সপ্তদশ শতাব্দীতে ভারতে বাজার বসত মূলত খোলা আসমানের তলায়। ছাদ ও দেয়ালে ঢাকা বাজার পশ্চিম এশিয়ায় দেখা গেলেও ভারতে তা ছিল নতুন। দিল্লিতে এমনই এক ছাদ ঢাকা বাজার নির্মাণ করিয়েছিলেন মোগল সম্রাট শাহজাহান।

মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের পুত্র শাহজাহান ১৬২৮ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির সিংহাসনে বসেন। মোগল সালতানাতের পঞ্চম সম্রাট তিনি। সাম্রাজ্যজুড়ে দৃষ্টিনন্দন মোগল স্থাপত্যের নির্মাতা হিসেবে শাহজাহানের খ্যাতি রয়েছে। স্থাপত্যপ্রেমী এ সম্রাটের উদ্যোগে স্ত্রী মমতাজ মহলের জন্য নির্মিত প্রেমের নিদর্শন আগ্রার তাজমহল এখনো বিশ্বের আশ্চর্যতম স্থাপত্য হিসেবে বিবেচিত হয়। এছাড়াও দিল্লির ঐতিহাসিক লালকেল্লাসহ শাহজাহানের আমলের মোগল স্থাপত্য ছড়িয়ে রয়েছে বাংলা, লাহোর, পেশওয়ার অবধি।

দিল্লির লালকেল্লায় সম্রাট শাহজাহান নির্মাণ করেন অনন্যসাধারণ একটি বাজার, যার পরিচিতি ‘ছাতা চক’ নামে। ইংরেজিতে একে ডাকা হয় কাভারড মার্কেট নামে, এককথায় ছাদ ঢাকা বাজার। সহজ কথায় আধুনিক মার্কেটের প্রোটোটাইপ। একসময় এটি বাজার-ই-মুসাক্কাফ (সাকাফ বা ছাদবেশিত বাজার) কিংবা ছাতাবাজার নামে সাধারণের কাছে পরিচিত ছিল। নাম দেখেই অনুমান করা যায়, এটা সাধারণ কোনো বাজার নয়। মোগল হেরেমের নারী সদস্যের জন্য বিশেষভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল এ বাজার। এ কারণে বাজারটিতে সদাই করতে আসা রাজপরিবারের প্রভাবশালী নারীদের পর্দা রক্ষার বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

মোগল হেরেমে অসংখ্য নারী থাকতেন। তাদের পরিধেয় বস্ত্র, অলংকার, ঘর সাজানোর কিংবা শখের জিনিসপত্র বিক্রি করতে বাইরে থেকে বিক্রেতারা হেরেমে আসতেন। মোগল অভিজাত নারীরা পর্দার আড়ালে থেকে জিনিসপত্র কিনতেন। তবে এতে একদিকে যেমন ঘুরে ঘুরে দরদাম করে জিনিস কেনার মজা থাকত না, তেমনি অনেক সময় হেরেমের নারীদের পর্দা বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি রয়ে যেত।

এ সমস্যার সমাধান করতে হেরেমের নারীদের জন্য সম্রাট শাহজাহান নির্মাণ করেন ছাতা চক। লালকেল্লার লাহোরি প্রবেশদ্বারের ঠিক পেছনের দিকে এ বাজার নির্মাণ করা হয়। এতে ছাদ ঢাকা তোরণশোভিত দ্বিতল ভবন নির্মাণ করা হয়, যার দৈর্ঘ্য ২৩০ ফুট ও প্রস্থ ১৩ ফুট। মোগল স্থাপত্যের ঢেউ খেলানো পাথুরে ছাদ এ বাজারের জৌলুস আরো বাড়িয়ে তোলে। ৩২টি খিলান দোকানের মতো ব্যবহূত হতো।

পূর্ব ও পশ্চিম দুই ভাগে পুরো বাজারটি বিস্তৃত। ছাদ ঢাকা হলেও এতে প্রাকৃতিক আলো ও বাতাস ঢোকার সুন্দর ব্যবস্থা রাখা হয়, যা দিল্লির গরম পরিবেশের জন্য উপযুক্ত। ওই সময় বাজারের মাঝখানে ৩০ ফুটের একটি খোলা উঠান ছিল। আরো ছিল চার ফুট উঁচু প্ল্যাটফর্ম। এখান থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি বাজার নিয়ন্ত্রণের কাজ করা হতো।

বাজারের প্রবেশমুখের দুই পাশের সুবিশাল দুটো দরজা আর হাঁটা পথ নির্মাণ করা হয়। লাহোরি প্রবেশদ্বারের পেছনে সুদৃশ্য বাজার নির্মাণে শাহজাহানের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল বলে মনে করা হয়। ওই সময় বিভিন্ন উৎসব আয়োজনে এ প্রবেশদ্বার দিয়ে সর্বসাধারণ লালকেল্লায় ঢুকতেন। ফলে প্রবেশপথে মোগল সাম্রাজ্যের ঐশ্বর্য, মেধা আর সক্ষমতার নিদর্শন হিসেবে ছাতা চক পরিচিতি পেয়েছিল।

