‘চান্দু কী চাচা নে চান্দু কী চাচী কো

চাঁদনি রাত মে, চাঁদনি চক মে

চাঁদি কী চাম্মাচ সে চাটনি চাটায়ী।’

 

ওপরের কথাগুলো ‘টাং টুইস্টার’ হিসেবে দিল্লিতে খুবই প্রচলিত। শুধু দিল্লি কেন, ভারতের অনেক জায়গায়ই প্রচলিত। আর প্রচলিত কথার মাঝেই মূলত একটি শহর বা অঞ্চলের পরিচয় লুকিয়ে থাকে। কেননা শ্লোক, উপকথা, কিংবদন্তির মাঝেই থাকে শহরের ইতিহাস এবং তার সঙ্গে জড়িত ঐতিহ্য। একইভাবে উপর্যুক্ত কথাগুলোর মধ্য থেকেই বোঝা যায় দিল্লির সাথে চাঁদনি চকের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। দিল্লির কথা এলেই চাঁদনি চকের নাম আসবে। চাঁদনি রাতের কথা আসবে। দিল্লির মতো দিল্লির বাসিন্দাদের সাথেও চাঁদনি চকের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক।

‘চক’ শব্দটা মূলত ‘চক’ নয় বরং ‘চওক’, সংস্কৃত ‘চতুষ্কা’ থেকে যার উত্পত্তি এবং এর অর্থ দাঁড়ায় ‘চতুষ্কোণ সমৃদ্ধ’। তবে চওক বলতে সহজ অর্থে সেই জায়গা বোঝায়, যেখানে চার রাস্তা এসে মিশে একটা পরিসর তৈরি করেছে কিংবা আরো সহজ অর্থে চক বলতে এখন বাজার বা জমায়েত বোঝানো হয়।

সম্রাট শাহজাহানের কীর্তি হিসেবে মানুষ আজও তাজমহলের কথাই স্মরণ করে। কিন্তু তাজের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে শাহজাহানের আরেক কীর্তি ‘শাহজাহানাবাদ’। লাল কেল্লাকে কেন্দ্র করে শাহজাহান এক শহর গড়ে তুলেছিলেন। মসজিদ, সরাই, কেল্লা, বাজার নিয়ে এক বিস্তৃত শহর গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল শাহজাহানের। অনেকটা তিনি করেও ছিলেন, কিন্তু কালের পরিক্রমায় টিকে আছে কেবল লাল কেল্লা। মানুষের চোখে ওটিই পড়ে। কিন্তু এই শাহজাহানাবাদেরই এক অংশ ছিল চাঁদনি চক। অবশ্য চাঁদনি চকের ক্ষেত্রে কৃতিত্ব যতখানি না শাহজাহানের, তার চেয়ে বেশি জাহানারা বেগমের।

উত্তরাধিকার যুদ্ধে দারার পক্ষে থাকার পরও আওরঙ্গজেব নিজ বাদশাহির সময়ে জাহানারাকে ‘পাদিশাহ্ বেগম’ উপাধি দিয়েছিলেন। জাহানারার প্রতিভা, ক্ষমতা ও মোগল সাম্রাজ্যে তার গুরুত্ব এখান থেকেই অনুমান করা যায়। মোগল নারীদের মধ্যে গুণের আধার যারা ছিলেন তাদের মধ্যে জাহানারা অন্যতম। সুফিবাদে আগ্রহী, কবি, দানশীল এই নারীর আরেক পরিচয় তিনি চাঁদনি চকের নকশাকার।

১৬৪৮ খ্রিস্টাব্দে শাহজাহানাবাদ নির্মাণের অব্যবহিতপরে জাহানারা একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তিনি সিদ্ধান্ত নেন এখানে একটি সরাই স্থাপন করবেন। দিল্লিতে তখন মধ্য এশিয়া থেকে বণিকদের আনাগোনা লেগেই থাকত। জাহাঙ্গীরের সময় থেকেই আসতে শুরু করেছিল ইউরোপীয় বণিকেরা। এমন অবস্থায় দিল্লির উপকণ্ঠে একটি সরাই স্থাপনের সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী ছিল। শাহজাহানের প্রিয়তম এই কন্যা তার পিতার মতোই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা করেছিলেন শাহজাহানাবাদ নিয়ে। স্টিফেন ব্লেক জাহানারার পরিকল্পনা সম্পর্কে জাহানারার জবানে লেখেন, ‘আমি বৃহৎ ও শীলিত একটি সরাই স্থাপন করব যা হিন্দুস্তানে অনন্য হবে। পথিকেরা এর প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতেই তাদের দেহ মনের ক্লান্তি কেটে যাবে আর আমার নাম অক্ষয় হয়ে থাকবে।’

