া গেলেও দোকানের সাজসজ্জা নিয়ে বার্নিয়ের হতাশ হয়েছিলেন। এ নিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘দিল্লি
শহর মোগল সম্রাটের শ্রেষ্ঠ রাজধানী এবং নানা রকমের মূল্যবান জিনিসপত্রেরও আমদানি হয় সেখানে, তা হলেও দিল্লি শহরের মধ্যে আমাদের এখানকার (ইউরোপীয়) শহরের মতো পথঘাট নেই, এমনকি সারা এশিয়া মহাদেশেই নেই বলা চলে। মূল্যবান পণ্যদ্রব্য সাধারণত সেখানে গুদামজাত করে রাখা হয় এবং দোকানপাতি কখনো সাজানো হয় না। দোকান সাজানোর ব্যাপারে যেন দিল্লির ব্যবসায়ীরা অভ্যস্ত নয়। কদাচিৎ এক-আধটি দোকান এ রকম দেখা যায়, যেখানে ভালো ভালো রেশমি বস্ত্র, সোনা-রুপার জরির কাজ করা নানা রকমের ঝালর, শিরস্ত্রাণ ইত্যাদি সাজিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু এ রকম একটি দোকানের বদলে ২৫টি দোকান দেখা যায় যেখানে কিছুই সাজানো থাকে না দেখার মতো।’
তবে
দিল্লির ফলের বাজারের প্রশংসা করেছেন বার্নিয়ের: ‘একটি
ফলের বাজার আছে, যা বাস্তবিকই দেখার মতো। ফলে বাজারে দোকানের সংখ্যাও যথেষ্ট এবং গ্রীষ্মকালে এসব দোকান নানা রকমের ফলে ভর্তি হয়ে যায়। নানা দেশ থেকে ফলের আমদানি হয় দিল্লির বাজারে। পারস্য থেকে, বল্খ বোখারা, সমরকন্দ থেকে ফলের আমদানি হয় ঝুড়ি ঝুড়ি। কত রকমের ফল তার ঠিক নেই—পেস্তা, বাদাম, আখরোট, খুবানি ইত্যাদি।’
বার্নিয়েরের
উল্লেখ করা একটি কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য দিয়ে এ লেখার ইতি টানতে চাই। ঢাকার বিভিন্ন খাবারের দোকানেই অনেক সময় ভেজাল, বাসি খাবার বিক্রির ঘটনার কথা শোনা যায়। সপ্তদশ শতাব্দীর দিল্লির বাজারেও পরিস্থিতিটা এমনই ছিল। বার্নিয়ের আমাদের তেমনটাই জানাচ্ছেন: ‘বাজারে
অনেক দোকান আছে, যেখানে নানা রকম রান্না মাংস বিক্রি হয়। কিন্তু সেসব বাজারের রান্না মাংস বিশ্বাস করে খাওয়া যায় না। কারণ কিসের মাংস যে রান্না করা থাকে, তা অনেক সময় বলা মুশকিল। ঘোড়ার মাংস, উটের মাংস এমনকি ব্যাধিগ্রস্ত মৃত ষাঁড়ের মাংসও রান্না করে বাজারের দোকানে বিক্রি করা হয়। সুতরাং বাজারের খাদ্যের ওপর নির্ভর করাই যায় না।’
তথ্যসূত্র:
দ্য
মোগল
ওয়ার্ল্ড, আব্রাহাম এরালি
মুঘল
অর্থনীতি:
সংগঠন
ও
কার্যক্রম, জগদীশ নারায়ণ সরকার
বাদশাহী
আমল, বিনয় ঘোষ
লেখক: শানজিদ অর্ণব