১৬৩৮-৪৮ সালের মধ্যে বাজারটি নির্মাণ করা হয়। ওই সময় মোগল হেরেমের নারীরা নিয়মিত এ বাজারে আসতেন। সম্রাট, যুবরাজ ও নির্দিষ্ট কয়েকজন আত্মীয় সম্পর্কীয় অভিজাত পুরুষের বাজারটিতে প্রবেশাধিকার ছিল। বাইরের পুরুষদের জন্য ছাতা চকে প্রবেশ পুরোপুরি নিষিদ্ধ ছিল। এমনকি এখানকার বিক্রেতারাও ছিলেন নারী।

মূলত ইরানের ইস্পাহানে ওই সময় নারীদের জন্য এমন একটি অভিজাত বাজার ছিল। সপ্তাহে একদিন রাজপরিবার ও অভিজাত বংশের নারীরা পর্দা মেনে বাজার করতে পারতেন। পারস্য ছাড়িয়ে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোয় নারীদের জন্য এমন স্বতন্ত্র বাজারের প্রচলন ছিল। এমনকি পেশওয়ারে মোগল দুর্গের ভেতরেও এমন একটি বাজার দেখেছিলেন শাহজাহান। সেসব জায়গা থেকে ধারণা নিয়ে দিল্লির অভিজাত নারীদের জন্য ছাতা চক নির্মাণ করেন স্থাপত্যপ্রেমী এ মোগল সম্রাট। ছাতা চক নির্মাণের দায়িত্ব পড়ে শাহজাহানের বিশ্বস্ত মুকারমাত খানের ওপর। তিনি পারস্য, পেশওয়ারের আদলে দিল্লিতেও গড়ে তোলেন পর্দাঘেরা বাজার।

প্রায় পৌনে ৪০০ বছর আগে ছাতা চকে দামি দামি সিল্ক, মখমল, পশমি কাপড়ের পসরা সাজিয়ে বসতেন বিক্রেতারা। পাওয়া যেত স্বর্ণ-রৌপ্যের অভিজাত অলংকার ও মূল্যবান রত্নপাথর। রাজপরিবার ও অভিজাতদের ব্যবহারের জন্য কার্পেট, গালিচা, শতরঞ্জি, জাজিম, মোগল নারীদের পছন্দের পশমিনা শাল, পশু-পাখি, ঝাড়বাতি, জরি ও ব্রোকেট বসানো সুচিকর্ম, মূল্যবান কাঠ ও কাঠের খোদাই করা শিল্পকর্ম, সিরামিকের বাসন, হাতির দাঁতের শিল্পকর্ম ও নিত্য ব্যবহার্য সামগ্রী, লোহা ও তামার তৈরি জিনিস, জাফরান ও কস্তুরিসহ বিভিন্ন দামি মসলাসহ নানা জিনিস পাওয়া যেত এ বাজারে। কথিত আছে, ছাতা চকে একটি চায়ের দোকানও ছিল। চীন থেকে আমদানি করা উপাদেয় চা পান করতে সেখানে অভিজাতরা আসতেন।

পর্যটক আকর্ষণের জন্য মোগল স্থাপত্য ছাতা চক এখনো টিকে রয়েছে। দেশী-বিদেশী পর্যটকদের পদচারণে মুখর থাকে বাজারটি। তবে আগের সেই জৌলুস আর নেই। পর্যটকদের জন্য বিভিন্ন স্যুভেনিরের পসরা সাজিয়ে বসেন বিক্রেতারা। দিল্লির বিখ্যাত চাঁদনি চক ও মীনা বাজার ঘুরে দেখার এক ফাঁকে পর্যটকরা ঢুঁ মারেন শাহজাহানের আমলের অনন্য স্থাপনা ছাতা চকে।

২০০৩ সাল থেকে ১৭ শতকের এ স্থাপনার দেখভালের দায়িত্বে রয়েছে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া। প্রতিষ্ঠানটি ঐতিহ্যবাহী এ বাজার ফের চালু করার উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে দিল্লি হাইকোর্ট এক আদেশে এটিকে শুধু ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবে ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে। পুরোদস্তুর কোনো বাণিজ্যিক কার্যক্রম এখানে পরিচালনা করা যাবে না।

বর্তমানে ছাতা চকের দুই পাশের সুবিশাল দুটো দরজা বন্ধ করা যায় না। তবে বাজারে প্রবেশের পথগুলো আগের তুলনায় সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। স্বাধীনতা দিবস কিংবা প্রজাতন্ত্র দিবসে নিরাপত্তাজনিত কারণে এ পথে সাধারণ মানুষের চাপ বেড়ে যায়। বাড়তি মানুষের চাপে এরই মধ্যে ছাতা চকের প্রবেশমুখ ও হাঁটা পথের অনেকটাই ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে ২০০৭ সালে ইউনেস্কো লালকেল্লাকে বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণার পর ছাতা চকসহ পুরো এলাকাটি কম্প্রিহেনসিভ কনজারভেশন ম্যানেজমেন্ট প্ল্যানের (সিসিএমপি) আওতায় সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যা জৌলুস হারালেও ছাতা চকের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ধরে রাখতে সহায়তা করছে।

 

ডেকান হেরাল্ড অবলম্বনে