জাহানারা সে সরাই বানিয়েছিলেন। এই ‘ক্যারাভান সরাই’-য়ের সঙ্গে ছিল একটি বাগান। ‘চারবাগ’ ধারার এই বাগান ও সরাইয়ের মিলিত সৌন্দর্যে সত্যিই পথিক, বণিকেরা মুগ্ধ হতেন। আর যেখানে বণিক, সেখানেই ব্যবসা। কিংবা যেখানে ব্যবসা সেখানে বণিকেরা আসবেন বলে সরাই প্রয়োজন। বাজার আর সরাই তাই অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত ছিল। জাহানারা সেভাবেই এই বাজার আর সরাইয়ের নকশা করেছিলেন।

শাহজাহানাবাদের লাহোরি দরওয়াজা থেকে ফতেহ্পুরি মসজিদ পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার লম্বা ও ১২০ ফুট চওড়া যে বাজার জাহানারা নকশা করেছিলেন আদতে তার নাম চাঁদনি চক ছিল না। বলা যায় কোনো নামই ছিল না। ধীরে ধীরে তা চাঁদনি চক হয়ে ওঠে। নামের এই রহস্য ভাঙার জন্য আমরা আবার এই লেখার শুরুতে যেতে পারি যেখানে চান্দুর চাচা-চাচির সঙ্গে চাঁদির চামচের কথা আছে।

হিন্দিতে ‘চাঁদি’ (উচ্চারণে চান্দি) শব্দের অর্থ রুপা। রুপার রঙের সাথে জোছনার মিল থেকে রুপাকে চাঁদি বলা হয় এমন একটা মতবাদ আছে। কিন্তু জাহানারা বেগমের নকশা করা বাজার আদতে জোছনার কারণেই চাঁদনি চক নামে পরিচিত। বাজার এবং সরাই তৈরির সময়ে কিংবা শাহজাহানাবাদ তৈরির পর পরই সেখানকার পানির চাহিদা মেটানোর চিন্তা করতে হয়েছিল। সে সমস্যার সমাধান করতে যমুনা থেকে একটি সরু খাল কেটে আনা হয়। খালটি বাজারের এ মাথা থেকে সে মাথা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, কিন্তু আসল সৌন্দর্য জাহানারা সৃষ্টি করেছিলেন বাজারের ঠিক মাঝখানে একটি জলাশয় খনন করে।

অগভীর হলেও জলাশয়টি হয়ে উঠেছিল বাজারের অন্যতম আকর্ষণ। আমরা যদি এ সময়ে বসে মনে করি বিদ্যুৎ আবিষ্কারের বহু আগে হয়তো দিনের আলো ফুরিয়ে গেলেই মানুষ কাজ শেষ করে ঘরে ফিরত, কিন্তু আদতে দিল্লির মতো শহরে তা হতো না। অনেক রাত অবধি সওদা হতো। আর যেসব রাতে জোছনা উঠত আকাশে, সেই জোছনা প্রতিফলিত হতো বাজারের মধ্যবর্তী জলাশয়ে। পুরো বাজারেই ছড়িয়ে পড়ত এক রুপালি আলো। আর চাঁদের আলোর সেই খেলায় এর নাম চাঁদনি চক হলো।

স্টিফেন ব্লেক লেখেন, ‘কোনো কোনো রাতে মূল জলাশয়ে চাঁদের আলো প্রতিফলিত হয়ে পাণ্ডুর এক রুপালি আলো তৈরি করত। সে আলো থেকে এর নাম চাঁদনি চক হয়ে যায়। এ নামই ধীরে ধীরে আর অন্যান্য নামকে সরিয়ে দিয়ে লাহোরি দরওয়াজা থেকে ফতেহ্পুরি মসজিদ পর্যন্ত পুরো একালাকে চাঁদনি চক নামে পরিচিতি দেয়।’

চাঁদনি চকের সাথে দিল্লির যে গভীর সম্পর্ক তার শুরুও বলা যায় এখান থেকেই। বাজারের এই জলাশয়, তার জন্য খনন করা খাল, পুরো শাহজাহানাবাদকেই উপকৃত করেছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর লেখক চতুর্মন রায় লেখেন, ‘জলবাহী এই ধারা দিল্লিকে সতেজ করে তুলেছিল। দিল্লিজুড়েই এই ধারা বয়ে চলত আর তার ফলে কূপগুলো জলপূর্ণ হয়ে উঠত। শাহজাদাদের প্রাসাদ থেকে শুরু হয়ে দিল্লির পথ বয়ে এই ধারা চাঁদনি চকে পৌঁছত, তারপর সাদুল্লা খাঁর প্রাসাদ হয়ে অন্যান্য আমিরদের বাড়ি ঘুরে পুরো দিল্লিতে ছড়িয়ে পড়ত।’


যেমনটা বলা হয়েছে চাঁদনি চকের দৈর্ঘ্য প্রায় এক কিলোমিটার (১৫২০ গজ) আর প্রশস্ততায় ১২০ ফুট এবং ১৬৫০ খ্রিস্টাব্দে এখানে ১ হাজার ৫৬০টি দোকান থাকার কথা জানা যায়। চাঁদ বা চাঁদনির সাথে এখানে আরো কিছু মিল রয়েছে। যেমন বার্নিয়েরের বর্ণনা অনুযায়ী এখানকার বেশির ভাগ দোকানই নাকি ছিল অর্ধচন্দ্রাকৃতি। এমনকি বাজারটিও অর্ধচন্দ্রাকারে বিন্যাসের নকশা করা হয়েছিল বলে বলা হয়।

চাঁদনি চক তিন অংশে বিভক্ত ছিল। উর্দু বাজার, জহুরি বাজার ও ফতেহ্পুরি বাজার। লাহোরি দরওয়াজা থেকে গুরুদুয়ারা পর্যন্ত উর্দু বাজার বিস্তৃত ছিল। উর্দু বাজার অঞ্চলে ছিল মোগল সৈন্য, কেরানি পদের লোকজনের বাস ও তাদের কারবার। জহুরি বাজার মূলত অর্থনৈতিক লেনদেনের বড় আখড়া হয়ে উঠেছিল। কেননা এখানে স্বর্ণ, রৌপ্য প্রভৃতি নিয়ে কারবার হতো। আর ফতেহ্পুরি মসজিদের নিকটবর্তী অংশ ফতেহ্পুরি বাজার।

একটি বিষয় উল্লেখ্য, ঢাকা শহরের নিউমার্কেটের কাছে ‘চাঁদনি চক’ বা পুরান ঢাকার ‘চক বাজার’ যেমন শুধু ‘মার্কেট প্লেস’ হিসেবে আমাদের কাছে পরিচিত, চাঁদনি চক মূলত তেমন বাজারে সীমাবদ্ধ ছিল না। চাঁদনি চক শাহজাহানাবাদেরই একটি অংশ হিসেবে গড়ে উঠেছিল। শাহজাহানাবাদকে একটি ‘শহর’ হিসেবে গড়ে তোলার ইচ্ছা ছিল শাহ জাহানের। সে হিসেবে চাঁদনি চককে শাহজাহানাবাদের উপশহর বলা যেতে পারে।

এ কথা উল্লেখ করার অন্যতম কারণ হলো ব্যবসার পাশাপাশি চাঁদনি চকে সে সময়েই বসতি গড়ে উঠতে শুরু করে। উর্দু বাজার কেবল বাজারই ছিল না, বরং সেখানে মোগল সৈন্য ও সমপর্যায়ের কর্মচারীরা বসতি স্থাপন করে। চাঁদনি চকজুড়েই এমন বসতি গড়ে ওঠে। চতুর্মন রায়ের লেখা থেকেই বোঝা যায় চাঁদনি চকে অনেক বসতি গড়ে উঠেছিল আর সেসব বসতির প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ করত সেই দীর্ঘ খালটি।

এখনো চাঁদনি চকের কথা বলতে গেলে এসব বসতির কথা উঠে আসে। একনামে ‘হাভেলি’ বলে এসব বসতি পরিচিত। পুরনো দিল্লি সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে সংস্কারের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। তার মাঝেও সরেজমিনে সেখানে গিয়ে পড়লে চাঁদনি চকের এসব হাভেলি আর তার বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। কেননা আয় রোজগার, পদমর্যাদা অনুসারে এক একজন হাভেলি তৈরি করেছিলেন। সেখান থেকে পরখ করলেই উর্দু বাজার আর জহুরি বাজারের পার্থক্য স্পষ্ট হবে।

কিন্তু যে শাহজাহানকে ‘স্বর্ণযুগের মোগল সম্রাট’ বলা হয়, সে স্বর্ণযুগ পেরিয়ে গেছে বহু আগে। তাই শাহজাহানের সময়ে জাহানারার তৈরি করা সেই চাঁদনি চক আমরা এখন দেখতে পাব না। তবে চাইলে এখনো বাল্লিমারোতে গালিবের হাভেলি খুঁজে পাওয়া সম্ভব। কবি গালিব তার ‘দাস্তাম্বু’-তে লিখে গেছেন উর্দু বাজারের ধ্বংসের কথা। সিপাহি বিদ্রোহের পর ইংরেজদের রোষের অনেকটাই বুক পেতে ভোগ করেছে দিল্লি আর চাঁদনি চক। তবু এখনো কোনো কোনো স্থাপনা টিকে আছে তার পুরনো ইতিহাস নিয়ে। বেগম সমরু, বেগা বেগম, গালিব ও সিপাহি বিদ্রোহের ইতিহাস বহন করে তারা।

বাস্তবে আজ চাঁদনি চকের সেই নান্দনিক সৌন্দর্য দেখতে না পারলেও কল্পনার চোখে তা সম্ভব। কল্পনা করুন পাঠক, আমরা আমাদের সময়ে নেই বরং পিছিয়ে গেছি সাড়ে তিনশ বছরেরও বেশি সময়। কোনো এক সন্ধ্যার দৃশ্য। লাহোরি দরওয়াজা পেরিয়ে উর্দু বাজার। আশপাশে মোগল সৈন্যদের বাড়ি। পদমর্যাদায় কেউ হয়তো ভাড়াটে সৈন্য, কেউ দশজনের নেতা কিংবা কেউ একশজনের। সেই অনুসারেই একেকজনের বাড়ি। কারো কারো হাভেলি। আশপাশে রুটির দোকান কিংবা মাংসের। কোথাও হয়তো দুধ, ঘি, মাখন নিয়ে বসেছে কেউ। একদিকে হল্লা, একদিকে সওদা।

এগিয়ে গেলে এসব দোকানের সংখ্যা কমে যাবে। দেখা যাবে রত্নপাথর মণিমাণিক্যের সওদাগরদের। সেখানে রুবি, পান্না, চুনি নিয়ে জহুরিরা বসে আছে। কোথাও কাপড়ের দোকান। নানা দেশী-বিদেশী কাপড় সাজিয়ে বসে আছে তারা। একেক দোকানের সওদার একেক রূপ। সেখানে গন্ধ, ভাষা, সহবতও ভিন্ন। এমন সময় হাঁটতে হাঁটতে হয়তো দেখা যাবে আকাশে মস্ত বড় একটা চাঁদ উঠেছে। সেই চাঁদের আলোয় আলোকিত হয়েছে পুরো চাঁদনি চক। রেশমের বস্ত্র পরা কোনো আমিরের স্ত্রী হয়তো তখন বেছে বেছে পান্না খরিদ করছেন। কিন্তু চাঁদনি চকের রূপের তুলনায় তিনি তখন ম্লান।

পাঠক, কল্পনার জগৎ থেকে আমরা এখন কিছুক্ষণের জন্য বেরিয়ে এসে কিছু তথ্যের দিকে মনোযোগ দিতে পারি। প্রথমত, ইতিহাস বলে চাঁদনি চকে রুটি, মাংস, কাবাব, বিভিন্ন ফল, যেমন—নানা জাতের খেজুর, তরমুজ, খরমুজ, পেঁপে, নানা রকম বস্ত্র থেকে শুরু করে হীরা, চুনি, পান্নার সওদা হতো। এমনকি এখানে বিক্রি হতো ফুল। বাদ যেত না হুঁকোর কল্কে। অর্থাৎ হেন পণ্য নেই যা চাঁদনি চকে মিলত না। অর্থাৎ চাঁদনি চক হয়ে উঠেছিল বাণিজ্যের পীঠস্থান। এখানে কেবল দেশী বণিকরাই ব্যবসা করতেন না, বরং আসতেন বিদেশী বণিকও।


যেমন এসেছিলেন মানুচি, বার্নিয়ের। যদিও তারা ঠিক ব্যবসার কাজে আসেননি। কিন্তু তাদের বর্ণনাতেই দিল্লির অনেক কিছু জানা যায়। বার্নিয়ের অবশ্য সমালোচনা করেছেন দিল্লির দোকানের। প্রথমত, বার্নিয়েরের ধারণা দিল্লির দোকানগুলো সুসজ্জিত নয়, এলোমেলো করে মালপত্র রাখা হয়। তিনি এখানকার রুটির বদনাম করেছেন, পাশাপাশি সন্দেহ প্রকাশ করেছেন মাংসের মান নিয়ে। অবশ্য আমরা মুদি দোকান বলে যা বুঝি বার্নিয়েরের বর্ণনা থেকে মনে হয়েছে তিনি সেসবের কথাই বলেছেন, যেখানে শস্য টাল দিয়ে রাখা হয়, খোলা অবস্থায় বিক্রি হয় দুখ, মধু, গুড় ইত্যাদি। এটি উর্দু বাজারের চিত্র হওয়া অসম্ভব নয়।

কিন্তু বার্নিয়েরের বর্ণনা থেকেই বোঝা যায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে বহু কিছু নিয়েই পসরা সাজিয়েছিল দিল্লির বাজার তথা চাঁদনি চক। কেননা তিনিই বলেছেন এখানে নানা রকম পণ্য এসে পৌঁছত এবং সওদা করত দেশী-বিদেশী মানুষ। বাণিজ্যের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল চাঁদনি চক কিংবা দিল্লির প্রাণ। আর বলা চলে সে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জাহানারা বেগম।

শিল্পের পাশাপাশি জাহানারা ব্যবসার দিকেও মনোযোগী ছিলেন। তিনি জাহাজ কিনে ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছিলেন। ডাচ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বিনিয়োগ করায় উৎসাহী ছিলেন। ফলে চাঁদনি চকে বিদেশী বণিকদের আনাগোনা বেড়েছিল বৈ কমেনি। তাই চাঁদনি চকের বাজারে দেখা মিলোত পর্তুগিজ, ডাচ প্রভৃতি ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের। ঘোড়া নিয়ে আসা আরব কিংবা পারস্যের ব্যবসায়ীরা তো ছিলেনই, এমনকি চীন থেকে মনোকলজাতীয় চশমা পর্যন্ত আসত এখানে। এর অনেকখানি কৃতিত্বই জাহানারা বেগমের।

স্বপ্না লিডলে লেখেন, ‘নিজস্ব সম্পদ থাকার কারণে জাহানারা শিক্ষামূলক নানা কাজে পৃষ্ঠপোষকতা করতে সক্ষম হয়েছেন।’ প্রচলিত ইতিহাসে জাহানারার দান ও শিক্ষামূলক কাজে পৃষ্ঠপোষকতাই পরিচিত, কিন্তু চাঁদনি চকের মাধ্যমে তিনি ব্যবসায়িক ও স্থাপত্যের দিক দিয়েও অনেককে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। শাহজাহানাবাদের মূল শহরের সাথে ক্যারাভান সরাই, বেগম কা বাগ আর চাঁদনি চক যোগ করে তিনি এ পরিকল্পনাকে পূর্ণতা দিয়েছিলেন। এজন্য প্রয়োজন হয়েছিল পরিকল্পনা, জ্ঞান ও সাহস।

জাহানারা যে বিস্তৃত বাণিজ্যক্ষেত্র তৈরি করেছিলেন তার সেই সোনালি সময় আর নেই। ধ্বংস হয়ে গেছে শহর, হারিয়ে গেছে অনেক ইমারত। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া সময়ের ছাপ এখনো রয়ে গেছে দিল্লি আর চাঁদনি চকের পথে পথে। ভগ্নস্তূপের মধ্য দিয়েই এখনো অনেক ইতিহাসবিদ কিংবা স্বপ্নজীবী দেখতে পান অপূর্ব জোছনা। সেখানেই বেঁচে থাকে চাঁদনি চক, বেঁচে থাকেন জাহানারা।

 

নোট:

১.  Shahjahanabad: The Sovereign City in Mughal India

২. Travels in the Mogul Empire (১৬৫৬-১৬৬৮)

৩. Chandni Chowk: The Mughal City of Old Delhi (২০১৭)

 

মাহমুদুর রহমান: লেখক